قَالَ خُذْهَا وَلَا تَخَفْ ۖ سَنُعِيدُهَا سِيرَتَهَا ٱلْأُولَىٰ — আল্লাহর এই একটি বাক্য যেন কাঁপতে থাকা হৃদয়ের ওপর নেমে আসা আসমানি হাত। মূসা আলাইহিস সালামকে যখন আল্লাহ তাআলা লাঠি ধরতে বললেন, তখন তিনি ভয় পেলেন; কেননা যা তাঁর হাতে ছিল, তা এখন আর সাধারণ এক লাঠি নয়, তা আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন, এক জীবন্ত নিদর্শন, যা অবাক করে দেয়, পরীক্ষা করে, আর বান্দার অন্তরকে নত করে দেয়। আল্লাহ বললেন, ‘ধরো, ভয় কোরো না’—অর্থাৎ কুদরত যখন প্রকাশ পায়, তখন ভয় নয়; বরং রবের ওপর পূর্ণ ভরসাই মুমিনের আসল আশ্রয়।

এই আয়াতের সরাসরি প্রেক্ষাপট সূরা ত্বহার সেই মহান মুহূর্ত, যেখানে মূসা আলাইহিস সালামকে নবুওয়াত ও দাওয়াতের দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। এখানে কোনো অজানা কাহিনি নয়, বরং আল্লাহর ওহির ভেতর দিয়ে একজন নবীকে শিখিয়ে দেওয়া হচ্ছে—সত্যের পথে হাঁটতে হলে অলৌকিক নিদর্শনও আল্লাহর হুকুমের অধীন, আর সেগুলো ভয় জাগানোর জন্য নয়, বরং হেদায়েতের দরজা খুলে দেওয়ার জন্য। মূসার হৃদয়ে যে কাঁপন, তা মানুষের দুর্বলতা; আর আল্লাহর এই সান্ত্বনা, তা নবুওয়াতের সৌন্দর্য: বান্দা কাঁপে, কিন্তু রব তাকে তুলে ধরেন।

‘সনু‘ীদুহা সিরাতাহাল উলা’—আমি আবার একে আগের রূপে ফিরিয়ে দেব—এই অংশে লুকিয়ে আছে এক গভীর রহমত। যিনি ভেঙে যাওয়া জিনিসকেও ফিরিয়ে আনতে পারেন, তিনি মানুষের ভীত হৃদয়, বিছিন্ন আত্মবিশ্বাস, দুঃখে নুয়ে পড়া অন্তরকেও তার প্রথম স্বচ্ছতায় ফিরিয়ে দিতে পারেন। দাওয়াতের পথেও এই সত্যই আমাদের সান্ত্বনা: মানুষের সামনে সত্য বলা সহজ নয়, অন্তর কাঁপে, পা থরথর করে; কিন্তু আল্লাহ যদি বলেন ‘ধরো’, তবে ধরা নিরাপদ। তিনি যদি বলেন ‘ভয় কোরো না’, তবে ভয়কে জমা রাখাই ঈমানের অবমাননা। এই আয়াত মূসার জন্য যেমন ছিল, তেমনি প্রতিটি মুমিনের জন্যও—যেখানে আল্লাহ আছেন, সেখানে ভাঙা জিনিসও হারায় না; সে ফিরে পায় তার প্রথম অবস্থা, প্রথম পবিত্রতা, প্রথম স্থিরতা।

আল্লাহর এই কথা শুধু মূসা আলাইহিস সালামের জন্য ছিল না; এটা ছিল ভয়গ্রস্ত প্রতিটি অন্তরের জন্য আসমানি সান্ত্বনা। যখন রব বলেন, ‘ধরো, ভয় কোরো না’, তখন বুঝে নিতে হয়—আদেশের ভেতরেই নিরাপত্তা লুকিয়ে আছে, আর আনুগত্যের ভেতরেই প্রশান্তি। মানুষের চোখে যা অচেনা, ভয়ংকর, অস্থির করে তোলার মতো; আল্লাহর হাতে তা-ই শান্তির নিদর্শন হয়ে যায়। কারণ তিনি যাকে দায়িত্ব দেন, তাকে একা ছাড়েন না; তিনি যাকে পথে নামান, তার অন্তরে এমন এক তাওহীদের শক্তি দেন, যা কাঁপনকে সিজদায় বদলে দেয়।

এই আয়াত আমাদের শেখায়, দাওয়াতের পথে মুমিনকে প্রথমে নিজের হৃদয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়। সত্যের বার্তা বহন করা সহজ নয়; সেখানে নিজের দুর্বলতা, মানুষের প্রতিক্রিয়া, অজানার ভয়—সবকিছু একসঙ্গে দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু মূসা (আ.)-এর লাঠির ভেতর যেমন আল্লাহ তাঁর কুদরত প্রকাশ করলেন, তেমনি আমাদের ভাঙা হাতিয়ার, দুর্বল ভাষা, সীমিত সামর্থ্য—এসবের মাঝেও তিনি চান আমরা তাঁর ওপর ভরসা করি। বান্দা যখন নিজের শক্তিকে বড় ভাবা বন্ধ করে, তখনই সে রবের শক্তিকে অনুভব করতে শেখে। তখন লাঠি আর লাঠি থাকে না; তা হয় নিদর্শন। আর ভয় আর ভয় থাকে না; তা হয় আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার দরজা।
‘আমি এখনি একে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেব’—এই প্রতিশ্রুতির ভেতরে আছে সৃষ্টির ওপর মালিকের পূর্ণ ক্ষমতা, আর মুমিনের জন্য এক গভীর আশা। যিনি মুহূর্তেই একটি জিনিসকে রূপান্তরিত করতে পারেন, তিনি আমাদের ভেঙে যাওয়া হৃদয়কেও ফিরিয়ে দিতে পারেন প্রশান্তির প্রথম রূপে। তাই এই আয়াত কেবল মূসার হাতে ধরা একটি নিদর্শন নয়; এটি আমাদের সব হারানোর মধ্যেও আল্লাহর ওয়ারদা নেমে আসার ঘোষণা। ভয় বলবে, ‘তুমি একা’; ওহি বলবে, ‘না, তোমার রব আছেন।’ আর তাওহীদ শেখাবে, যিনি শুরু করেছেন, তিনিই ফেরাতে পারেন; যিনি পরীক্ষা দেন, তিনিই আশ্বাসও দেন।

আল্লাহর এই কথায় এক রহস্যময় সান্ত্বনা আছে: “ধরো, ভয় কোরো না।” যেন রব্বুল আলামীন শুধু মূসা আলাইহিস সালামকেই নয়, প্রত্যেক কাঁপতে থাকা হৃদয়কেও ডাকছেন। মানুষ নিজের ভেতরের ভাঙন দেখে থমকে যায়, নিজের দুর্বল হাতে দায়িত্ব তুলে নিয়ে ব্যর্থতার আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে। কিন্তু এই আয়াত স্মরণ করিয়ে দেয়, আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে তাঁর পথে দাঁড় করান, তখন তিনি সেই বান্দার ভয়কে অপমান করেন না; বরং নিজের কুদরতে তাকে নিরাপত্তা দেন। দাওয়াতের পথ হোক, তাওহীদের আহ্বান হোক, কিংবা নিজের নফসের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো—মুমিনের আসল শক্তি তার সাহসে নয়, তার রবের আশ্বাসে। ভয় আসে যখন আমরা নিজের দিকে তাকাই; শান্তি নামে যখন দৃষ্টি চলে যায় আল্লাহর দিকে।

আর “আমি এখনই একে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেব”—এই বাক্যে আছে পুনরুদ্ধারের এক আসমানি প্রতিশ্রুতি। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন, তার ভাঙা জিনিসও ফের আগের রূপে ফিরিয়ে দেন; কেবল লাঠি নয়, মানুষের ভেতরের রুক্ষতা, দিশেহারা মন, তাওহীদ থেকে ছিটকে পড়া হৃদয়ও তাঁর কুদরতে ফিরে পায় প্রথম নির্মলতা। সমাজ যখন ভয়ে জমে যায়, সত্যকে চাপা দেয়, আর ক্ষমতাকে জীবনের নীতিতে পরিণত করে, তখন এই আয়াত আমাদের শেখায়—আল্লাহর হাতে যা পড়ে, তা হারায় না; বরং তাঁর হুকুমে নতুন অর্থ পায়। নিজের হিসাব নিজে নেয়া, অন্তরকে জাগিয়ে রাখা, গুনাহের ভয় ও রহমতের আশা—এই দুয়ের মাঝে থেকেই বান্দা আবার আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। কারণ যিনি ফেরাতে পারেন, তিনি পথ হারানো হৃদয়কেও তার সীরাতে উলাতে ফিরিয়ে দিতে সক্ষম।

আল্লাহর এই বাক্যে শুধু মূসা আলাইহিস সালামের হাতেই নয়, আমাদের ভেতরের ভয়ের শিকড়েও এক আসমানি স্পর্শ পড়ে। আমরা কত কিছুই না ভয় করি—মানুষের কথা, ভবিষ্যতের অন্ধকার, দায়িত্বের ভার, নিজের দুর্বলতা, এমনকি সত্যকে প্রকাশ করার পরিণতিও। অথচ যিনি মূসাকে বললেন, “ধরো, ভয় কোরো না,” তিনিই তো আজও বান্দার ভাঙা হাতে ভরসা ঢেলে দেন। মানুষ যখন নিজের শক্তিতে কাঁপে, তখন রবের হুকুম তাকে দাঁড় করায়; মানুষ যখন নিজের চোখে পথ দেখে না, তখন আল্লাহর ওয়াদা পথকে ফিরিয়ে আনে তার প্রথম স্বচ্ছতায়।

এখানে তাওহীদের এক গভীর শিক্ষা আছে: জিনিসের শক্তি তার নিজের মধ্যে নয়, আল্লাহর ইচ্ছার মধ্যে। লাঠি তখনই নিদর্শন, যখন আল্লাহ চান; আবার যখন চান, তখন তা ফিরে যায় আগের রূপে। এটাই মুমিনের অন্তরকে মুক্ত করে—কারণ যে হৃদয় আল্লাহর কুদরতকে চিনে নেয়, সে আর উপকরণকে চূড়ান্ত ক্ষমতাবান মনে করে না, আর যে হৃদয় আল্লাহকে চূড়ান্ত শক্তি হিসেবে জানে, সে বিপদের মুখেও ভেঙে পড়ে না। দাওয়াতের পথ, ইবাদতের পথ, তওবার পথ—সব পথেই এই আয়াত যেন কানে কানে বলে, ভয়কে বড় কোরো না; আল্লাহর নির্দেশকে বড় করো।

হে অন্তর, তুমি যদি আজও কাঁপো, তবে এই আয়াতকে স্মরণ করো। যাকে আল্লাহ ধরতে বলেন, তার জন্যই নিরাপত্তা; যাকে আল্লাহ ফিরিয়ে দিতে চান, তার জন্যই প্রথম রূপে ফিরে আসা। তাই গুনাহের ভারে নুয়ে পড়া হৃদয়ও হতাশ হবে না, বরং লজ্জা নিয়ে রবের দিকে ফিরবে। কারণ আল্লাহর কাছে অসম্ভব বলে কিছু নেই, আর তাঁর বান্দার জন্য শেষ কথা ভয় নয়—রহমত, হিদায়েত, এবং ফিরে আসার দরজা।