এই আয়াতে ইবরাহিম-অবধারিত দীপ্তি নেই; বরং মূসার ন্যায় এক নবীর অন্তর-নিঃসৃত প্রার্থনা আছে—হে আমার রব, আমাকে এমন হিকমত দান করুন, যা কথাকে সত্যের দিকে, কাজকে ইখলাসের দিকে, আর সিদ্ধান্তকে ন্যায়ের দিকে নিয়ে যায়; আর আমাকে এমন সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যাদের জীবন নিজেই দাওয়াত, যাদের সঙ্গ নিজেই নিরাপত্তা। এখানে ‘হিকমত’ শুধু জ্ঞানের নাম নয়, এটি সত্যকে সত্য হিসেবে চিনে নেওয়ার আলোক, জীবনের গোলকধাঁধায় সঠিক পথ ধরার ফুরফুরে নয়—গভীর স্থিরতা। নবীদের কাহিনির ভেতর এই দোয়া আমাদের শেখায়: আল্লাহর পথে হাঁটা মানে কেবল নীতি জানা নয়, নীতির সঙ্গে অন্তরকে মিলিয়ে নেওয়া।
সূরা আশ-শুআরা সামগ্রিকভাবে এমন এক যুগের কথোপকথন যেখানে সত্যদূতদেরকে কবি, জাদুকর, মিথ্যাবাদী বলে দমানোর চেষ্টা করা হয়েছিল; অথচ আল্লাহ একে একে নবীদের ইতিহাস তুলে দেখান—দাওয়াতের ভাষা বদলাতে পারে, কিন্তু সত্য বদলায় না। এই প্রেক্ষিতে ২৬:৮৩-এর প্রার্থনা আরও গভীর হয়ে ওঠে। কারণ দাওয়াতের পথে সবচেয়ে বড় বিপদ কখনো শত্রুর আক্রমণ নয়, বরং নিজের বুদ্ধি, নিজের ভাষা, নিজের আত্মবিশ্বাসের ভেতর অহংকারের ছায়া। তাই নবী রাব্বুল আলামীনের দরজায় দাঁড়িয়ে প্রজ্ঞা চান, যেন তাঁর কথা সত্যের ওজন হারিয়ে ফাঁপা স্লোগানে পরিণত না হয়; আর সৎকর্মশীলদের সঙ্গ চান, যেন একাকী পথচলায় হৃদয় শুষ্ক না হয়ে পড়ে।
এ আয়াত আমাদের ভেতরের দিকে তাকাতে বাধ্য করে। আমরা কতবার জ্ঞান চাই, কিন্তু হিকমত চাই না; কতবার পরিচিতি চাই, কিন্তু নেককারদের সঙ্গ চাই না; কতবার সাফল্য চাই, কিন্তু সাফল্যের দায় বহনের চরিত্র চাই না। অথচ কুরআন শেখায়—আল্লাহর নৈকট্য শুধু উচ্চারণে নয়, সৎকর্মীদের ধারায় নিজের জীবনকে যুক্ত করার মধ্যেই। যে অন্তর হিকমতের জন্য কাঁদে, সে অন্তর আসলে সত্যের ওজন বুঝতে শুরু করে; আর যে অন্তর নেককারদের কাতারে থাকার তাওফিক চায়, সে অন্তর একাকী অহংকার থেকে মুক্তির দরজা খুঁজে পায়। এই দোয়া তাই কেবল নবীর দোয়া নয়, এটি প্রতিটি মুমিনের ভোর-সন্ধ্যার দরকারি কান্না: হে রব, আমাকে সত্য বুঝতে দিন, এবং আমাকে এমন মানুষের কাতারে রাখুন যাদের জীবন আপনার সন্তুষ্টির দিকে বয়ে যায়।
নবীর মুখে এই দোয়া যেন একটি নরম অথচ অচল ঘোষণা—হে আমার রব, আমাকে হিকমত দান করুন। হিকমত মানে শুধু জানা নয়; সত্যকে চিনে নেওয়ার ভিতরকার আলো, শব্দের ভিড়ে নির্ভুল সুর খুঁজে পাওয়া, আর সিদ্ধান্তের সময় নফসের ঝড়ের ওপর আল্লাহর প্রশান্তি নামিয়ে আনা। মানুষ অনেক কিছুই জানে, কিন্তু জানার মধ্যেও যদি আল্লাহর আলো না থাকে, তবে সেই জ্ঞান অহংকারে ফুলে ওঠে। আর নবী-দাওয়াতের পথে এর চেয়ে সূক্ষ্ম বিপদ আর কী আছে? যে পথ মানুষকে সত্যের দিকে ডাকে, সেখানে প্রথম প্রয়োজন নিজের অন্তরকে এমনভাবে সোজা করা, যাতে মুখের কথা আর হৃদয়ের অবস্থা আলাদা না থাকে।
সূরা আশ-শুআরার বৃহৎ স্রোতের মাঝে এই আয়াত যেন এক আত্মসমর্পিত হৃদয়ের মৃদু কণ্ঠস্বর। যেখানে সত্যদূতদেরকে কখনো কবি, কখনো মিথ্যাবাদী বলে অপমান করা হয়, সেখানে আল্লাহর কাছেই ফিরে আসতে হয় সত্যের ওজন জানতে। মানুষের লেবেল পাল্টায়, কিন্তু আল্লাহর কাছে প্রকৃত মানদণ্ড একটাই—তিনি কাকে হিকমত দিলেন, কাকে সৎকর্মীদের পথে রাখলেন, কাকে সত্যের সঙ্গে স্থির করলেন। তাই এই দোয়া শুধু মূসা আলাইহিস সালামের কণ্ঠ নয়; এটি প্রত্যেক হৃদয়ের জন্য এক চিরন্তন প্রার্থনা—হে রব, আমাকে এমন বুঝ দাও যা আমাকে তোমার দিকে ফেরায়, আর আমাকে এমন মানুষের কাতারে রাখো যাদের জীবন তোমার আনুগত্যে সুন্দর।
এই দোয়ার ভেতরে এক নবীর অন্তর কাঁপে, আর সেই কাঁপনেই আমাদের হৃদয় জেগে ওঠে। কারণ মানুষের সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি হলো—নিজের জ্ঞানকে যথেষ্ট ভেবে ফেলা, নিজের পথকে নিরাপদ ভেবে নেওয়া। অথচ সত্যের পথে চলতে চলতে বারবার দরকার হয় হিকমত, এমন প্রজ্ঞা যা অহংকারকে নীরব করে, তাড়াহুড়োকে সংযত করে, আর সিদ্ধান্তের আগে অন্তরকে আল্লাহর সামনে দাঁড় করায়। মূসা আলাইহিস সালামের এই প্রার্থনা আমাদের শেখায়, দাওয়াতের ভাষা শুধু তীক্ষ্ণ হলেই চলে না; হৃদয়ে আল্লাহভীতি না থাকলে কথা শূন্য হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি নিজের জন্য প্রজ্ঞা চায়, সে আসলে স্বীকার করে—আমি একা নই, আমি দুর্বল, আমার প্রতিটি পদক্ষেপে সঠিক দিশার দরকার।
আর ‘সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত কর’—এই বাক্যটি যেন জানিয়ে দেয়, ঈমান শুধু একাকী উত্সাহের নাম নয়; এটি এমন এক সফর, যেখানে নেক লোকদের সোহবত আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখে। মানুষের সমাজ যখন সত্য-মিথ্যার মিশ্রণ হয়ে যায়, যখন বাহ্যিক সৌন্দর্য আর কথার চাকচিক্য অন্তরকে ধোঁকা দিতে চায়, তখন সৎকর্মীদের সঙ্গ এক আশ্রয়, এক রক্ষাকবচ। তারা আল্লাহর স্মরণে বাঁচে, আল্লাহর সীমায় থাকে, আর তাদের জীবন অন্যের জন্য নীরব শিক্ষা হয়ে ওঠে। এই দোয়া আমাদেরও শেখায়—আমি যেন এমন পথে না থাকি, যেখানে আমার চারপাশে শুধু প্রশংসা আছে কিন্তু তাকওয়া নেই; বরং আমি যেন এমন লোকদের কাতারে থাকি, যাদের সঙ্গে থাকলে দুনিয়া হালকা হয়, আখিরাত ভারী হয়।
সুরা আশ-শুআরার দীর্ঘ নবী-ইতিহাসের মাঝে এই আয়াত এক নরম কিন্তু গভীর আহ্বান: সত্যের পথে হাঁটা মানে প্রতিনিয়ত নিজের নফসকে জিজ্ঞাসা করা, আমি কি আল্লাহর জন্য চাইছি, নাকি নিজের নামের জন্য? আমি কি হিদায়াতের আলো চাইছি, নাকি শুধু জয়ের স্বাদ? এখানে ভয়ও আছে, কারণ অন্তর বিচ্যুত হতে পারে; আবার আশা-ও আছে, কারণ যে রবের কাছে প্রজ্ঞা চাওয়া হয়, তিনি প্রজ্ঞা দান করতে পারেন, আর যে রবের কাছে সৎকর্মীদের সঙ্গ চাওয়া হয়, তিনি তাঁর রহমতে সেই সঙ্গের দরজা খুলে দিতে পারেন। তাই এই আয়াত কেবল একটি দোয়া নয়; এটি আত্মসমালোচনার আয়না, ভাঙা অন্তরের আর্তি, এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার এক নরম অথচ অদম্য ডাক।
দাওয়াতের পথে হাঁটতে হাঁটতে মানুষ কখনো ক্লান্ত হয় না শুধু দেহে, ক্লান্ত হয় অন্তরে। সত্যকে বহন করতে করতে মনে পড়ে যায় নিজের দুর্বলতা, নিজের অস্থিরতা, নিজের ভিতরের সেই অন্ধকার—যেখানে অহংকারও থাকে, ভয়েরও আসন থাকে। তাই নবীর মুখে এই দোয়া শুধু এক মোনাজাত নয়; এটি একজন বান্দার নিঃস্বতা, যে বুঝে গেছে, হিকমত আল্লাহরই দান, আর সৎকর্মীদের সঙ্গও আল্লাহই জুড়ে দেন। মানুষ চাইলে জ্ঞান অর্জন করতে পারে, কিন্তু প্রজ্ঞা ছোঁয়া যায় না যদি আল্লাহ না দেন; মানুষ চাইলে নেক মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে, কিন্তু তাদের কাতারে হৃদয়কে স্থির রাখা আল্লাহর রহমত ছাড়া সম্ভব নয়। এই আয়াত আমাদের ভেতরের তাড়াহুড়োকে থামিয়ে দেয়, আমাদের নিজস্ব আত্মপ্রশংসাকে ভেঙে দেয়, আর বলে—তুমি সত্যের পথের পথিক, মালিক নও।
যে ব্যক্তি এই দোয়া হৃদয়ে নেয়, সে আর মিথ্যার বাহাদুরিতে মুগ্ধ হয় না, মানুষের প্রশংসায় বিভোর হয় না, বিভ্রান্তির শব্দে দিশেহারা হয় না। সে জানে, শেষ পর্যন্ত বাঁচাবে না বক্তৃতা, বাঁচাবে না খ্যাতি, বাঁচাবে না নিজেকে নিয়ে নিজের সন্তুষ্টি; বাঁচাবে শুধু সেই প্রজ্ঞা, যা সত্যকে চিনে নেয়, আর সেই সঙ্গ, যা নেককারদের ছায়ায় বান্দাকে নরম করে, শুদ্ধ করে, আল্লাহমুখী করে। হে আমার রব, আমাদেরও এমন হিকমত দিন, যাতে আমরা সত্যকে তর্কের বিষয় না বানাই, ইবাদতের বিষয় বানাই; আর আমাদের এমন সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যাদের জীবন দেখে হৃদয় নরম হয়, যাদের পথ দেখে তওবা জাগে, যাদের সান্নিধ্যে গুনাহের মোহ ক্ষীণ হয়ে যায়। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ আল্লাহর দিকেই ফিরে যাবে—এবং সেই ফিরে যাওয়ার মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হবে, যদি আমাদের অন্তর সৎকর্মীদের কাতারের জন্য আল্লাহর কাছে গড়া একটি যোগ্যতা নিয়ে দাঁড়াতে পারে।