সূরা ত্বহার প্রথম উচ্চারণ: “ত্বা-হা”। এই দুই অক্ষর আমাদের সামনে কোনো সহজ অনুবাদ রেখে যায় না, বরং হৃদয়ের দরজায় এক রহস্যময় নক্শা আঁকে। কুরআনের কিছু সূরার শুরুতে এমন বিচ্ছিন্ন অক্ষর আসে, যেগুলোর প্রকৃত মর্ম আল্লাহই অধিক জানেন। বান্দার জন্য এতে এক বড় শিক্ষা আছে: সবকিছুই আমাদের বোধের মাপে ধরা পড়ে না; অহির সামনে মানুষকে প্রথমে আত্মসমর্পণ করতে হয়, ব্যাখ্যার আগে বিশ্বাস শিখতে হয়। যেন কুরআন নিজেই বলে, স্মরণ করো—তোমার জ্ঞান সীমিত, আর তোমার রবের বাণী সীমাহীন।
এই সূরার শুরুতে মূসা (আ.)-এর ঘটনা, ফেরাউনের অহংকার, তাওহীদের আহ্বান, এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে দাওয়াতের ভার—সবকিছু সামনে আসবে। তাই “ত্বা-হা” শুধু এক ধ্বনিময় সূচনা নয়; এটি যেন অন্তরকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান, যেন ঘুমন্ত হৃদয়কে বলা হচ্ছে: ভয় পেও না, বিভ্রান্ত হয়ো না, তোমার পথের আলো এখনো নিভে যায়নি। যে রব মূসা (আ.)-কে প্রেরণ করেছিলেন, তিনিই আজও ভাঙা অন্তরকে শক্ত করেন, হক্বের পথে দাঁড়ানো দুর্বল বান্দাকে সান্ত্বনা দেন, আর তাওহীদের শব্দকে ভয়হীন করে তোলেন।
এই আয়াতের ঐতিহাসিক বা সামাজিক কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা এখানে স্পষ্টভাবে বর্ণিত নয়; বরং এটি সূরার এক গূঢ় দরজা, যার পরে অহি, স্মরণ, এবং দাওয়াতের বিস্তৃত আকাশ খুলে যায়। আদম (আ.)-এর প্রসঙ্গ, মানুষের ভুলে যাওয়া, এবং আবার রবের দিকে ফিরে আসার যে বড় মানবিক সত্য—সবই এই সূরার স্রোতে এসে মিশবে। তাই “ত্বা-হা” আমাদের শেখায়: কুরআন কেবল তথ্য দেয় না, হৃদয়কে ডাকেও; কেবল কথা বলে না, আত্মাকে ঘরে ফেরায়। আর যে অন্তর এই ডাক শোনে, সে বুঝে যায়—আল্লাহর স্মরণই ক্লান্তির সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
এই সূরার প্রথম ধ্বনি যেন আমাদের শেখায়, আল্লাহর বাণীকে হৃদয়ে নিতে হলে আগে অহংকারকে নামিয়ে রাখতে হয়। “ত্বা-হা” উচ্চারণে আমরা এমন এক দরজার সামনে দাঁড়াই, যেখানে মানুষের জবাবের চেয়ে আত্মসমর্পণ বড়, আর ব্যাখ্যার চেয়ে আদব গভীর। কুরআন সবকিছু আমাদের বোধের কাঠামোয় বাঁধতে আসে না; বরং আমাদের বোধকে ভেঙে নতুন করে গড়ে দেয়, যেন অন্তর শিখে নেয়—যে সত্য আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, তা মানুষের ছোট পরিমাপে শেষ হয় না। এই রহস্যময় সূচনা তাই বিভ্রান্তির নয়, বরং স্থিতির আহ্বান; যেন বলা হচ্ছে, তুমি সব বুঝে ফেলতে পারবে না, কিন্তু তোমার রবকে বিশ্বাস করে তুমি শান্ত হতে পারো।
এই সূচনার রহস্যই আমাদেরকে আত্মসমালোচনার দরজায় দাঁড় করায়। আমরা কত কথাই জানি, কিন্তু কতটা স্মরণে বাঁচি? কতবার নামাজের দিকে ফিরি, তবু হৃদয়ের ভেতর ফেরাউনের অহংকারকে নীরবে লালন করি? ত্বা-হা যেন মনে করিয়ে দেয়—আল্লাহর সামনে মানুষের প্রথম প্রয়োজন জ্ঞান নয়, বিনয়; প্রথম শক্তি নয়, আত্মসমর্পণ। যে অন্তর নিজেকে বারবার বড় ভাবতে শেখে, সে আসলে নিজেরই ফাঁদে পড়ে। আর যে অন্তর আল্লাহকে স্মরণ করে, সে-ই অল্প আলোতেও পথ চিনে নেয়।
এই সূরার প্রাথমিক নীরব ধ্বনির ভেতর দিয়ে এক গভীর সামাজিক সত্যও জেগে ওঠে: মানুষ যখন অহংকারে ডুবে যায়, তখন সে কেবল নিজের রবকেই ভুলে না, দুর্বলদেরও ভুলে যায়। মূসা (আ.)-এর কাহিনি সামনে আসবে বলেই শুরুটা এমন—যেন বলা হচ্ছে, দাওয়াত মানে শুধু কথা বলা নয়, সত্যের সামনে নিজেকে নত করা। সমাজ যখন গর্ব, ভোগ আর দম্ভে ভারী হয়, তখন তাওহীদের একটি উচ্চারণও বিপ্লবের মতো শোনায়। কারণ তাওহীদ মানুষকে শেখায়, ক্ষমতার আসল মালিক আল্লাহ; আর বান্দার মর্যাদা তার আনুগত্যে, তার দাম্ভিকতায় নয়।
তাই ত্বা-হা শুধু একটি সূচনা নয়, এটি প্রত্যাবর্তনের ডাক। ভয়গ্রস্ত হৃদয়কে বলে: আল্লাহর স্মরণে ফিরে এসো। বিভ্রান্ত আত্মাকে বলে: অহির আলোকে ধরে রাখো। পাপের ভারে ক্লান্ত মানুষকে বলে: দরজা এখনো বন্ধ হয়নি। আদম (আ.)-এর সন্তান হিসেবে আমরা ভুল করি, কিন্তু তওবা আমাদের হারিয়ে যাওয়ার জন্য নয়, ফিরে আসার জন্যই দেওয়া হয়েছে। এই আয়াতের অদৃশ্য প্রতিধ্বনি যেন আমাদের অন্তরে নামিয়ে আনে—তুমি একা নও, তোমাকে ডাকছেন সেই রব, যিনি মূসা (আ.)-কে ডেকেছিলেন, যিনি আজও ভাঙা হৃদয়কে সান্ত্বনা দেন, আর তাওহীদের পথে দাঁড়ানো বান্দাকে স্থির রাখেন।
আর তাই সূরা ত্বহার এই প্রথম ধ্বনিটি আমাদের কাছে কেবল পাঠের শুরু নয়; এটি আত্মসমর্পণের শুরু। “তোয়া-হা” উচ্চারিত হয়, আর তার সঙ্গে মানুষের ভেতরের সব অহংকার একটু নত হয়ে যায়। কারণ আল্লাহর কালামের সামনে দাঁড়ালে বান্দার প্রথম সৌন্দর্য হলো—সবকিছু না বুঝেও সেজদায় যেতে পারা, সব প্রশ্নের উত্তর না পেয়েও রবের ওপর ভরসা রাখা। মূসা (আ.)-এর জীবন আমাদের শেখায়, দাওয়াতের পথ সহজ নয়; ভয় আসে, দায় আসে, পরীক্ষাও আসে। কিন্তু যিনি ডেকেছেন, তিনিই শক্তি দেন। যিনি স্মরণ করান, তিনিই অন্তরকে বাঁচান।
আজ এই “তোয়া-হা” আমাদেরও জিজ্ঞেস করে: তুমি কি এখনও নিজেকে যথেষ্ট মনে করো, নাকি তুমি এখনো রবের মুখাপেক্ষী এক দুর্বল বান্দা? তুমি কি অহংকারের আলোতে পথ খুঁজছ, নাকি অহির আলোয় ফিরে আসতে চাও? এই সূরার দরজা খুললেই বোঝা যায়, আল্লাহ আদম (আ.) থেকে মূসা (আ.) পর্যন্ত মানব-ইতিহাসকে স্মরণের এক দীপ্ত স্রোতে বেঁধে রেখেছেন—যাতে মানুষ ভুলে না যায়, সে কোথা থেকে এসেছে, কিসের জন্য বাঁচছে, আর শেষ পর্যন্ত কার কাছেই ফিরে যেতে হবে। কাজেই হৃদয় যদি আজ ক্লান্ত হয়, পাপ যদি ভারী লাগে, আর পথ যদি অন্ধকার মনে হয়, তবে “তোয়া-হা”র দিকে তাকাও—এ যেন বলে, তোমার রব তোমাকে ভুলে যাননি; বরং তোমাকে জাগাতে কুরআনের প্রথম দরজাতেই রহস্যের আলো জ্বালিয়ে দিয়েছেন।