সূরা আশ-শুআরার এই আয়াতটি যেন দীর্ঘ এক দাওয়াতি সফরের শেষে আকাশের মতো প্রশান্ত, অথচ বজ্রের মতো দৃঢ় একটি ঘোষণা। আল্লাহ বলেন: আপনার পালনকর্তা অবশ্যই পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু। এখানে দু’টি গুণ পাশাপাশি এসেছে—العزيز, অর্থাৎ যাঁকে কেউ পরাস্ত করতে পারে না; আর الرحيم, যাঁর রহমত না থাকলে কোনো অন্তরই নতুন করে জেগে উঠতে পারে না। এই এক বাক্যে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, সত্যের পক্ষে আল্লাহর শক্তি কেবল শাসন নয়, বরং তাঁর দয়া সত্যকে টিকিয়ে রাখে, পথহীনকে ফেরায়, ভাঙা মানুষকে আবার দাঁড় করায়।
এই সূরায় বারবার নবীদের কাহিনি এসেছে—নূহ, হূদ, সালিহ, লূত, শু‘আইব আলাইহিমুস সালাম—যেন একটাই সত্য বারবার নানা যুগের দরজায় কড়া নাড়ছে: মানুষ যখন অহংকারে ডুবে যায়, তখন নবীদের কণ্ঠে নেমে আসে তাওহীদের আহ্বান। এই আয়াত সেই ধারাবাহিক বয়ানের এক গভীর মোড়। যারা আল্লাহর রাসূলদেরকে মিথ্যা বলেছিল, তারা বাহ্যিক শক্তিতে উদ্ধত ছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের ওপরই প্রমাণ হলো, ক্ষমতার প্রকৃত মালিক তিনিই। আবার এই বিজয় কেবল ধ্বংসের ভাষা নয়—কারণ আল্লাহ ‘পরম দয়ালু’। তিনি বান্দাকে ডেকে নেন, সুযোগ দেন, তাওবা কবুল করেন, হেদায়াতের দরজা খোলা রাখেন।
এখানে কোনো নির্দিষ্ট সহিহভাবে প্রতিষ্ঠিত একক কারণ-নুযূল বর্ণিত না হলেও, পুরো সূরার প্রবাহ মক্কার সেই কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, যখন সত্যকে কবিতা, কল্পনা বা মানুষের বানানো কথা বলে ঠেলে দেওয়া হচ্ছিল। সেই পরিবেশে এই আয়াত যেন বলে: নবীদের দাওয়াত দুর্বল নয়, আর মিথ্যার শব্দ যতই উচ্চ হোক, তা আল্লাহর শক্তির সামনে তুচ্ছ। একই সঙ্গে এও জানিয়ে দেয়—যিনি দমন করতে সক্ষম, তিনিই অনুগ্রহ করতে সক্ষম; যাঁর ক্ষমতা ভয় জাগায়, তাঁর রহমত নিরাশ হৃদয়কে বাঁচায়। তাই এই আয়াত কেবল একটি বর্ণনা নয়, এটি মুমিনের হৃদয়ে ভরসার স্থির আলো: আল্লাহর কাছে সত্য কখনো একা নয়, আর দয়ার কাছে ফিরে আসা কেউ কখনো পথ হারায় না।
এই আয়াতের মধ্যে এমন এক নীরব মহিমা আছে, যা মানুষের অহংকারকে এক মুহূর্তে ক্ষুদ্র করে দেয়। আল্লাহ বলেন, আপনার রবই পরাক্রমশালী, আবার তিনিই পরম দয়ালু। অর্থাৎ সত্যের পথে যা কিছু দৃঢ়তা, শক্তি, প্রতিরোধ—সবই তাঁর; আর পথভ্রষ্টের জন্য ফিরে আসার যে দ্বার, তা-ও তাঁর রহমতেরই ফল। নবীদের কাহিনির দীর্ঘ শৃঙ্খলে এই বাক্য যেন এক দীপ্ত সিলমোহর: তিনি শুধু শাস্তিদাতা নন, তিনি পথ দেখান; শুধু বিজয়ী নন, তিনি ফিরিয়ে আনার দরজাও খুলে রাখেন।
আসলে এই বাক্যটি আমাদের শেখায়, আল্লাহর ক্ষমতা কখনো নিরর্থক আঘাত নয়, আর তাঁর দয়া কখনো দুর্বল আশ্বাস নয়। তিনি অপ্রতিরোধ্য—তাই সত্য একদিন অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হবে; আবার তিনি অসীম দয়ালু—তাই যে মানুষ আজও ভেঙে পড়েছে, তার জন্যও ফিরবার সুযোগ শেষ হয়ে যায়নি। এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়, জীবন যেন দু’টি দরজার মাঝখানে: একদিকে আল্লাহর শাস্তির ভয়, অন্যদিকে আল্লাহর রহমতের আশা। আর যে হৃদয় এই দুইয়ের ভারসাম্য বুঝে নেয়, সে জানে—আল্লাহর দিকে ফিরতে দেরি করা যায় না, কারণ তাঁর পরাক্রম চূড়ান্ত, আর তাঁর দয়া প্রত্যাশার চেয়েও বিস্তৃত।
নবীদের কাহিনিগুলো শুধু অতীতের পাতা নয়; সেগুলো আমাদের অন্তরের আয়না। নূহ, হূদ, সালিহ, লূত, শু‘আইব আলাইহিমুস সালাম—প্রতিটি দাওয়াত একই সত্যের দিকে ডাকে: মানুষ যেন অহংকার থেকে নেমে আসে, মিথ্যার মোহ থেকে জেগে ওঠে, আল্লাহর সামনে নত হয়। আর এই আয়াত সেই দীর্ঘ বয়ানের অন্তিম সুরের মতো বলে দেয়, তোমরা যাদেরকে দুর্বল ভেবেছিলে, তাদের রব দুর্বল নন। তিনি العزيز—যার ক্ষমতার সামনে কোনো জুলুম স্থায়ী হতে পারে না; তিনি الرحيم—যার দয়ার দরজা তওবাকারীর জন্য কখনো বন্ধ হয় না। সমাজ যখন মিথ্যাকে সভ্যতার নামে সাজায়, অন্যায়কে শক্তির ভাষায় বৈধ করে, তখন এই আয়াত কানে নয়, হৃদয়ে আঘাত করে: শেষ কথা মানুষের কৌশল নয়, আল্লাহর হুকুম।
এই সত্য আমাদের নিজের দিকে ফিরিয়ে আনে। আমরা কি এমন না, যে বাহ্যিক সাফল্যে গর্ব করি, অথচ অন্তরে ভাঙা, ভয়ের মধ্যে ছুটে চলা এক অসহায় আত্মা? আল্লাহর পরাক্রম আমাদের ভীত করে, কারণ তাঁর কাছে কিছুই গোপন নয়; আবার তাঁর দয়া আমাদের আশা জাগায়, কারণ তাঁর কাছে ফিরে আসা কখনো বৃথা যায় না। যে হৃদয় দম্ভে শক্ত হয়ে গেছে, সে এই আয়াতে নরম হয়ে যায়; যে হৃদয় পাপের ভারে ক্লান্ত, সে এই আয়াতে আশ্রয় খুঁজে পায়। এখানে ভয় আছে, কিন্তু হতাশা নেই; আশা আছে, কিন্তু গাফলত নেই। যেন আল্লাহ নিজেই আমাদের বলছেন: আমার শক্তি তোমাদের বিদ্রোহকে চূর্ণ করবে, আর আমার রহমত তোমাদের অনুতাপকে বাঁচিয়ে তুলবে।
অতএব এই আয়াত শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়, আত্মসমালোচনার জন্য। আমি কি আল্লাহর দয়ার উপর ভরসা রেখে অবাধ্য হয়ে চলছি, নাকি তাঁর পরাক্রম মনে রেখে গোপন-প্রকাশ্যে নিজের হিসাব নিচ্ছি? সত্যের পথে দাঁড়ানো নবীদের উত্তরাধিকার; আর সেই পথ সহজ নয়, কারণ তা মানুষের প্রশংসার পথ নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ। তবু যে ব্যক্তি আজ নিজেকে সংশোধন করে, যিনি নিজের নাফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন, তাঁর জন্য এই আয়াত এক প্রশান্ত আশ্বাস: তোমার রব পরাক্রমশালী, তাই তোমার সংগ্রাম বৃথা যাবে না; তোমার রব পরম দয়ালু, তাই তোমার তওবা ফিরিয়ে দেওয়া হবে না। শেষ পর্যন্ত মানুষ আল্লাহর কাছেই ফিরে যাবে—কিছু নিয়ে নয়, বরং খালি হাতে, কিন্তু যদি ঈমানের অশ্রু থাকে, সে খালি হাতই দয়া দিয়ে পূর্ণ হয়ে যেতে পারে।
মানুষের ইতিহাসে অহংকার অনেক রূপ নেয়—কখনো তা শক্তির ভাষা, কখনো সম্পদের, কখনো জ্ঞানের, কখনো সংখ্যার। কিন্তু এই ছোট্ট আয়াত যেন সেই সব ভ্রান্ত উচ্চারণের ওপর নীরব, অটল, চিরন্তন এক সীলমোহর: আপনার রব পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু। তিনি চাইলে মুহূর্তে সব ভেঙে দিতে পারেন, আর চাইলে ভাঙা হৃদয়কে এমনভাবে জুড়ে দিতে পারেন যে সেখানে আবার ঈমানের আলো জ্বলে ওঠে। তাঁর পরাক্রম আমাদের ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং আমাদের জাগানোর জন্য; আর তাঁর দয়া আমাদের অবহেলার সুযোগ দেওয়ার জন্য নয়, বরং ফিরে আসার পথ খুলে দেওয়ার জন্য।
যে প্রভু নবীদেরকে সত্যের সাক্ষী বানিয়েছেন, যিনি মিথ্যার কোলাহলের ভেতর থেকেও হকের কণ্ঠকে টিকিয়ে রেখেছেন, তিনি আজও বদলাননি। যাঁর হাতে ক্ষমতা, তাঁর হাতেই রহমত; আর যাঁর রহমত, তা কেবল দুর্বলদের সান্ত্বনা নয়, তাওবা করা মানুষের আশ্রয়। তাই এই আয়াত পাঠ করে যদি অন্তরে সামান্য কাঁপন না আসে, তবে বুঝতে হবে হৃদয় খুব বেশি শব্দে ভরে গেছে। আজ দরকার নত হওয়া—কারণ পরাক্রমশালী রবের সামনে মাথা নিচু করাই মুক্তি, আর পরম দয়ালুর দরজায় ফিরে আসাই বেঁচে থাকার আসল ঠিকানা।