ফেরাউন যখন বলল, “হে মূসা, তোমাদের রব কে?”—এ প্রশ্ন বাইরে থেকে সাধারণ মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক গভীর সংঘাত: মানুষের অহংকার বনাম আকাশ-জমিনের সত্য। এই আয়াতে দৃশ্যত জিজ্ঞাসা, কিন্তু অন্তর্গতভাবে এটি ছিল তাওহীদের ওপর চাপানো একটি পরীক্ষামূলক তিরস্কার। ফেরাউন নিজেকে কর্তৃত্বের কেন্দ্রে বসাতে চেয়েছিল; তাই সে এমন প্রশ্ন করল, যেন রবের পরিচয় মানুষের হাতে বন্দি কোনো ধারণা। অথচ মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াত মানুষকে ঠিক এই বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করার জন্যই এসেছিল—যে মুক্তি স্মরণকে জাগায়, হৃদয়কে নরম করে, আর আত্মাকে সত্যের দিকে ফিরিয়ে আনে।
এখানে “তোমাদের রব” বলা হয়েছে—আর এই সম্বোধনের মধ্যেই তাওহীদের আলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মূসা ও হারুন আলাইহিস সালাম ফেরাউনের দরবারে কোনো ব্যক্তিগত মতবাদ নিয়ে দাঁড়াননি; তাঁরা এসেছিলেন সমস্ত মানুষের একমাত্র পালনকর্তার খবর নিয়ে। রব মানে শুধু স্রষ্টা নন, তিনিই প্রতিপালক, দিশারী, রক্ষাকারী, জীবনের প্রতিটি স্তরের মালিক। ফেরাউনের প্রশ্ন তাই অনিচ্ছায় হলেও এক মহাসত্যকে উন্মোচন করে: মানুষের যাবতীয় শক্তি, রাজ্য, ঘোষণা—সবই ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু রবের কর্তৃত্ব চিরন্তন। এই আয়াত আমাদের শেখায়, দাওয়াতের পথে যখনই শক্তির কণ্ঠ জিজ্ঞাসা তোলে, তখনও মুমিনের উত্তর ভেতরে ভেতরে প্রস্তুত থাকে—আমাদের আশ্রয় সেই রব, যিনি হৃদয়ের শব্দ শোনেন, দুঃখ জানেন, এবং পথহারা বান্দাকে আবার তাঁর দিকে ফিরিয়ে নেন।
সূরা ত্বহার এই পর্বে মূসা আলাইহিস সালামের মিশনের সঙ্গে মানুষের চিরন্তন অবস্থাও জড়িয়ে যায়। এটি কেবল প্রাচীন মিশরের এক দরবারের প্রশ্ন নয়; এটি প্রতিটি যুগের প্রশ্ন—কে তোমার রব? কে তোমার ভরসা? কে তোমার জীবনের মানে নির্ধারণ করে? ইতিহাসের পটভূমিতে এখানে এক স্বৈরশাসক দাঁড়িয়ে আছে, আর তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে ওহির আলো। কুরআন এই দৃশ্যকে এমনভাবে তুলে ধরে যে তা আমাদের হৃদয়ে ফিরে আসে: যখন অহংকার প্রশ্ন করে, তখন ঈমানকে নীরব হতে নেই; বরং তাকে সত্যের নরম কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিতে হয়। এই উত্তরই অন্তরের সান্ত্বনা—যে সান্ত্বনা বলে, মানুষের প্রশ্ন বড় নয়, রবের পরিচয়ই বড়; মানুষের দরবার ক্ষণিকের, কিন্তু আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনই স্থায়ী শান্তি।
ফেরাউনের কণ্ঠে এই প্রশ্ন যেন শুধু একটি জিজ্ঞাসা নয়, বরং অহংকারের ভেতর থেকে ছুঁড়ে দেওয়া এক চ্যালেঞ্জ—হে মূসা, তোমাদের রব কে? কিন্তু তাওহীদের আলো এমনই; তা প্রশ্নের মুখেও আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানুষ যখন নিজেকে কেন্দ্রে বসায়, তখন তার চোখে রবের ধারণা দূরত্বের বিষয় হয়ে যায়। অথচ মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াত ছিল এই ভ্রম ভেঙে দেওয়ার জন্যই—মানুষকে সেই সত্যের কাছে ফিরিয়ে আনা, যিনি শুধু সৃষ্টি করেন না, প্রতিপালনও করেন; যিনি কেবল আকাশ-জমিনের মালিক নন, হৃদয়ের গোপন কাঁপনও জানেন। এই আয়াতে ফেরাউনের উদ্ধত প্রশ্নের আড়ালে এক বড়ো বাস্তবতা প্রকাশ পায়: ক্ষমতা যতই গর্জাক, সে রবের পরিচয় নির্ধারণ করতে পারে না, বরং সত্যের সামনে তার প্রশ্নও একদিন সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
ফেরাউন যখন জিজ্ঞেস করল, “হে মূসা, তোমাদের রব কে?”—এ প্রশ্নের ভেতরে ছিল কেবল জেদ নয়, ছিল মানুষের সীমাহীন অহংকারের ঘোষণা। সে যেন বলতে চাইল, ক্ষমতা যার হাতে, পরিচয়ের মানদণ্ডও তার হাতে। কিন্তু নবীদের দাওয়াত এমন দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙতেই আসে। “রব” শব্দটি এখানে শুধু স্রষ্টার নাম নয়; তিনি যিনি সৃষ্টি করেন, লালন করেন, রক্ষা করেন, পথ দেখান, আবার অন্তরের ভাঙা টুকরোগুলোও জোড়া দেন। তাই এই প্রশ্নের উত্তর কেবল জিহ্বার নয়—এটি হৃদয়ের, এটি জীবনের, এটি আত্মসমর্পণের।
এই আয়াত আমাদেরও থামিয়ে দেয়। আমরা কি সত্যিই জানি আমাদের রব কে, নাকি দুনিয়ার শব্দে, ভয়েতে, অভ্যাসে, মানুষের প্রশংসা-নিন্দায় আমাদের হৃদয় ছিন্নভিন্ন হয়ে আছে? ফেরাউনের দরবারে মূসা আলাইহিস সালামের উপস্থিতি আমাদের শেখায়, তাওহীদ কখনো নির্জীব স্লোগান নয়; এটি সেই দীপ্ত চেতনা, যা ক্ষমতার মুখেও কম্পিত হয় না, আর একা হয়ে গেলেও নিঃসঙ্গ হয় না। কারণ যার রব আল্লাহ, তার ভরসা সংখ্যায় নয়, চেহারায় নয়, প্রাচুর্যে নয়—তার ভরসা চিরজাগ্রত সত্যে। সমাজ যখন অহংকারে অন্ধ, তখন নবীর কাজ হয় স্মরণ জাগানো; আর সেই স্মরণই মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ফিতরাতকে আবার জাগিয়ে তোলে।
এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আত্মা যেন নিজের আদালতে হাজির হয়: আমি কার দিকে ফিরছি, কার জন্য বাঁচছি, কার সন্তুষ্টি খুঁজছি? ভয় ও আশা—দুটিই তখন নতুন অর্থ পায়। কারণ আল্লাহই রব হলে, তাঁর কাছে ফেরা লজ্জার নয়; বরং সেটাই একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। ফেরাউনের মুখ থেকে বের হওয়া এই প্রশ্ন তাওহীদের বিপরীতে এক উপহাস হয়ে উঠেছিল, কিন্তু আল্লাহর কিতাবে তা আমাদের জন্য এক দরজা খুলে দেয়: নিজের রবকে চেনা, স্মরণকে জীবিত করা, এবং অন্তরের অস্থিরতাকে সিজদার দিকে ফিরিয়ে দেওয়া। যে হৃদয় “রব”কে চিনে, সে আর অন্য কারও সামনে চূড়ান্তভাবে নত হয় না; সে জানে, শেষ আশ্রয় একমাত্র আল্লাহ।
ফেরাউনের প্রশ্নের ভেতরে ছিল অহংকারের দম্ভ, কিন্তু মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াতের ভেতরে ছিল এমন এক শান্ত অথচ অটল সত্য, যা যুগে যুগে মানুষের বুক কাঁপিয়ে দেয়: তোমাদের রব একমাত্র তিনিই, যিনি সৃষ্টি করেছেন, পথ দেখিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন, মৃত্যু দেবেন, আর অন্ধকারের ভিতরেও হিদায়াতের আলো জ্বালিয়ে রাখেন। যে রবকে মানুষ স্মরণে ভুলে যায়, তিনি স্মরণে হারিয়ে যান না; বরং বান্দার অবহেলায়ও তাঁর দয়া থামে না। তাই এই প্রশ্ন কেবল ফেরাউনের মুখের প্রশ্ন নয়, এ প্রশ্ন আমাদের হৃদয়ের দরজায়ও কড়া নাড়ে—তোমার ভরসা কি সত্যিই তোমার রব, নাকি তুমি এখনো ক্ষমতা, নাম, কারণ, মানুষ, কিংবা নিজের আত্মপ্রশংসার কাছে মাথা নত করে আছো?
এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, তাওহীদ শুধু বাক্যে উচ্চারণের বিষয় নয়; এটি অন্তরের সবচেয়ে গোপন আসন দখল করা এক নীরব বিপ্লব। যখন হৃদয় এক রবকে চিনে, তখন ভয় তার আসল সীমা জানতে শেখে; যখন হৃদয় এক রবকে স্মরণ করে, তখন পৃথিবীর শোরগোল আর তাকে সম্পূর্ণ গ্রাস করতে পারে না। মূসা আলাইহিস সালামের কাহিনি আমাদের শেখায়—দাওয়াত মানে মানুষের সামনে মাথা তুলে অহংকারকে ভাঙা নয়, বরং হৃদয়ের ভেতরকার মিথ্যা প্রভুদের সরিয়ে সত্য রবের দিকে ফিরিয়ে আনা। আজও এই আয়াত আমাদের জিজ্ঞেস করে: তুমি কাকে রব মানছো, আর কাকে শুধু মুখে রব বলছো?
সুতরাং, এই প্রশ্ন শুনে ফিরে আসো। কারণ যে হৃদয় তার রবকে চিনে ফেলে, সে হৃদয় আর শূন্য থাকে না। সেখানে ভয়ে কেঁপে ওঠার বদলে তাওবা জন্ম নেয়, বিচ্ছিন্নতার জায়গায় স্মরণ জন্ম নেয়, আর পথহীনতার জায়গায় সান্ত্বনা নেমে আসে। হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরকে তোমার দিকে ফেরাও; আমাদের স্মরণকে জীবন্ত করো; আমাদের অহংকারকে ভেঙে দাও, আর এমন ঈমান দান করো, যা ফেরাউনের প্রশ্নের সামনে নয়, তোমার সামনে নত হতে জানে।