আল্লাহ তাআলা এখানে মানুষকে জমিনের দিকে তাকাতে বলেন—কিন্তু এই তাকানো কেবল চোখের কাজ নয়, হৃদয়ের জাগরণ। মাটির বুক চিরে কী অসংখ্য “করিীম” জোড়া-জোড়া সৃষ্টি তিনি উদগত করেছেন: রঙে, রসে, গন্ধে, রূপে, উপকারে, সৌন্দর্যে। ক্ষুদ্র বীজ কীভাবে নীরব মাটির অন্ধকার ভেদ করে আলোর দিকে উঠে আসে, কীভাবে একটিই পৃথিবী হাজারো ভিন্ন জীবনের আশ্রয় হয়—এসব কি নিছক দৈব? এই আয়াত যেন বলে, জমিনের প্রতিটি অঙ্কুরে আল্লাহর কুদরতের স্বাক্ষর লেখা আছে। যে চোখ তা দেখে, সে শুধু সবুজ দেখে না; সে দেখে রবের ক্ষমতা, দয়াকে, এবং মৃতের পর জীবিত করার অসীম শক্তিকে।
সূরা আশ-শুআরার এই ধারাবাহিকতায় নবীদের দাওয়াত, সত্য-মিথ্যার সংঘাত, আর মানুষের অন্তরের হঠকারিতা বারবার উন্মোচিত হচ্ছে। অনেকেই ওহিকে কাব্য, নবীকে কবি, আর সত্যকে কল্পনা বলে এড়িয়ে যেতে চায়; কিন্তু আল্লাহ তাদেরকে প্রকৃতির দিকে ফিরিয়ে দেন। আসমান-জমিনের বিস্ময়, বৃষ্টির পর জীবনের উত্থান, ভূমির বহুবর্ণ শস্য ও উদ্ভিদ—এসবই নিঃশব্দে সাক্ষ্য দেয় যে এই বিশ্ব কোনো বেহিসাবি খেলনা নয়, বরং পরিমিত, উদ্দেশ্যময়, ক্ষমতাবান রবের সৃষ্টি। তাই আয়াতটি শুধু কৃষির কথা বলে না; এটি তাওহীদের দিকে ডাক দেয়, নবীদের সত্যবার্তার পক্ষে নিঃশব্দ কিন্তু অটল প্রমাণ তুলে ধরে।
কুরআন মানুষকে বারবার প্রকৃতির কাছে ফেরায়, কারণ প্রকৃতি এক নিষ্ঠুর আয়না—যেখানে অহংকার ভেঙে পড়ে, আর অন্তর বুঝে যায় তার নিজের অসহায়ত্ব। যে মাটি থেকে আমরা সৃষ্টি, সেই মাটিতেই আল্লাহ জীবনের এমন বিস্তার ঘটান যে অবিশ্বাসের সব অজুহাত ম্লান হয়ে যায়। এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে বান্দা যদি ভাবতে শেখে, তবে জমিন আর কেবল পদচারণার স্থান থাকে না; তা হয়ে ওঠে ইমানের পাঠশালা। আর এই পাঠশালায় একটিই শিক্ষা বারবার লেখা থাকে: যে প্রভু শুষ্ক মাটি থেকে সবুজ উথলে দিতে পারেন, তিনি মৃত হৃদয়কেও জাগাতে পারেন, তিনি সত্যকে বিজয়ী করতে পারেন, এবং তিনি যাকে চান তাকেই তাঁর নিদর্শনের ভেতর দিয়ে নিজের দিকে ফিরিয়ে আনতে পারেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের দৃষ্টি শুধু আকাশের দিকে তুলে থামিয়ে দেন না; তিনি জমিনের বুকেও তাকাতে বলেন। কারণ এই মাটি, যা আমাদের পায়ের নিচে নীরব পড়ে থাকে, তারই অন্তরে লুকিয়ে আছে জীবনের বিস্ময়। কত রঙ, কত গন্ধ, কত স্বাদ, কত নরম কঠিন রূপ—সবই এক মাটির গর্ভ থেকে ফুঁটে ওঠে। একটাই ভূমি, কিন্তু তার মধ্যে আল্লাহর কুদরত এমন বৈচিত্র্য স্থাপন করেছেন যে, প্রতিটি অঙ্কুর যেন অন্য এক সাক্ষ্য, প্রতিটি বৃক্ষ যেন অন্য এক ভাষা। মানুষ যদি একটু থামে, একটু দেখে, একটু অনুভব করে, তবে বুঝবে—এই সৃষ্টিজগত এমনই নিঃশব্দে কথা বলে, যার কণ্ঠে আছে রবের পরিপূর্ণ ক্ষমতার ঘোষণা।
কত মানুষ জমিনের ওপর দিয়ে হেঁটে যায়, অথচ জমিনের দিকে তাকায় না। তারা শস্য দেখে, কিন্তু দানকারীকে দেখে না; ফুল দেখে, কিন্তু ফোটানো সত্তাকে মনে করে না; ফল খায়, কিন্তু ফলদাতার রহমত অনুভব করে না। এই আয়াত যেন তাদের কঠিন অন্তরকে আলতো করে নাড়া দেয়: দেখো, তোমার চারপাশে যা কিছু ফুটছে, তা তোমাকে অস্বীকারের জন্য নয়, চিন্তার জন্য। আল্লাহর সৃষ্টির এই অফুরন্ত বিস্তার মানুষকে অহংকার থেকে নামিয়ে আনে, মাটির সাথে মিলিয়ে দেয়, আর বলে—তুমি নিজেও তো একদিন এ মাটিতেই ফিরে যাবে। তখন যে হৃদয় আজ কুদরত দেখে কাঁপে, সে হৃদয়ই একদিন রবের সামনে বিনম্র হয়ে দাঁড়াতে প্রস্তুত হয়।
আল্লাহ মানুষকে জমিনের দিকে তাকাতে বলেন—কিন্তু এই দৃষ্টি কেবল চোখের নয়, অন্তরেরও। মাটির বুক ফুঁড়ে যে কত রকম “করিীম” সৃষ্টি তিনি উদগত করেছেন, তা কি কেবলই দৃশ্যের আনন্দ? না, এ তো রবের নিঃশব্দ আহ্বান। শুষ্ক ভূমি কীভাবে জীবনে ভরে ওঠে, এক ক্ষুদ্র বীজ কীভাবে অন্ধকারের ভিতর থেকে আলো খুঁজে নেয়, এক পৃথিবী কীভাবে অসংখ্য রঙ, গন্ধ, রস ও উপকারে ভরে যায়—এসবের মধ্যে মানুষের জন্য নিদর্শন আছে। যে হৃদয় জাগ্রত, সে মাটির সবুজে কেবল উদ্ভিদ দেখে না; সে দেখে আল্লাহর কুদরত, তাঁর দয়া, তাঁর হিকমত।
সূরা আশ-শুআরার ধারাবাহিকতায় এই আয়াত যেন সত্যকে অস্বীকারকারীদের মুখে নীরবতার সিলমোহর বসায়। যারা নবীদের দাওয়াতকে কবিতা বলে হালকা করতে চায়, যারা ওহির আলোকে মানুষের কল্পনা ভেবে উড়িয়ে দিতে চায়, তাদের সামনে জমিন নিজেই সাক্ষ্য দেয়—এ জীবন হঠাৎ জন্মানো নয়, এ বিস্তার অর্থহীন নয়। যে মাটি মৃতের মতো পড়ে থাকে, তাতে প্রাণের ফোয়ারা বইয়ে দেন যিনি, তিনি কি মৃত হৃদয়কে জাগাতে সক্ষম নন? এই প্রশ্ন মানুষকে নিজের রবের সামনে ফিরিয়ে আনে, আর মনে করিয়ে দেয়—আল্লাহর ক্ষমতার সামনে অস্বীকারের কোনো আশ্রয় নেই।
এ আয়াতের ভেতরে তাই ভয়ও আছে, আশা-ও আছে। ভয়—কারণ যে চোখ এত নিদর্শন দেখেও অবনত হয় না, তার অন্তর কঠিন হয়ে যেতে পারে। আর আশা—কারণ আল্লাহ তাঁর দাওয়াতকে এমনভাবে ছড়িয়ে দেন যে, ধুলোমাটি পর্যন্ত তাঁর সাক্ষী হয়ে ওঠে। সমাজ যখন অহংকারে অন্ধ হয়, যখন সত্যকে হালকা আর মিথ্যাকে চতুর বলে জিতে যেতে চায়, তখন জমিনের এই নীরব বিস্ময় মানুষকে লজ্জিত করে। ফিরে এসো, হৃদয়! কারণ যে রব মৃত জমিনে জীবন নামিয়ে আনেন, তিনি তোমার ক্লান্ত আত্মাকেও পুনর্জীবিত করতে পারেন। তাঁর দিকে ফেরা মানে শূন্যতা থেকে ভরে ওঠা, আর সত্যকে অস্বীকার না করে নিজের ভেতরকার জমিনকে সজীব করে তোলা।
মানুষ কত সহজেই চোখের সামনে থাকা নিদর্শনকে উপেক্ষা করে! মাটির বুকে যে বীজ শুয়ে থাকে, তা কি জানে—তার জন্য কী বিস্ময় অপেক্ষা করছে? তবু আল্লাহর কুদরতে তা ফেটে ওঠে, সবুজ হয়, ফুলে-ফলে ভরে যায়, উপকারে ও সৌন্দর্যে জগতকে আচ্ছন্ন করে। এই একটিমাত্র আয়াত যেন আমাদের অহংকারকে নরম করে দেয়। যে রব মৃত জমিনকে জীবনের ঝরনায় ভরিয়ে দিতে পারেন, তিনি কি সত্যকে প্রকাশ করতে, মিথ্যাকে লজ্জিত করতে, আর অন্ধ হৃদয়কে জাগিয়ে তুলতে অপারগ? না—সমস্যা তাঁর কুদরতে নয়; সমস্যা আমাদের দেখার চোখে, ভাবার মননে, মানার সাহসে।
সূরা আশ-শুআরার এই পথে নবীদের কাহিনি আমাদের শেখায়: সত্য কখনো শব্দের চাকচিক্যে টেকে না, টেকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা আলোতে। কেউ ওহিকে কবিতা মনে করে ঠেলে দিতে পারে, কেউ দাওয়াতকে কল্পনা বলে তুচ্ছ করতে পারে, কিন্তু ভূমির এই নিরব সাক্ষ্য তাদের সব অজুহাতকে ভেঙে দেয়। মাটি যখন মৃতের পর জীবন ধারণ করে, তখন অন্তরকে কীভাবে বলা যায়—পুনরুত্থান অসম্ভব? হে মানুষ, একটু থামো, একটু নত হও। নিজের চোখে যা দেখছ, তা কেবল দৃশ্য নয়; তা রবের ডাকে সাড়া দেওয়ার আহ্বান। যে হৃদয় আজও ফিরতে পারেনি, সে যেন এই সবুজের দিকে তাকিয়ে বলে—হে আল্লাহ, আমি দেখলাম; এখন আমাকে সত্যের সামনে নম্র করে দিন।