কিয়ামতের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে মানুষ যখন নিজের ভেতরের সব অজুহাত ফেলে দিতে বাধ্য হয়, তখন সত্যের সামনে তার কণ্ঠ আর আগের মতো থাকে না। সূরা আশ-শুআরার এই আয়াতে তারা যে কথা বলে, তা এক নির্মম স্বীকারোক্তি: আমাদেরকে দুষ্টকর্মীরাই গোমরাহ করেছিল। এখানে গোমরাহি আর আকস্মিক ভুল নয়, বরং বারবার ডাকা এক অন্ধ অনুসরণ, যেখানে মানুষ মিথ্যাকে শুধু গ্রহণই করেনি, তাকে আশ্রয়ও দিয়েছে। আজীবন যে সঙ্গ, যে প্ররোচনা, যে দুনিয়াবি মোহ সত্যের কণ্ঠকে চাপা দিয়েছিল, আখিরাতের আদালতে সে-সব আর আড়াল থাকে না। তখন বোঝা যায়, কতটা ভয়ংকর হতে পারে ভ্রান্ত নেতৃত্বের হাত, আর কতটা দুর্বল হতে পারে সেই হৃদয়, যে আল্লাহর আহ্বানের বদলে মানুষের ধোঁকা বেছে নেয়।
সূরা আশ-শুআরা মূলত নবীদের কাহিনি, সত্যের দাওয়াত, আর অস্বীকারকারীদের পরিণতির বিস্তৃত ধারা নিয়ে এগোয়। এই আয়াতও সেই বৃহত্তর স্রোতের ভেতরই দাঁড়িয়ে আছে—যেখানে বারবার দেখা যায়, নবীরা মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকেন, আর একদল মানুষ দম্ভ, স্বার্থ, অনুকরণ ও সত্যবিমুখতার কারণে সেই ডাক থেকে মুখ ফেরায়। এ আয়াতে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক কারণ বর্ণিত না হলেও এর নৈতিক পরিসর খুব স্পষ্ট: সমাজে যখন মিথ্যাবাদী, পাপাচারী, ভোগবাদী বা প্রভাবশালী দুষ্টরা নেতৃত্ব দেয়, তখন অনেকেই তাদের পেছনে হাঁটে, নিজের বিবেককে নীরব করে, নিজের দায়কে অন্যের কাঁধে চাপায়। কিন্তু কিয়ামতের দিনে সেই দায়চ্যুতি ভেঙে পড়ে; তখন মানুষ বুঝতে পারে, সে শুধু প্রতারিত হয়নি, সে প্রতারণাকে সঙ্গ দিয়েছিল।
এই আয়াত হৃদয়ে এমন এক কাঁপন জাগায়, যা আত্মাকে জিজ্ঞেস করে: আমি কি সৎসঙ্গের পাশে আছি, নাকি ধীরে ধীরে এমন কারও হাতে নিজেকে সঁপে দিয়েছি, যে আমাকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে দিচ্ছে? গোমরাহি শুধু একদিনে আসে না; কখনও তা আসে হাসির ভেতর, অবহেলার ভেতর, ভ্রান্ত কথা স্বাভাবিক মনে করার ভেতর, আর পাপকে ছোট করে দেখার ভেতর। তাই কিয়ামতের এই স্বীকারোক্তি শুধু অপরাধীদের লজ্জা নয়, জীবিতদের জন্য সতর্কবার্তা। যে মানুষ সত্যকে চিনেও ভুল সঙ্গের কাছে নিজেকে সঁপে দেয়, সে একদিন নিশ্চয়ই বুঝবে—আল্লাহর ন্যায়বিচারের সামনে কোনো ভিড়, কোনো প্রভাব, কোনো অনুসারী-অজুহাতই তাকে বাঁচাতে পারবে না। তখন মুখ থেকে বের হবে শুধু এক জ্বালাময়ী আর্তি: আমাদেরকে দুষ্টকর্মীরাই গোমরাহ করেছিল।
কিয়ামতের দিন মানুষের অনেক কথাই ভেঙে যায়, কিন্তু এই স্বীকারোক্তির ভাঙন সবচেয়ে নির্মম। তারা তখন আর নিজেদের পক্ষে বড় কোনো তত্ত্ব দাঁড় করাতে পারে না; শুধু বলে, আমাদেরকে দুষ্টকর্মীরাই গোমরাহ করেছিল। কী গভীর এই বাক্য—এখানে দোষের আঙুল যেমন অন্যের দিকে ওঠে, তেমনি নিজের হৃদয়ের ভীতরও এক নীরব প্রমাণ জ্বলে ওঠে: আমি শুনেছিলাম, বুঝেছিলাম, তবু থামিনি। গোমরাহি তো অনেক সময় হঠাৎ পতন নয়; তা ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এক সঙ্গ, এক অভ্যাস, এক লজ্জাহীন স্বস্তি। পাপীরা শুধু পাপ করে না, তারা পাপকে সুন্দর দেখায়; শুধু পথ হারায় না, পথহারা মানুষকে নিয়ে দল বেঁধে হাসে। আর সেই হাসির ভেতরেই সত্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বিপজ্জনক ষড়যন্ত্রটি কাজ করে।
এই আয়াত আমাদের হৃদয়ে এক তীব্র সতর্কতা ফেলে দেয়: কার সান্নিধ্যে আমরা নরম হচ্ছি, কার কথায় আমরা সত্যের সঙ্গে আপস করছি, কোন অভ্যাস আমাদের চোখে গুনাহকে স্বাভাবিক করে তুলছে? অনেক সময় গোমরাহি কোনো তর্ক দিয়ে আসে না; আসে আস্তে আস্তে, পরিচয়ের ভেতর, বিনোদনের ভেতর, স্বার্থের ভেতর, সাহচর্যের মায়ায়। তাই কুরআন শুধু পরিণাম দেখায় না, ভিতরের রাস্তা দেখায়—যেখানে মানুষ নিজের হাতে নিজের পথকে অন্ধকার করে। আর যখন সত্যের দরজা বন্ধ হওয়ার পরে দুঃখ এসে দাঁড়ায়, তখন আর কোনো অজুহাত কাজ করে না। অবশিষ্ট থাকে কেবল লাঞ্ছিত স্বীকারোক্তি: আমি ভুল সঙ্গকে আশ্রয় দিয়েছিলাম, আর সেই আশ্রয়ই আমাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল। এই উপলব্ধি হৃদয়কে কাঁপায়, কারণ এতে মুক্তির একটি দরজাও খোলা থাকে—আজও যদি মানুষ ভ্রান্তদের হাত ছাড়ে, আল্লাহর দিকে ফেরে, তবে দেরি হয়ে যায়নি।
কিয়ামতের সেই মুহূর্তে মানুষ যখন আর কাউকে দোষ চাপাতে পারে না, তখন তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে এমন এক স্বীকারোক্তি, যা হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়: আমাদেরকে দুষ্টকর্মীরাই গোমরাহ করেছিল। এই বাক্যে শুধু অন্যের অপরাধের কথা নেই; আছে নিজের দুর্বলতারও নগ্ন প্রকাশ। কারণ ভ্রান্ত সঙ্গ কেবল বাইরে থেকে ঠেলে দেয় না, ভেতরে এক ধরনের সান্ধ্য নেমে আনে—সত্যের আলোকে ধীরে ধীরে অসহ্য করে তোলে, আর মিথ্যার অভ্যেসকে স্বাভাবিক বানিয়ে ফেলে। মানুষ যখন প্রবৃত্তির আরাম, গোষ্ঠীর চাপ, ভোগের প্রলোভন বা বেপরোয়া নেতৃত্বকে সত্যের উপর প্রাধান্য দেয়, তখন সে শুধু পথ হারায় না; নিজের অন্তরের দরজাও বন্ধ করে দেয়।
সূরা আশ-শুআরার এই স্রোতে নবীদের দাওয়াত বারবার এসে দাঁড়ায় মানুষের অহংকার, বিদ্রূপ ও অন্ধ অনুসরণের সামনে। কেউ সত্যকে অস্বীকার করেছে নিজের বাঁচার জন্য, কেউ মিথ্যার পাশে দাঁড়িয়েছে নিজের স্বার্থের জন্য, আর কেউ আবার দুষ্টদের ছায়ায় থেকে সত্যকে দূরে ঠেলে দিয়েছে—কিন্তু শেষ বিচারে আল্লাহর ন্যায়বিচারের সামনে এসব অজুহাতের ওজন থাকে না। তখন বোঝা যায়, সঙ্গ কেবল সহযাত্রী নয়; সঙ্গ কখনও ভাগ্যও হয়ে ওঠে। তাই এই আয়াত আমাদের জিজ্ঞেস করে: আমি কাদের কথা শুনছি, কাদের অনুসরণ করছি, কার দিকে আমার হৃদয় ঝুঁকছে? আজ যদি আমি মন্দের স্বরে অভ্যস্ত হই, সত্যের ডাককে যদি কড়া মনে করি, তবে কাল এই একই মুখে কি কোনো অজুহাত টিকবে?
তবু এই আয়াতের ভেতর শুধু আতঙ্ক নেই, আছে জাগরণের দরজাও। কারণ যে মানুষ এখনই নিজের দায় বুঝে নেয়, সে-ই আল্লাহর রহমতের দিকে ফিরে আসার সুযোগ পায়। দুনিয়ায় দুষ্টদের প্ররোচনা যতই গভীর হোক, আল্লাহর দিকে একনিষ্ঠ প্রত্যাবর্তন তার চেয়েও শক্তিশালী। তাই আজকের পাঠ হলো—নিজেকে প্রশ্ন করা, হৃদয়ের বন্ধুত্বগুলো যাচাই করা, মিথ্যার অভ্যাস ভেঙে ফেলা, আর সেই রবের কাছে মাথা নত করা যিনি গোপনটুকুও জানেন, প্রকাশ্যটুকুও জানেন। ভ্রান্তি মানুষকে একা ছাড়ে, কিন্তু তওবা মানুষকে আল্লাহর সান্নিধ্যে ফিরিয়ে আনে। আর সেই ফেরা-ই শেষ আশ্রয়, শেষ সত্য, শেষ নিরাপত্তা।
কিয়ামতের সেই মুহূর্তে মানুষের ঠোঁটে যে স্বীকারোক্তি জেগে ওঠে, তা শুধু একটি বাক্য নয়—তা জীবনের দীর্ঘ এক আত্মপ্রতারণার ভাঙা আয়না। তারা বলবে, আমাদেরকে দুষ্টকর্মীরাই গোমরাহ করেছিল। কিন্তু তখন এই কথার ভেতরে আর আরাম থাকবে না, থাকবে না কোনো আশ্রয়। যে সঙ্গকে আমরা আপন ভেবেছিলাম, যে প্ররোচনাকে আমরা বুদ্ধি ভেবেছিলাম, যে ভিড়কে আমরা নিরাপত্তা ভেবেছিলাম—সেই সবই তখন অপরাধের সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে। সত্যের ডাক সেদিন এত স্পষ্ট হবে যে, মিথ্যার কোনো রংই আর টিকবে না।
মানুষের পতন অনেক সময় এক লাফে ঘটে না; তা আসে ধীরে, চুপিসারে, পরিচয়ের ভেতর ঢুকে, স্বাভাবিকতার মুখোশ পরে। প্রথমে গুনাহকে অদ্ভুত লাগে, পরে তাকে অভ্যাস মনে হয়, শেষে তাকে পথ বলে ধরে নেওয়া হয়। আর এই আয়াত আমাদের ভয় জাগায় এইজন্য যে, ভ্রান্ত সঙ্গ কেবল পথ বদলায় না—সে হৃদয়ের দিকও বদলে দেয়। তাই আজ যদি অন্তর একটু কেঁপে ওঠে, তবে সেটাই রহমতের ইশারা। আল্লাহর সামনে ফিরে আসার আগেই ফিরে আসতে হয়; নইলে আখিরাতের আদালতে শুধু আফসোস থাকে, সংশোধন থাকে না। হে আল্লাহ, আমাদেরকে এমন সঙ্গ দাও, যে সঙ্গ তোমার স্মরণ বাড়ায়; আমাদেরকে এমন অন্তর দাও, যা সত্যকে চিনে নেয়, আর মিথ্যার কাছে সহজে বিক্রি হয়ে যায় না।