সূরা ত্বহার এই আয়াতটি এক অদ্ভুত মমতায় আমাদের থামিয়ে দেয়। আল্লাহ বলেন, তোমার রবের পক্ষ থেকে আগে থেকেই একটি কথা না থাকলে, আর একটি নির্দিষ্ট সময় স্থির না থাকলে, শাস্তি অবশ্যই লেগে যেত। অর্থাৎ এই জগতে যে অবকাশ আমরা দেখি, তা কোনো দুর্বলতা নয়; তা রহমতের পর্দা, হিকমতের ছায়া, আর তাওবার দরজা খোলা রাখার এক নীরব আহ্বান। মানুষ অনেক সময় মনে করে বিলম্ব মানে অনিশ্চয়তা, কিন্তু কুরআন শেখায়—কখনো কখনো বিলম্বই সবচেয়ে গভীর ফয়সালা; কখনো কখনো দেরি-ই বান্দার জন্য জাগরণের সুযোগ।

মুসা আলাইহিস সালামের দাওয়াত, ফেরাউনের ঔদ্ধত্য, আর অস্বীকারকারীদের জন্য সতর্কবাণীর ধারাবাহিকতায় এ আয়াত যেন এক মহাবিশ্বের নিয়ম ঘোষণা করে দেয়: আল্লাহর পাকড়াও হঠাৎও হতে পারে, কিন্তু তাঁর রহমত হঠাৎ করে পথরোধ করে না; তিনি বান্দাকে অবকাশ দেন, যেন অন্তর ফিরে আসে, স্মরণ জাগে, তাওহীদের ডাকে হৃদয় নরম হয়। এ কারণে এই আয়াত কেবল শাস্তির কথা বলে না, বরং আল্লাহর ফয়সালার ভারসাম্য শেখায়—ভয়ের মধ্যেও দয়া আছে, আর দয়ার মধ্যেও সতর্কতা আছে। যে মানুষ দেরিকে নিরাপত্তা ভাবে, তার জন্য এই আয়াত এক কাঁপিয়ে দেওয়া আয়না; আর যে মানুষ রবের দিকে ফিরে আসতে চায়, তার জন্য এটি সান্ত্বনার দরজা, কারণ সময় এখনও শেষ হয়নি।

এই আয়াতের ভেতরে এক ভয়াবহ মায়া আছে। শাস্তি অবধারিত ছিল, যদি না রবের পক্ষ থেকে আগেই একটি কথা স্থির হয়ে থাকত, আর নির্ধারিত একটি সময় নির্দিষ্ট না থাকত। অর্থাৎ মানুষ যতই দেরিকে স্বস্তি ভাবুক, এই দেরি আসলে শূন্যতার নাম নয়; এটি আল্লাহর হিকমতের পর্দা। তিনি তাড়াহুড়ো করে পাকড়াও করেন না, কারণ তাঁর ন্যায়বিচার অন্ধ উত্তেজনার নয়, তাঁর রহমতও দায়িত্বহীন শিথিলতার নয়। প্রতিটি অবকাশের মধ্যে লুকিয়ে থাকে এক নীরব ডাক—ফিরে এসো, স্মরণ করো, তাওহীদের আলোয় নিজের ভাঙা হৃদয়কে জোড়া লাগাও। যে অন্তর এখনো জাগেনি, তার জন্যই সময়কে দীর্ঘ করা হয়েছে; যে চোখ এখনো কাঁদেনি, তার জন্যই মুহূর্তগুলোকে ফেলে রাখা হয়েছে।

তাই দুনিয়ার বিলম্বকে হালকা মনে করা যাবে না। কখনো কখনো মানুষ মনে করে, আমি তো এখনো বেঁচে আছি, এখনো কিছুই হয়নি—কিন্তু বেঁচে থাকাটাই তো এক সুযোগ, শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার নয়, বরং তাওবার পথে হাঁটার সুযোগ। মুসা আলাইহিস সালামের দাওয়াতের সুরে এই আয়াত আমাদের শেখায়, আল্লাহর আহ্বান কখনো বন্ধ হয় না; কেবল বান্দার হৃদয় কখনো কখনো পাথর হয়ে যায়। তবু রব ছেড়ে দেন না। তিনি অবকাশ দেন, কারণ তিনি জানেন কোন অন্তর কখন নরম হবে, কোন আত্মা কখন ভেঙে পড়বে, কোন মনের ভেতর কবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ সত্য হয়ে উঠবে। আর এই সত্যটিই হৃদয়ের জন্য সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা: আল্লাহর দেরি কখনো অক্ষমতা নয়, বরং তাঁর পরিপূর্ণ জ্ঞান; তাঁর বিলম্ব কখনো উপেক্ষা নয়, বরং এক গভীর দাওয়াত—যেখানে ভয় ও আশা একসঙ্গে হাঁটে, আর বান্দা বুঝে যায়, রবের দরজা এখনো খোলা, তাই ফিরে আসার সময় এখনো শেষ হয়নি।

এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, আসমানের দরজা খুলে আল্লাহ আমাদের হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি জানিয়ে দিচ্ছেন—তাঁর ফয়সালা তাড়াহুড়ার ওপর দাঁড়ায় না, আর তাঁর পাকড়াও বিলম্ব মানে দুর্বলতা নয়। বান্দা যখন নিজেকে নিরাপদ ভাবতে শুরু করে, তখন এই আয়াত তাকে থামিয়ে দেয়; বলে, তোমার অবকাশকে অবহেলা কোরো না, কারণ অবকাশও এক পরীক্ষা। সমাজ যখন গাফিলতির নেশায় ডুবে থাকে, যখন সত্যের ডাককে মানুষ হালকা করে দেখে, তখন এই কুরআনি বাক্য অন্তরে কাঁপন জাগায়—আজ যে সময় পেয়েছ, তা ফিরে আসার জন্য; আজ যে দয়া পেয়েছ, তা জেগে ওঠার জন্য।

মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াত, ফেরাউনের অহংকার, আর মানুষের বারবার সতর্ক হয়েও না-শোনা—এসবের মাঝখানে এ আয়াত যেন এক গম্ভীর ঘোষণা: রবের হিকমত ছাড়া কিছুই ঘটে না। শাস্তি স্থগিত থাকা মানে ক্ষমা চিরকাল থাকবে, এমন নয়; আবার তাড়াহুড়ো করে শাস্তি নেমে না আসা মানে দাওয়াতের মূল্য কমে গেছে, এমনও নয়। বরং এ বিলম্বের ভেতরে আছে বান্দাকে নিজের হিসাব দেখতে দেওয়ার সুযোগ, অন্তরকে নরম করার আহ্বান, তাওহীদের দিকে ফিরে আসার নীরব দরজা। যে হৃদয় আল্লাহর অবকাশকে রহমত হিসেবে চিনতে পারে, সে ভয়ও হারায় না, আশা-ও হারায় না; বরং লজ্জা, বিনয় ও তাওবার মধ্যে ফিরে আসে তার রবের কাছে।

এই আয়াতে এক ভয়ংকর কোমলতা আছে। আল্লাহ যদি তৎক্ষণাৎ ধরতেন, তবে আমাদের অনেকেই আজ স্মরণ করার অবকাশই পেতাম না। যেটাকে আমরা দেরি বলে ভাবি, অনেক সময় সেটাই আমাদের জন্য আসমানী দয়ার চাদর; যেটাকে আমরা নিরাপত্তা মনে করি, হয়তো সেটাই পরীক্ষার দীর্ঘ ছায়া। রবের ফয়সালা মানুষের তাড়াহুড়োর মতো নয়। তিনি ছাড় দেন, কিন্তু ছেড়ে দেন না; তিনি সময় দেন, কিন্তু অগণিত হুঁশিয়ারি পাঠিয়ে দেন। এই সময়ের নামই কখনো রহমত, কখনো হুজ্জত, কখনো অন্তরের দরজায় শেষবারের মতো কড়া নাড়া।

তাই অবকাশ পেয়ে যেন আমরা ঔদ্ধত্য না শিখি, বরং লজ্জা শিখি; নিরাপদ বোধ করে যেন গুনাহে স্থির না হই, বরং তাওবার দিকে ফিরে আসি। মুসা আলাইহিস সালামের দাওয়াতের পাশে এই আয়াত আমাদের বলে—দাওয়াত কেবল কথার নয়, সময়েরও ইবাদত; বান্দাকে ডেকে নিতে নিতে রব নিজেই বান্দার অন্তরকে জাগান। আজও যদি হৃদয় নরম হয়, যদি চোখে একফোঁটা ভয় নামে, যদি আল্লাহর দিকে ফেরা সহজ মনে হয়, তবে জেনে রাখি—এও তাঁরই রহমতের অবকাশ। কিন্তু এই অবকাশ চিরকাল নয়। নির্ধারিত সময়ের আগে যে জেগে ওঠে, সে-ই বাঁচে। আর যে অবকাশকে অবহেলা করে, তার জন্য একদিন সময় থেমে যাবে, কিন্তু অনুতাপ আর ফেরার পথ থাকবে না।