মানুষের অন্তর কত বিচিত্র! সামনে সত্যের দীপ্তি থাকা সত্ত্বেও সে আবার জিজ্ঞেস করে, “আরও কোনো নিদর্শন কেন আসে না?” সূরা ত্বহার এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা সেই চিরচেনা অজুহাতকে উন্মোচিত করেন—যেখানে দাবি থাকে প্রমাণের, কিন্তু উদ্দেশ্য থাকে সমর্পণের নয়, টিকে থাকার। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতের মুখে মুশরিকরা এমন প্রশ্নই তুলত; অথচ কুরআন স্মরণ করিয়ে দেয়, সত্য তো নিদর্শনের খোঁজে পথ হারায়নি—সত্যের প্রমাণ আগে থেকেই এসেছে, সুস্পষ্ট সাক্ষ্য হিসেবে এসেছে পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহে।
আয়াতের ভাষা খুব নরম, কিন্তু আঘাত খুব গভীর। “পূর্বের সহিফাগুলোর বায়্যিনাহ”—অর্থাৎ ইবরাহিম, মূসা ও অন্যান্য নবীদের অবশিষ্ট সত্য-সাক্ষ্যের ধারায় তাওহীদের একই আহ্বান বারবার উচ্চারিত হয়েছে; আল্লাহ এক, তাঁর ইবাদতে শরিক নেই, মানুষকে তাঁরই দিকে ফিরতে হবে। কুরআন এখানে যেন বলছে: নতুন কোনো অলৌকিক চমক না পেলেই কি সত্য অস্বীকার করা যায়? না, কারণ সত্যের ভিত্তি কেবল চোখের বিস্ময় নয়; তার ভিত্তি ঐতিহাসিক সাক্ষ্য, নবীদের ধারাবাহিক বার্তা, এবং অন্তরের ভিতর জেগে ওঠা স্বাভাবিক ফিতরাহ।
এই প্রসঙ্গ আমাদেরও নরমভাবে ঝাঁকিয়ে দেয়। কত সময় আমরা সত্যকে দেরিতে গ্রহণ করি—দলিল কম বলে নয়, হৃদয় কঠিন বলে। নিদর্শন সবসময় বাহিরে আসে না; অনেক সময় নিদর্শন ইতিমধ্যেই উপস্থিত থাকে, কিন্তু আমাদের ভেতরের পর্দা তাকে চিনতে দেয় না। তাই এ আয়াত শুধু অস্বীকারকারীদের জবাব নয়, বরং প্রত্যেক দাওয়াতপ্রাপ্ত হৃদয়ের জন্যও এক সান্ত্বনা: তুমি যদি আল্লাহর বাণীকে আঁকড়ে ধরো, তবে তুমি একাকী নও; পূর্বগ্রন্থের সত্যধারা, নবীদের দীর্ঘ কাতার, আর তাওহীদের চিরন্তন আহ্বান তোমারই পাশে দাঁড়িয়ে আছে। হৃদয় জাগুক—এটাই আসল নিদর্শন।
মানুষের এক পুরোনো অভ্যাস আছে—সত্যকে বুঝতে নয়, সত্যকে থামাতে সে নিদর্শন চায়। কিন্তু এই চাওয়ার ভিতরে অনেক সময় বিশ্বাসের ক্ষুধা থাকে না; থাকে অস্বীকারের কৌশল। কুরআন যেন এই আয়াতে সেই অন্তর্লুকানো ফাঁদকে উন্মোচন করে দেয়। “সে আমাদের কাছে তার রবের কাছ থেকে কোনো নিদর্শন আনে না কেন?”—এই বাক্য উচ্চারণের মধ্যে প্রশ্নের সুর আছে, কিন্তু হৃদয়ের নত হওয়ার সুর নেই। অথচ আল্লাহ তাআলা স্মরণ করিয়ে দেন, সত্য তো আগে থেকেই সাক্ষ্য রেখে গেছে। পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের ভাঁজে ভাঁজে তাওহীদের আলো জ্বলেছে, নবীদের বাণীতে মানুষের ফিরে আসার ডাক প্রতিধ্বনিত হয়েছে। সুতরাং নতুন কিছু না দেখার অজুহাতে সত্যকে অস্বীকার করা মানুষের নিজেরই আত্মপ্রবঞ্চনা।
এখানে মানুষের এক গভীর মানসিক দুর্বলতা ধরা পড়ে। সত্যকে মেনে নেওয়ার জন্য যতটুকু আলোকই যথেষ্ট, ততটুকু আলোর সামনে দাঁড়িয়েও সে বলে—“আরও নিদর্শন নেই কেন?” আসলে অনেক সময় প্রশ্নটি জ্ঞান থেকে আসে না; আসে আত্মসমর্পণের ভয়ে। কারণ নিদর্শন যদি এসে যায়, তবে দম্ভের জন্য আর অজুহাত থাকে না, অনুসরণের দায় এসে যায়। তাই কুরআন যেন ভদ্র অথচ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে স্মরণ করায়: এদের কাছে কি সেই সুস্পষ্ট প্রমাণ এসে যায়নি, যা পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহেই ছিল? অর্থাৎ সত্য তো নতুন কিছু নয়; তাওহীদের ডাক, আখিরাতের ভয়, ন্যায়ের আহ্বান, মিথ্যার পরিণতি—সবই নবীদের দীর্ঘ সিলসিলায় আগেই উচ্চারিত হয়েছে। মানুষ যদি শুনতে না চায়, তবে চোখের সামনে আকাশ নামিয়েও তাকে জাগানো যায় না।
পূর্বগ্রন্থের এই বায়্যিনাহ আমাদের শিখিয়ে দেয়, আল্লাহর দীন বিচ্ছিন্ন কোনো হঠাৎ আবির্ভাব নয়; এটি আদম আ. থেকে শুরু হওয়া হিদায়াতের ধারাবাহিক আহ্বান, যার কেন্দ্রে একটাই কথা—আল্লাহই একমাত্র রব, তিনিই ইবাদতের একমাত্র হকদার। মূসা আ.-এর কাহিনি, অহির অবিরাম স্রোত, নবীদের সতর্কবাণী—সব মিলিয়ে মানবজাতির কাছে সত্য বহুবার পৌঁছেছে। কাজেই সমস্যা নিদর্শনের অভাব নয়; সমস্যা হৃদয়ের অনুর্বরতা। আজও সমাজে কত মানুষ বাহ্যিক প্রমাণের কথা তোলে, কিন্তু নৈতিকতার প্রমাণ দেখে না, সত্যের সাক্ষ্য দেখে না, মানুষের মধ্যে জাগ্রত হওয়া প্রয়োজন দেখে না। অথচ কুরআন মানুষকে স্মরণ করায়—যে অন্তর স্মরণ হারায়, সে নিদর্শন দেখেও অন্ধ থেকে যায়।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের কাছেই প্রশ্ন জাগে: আমি কি সত্যকে জানতে চাই, নাকি শুধু নিজের মনকে বাঁচাতে চাই? আমার জীবন কি প্রমাণ খোঁজার নাম করে বারবার দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে? আল্লাহ তাআলা বান্দাকে নিরাশ করেন না; তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, যাতে হৃদয় জেগে ওঠে, যাতে মানুষ তাওহীদের আশ্রয়ে ফিরে আসে। এখানে ভয় আছে—কারণ অস্বীকারের দাম বড়; কিন্তু আশা আরও বড়—কারণ যে ব্যক্তি সত্যের দিকে ফিরে, তার জন্য দরজা বন্ধ নয়। তাই কুরআনের এই নরম তিরস্কার আসলে এক অন্তর-জাগানিয়া ডাক: চোখের নয়, হৃদয়ের সাক্ষ্য চাই; ধূলিমলিন অহংকার নয়, বিনম্র আত্মসমর্পণ চাই; কারণ আল্লাহর দিকে ফেরা মানেই বেঁচে ফেরা, আর স্মরণ মানেই হারিয়ে যাওয়া আত্মাকে আবার রবের কাছে খুঁজে পাওয়া।
মানুষের হৃদয় যখন অহংকারে মোড় নেয়, তখন সে সত্যের কাছে মাথা নত করতে চায় না; সে চায় এমন কিছু, যা দেখে চোখ চমকে উঠবে, কিন্তু অন্তর বদলে যাবে না। তাই সে বলে, “আরও নিদর্শন কোথায়?” অথচ কুরআন খুব নীরবে, খুব দৃঢ়ভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়—প্রমাণ তো আগেই এসেছে, পূর্ববর্তী সহিফাগুলোর আলোতেই এসেছে, নবীদের ধারাবাহিক বাণীতেই এসেছে। এই আয়াতে আল্লাহ যেন প্রশ্ন করেন, নিদর্শন কি সত্যের জন্ম দেয়, নাকি সত্যই নিদর্শনের মানদণ্ড? যে হৃদয় পূর্বগ্রন্থের বায়্যিনাতেও জাগে না, তার কাছে হাজার বিস্ময়ও কেবল অজুহাতের নতুন রূপ হয়ে থাকে।
তাই এই আয়াত আমাদের সামনে একটি কঠিন আয়না ধরে: আমরা কি সত্য খুঁজছি, নাকি সত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য প্রমাণের খেলা খেলছি? মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াত, পূর্ববতী নবীদের তাওহীদের সাক্ষ্য, আর আল্লাহর ওহীর ধারাবাহিক আহ্বান—সবই এক কথাই বলে: রব এক, পথ এক, ফিরে আসা তাঁর দিকেই। মানুষের অন্তর যখন স্মরণ হারায়, তখন সে নিদর্শনও দেখে কিন্তু নতি স্বীকার করে না; আর যখন আল্লাহ দয়া করেন, তখন একই হৃদয় অশ্রুতে ভেঙে পড়ে, নিজের দেরি, নিজের জেদ, নিজের অন্ধত্ব দেখে লজ্জিত হয়। হে অন্তর, তুমি যদি সত্যিই জেগে উঠতে চাও, তবে নতুন চমক নয়—পুরোনো সত্যের সামনে নিজেকে খোলা রাখো; কারণ মুক্তি বিস্ময়ে নয়, বিনয়ে।