আল্লাহ বলেন, “ভয় করো না, আমি তোমাদের সাথে আছি; আমি শুনি ও দেখি।” এ এক আয়াত নয়, যেন ভয়ে কাঁপা হৃদয়ের ওপর নেমে আসা আসমানি হাত। মূসা ও হারুনের সামনে যখন ফেরাউনের মতো শক্তিমান, উদ্ধত ও জালিম এক বাস্তবতা দাঁড়িয়ে আছে, তখন আল্লাহ তাদের প্রথমে শক্তি দেন নসিহতের ভাষায় নয়, প্রথমে দেয় আশ্বাসে: তোমরা একা নও। দাওয়াতের পথ সবসময়ই বাহ্যিকভাবে দুর্বল মনে হতে পারে, কিন্তু যার সাথে আল্লাহ আছেন, তার দুর্বলতা-ই একদিন হিকমতের আলো হয়ে ওঠে।
এই বাক্যের মধ্যে তাওহীদের এক গভীর প্রশান্তি আছে। মানুষ দেখে অল্প, শোনে অল্প, ভরসা করে অল্প; কিন্তু রব শুনেন সম্পূর্ণ, দেখেন সম্পূর্ণ, জানেন গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু। তাই এই আয়াত বান্দাকে শেখায়, নিজের কণ্ঠ ক্ষীণ হলেও তার আহ্বান হারিয়ে যায় না, নিজের পদক্ষেপ ছোট হলেও তা অদৃশ্য হয় না। যারা আল্লাহর পথে মানুষকে ডাকে, তারা যেন মনে রাখে—দাওয়াতের সাফল্য মানুষের অনুমোদনে নয়, আল্লাহর মুআইয়াতে, তাঁর সান্নিধ্যে।
সূরা ত্বহার এ প্রেক্ষাপটে মূসা আলাইহিস সালামের কাহিনি কেবল ইতিহাসের বিবরণ নয়; এটি ভয়, দায়িত্ব, বাকচাতুর্য, এবং সত্যের মুখোমুখি হওয়া মানুষের অন্তরের গল্প। এ আয়াতের ব্যাপ্তি তাই এক সময়ের ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি প্রত্যেক মুমিনের অন্তরে নেমে আসে, যখন পরিবারে, সমাজে, অন্যায়ের সামনে, কিংবা নিজের নফসের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে সে কেঁপে ওঠে। তখন এই আয়াত বলে—ভয় পেয়ো না, কারণ তোমার রব দূরে নন; তিনি শোনেন, তিনি দেখেন, আর তাঁর দেখার মধ্যেই আছে তোমার জন্য নিরাপত্তা, সান্ত্বনা, এবং চলার শক্তি।
এই আয়াতের ভেতরে এমন এক আসমানি সান্ত্বনা আছে, যা ভয়ের অন্ধকারকে ভেদ করে হৃদয়ের গভীরে নেমে যায়। আল্লাহ যখন বলেন, “ভয় কোরো না,” তখন তা শুধু মূসা ও হারুনের জন্য নয়; তা যেন প্রত্যেক সত্যপথিকের কাঁপা বুকে উচ্চারিত চিরন্তন অভয়বাণী। দাওয়াতের রাস্তা সবসময়ই কঠিন, কারণ সেখানে মুখোমুখি হতে হয় মানুষের অহংকার, ক্ষমতার দম্ভ, আর সত্যের সামনে দাঁড়ানো প্রতিরোধের। কিন্তু আল্লাহর সান্নিধ্য থাকলে ভয় আর ভয় থাকে না; তা হয়ে যায় ইবাদতের এক ক্ষীণ ছায়া, যা রবের আলোয় গলে যায়। বান্দা যখন একাকিত্ব অনুভব করে, তখন এই বাক্য তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়—একাকী হওয়া আর পরিত্যক্ত হওয়া এক নয়। আল্লাহর সঙ্গে থাকা মানে এমন এক নিরাপত্তা, যেখানে শত্রুর দৃশ্যমান শক্তিও হৃদয়ের শান্তিকে ছিনিয়ে নিতে পারে না।
যে দাওয়াত আল্লাহর জন্য, তা বাহ্যিক হিসাবের কাছে দুর্বল মনে হতে পারে; কিন্তু রবের নাসর যেখানে আছে, সেখানে দুর্বলতাই হিকমতের বাহন হয়ে ওঠে। মূসা-হারুনের এই অভিযাত্রা আমাদের শেখায়, সত্যের পথে চলা মানে কেবল কথা বলা নয়, বরং রবের ওপর এমন ভরসা স্থাপন করা, যা হৃদয়ের কাঁপনকেও সিজদায় রূপ দেয়। যখন মানুষকে ডাকতে গিয়ে নিজের ভাষা ছোট মনে হয়, নিজের শক্তি ক্ষীণ মনে হয়, নিজের অবস্থান অনিরাপদ মনে হয়, তখন এই আয়াত বুকে নেমে এসে বলে—তোমাদের কাজ ফল সৃষ্টি করা নয়, তোমাদের কাজ সত্য পৌঁছে দেওয়া; ফলের মালিক আল্লাহ। আর যিনি শুনছেন, দেখছেন, তোমাদের সঙ্গে আছেন—তিনি পথ জানেন, তিনি সময় জানেন, তিনি প্রতিটি নীরব অশ্রুকেও জানেন।
এই আয়াতের ভিতরে বান্দার জন্য এক অদ্ভুত কিন্তু অশেষ সান্ত্বনা লুকিয়ে আছে: তুমি যেখানে ভয় পাও, সেখানে তোমার রবও তোমার সাথে আছেন। মূসা ও হারুন আলাইহিমাস সালাম যখন জালিম ফেরাউনের দরবারের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন, তখন আল্লাহ তাদের ভয়কে তুচ্ছ করে দেন না; বরং সেই ভয়কে নিজের উপস্থিতির আলো দিয়ে গলিয়ে দেন। এটাই তো দাওয়াতের পথ—কণ্ঠ কাঁপতে পারে, পা থমকে যেতে পারে, মানুষের মুখের কঠোরতা সামনে দাঁড়াতে পারে; কিন্তু যদি অন্তর জানে, “আমি একা নই,” তবে ভাঙা সুরও হিদায়াতের আহ্বানে পরিণত হয়। আল্লাহর এই সান্নিধ্য মানে শুধু সাহায্য নয়, এ মানে আশ্রয়; শুধু সমর্থন নয়, এ মানে অন্তরের গভীরে এমন এক নিশ্চয়তা, যা বাহ্যিক শক্তির অভাবকেও লজ্জিত করে দেয়।
আল্লাহ বলেন, “আমি শুনি ও দেখি”—এ বাক্যটি বান্দাকে এমন এক আত্মসমালোচনার সামনে দাঁড় করায়, যেখান থেকে আর পালানোর পথ থাকে না। মানুষ অনেক কিছু আড়াল করে, নিজের দুর্বলতা ঢেকে রাখে, অন্যায়কে যুক্তি দিয়ে সাজায়, নীরবতাকে নিরাপত্তা ভাবে; কিন্তু যে রব শুনেন ও দেখেন, তাঁর সামনে কিছুই অদৃশ্য নয়। সমাজ যখন অহংকারে কঠিন হয়ে ওঠে, যখন সত্যের ডাককে অবহেলা করে, যখন শক্তিমানের কণ্ঠ ন্যায়বোধকে চাপা দেয়, তখন এই আয়াত হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে: তোমার গোপন অশ্রুও দেখা হচ্ছে, তোমার নীরব কষ্টও শোনা হচ্ছে, তোমার সংগ্রামও হারিয়ে যাচ্ছে না। তাই বান্দা ভয় ও আশা—দুটোর মাঝখানে ভারসাম্য শিখে; ভয় করে নিজের গাফিলতিকে, আশা করে রবের রহমতকে।
সূরা ত্বহার এই আয়াত আমাদের স্মরণ করায়, দাওয়াতের ময়দানে সফলতা প্রথমে মানুষের চোখে নয়, আল্লাহর নজরে। ফেরাউনের শক্তি যত বড়ই হোক, আল্লাহর “আমি তোমাদের সাথে আছি” তার চেয়ে বড়; মানুষের কণ্ঠ যত উচ্চই হোক, রবের শুনা তার চেয়ে গভীর; সমাজের অন্ধকার যত ঘনই হোক, আল্লাহর দেখা তার ভেতরেও আলো পৌঁছায়। তাই যে বান্দা নিজের অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেয়, সে আর ভয়কে চূড়ান্ত সত্য মনে করে না। সে জানে, প্রত্যাবর্তনের দরজা খোলা আছে, স্মরণের আলো এখনও নিভে যায়নি, এবং যিনি মূসাকে বলেছিলেন “ভয় কোরো না,” তিনিই আজও ভীত হৃদয়কে বলেন—তুমি আমার সঙ্গে থাকো, আমি তোমার সঙ্গে আছি। এই সান্ত্বনা শুধু অতীতের এক নবীর জন্য নয়; এটি কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি ঈমানদারের জন্য অন্তরের আশ্রয়।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, ভয় আসলে আল্লাহর অভাব থেকে নয়; ভয় আসে যখন অন্তর নিজের চারপাশে শুধু দেয়াল দেখে, আকাশ দেখে না। মূসা ও হারুনের জন্য এই উত্তর ছিল পথচলার শুরুতে এক আসমানি আশ্বাস, আর আমাদের জন্য তা আজও একই সত্য—যে রব বলেন, “আমি তোমাদের সাথে আছি,” তাঁর বান্দা কখনো নিঃসঙ্গ নয়, যদিও চারপাশে মানুষ নীরব হয়ে যায়, সমর্থন সরে যায়, আর সত্যের পথে পা রাখতে গিয়ে বুক কেঁপে ওঠে। আল্লাহর সাথে থাকার অর্থ এই নয় যে বিপদ থাকবে না; বরং বিপদের মাঝেও অন্তর ভেঙে পড়বে না। কারণ যিনি শোনেন, তিনি হারিয়ে যেতে দেন না; যিনি দেখেন, তিনি জুলুমকে অনন্তকাল ছাড় দেন না।
তাই এই আয়াত শুধু ফেরাউনের দরবারে উচ্চারিত এক সান্ত্বনা নয়; এটি প্রত্যেক ভীত হৃদয়ের জন্য এক জীবন্ত ডাক। তুমি যখন দাওয়াত দাও আর ভাষা জড়িয়ে আসে, তুমি যখন সত্য বলতে গিয়ে একা হয়ে যাও, তুমি যখন তাওহীদের পথে চলতে গিয়ে নিজের দুর্বলতা অনুভব করো, তখন স্মরণ করো—আল্লাহ দেখছেন, শুনছেন, সাথে আছেন। এই স্মরণই বান্দার ভিতরে ইমানের মেরুদণ্ড গড়ে তোলে। আর যে অন্তর নিজের উপর নয়, রবের উপর ভরসা করতে শেখে, সে ধীরে ধীরে ভয়কে উপাসনা থেকে সরিয়ে দেয়, আত্মসমর্পণকে জীবনের ভাষা বানায়, এবং প্রতিটি পদক্ষেপে বলে ওঠে: আমি একা নই; আমার সাথে আছেন সেই মহান সত্তা, যাঁর সামনে ফেরাউনের অহংকারও তুচ্ছ, আর মুমিনের অশ্রুও অমূল্য।