আল্লাহ তাআলা জানেন তাদের সামনে কী আছে, আর তাদের পেছনেও কী রয়ে গেছে; আর মানুষের কোনো জ্ঞানই তাঁকে পরিবেষ্টন করতে পারে না। এই একটিমাত্র বাক্যে যেন মানুষের সব অহংকার ভেঙে পড়ে, আর তাওহীদের আকাশ খুলে যায়। আমরা যত জানি বলি, ততই বুঝি—জ্ঞান আসলে আমাদের হাতের মুঠোয় নয়, বরং আমাদের সীমার দেয়ালে বারবার ধাক্কা খায়। আর আল্লাহর জ্ঞান? তা সীমাহীন, শুরুহীন, শেষহীন; তার কাছে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ এক উন্মুক্ত সত্যের মতো, কোনো অন্ধকার তাঁর জন্য অন্ধকার নয়।
সূরা ত্বহার এই অংশে মূসা আলাইহিস সালামের কাহিনির বৃহত্তর ধারার ভেতরে এক গভীর তাওহীদী শিক্ষা জেগে ওঠে। পবিত্র কালামে বারবার দেখা যায়, অহি মানুষের দিশাহীনতাকে আলো দেয়, আর দাওয়াতের পথে বান্দাকে শেখায়—তুমি দাওয়াত দেবে, কিন্তু মানুষকে তুমি জ্ঞানে বা হিদায়তে জোর করে ঘিরে ফেলতে পারবে না; কারণ আল্লাহই জানেন অন্তরের সামনে-পেছনে কী জমে আছে। এখানে কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক উপলক্ষের উপর নির্ভর না করেও বোঝা যায়, এই আয়াত বান্দার সীমা ও রবের পূর্ণতার ব্যবধানকে এমনভাবে স্পষ্ট করে, যা নীরবে হৃদয়কে নত করে।
এ আয়াত যেন মুমিনকে বলে: তুমি নিজের অজানা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় পেয়ো না, তুমি মানুষের অদৃশ্য অভিপ্রায় নিয়ে অতিরিক্ত অহংকারও কোরো না; সবকিছুর উপরে একজন আছেন, যিনি জানেন কী প্রকাশিত, কী গোপন, কী সামনে, কী পেছনে। তাই তাঁর সামনে দাঁড়ানো মানে অজানার সামনে দাঁড়ানো নয়, বরং সর্বজ্ঞের আশ্রয়ে ফিরে আসা। এই জ্ঞানই আদমের সন্তানকে বিনয় শেখায়, স্মরণকে জাগিয়ে তোলে, আর ক্লান্ত হৃদয়কে বলে—তুমি সীমিত, কিন্তু তোমার রব সীমাহীন; তুমি প্রশ্নে ভরা, কিন্তু তোমার রবের জ্ঞানেই সব প্রশ্নের ন্যায়সঙ্গত স্থান আছে।
মানুষের জ্ঞান যতদূর পৌঁছে, ততদূরেই সে নিজের অক্ষমতার সীমানা দেখতে পায়। আমরা সামনে কী আছে তা আন্দাজ করি, পেছনে কী রয়ে গেছে তা স্মৃতিতে আঁকড়ে ধরি; কিন্তু আল্লাহ তাআলার জ্ঞান এমন নয় যে তাকে সময়ের খণ্ডে ভাগ করা যায়, কিংবা ঘটনাগুলোর ভেতর আটকে রাখা যায়। তিনি জানেন যা তাদের সামনে, আর যা তাদের পেছনে—অর্থাৎ প্রকাশিত-অপ্রকাশিত, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ, দৃশ্য-অদৃশ্য সবই তাঁর জ্ঞানের আওতায়। এই সত্য মানুষের অহংকারকে ভেঙে দেয়, আবার হৃদয়কে অদ্ভুতভাবে শান্তও করে; কারণ যখন বান্দা বোঝে যে তার জীবন অন্ধভাবে ছড়িয়ে নেই, বরং সর্বজ্ঞ রবের জ্ঞানের মধ্যে নিরাপদ, তখন তার ভয় একটু কমে, বিনয় একটু বাড়ে, আর তাওহীদের আলো বুকের গভীরে নেমে আসে।
আল্লাহ তাআলা জানেন তাদের সামনে কী আছে, আর পেছনে কী রয়ে গেছে—এই ঘোষণার মধ্যে মানুষের সব ভেতরের ও বাইরের পর্দা যেন একে একে সরে যায়। আমরা যাকে গোপন ভাবি, তা তাঁর কাছে প্রকাশিত; আমরা যাকে ভবিষ্যৎ বলে অনিশ্চিত দেখি, তা তাঁর জ্ঞানে স্পষ্ট; আমরা যাকে স্মৃতি বলে পেছনে ফেলে আসি, সেটাও তাঁর অবগতির বাইরে নয়। ফলে এ আয়াত মানুষের বুকের ওপর একসঙ্গে ভয় ও সান্ত্বনা নামিয়ে আনে। ভয়, কারণ কোনো পাপ, কোনো কপটতা, কোনো ভাঙা অঙ্গীকার লুকোনো যায় না। সান্ত্বনা, কারণ কোনো দুঃখ, কোনো দুর্বলতা, কোনো অশ্রু—যা সামনে-পেছনে ঘিরে আছে—সেগুলোকেও তিনিই জানেন, যাঁর জ্ঞান আমাদের কল্পনার সীমা ছাড়িয়ে যায়।
আর মানুষ তাঁকে জ্ঞান দ্বারা আয়ত্ত করতে পারে না—এই বাক্যে বান্দার অহংকার ভেঙে চূর্ণ হয়, আবার ঈমানের মাটিতে দাঁড়ানোর শক্তিও জন্ম নেয়। সমাজ যখন নিজেকে জ্ঞানী মনে করে, তখনই সে বিচার করতে ভুলে যায়; যখন মানুষ সামান্য কিছু তথ্যকে সত্যের মাপদণ্ড বানায়, তখন সে হৃদয়কে হারিয়ে ফেলে। কিন্তু আল্লাহর সামনে মানুষের জ্ঞান কেবল কণা, আর মানুষের ধারণা কেবল ছায়া। তাই এই আয়াত আমাদের শেখায়—নিজের বুদ্ধির জোরে রবকে ঘিরতে যেয়ো না; বরং বিনয়ের চোখে নিজের সীমা চিনে নাও। যে নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝে, সে-ই সঠিক দাওয়াতি হৃদয় পায়; কারণ সে জানে, হিদায়াত জোরে আসে না, আসে আল্লাহর নূরে।
সূরা ত্বহার এই আয়াতে তাই মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াতের পথে এক নীরব কিন্তু গভীর সান্ত্বনা আছে। তুমি যদি সত্যের পথে থাকো, কিন্তু মানুষ তোমাকে না বোঝে; তুমি যদি কল্যাণের আহ্বান দাও, কিন্তু অন্তরগুলো কঠিন মনে হয়; তুমি যদি নিজের ভেতরের দুর্বলতা নিয়ে লড়ে যাও, তবুও হতাশ হয়ো না। আল্লাহ জানেন সামনে কী আছে, পেছনে কী আছে—অর্থাৎ তিনি জানেন তোমার গন্তব্য, তোমার সংগ্রাম, তোমার অদৃশ্য ক্ষত, তোমার অপ্রকাশিত কান্না। এই জ্ঞানই বান্দাকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে। কারণ শেষে মানুষ জ্ঞান দিয়ে অহংকার করতে পারে না; তাকে ফিরতেই হয় সেই রবের কাছে, যাঁর জ্ঞান সবকিছু ঘিরে আছে, কিন্তু যাঁকে কোনো জ্ঞানই ঘিরতে পারে না।
যে মানুষ নিজের মনের গোপন কোণও পুরোপুরি দেখতে পায় না, সে কী করে রবের সত্তাকে ঘিরে ফেলবে? এই আয়াত আমাদের অহংকারের মূলে কুঠারাঘাত করে। আমরা ভুলে যাই, জানার শক্তি আমাদের পরিচয় নয়; বরং আমাদের অজ্ঞতার সীমা-চিহ্ন। কত পরিকল্পনা করি, কত হিসাব কষি, কত যুক্তির জাল বুনি—তার পরেও এমন এক অদৃশ্য সত্য থাকে, যা আমাদের সামনে-পেছনের সবকিছুকে আল্লাহর জ্ঞানের সামনে নগণ্য করে দেয়। তিনি জানেন, কার অন্তরে কী জমছে, কার মুখে কী কথা লুকোনো, কার ভবিষ্যতে কী বাঁক, আর কার অতীতে কী ক্ষত। তাঁর জানা শুধু তথ্যের জানা নয়; তা সৃষ্টিকে পরিবেষ্টনকারী এক মহাজ্ঞান, যেখানে কোনো পর্দা, কোনো বিস্মৃতি, কোনো অনিশ্চয়তা নেই।
এখন বুঝি, দাওয়াতের পথে আমাদের কাজ হলো ডাকা, জাগানো, স্মরণ করানো; কিন্তু হৃদয়কে বদলে দেওয়া, হিদায়েতকে স্থির করে দেওয়া, কারও গোপন ভেতরকে উল্টে দেওয়া—এটা আল্লাহর কাজ। এ আয়াত মূসা আলাইহিস সালামের সেই বিস্তৃত তাওহীদী শিক্ষা-ধারার ভেতরে আমাদের নত করে দেয়, যেন বান্দা বুঝে: তুমি দুর্বল, তোমার জ্ঞান সীমিত, তোমার দৃষ্টি অসম্পূর্ণ; কিন্তু তোমার রব পূর্ণ, তাঁর জ্ঞান অবারিত, তাঁর নজর চিরজাগ্রত। এই সত্য উপলব্ধি করলে বুকের ভেতর থেকে একদিকে ভেঙে পড়ে অহংকার, অন্যদিকে নেমে আসে অপার সান্ত্বনা—কারণ যিনি আমাকে জানেন, আমার দুর্বলতাও তিনি জানেন; যিনি আমার গোপন পাপ দেখেন, তিনিই আমার অশ্রুও দেখেন। সুতরাং আজ জ্ঞানের গর্ব নয়, বিনয়ের কান্নাই হোক আমাদের পথ; আজ নিজের সীমা স্বীকার করে রবের দিকে ফিরে আসাই হোক আমাদের আসল বাঁচা।