সূরা ত্বহার এই আয়াতে মূসা আলাইহিস সালাম এমন এক প্রার্থনা করছেন, যা মানুষের সব বড় কণ্ঠস্বরের চেয়েও বেশি সত্যবহ, বেশি কোমল, বেশি বিনীত। তিনি বলেন, “এবং আমার জিহবা থেকে জড়তা দূর করে দিন।” নবুওতের ভার কাঁধে নেওয়ার আগমুহূর্তে তিনি নিজের শক্তির ওপর নির্ভর করেননি; বরং আল্লাহর কাছে নিজের দুর্বলতাকে খুলে ধরেছেন। এই বিনয়ে লুকিয়ে আছে দাওয়াতের আসল আদব: সত্য বলার আগে প্রথমে আল্লাহর সাহায্য চাইতে হয়, কারণ মুখের ভাষা যতই শুদ্ধ হোক, অন্তরের খুলে যাওয়া ছাড়া বাণী হৃদয়ে নামে না।
এখানে “জিহবার জড়তা” শুধু উচ্চারণের একটি অস্পষ্টতা নয়; এর ভেতরে আছে সেই মানবিক আশঙ্কা, যা একজন দায়িত্ববান নবীর মুখে এসে আরও পবিত্র হয়ে ওঠে। মূসা আলাইহিস সালাম চান, আল্লাহ যেন তাঁর কথা এমনভাবে উন্মুক্ত করে দেন, যাতে তাওহীদের আহ্বান স্পষ্ট হয়, অপব্যাখ্যার অন্ধকার না থাকে, আর সত্যের ডাক মানুষকে আহত না করে পৌঁছে যায়। দাওয়াতের ময়দানে কখনো শব্দই সব নয়—শব্দের ভেতর যে নরম আলো, যে আন্তরিকতা, যে আল্লাহনির্ভরতা, সেটাই মানুষের অন্তরকে জাগায়। এই আয়াত আমাদের শেখায়, সত্যের পথে দাঁড়িয়ে নিজেকে দক্ষ ভাবা নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া ভাষা ও আল্লাহর দেওয়া প্রশান্তি চাওয়া।
মূসার এই আর্তি কেবল একটি ব্যক্তিগত প্রয়োজনের কথা নয়; এটি এক বৃহত্তর নবুওতি বাস্তবতার দরজা খুলে দেয়। সামনে আছে ফেরাউনের কঠিন দরবার, পেছনে আছে মিসরের জুলুমের ইতিহাস, আর মাঝখানে আছে তাওহীদের মহান ঘোষণা। এমন সময় একজন রাসূলের মুখে উচ্চারিত এই দোয়া প্রমাণ করে, হিদায়াতের কাজ কখনো কৃত্রিম ভাষণ দিয়ে হয় না; তা হয় ভাঙা হৃদয়, নির্মল অন্তর আর আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা দিয়ে। যে বান্দা নিজের জিহবার জড়তা দূর করার জন্যও রবের কাছে হাত তোলে, সে-ই আসলে জানে—দাওয়াতের সফলতা বক্তৃতার দক্ষতায় নয়, আল্লাহর তাওফিকে। আর এই আয়াত আমাদেরও মনে করিয়ে দেয়, আমাদের মুখের কথা, আমাদের নসিহত, আমাদের সাক্ষ্য—সবকিছুর আগে দরকার সেই রহমত, যা অন্তরকে নরম করে, আর জিহবাকে সত্যের বাহন বানায়।
আল্লাহর সামনে নিজের দুর্বলতাকে অস্বীকার করা নবীদের পথ নয়; বরং সেই দুর্বলতাকেই দোয়ার আলোয় তুলে ধরা তাঁদের সর্বোচ্চ বিনয়। মূসা আলাইহিস সালাম এখানে এমন এক জিহ্বার কথা বলছেন, যা সত্যের ভার বহন করতে গিয়ে নিজেকেই অসহায় মনে করে। এই অসহায়ত্বে কোনো লজ্জা নেই; বরং আছে বান্দার গভীরতম শুদ্ধতা। কারণ দাওয়াতের আগে প্রথম জিনিস ভাষা নয়, হৃদয়। আর হৃদয় যদি আল্লাহর হাতে না থাকে, তবে সবচেয়ে সুন্দর বাক্যও ফাঁপা হয়ে যায়। জিহবার জড়তা দূর করার এই মিনতি আসলে সেই প্রার্থনা, যাতে কথা কেবল উচ্চারিত না হয়, বরং পৌঁছে যায়; কেবল শোনা না হয়, বরং অন্তরে বসে যায়।
এই আয়াত আমাদেরও অস্থির বুকের ভিতর শান্ত করে। আমরা অনেকেই বলতে গিয়ে থেমে যাই, ন্যায়ের কথা উঠলেই জিহ্বা ভারী হয়ে আসে, সত্যের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে কণ্ঠ শুকিয়ে যায়। মূসার দোয়া তখন আমাদেরও দোয়া হয়ে ওঠে: হে আল্লাহ, আমাদের কথায় জড়তা থাকুক, যদি সেই জড়তা অহংকারকে ভেঙে দেয়; আর আমাদের ভাষা খুলে দিন, যদি তা তোমার দিকে ডেকে নেয়। কারণ শেষ বিচারে মানুষকে বদলায় কেবল শব্দ নয়, আল্লাহর দেওয়া সত্য, আল্লাহর দেওয়া আন্তরিকতা, আর আল্লাহর দেওয়া আলো।
মূসা আলাইহিস সালামের এই প্রার্থনায় একটি সূক্ষ্ম শিক্ষা আছে: আল্লাহর দিকে ডাকতে হলে আগে নিজের ভেতরের ভাঙন স্বীকার করতে হয়। মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে সত্য বলা সহজ নয়; বিশেষত যখন সত্যে জবাবদিহি আছে, বিরোধিতা আছে, অহংকারের পাহারা আছে। তাই তিনি নিজের দুর্বলতাকে লুকোন না, বরং তা নিয়ে আল্লাহর দরবারে হাজির হন। এটাই আত্মসমালোচনার পবিত্র রূপ—আমি যথেষ্ট নই, আমার ভাষাও যথেষ্ট নয়, আমার সাফল্যও আমার হাতের নয়; যদি তুমি সাহায্য না করো, তবে আমার কণ্ঠে সত্য থাকলেও তার পৌঁছানো অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
এই আয়াত আমাদের সমাজের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। মানুষ যখন সত্য থেকে দূরে সরে যায়, তখন কথা ভারী হয়ে ওঠে; হৃদয় কঠিন হলে বাক্যও কঠিন হয়, আর নরম আহ্বানও অবজ্ঞার মুখে পড়ে। মূসা আলাইহিস সালাম যেন শেখাচ্ছেন, দাওয়াতের পথ কেবল যুক্তির পথ নয়, এটি সান্ত্বনারও পথ, দয়ারও পথ, আল্লাহর পক্ষ থেকে খুলে দেওয়া ভাষারও পথ। তাওহীদের বাণী কেবল ঘোষণা করার বিষয় নয়; সেটি এমনভাবে বলা চাই, যাতে অন্তর জেগে ওঠে, অনুতাপ নড়েচড়ে বসে, আর মানুষ নিজের রবের দিকে ফিরতে ভয় না পেয়ে ভরসা করতে শেখে।
যে হৃদয় নিজের জিহবার জড়তা নিয়ে আল্লাহর কাছে যায়, সে-ই প্রকৃত অর্থে মুক্ত হতে শুরু করে। কারণ অন্তরের ভার নামিয়ে না দিলে মুখের ভাষা পবিত্র হয় না, আর অন্তরের কাঁপুনি আল্লাহর সাহায্যে সুরে পরিণত না হলে দাওয়াত পূর্ণতা পায় না। এই আয়াত আমাদের শেখায়: আগে বিনয়, তারপর বয়ান; আগে সাহায্য, তারপর উচ্চারণ; আগে আল্লাহর দিকে ফেরা, তারপর মানুষের দিকে ডাকা। আর যে ব্যক্তি এভাবে নিজের দুর্বলতাকে রবের সামনে রাখে, তার কণ্ঠস্বর হয়তো জড়, কিন্তু তার দোয়া জীবন্ত; তার ভাষা হয়তো নরম, কিন্তু তার ভেতরকার তাওহীদ পাহাড়ের মতো দৃঢ়।
এই দোয়ার ভেতর আমরা এক বিস্ময়কর সত্য দেখতে পাই: আল্লাহর পথে ডাক দিতে হলে প্রথমে নিজের ভেতরের গিঁটগুলো আল্লাহর হাতে সোপর্দ করতে হয়। মানুষ কখনো ভাষাকে দোষ দেয়, কখনো সাহসের অভাবকে, কখনো পরিস্থিতিকে; কিন্তু মূসা আলাইহিস সালাম আমাদের শেখান, নবুওতের সামনে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হলো আল্লাহর কাছে ভাঙা কণ্ঠে ফিরে যাওয়া। কারণ হৃদয় যদি আল্লাহর দিকে সঁপে না দেওয়া হয়, তবে মুখের শব্দ অনেক, আর সত্যের আলো কম। আর হৃদয় যদি তাঁর হাতে নরম হয়ে যায়, তবে জড়তাও রহমতের দরজা হতে পারে—মানুষের দুর্বলতা তখন আল্লাহর কুদরতের সাক্ষ্য হয়ে ওঠে।
কতবার আমরা সত্য বলতে গিয়েও কেঁপে উঠেছি, কতবার ভালো কথা মুখে এসে গলায় আটকে গেছে, কতবার গুনাহের ভার আমাদের ভাষাকে শুষ্ক করে দিয়েছে। এই আয়াত যেন আমাদেরও শেখায়: নিজের অক্ষমতাকে লুকিও না, বরং আল্লাহর সামনে তা খুলে ধরো। দাওয়াত, ইলম, নসিহত, ক্ষমা চাওয়া, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো—সবকিছুর আগে দরকার সেই বিনয়, যেখানে বান্দা বোঝে, আমি বলব বটে, কিন্তু কথা পৌঁছাবে তিনি যাঁর হাতে হৃদয়ের চাবি। তখন জিহবার গিঁট শুধু খুলে যায় না, অন্তরের কঠোরতাও গলে যায়। আর যে হৃদয় নরম হয়, সে তাওহীদের আলোকে ভয় পায় না; বরং তার ভেতর এক গভীর সান্ত্বনা জন্ম নেয়—আমার রব আমার দুর্বলতাও জানেন, তবু আমাকে ডাকছেন।