সূরা ত্বহার এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা এক অমোঘ সত্য উচ্চারণ করেছেন: কেয়ামত অবশ্যই আসবে। মানুষের সমস্ত অজুহাত, পৃথিবীর সমস্ত ব্যস্ততা, সময়ের সমস্ত ঢেউ—কোনোটিই সেই দিনের আগমন রোধ করতে পারবে না। তারপর এসেছে এক বিস্ময়কর বাক্য: আমি তা গোপন রাখতে চাই। এই গোপনীয়তা মানুষের জন্য শাস্তি নয়, বরং এক ধরনের রহমত ও পরীক্ষা। যদি সেই দিনের সময় মানুষ জানত, তবে অনেকে আজকের জীবনকে শুধু অপেক্ষার অসহ্য হিসাব বানিয়ে ফেলত; কিন্তু সময় অজানা বলেই হৃদয়কে প্রতিদিন জাগতে হয়, প্রত্যেক সকালকে তওবার সম্ভাবনা হিসেবে নিতে হয়, আর প্রত্যেক রাতকে ফিরে আসার দরজা হিসেবে চিনতে হয়।

এই আয়াতের আলোয় বোঝা যায়, দুনিয়া স্থায়ী নয়; এখানে যা কিছু চলছে, তার প্রতিটি কাজ একদিন প্রকাশ পাবে। কেয়ামত মানে শুধু এক ভয়ংকর মহাসত্য নয়, বরং ন্যায়বিচারের পূর্ণ উদ্ভাস—যেখানে কোনো নিঃশ্বাস, কোনো নীরবতা, কোনো গোপন স্নেহ, কোনো গোপন পাপ, কোনো সৎকর্ম, কিছুই হারিয়ে যাবে না। প্রতিটি আত্মাকে তার কৃতকর্মের ফলই দেওয়া হবে। তাই এই আয়াত মানুষকে আতঙ্কিত করার জন্য নয়; তাকে জাগিয়ে তোলার জন্য। যে হৃদয় আল্লাহকে ভুলে যায়, সে সময়ের মোহে ঘুমিয়ে পড়ে। আর যে হৃদয় কেয়ামতের কথা স্মরণ করে, সে জানে—এই জীবন কেবল জমা করার মাঠ নয়, জবাবদিহির প্রস্তুতির ক্ষেত্র।

সূরা ত্বহার সামগ্রিক প্রবাহে এই ঘোষণা বিশেষভাবে হৃদয়ছোঁয়া। মুসা আলাইহিস সালামের ঘটনাপ্রবাহে আল্লাহর আহ্বান, তাওহীদের ডাক, ফেরাউনের অহংকার ভাঙা, এবং অন্তরকে ভয় ও সান্ত্বনার মাঝে স্থির করা—সবকিছুর ভেতরেই এই আয়াত যেন অন্তরের ঘড়িকে সঠিক সময়ে ফেরায়। এর কোনো নির্দিষ্ট সহিহ ও সুপ্রতিষ্ঠিত শানে নুযুল এখানে উল্লেখ করা হয় না; তবে সূরার বৃহত্তর প্রেক্ষাপট স্পষ্ট করে যে, এটি সেইসব মানুষের জন্য যারা অহংকারে ডুবে যায়, দাওয়াতকে অবহেলা করে, আর আল্লাহর স্মরণকে পিছিয়ে দেয়। এই আয়াত তাদেরও সান্ত্বনা দেয়, যারা ন্যায় পায় না বলে কষ্ট পায়—জেনে রাখে, শেষ বিচারের দিনে প্রতিটি অধিকার, প্রতিটি কান্না, প্রতিটি ক্ষত—সবই আল্লাহর সামনে প্রকাশিত হবে।

কেয়ামতের কথা কুরআনে এলে হৃদয় থেমে যায়, কারণ এটি কেবল ভবিষ্যতের কোনো সংবাদ নয়; এটি সৃষ্টির শেষ সত্য, ন্যায়বিচারের অবশ্যম্ভাবী সকাল। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, সেই সময় অবশ্যই আসবে, আর আমি তা গোপন রাখতে চাই। এই গোপন রাখার ভেতরেই এক গভীর হিকমত আছে—মানুষ যেন সময়ের প্রাচীর ভেঙে নিশ্চিন্ত না হয়ে যায়, যেন প্রতিদিন নিজেকে জিজ্ঞেস করে: আজকের আমার পথ কি আমাকে সেই দিনের সামনে দাঁড় করাতে পারবে? অজানা সময় মানুষের অহংকার ভাঙে, হৃদয়ে বিনয় নামায়, আর অন্তরকে তওবার জন্য উন্মুক্ত রাখে।

এই আয়াত আমাদের শেখায়, জীবন এলোমেলো নয়; প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে এক অনিবার্য সাক্ষাৎ আছে। মানুষ যা-ই করুক, ভালো হোক বা মন্দ, সবই তার আত্মার ভেতর সঞ্চিত হচ্ছে, আর একদিন তা প্রকাশের জন্যই ফেরত আসবে। এ হলো তাওহীদেরই আরেক রূপ—আল্লাহই একমাত্র মালিক, তিনিই জানেন, তিনিই গোপন রাখেন, তিনিই প্রকাশ করবেন, এবং তিনিই প্রতিটি আত্মাকে তার প্রচেষ্টার মতোই বিচার করবেন। তাই এই দুনিয়ার কোলাহল যতই বড় হোক, মুমিনের হৃদয় তার গভীরে এক নীরব সত্য বহন করে: শেষ কথা দুনিয়ার নয়, রবের।
এ কারণে কেয়ামতের স্মরণ ভয় সৃষ্টি করে, কিন্তু সেই ভয় ধ্বংসের নয়; তা জাগরণের, তা সংশোধনের, তা আল্লাহর দিকে ফিরে আসার ভয়। যে হৃদয় এই আয়াতকে সত্যি করে নেয়, সে আর গাফলতের মোটা চাদরে ঘুমাতে পারে না। তার চোখে দুনিয়া ছোট হয়ে আসে, আর আখিরাত বিশাল হয়ে ওঠে; তার পাপের ভার তাকে শাস্তিহীন সাহসী করে না, বরং নরম করে তোলে; তার নেক আমলকে সে লোকদেখানো সাজ নয়, বরং পরকালের পাথেয় হিসেবে দেখতে শেখে। কেয়ামতের নিশ্চিত আগমন তাই আতঙ্কের নয়, বরং সজাগ আত্মার জন্য এক রহমত—যে রহমত মানুষকে মৃত্যুর আগেই জাগিয়ে দেয়, যাতে সে ফিরে আসতে পারে, ক্ষমা চাইতে পারে, এবং তার রবের সামনে লজ্জিত কিন্তু আশাবান্দিত হৃদয় নিয়ে দাঁড়াতে পারে।

কেয়ামতের এই ঘোষণা মানুষের কানে শুধু এক ভয় নয়, এক জাগরণও এনে দেয়। আল্লাহ বলছেন, সেই দিন আসবেই—আর আমি তা গোপন রেখেছি। এ গোপনীয়তার মধ্যে এক গভীর রহমত আছে: মানুষ যেন প্রতিদিন নিজের ভেতর ফিরে তাকায়, নিজের আমলকে প্রশ্ন করে, নিজের হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে। যদি হিসাবের নির্দিষ্ট সময় মানুষ জেনে যেত, তবে অনেকেই জীবনকে দায়িত্বের বদলে অপেক্ষার নিষ্প্রাণ ভারে পরিণত করত; আর যদি একেবারেই স্মরণ না থাকত, তবে গাফলতের ঘন অন্ধকারে ডুবে যেত। তাই আল্লাহর এই গোপন রাখা মানুষকে দিশেহারা করতে নয়, বরং সর্বদা প্রস্তুত রাখতে—যেন প্রতিটি ভোর তওবার আহ্বান হয়, প্রতিটি সন্ধ্যা আত্মসমালোচনার আয়না হয়, আর প্রতিটি নিঃশ্বাস স্মরণে নরম হয়ে আসে।

আর এই আয়াত সমাজের মুখের ওপরও এক নীরব অথচ তীব্র সত্য স্থাপন করে। যে সমাজ কেয়ামত ভুলে যায়, সে সমাজে ক্ষমতা অহংকারে ফুলে ওঠে, অন্যায় ন্যায়ের বেশ ধরে, দুর্বল মানুষের কান্না বাজারের ধুলোয় মিশে যায়। কিন্তু যখন অন্তরে এই বিশ্বাস জেগে ওঠে যে, একদিন সকল আত্মাকে তার কৃতকর্মের ফলই দেওয়া হবে, তখন মানুষের হাত কাঁপে পাপের আগে, জিহ্বা কাঁপে মিথ্যার আগে, আর হৃদয় কেঁপে ওঠে কারও হক নষ্ট করার আগে। কেয়ামতের স্মরণ আমাদের ভীত করে শুধু নয়; আমাদের সত্যের দিকে ফেরায়, আমাদের দায়বদ্ধ করে, আমাদের ভেতরের অশান্তিকে আল্লাহর সামনে এনে দাঁড় করায়। সেই দিন হবে ন্যায়বিচারের পূর্ণ বিকাশ, আর আজকের এই স্মরণই মুমিনের অন্তরকে সান্ত্বনা দেয়—কারণ যে আল্লাহ হিসাব নেবেন, তিনিই সবকিছু জানেন, তিনি কাউকে অবিচারে হারিয়ে যেতে দেবেন না।

কেয়ামতকে আল্লাহ গোপন রেখেছেন—এটাই তো মানুষের জন্য সবচেয়ে গভীর শিক্ষা। যদি সে দিনের সময় জানা থাকত, তবে বহু হৃদয় হয়তো তাওবা দেরি করত, বহু চোখ হয়তো গাফিল ঘুমে ডুবে থাকত, বহু জীবন হয়তো প্রস্তুতির বদলে হিসাবের কৌশলেই কেটে যেত। কিন্তু সময় অজ্ঞাত বলেই মানুষকে প্রতিদিন জেগে উঠতে হয়; প্রতিটি সকালকে নতুন সুযোগ মনে করতে হয়; প্রতিটি ভাঙা হৃদয়কে আল্লাহর দিকে ফেরার দরজা হিসেবে চিনতে হয়। এই গোপনীয়তার মধ্যে রহমত আছে, আর রহমতের মধ্যেই আছে কঠোর সতর্কতা। মানুষ যেন মনে না করে—আজই শেষ নয়, তাই আজকেও বদলানোর দরকার নেই। বরং অজানা সেই দিনের ছায়াই আজকের দিনকে পবিত্র করে।

আর সেই দিন আসবে, যখন কোন বাহানা কাজে লাগবে না, কোন মুখোশ টিকবে না, কোন সম্পর্কের আশ্রয়ে পালানো যাবে না। প্রত্যেক আত্মা তারই কৃতকর্মের ফল পাবে—যে অল্প অশ্রু গোপনে ঝরেছিল, যে একাকী সিজদা নিঃশব্দে উঠেছিল, যে ক্ষমা মানুষের কাছে হার মানেনি, সবই আলো হয়ে ফিরে আসবে; আর যে পাপ মনে মনে লালন করা হয়েছিল, যে জুলুমকে শক্তি ভেবেছিল, যে গাফলতকে নিরাপত্তা মনে হয়েছিল, সেগুলোও একদিন সামনে দাঁড়াবে। তাই এই আয়াত হৃদয়কে আতঙ্কে ভাঙে, আবার সান্ত্বনাতেও ভরে দেয়: আল্লাহ কেবল হিসাব নেবেন না, তিনি ন্যায়ও করবেন। তিনি যা জানেন তা আড়াল করেন, যাতে আমরা নিজের ভেতরে ফিরে তাকাই; এবং যখন ফিরে তাকাই, তখন যেন বুঝতে পারি—আমার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা আমার সম্পদে নয়, আমার পদে নয়, আমার গোপন পরিচয়ে নয়; আমার নিরাপত্তা কেবল সেই রবের দিকে ফেরায়, যাঁর কাছে প্রত্যেক জীবনের শেষ কথাটি সত্য হয়ে দাঁড়ায়।