কিয়ামতের ময়দানে একটি প্রশ্ন অনেক বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠবে, কারণ সে প্রশ্নের ভিতরে লুকিয়ে থাকবে সব ভ্রান্ত আশ্রয়ের পরিণতি: “তারা কোথায়, যাদের তোমরা পূজা করতে?” সূরা আশ-শুআরার এই আয়াতটি শুধু জিজ্ঞাসা নয়, এটি এক নির্মম উন্মোচন। দুনিয়ায় মানুষ যাদের সামনে মাথা নত করেছিল, যাদেরকে শক্তি, ভরসা, উদ্ধারকারী বা মধ্যস্থ মনে করেছিল, সেদিন তারা কোথায়? এই প্রশ্নের মধ্যে ভেঙে পড়ে মিথ্যার সব প্রাসাদ। যে ভরসা আল্লাহর বদলে বানানো হয়েছিল, সে ভরসা শেষ বিচারের দিনে মানুষের হাতেই আর ধরা দেবে না।
এই আয়াতের তাৎপর্য সূরার বৃহৎ ধারার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সূরা আশ-শুআরাতে বারবার নবীদের কাহিনি এসেছে—একই সত্য, একই দাওয়াত, একই মিথ্যা প্রতিক্রিয়া: তাওহিদের আহ্বান, সত্যের বিরুদ্ধে অহংকার, এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ক্ষমতার প্রকাশ। এখানে মুশরিকদের উপাস্যদের প্রসঙ্গ উঠে আসা মানে শুধু পাথর-মূর্তির কথা নয়; বরং সব ধরনের ভ্রান্ত নির্ভরতার পতন—যা মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরায়। কুরআন মানুষের হৃদয়কে শেখায়, যাকে তুমি প্রভু বানাও সে যদি আল্লাহ না হন, তবে প্রয়োজনের মুহূর্তে সে তোমাকে ফেলে দেবে; আর কিয়ামতের দিনে তো সে আরও নির্জীব, আরও অসহায়, আরও নিরুত্তর হবে।
এখানে কোনো নির্দিষ্ট, নিশ্চিত শানে নুযুলের রিপোর্টের ওপর দাঁড়ানো জরুরি নয়; আয়াতটি তার বিস্তৃত কুরআনিক প্রেক্ষাপটেই দীপ্ত। মক্কার সমাজে মূর্তি, পূর্বপুরুষ-অনুসরণ, এবং মিথ্যা মধ্যস্থতার ধারণা মানুষের বিবেককে বেঁধে রেখেছিল। এই আয়াত সেই সামাজিক বাস্তবতাকে কিয়ামতের আয়নায় এনে দেয়: যারা দুনিয়ায় মানুষের চোখে বড় ছিল, আখিরাতে তারা অসহায়। আর যারা আল্লাহর সামনে বিনয়ী ছিল, তারাই সত্যের পাশে দাঁড়াবে। তাই এই প্রশ্ন আমাদেরও ডেকে নেয়—আজ আমার হৃদয় কোথায় ঝুঁকে আছে? আমি কি এখনো এমন কিছু আঁকড়ে আছি, যা শেষ বিচারে আমার কোনো কাজেই আসবে না?
কিয়ামতের আদালতে একদিন এমন এক প্রশ্ন উঠবে, যার ভেতরেই লুকিয়ে থাকবে সব মিথ্যা ভরসার মৃত্যু: “তারা কোথায়, যাদের তোমরা পূজা করতে?” এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য নয়; বরং মানুষের অন্তরের গোপন ভরসাগুলোকে নগ্ন করে দেওয়ার জন্য। দুনিয়ায় যাদের মানুষ আশ্রয় ভেবেছিল, উদ্ধারকারী ভেবেছিল, সম্মান ও নিরাপত্তার ভিত্তি ভেবেছিল—সেদিন তারা কোথায়? তখন বোঝা যাবে, আল্লাহ ছাড়া যা কিছুকে অবলম্বন বানানো হয়েছিল, তা আসলে ছায়ার মতোই ছিল; আলো সরে গেলেই তার কোনো অস্তিত্ব থাকে না। এ আয়াত হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়, কারণ এটি শুধু মূর্তির কথা বলে না; বলে সেইসব ভ্রান্ত নির্ভরতার কথা, যা মানুষকে তাওহিদের সোজা পথ থেকে সরিয়ে নিজের দুর্বল হাতের তৈরি আশ্রয়ে আটকে রাখে।
এই দৃশ্য আমাদের এখনই জাগিয়ে তোলে। জীবনের ভেতরেও তো মানুষ কত কিছুতে ভরসা রাখে—সম্পদ, মর্যাদা, সাফল্য, সম্পর্ক, নিজের বুদ্ধি, মানুষের প্রশংসা। কিন্তু কুরআন নীরবে মনে করিয়ে দেয়, আল্লাহর সামনে সব ভরসা একদিন পরীক্ষা হবে। যেটি সত্য, সেটি টিকে যাবে; যেটি মিথ্যা, সেটি ধুলো হয়ে ঝরে পড়বে। তাই এ আয়াত আমাদের হৃদয়ে একটি নির্মম কিন্তু মুক্তিদানকারী শিক্ষা ঢেলে দেয়: একমাত্র আল্লাহই আশ্রয়, একমাত্র আল্লাহই হক, আর তাঁর বাইরে যা কিছুকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া হয়, শেষ বিচারে তা নীরব অপমান ছাড়া আর কিছুই দেয় না। আল্লাহ আমাদের অন্তরকে এমন এক তাওহিদের আলো দান করুন, যাতে আমরা ভাঙা আশ্রয়ে নয়, বরং الْحَقّ-এর অবিচল হাতে আশ্রিত হতে পারি।
কিয়ামতের সেদিন প্রশ্নটি শুধু তথ্য জানার জন্য হবে না; সে প্রশ্নের মধ্যে থাকবে উন্মোচন, অপমান, এবং সত্যের নির্মম ঘোষণা। “তারা কোথায়, যাদের তোমরা পূজা করতে?”—এই বাক্য যেন মানুষের হৃদয়ের সব বানানো আশ্রয়কে একে একে খসে পড়তে দেখে। দুনিয়ায় যাদের ঘিরে মানুষ ভরসার প্রাসাদ বানিয়েছিল, যাদেরকে শক্তি, মধ্যস্থতা, কল্যাণ বা মুক্তির দরজা মনে করেছিল, সেদিন তাদের কোনো সাড়া নেই, কোনো জবাব নেই, কোনো স্নেহ নেই। আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ তখন বুঝতে শিখবে—আসল শক্তি কখনো মূর্তিতে, গোষ্ঠীতে, খ্যাতিতে, কিংবা নিজের অহংকারে ছিল না; সত্য ছিল একমাত্র الْحَقّ, আর বাকি সব ছিল ভঙ্গুর ছায়া।
এই আয়াত আমাদের সমাজকেও কাঁপিয়ে দেয়। কারণ উপাস্য শুধু পাথরের মূর্তি হয় না; কখনো তা হয় লোভ, ভয়, লোকদেখানো ধার্মিকতা, ক্ষমতার মোহ, কিংবা সেই সব সম্পর্ক, যেগুলো আল্লাহর চেয়ে বড় হয়ে যায় হৃদয়ের ভেতর। মানুষ যখন সত্যের বদলে মিথ্যা ভরসাকে আঁকড়ে ধরে, তখন তার ভিতরে নীরবে শুরু হয়ে যায় ভাঙন। সূরা আশ-শুআরা’র নবীদের ধারাবাহিক কাহিনি তাই আমাদের শেখায়—দাওয়াতের মূল কথা একটাই: আল্লাহর দিকে ফিরে আসো, কারণ মানুষ যা কিছু পূজা করে, সবকিছুই একদিন আল্লাহর প্রশ্নের সামনে অসহায় হয়ে পড়বে। তখন আর কেউ কারও হয়ে দাঁড়াতে পারবে না; তখন মানুষকে একাই নিজের আমলের বোঝা বহন করতে হবে।
এই আয়াত হৃদয়কে জাগাতে চায়, ভয় দিয়ে নয় শুধু, বরং ফিরে আসার পথ দেখিয়ে। যে হৃদয় আজই নিজের উপাস্যগুলোকে চিনে নিতে পারে, সে কালকের অপমান থেকে বাঁচতে পারে। তাই এখনই জিজ্ঞেস করা দরকার—আমি কাকে সবচেয়ে বেশি ভয় করি, কাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, কাকে সবচেয়ে বেশি নির্ভর করি? যদি উত্তর আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুতে চলে যায়, তবে তা সংশোধনের সময় এখনই। কারণ সেদিন প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে কেবল সত্যই টিকে থাকবে, আর সত্যের এই নীরব বজ্রধ্বনি মানুষের আত্মাকে বলবে: তুমি যার পেছনে ছুটেছিলে, সে কোথায়? ফিরে এসো তোমার রবের দিকে, সেই রবের দিকে, যাঁর সামনে সব ভান শেষ, আর যাঁর কাছে আত্মসমর্পণই একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়।
দুনিয়ায় মানুষ কত রকম আশ্রয় বানায়—ক্ষমতা, সম্পর্ক, প্রতিপত্তি, ধন, সংস্কৃতি, ব্যক্তি, এমনকি নিজের অহংকারকেও। কিন্তু মৃত্যুর পরের ময়দানে সেই সব নামের কোনো সাড়া থাকে না। তখন বোঝা যায়, যাকে সিজদা দেওয়া হয়েছিল সে স্রেফ সৃষ্টি; যাকে মনে রাখা হয়েছিল উদ্ধারকর্তা বলে, সে নিজেই মুখ ফিরিয়ে নেয়। এই আয়াতের কাঁপন এখানেই—মানুষকে জাগিয়ে দেওয়া, যেন সে আজই বুঝে নেয়, তার হৃদয় কোথায় বাঁধা। কারণ যে হৃদয় আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে, শেষ পর্যন্ত সে হৃদয়ই সবচেয়ে বেশি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে।
হে অন্তর, এই প্রশ্ন যেন তোমার জন্য এখনও দেরি হয়ে না যায়। আজই ফিরো সেই রবের দিকে, যাঁর সামনে সবকিছু টিকে আছে, আর সবকিছু ধসে যায় তাঁর হুকুমে। যাদের তুমি অপরিহার্য ভেবেছ, তারা একদিন প্রশ্নের উত্তরে অদৃশ্য হয়ে যাবে; কিন্তু আল্লাহর রহমত, তাঁর ন্যায়, তাঁর ক্ষমা, তাঁর সত্য—এগুলো কখনো অদৃশ্য হয় না। তাই মিথ্যা আশ্রয়ের দেয়াল ভেঙে দাও, নিজের ভেতরের প্রতারণাকে চিনে নাও, আর বুকভাঙা নম্রতায় বলো: আমি আর কার কাছে যাব? আমি তো শুধু তাঁরই মুখাপেক্ষী, যাঁর সামনে সব ভান শেষ, আর যাঁর কাছে ফিরে আসাই একমাত্র নিরাপদ সত্য।