সূরা আশ-শুআরার এই আয়াতটি খুব অল্প শব্দে এক ভয়ংকর দৃশ্য এঁকে দেয়: وَأَزْلَفْنَا ثَمَّ ٱلْءَاخَرِينَ—“আমি সেথায় অপর দলকে পৌঁছিয়ে দিলাম।” বাহ্যত এটি একটি স্থানান্তরের কথা, কিন্তু অন্তরে এটি আল্লাহর কুদরতের এমন এক ঘোষণা, যেখানে মানুষের পরিকল্পনা, অহংকার, শক্তি আর পিছুটান—সবই এক মুহূর্তে মূল্যহীন হয়ে যায়। যারা দূরে ছিল, যারা তাগিদ এড়িয়ে চলেছিল, যারা সত্যের ডাককে ঠাট্টা করে পিছিয়ে গিয়েছিল, আল্লাহ চাইলে তাদেরই এমন জায়গায় এনে দাঁড় করান, যেখানে আর পালাবার কোনো পথ থাকে না।
এই আয়াতের পেছনের ধারাবাহিকতায় দেখা যায় মূসা আলাইহিস সালামের ঘটনা, যেখানে ফেরাউন ও তার বাহিনী সত্যকে অস্বীকার করে ধাওয়া করেছিল। পূর্বের আয়াতগুলোতে সমুদ্র ফেটে যাওয়ার, এক পক্ষের নিরাপদে পার হয়ে যাওয়ার, আর অন্য পক্ষের সামনে পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ইশারা রয়েছে। এখানে “অপর দল” বলতে সেই অগ্রাহ্যকারী দলকেই বোঝানো হয়েছে, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা এমনভাবে সন্নিকটে এনে দিলেন যে, তাদের নিজের চূড়ান্ত পরিণতির মুখোমুখি হওয়া অনিবার্য হয়ে উঠল। এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা নয়; এটি সত্য-মিথ্যার সংঘর্ষে আল্লাহর ফয়সালার এক কঠিন, দীপ্ত, অবিসংবাদিত ঘোষণা।
মানুষ অনেক সময় ভাবে—আমি আজ যেখানে আছি, সেখান থেকেই আমি নিজেকে বাঁচিয়ে নেব, লুকিয়ে নেব, দূরে সরিয়ে নেব। কিন্তু এই আয়াত শেখায়, আল্লাহর ইচ্ছার সামনে দূরত্ব কোনো নিরাপত্তা নয়। তিনি চাইলে মিথ্যার বাহিনীকে এমন কাছে এনে দেন যে, তাদের গর্বিত পদক্ষেপই তাদের ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়; আর সত্যপন্থীরা দেখে নেয়, সাহায্য আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। তাই এই আয়াত হৃদয়ে কাঁপন তোলে: যে আল্লাহ পালিয়ে থাকা মানুষকে কাছাকাছি এনে ধরতে পারেন, তিনি তওবা করা বান্দাকেও দূর থেকে ডাকতে পারেন, আর অবাধ্যকে সতর্ক করার ক্ষমতাও তাঁরই।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমি সেথায় অপর দলকে পৌঁছিয়ে দিলাম।” বাহ্যত এটি একটি ছোট্ট বাক্য, কিন্তু এর অন্তরে লুকিয়ে আছে ক্ষমতার এমন এক বজ্রধ্বনি, যা মানুষের সব কৌশল, সব দম্ভ, সব নিরাপদ দূরত্বকে এক মুহূর্তে ভেঙে ফেলে। যারা সত্যকে এড়িয়ে চলে, যারা নিদারুণ স্পর্ধায় আল্লাহর ডাকে পেছন ফিরে দাঁড়ায়, তারা মনে করে দূরে সরে গেলেই বোধ হয় রক্ষা পাওয়া যাবে; কিন্তু দূরত্ব কখনো আল্লাহর কুদরতের সামনে আড়াল হতে পারে না। তিনি চাইলে দূরেরকেও কাছে এনে দেন, পালিয়ে বেড়ানো হৃদয়কে এমন জায়গায় দাঁড় করান, যেখানে সত্যের মুখোমুখি হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না।
এ আয়াত আমাদের কাঁপিয়ে দেয়, কারণ এটি বলে—আল্লাহর সামনে পালাবার জায়গা নেই, আর সত্যের সামনে অন্ধকার চিরকাল টেকে না। নবীদের দাওয়াত শুধু বক্তব্য ছিল না; তা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন আহ্বান, যার সামনে একদিন না একদিন সব মুখোশ খুলে যায়। আজও মানুষ নিজের ভেতরের ফেরাউনকে লুকাতে চায়, তর্কে, অস্বীকারে, ব্যস্ততায়, গর্বে; কিন্তু আল্লাহ চাইলে সে-ই হয়ে যায় “অপর দল”, যে দূরে থাকতে চেয়েছিল, অথচ অবশেষে টেনে আনা হলো তারই পরিণতির দিকে। এই আয়াত আমাদের শেখায়, দেরি করে হলেও সত্যের কাছে ফিরে আসা জীবন, আর জেদ ধরে দূরে থাকা এমন এক ডুব, যার শেষ প্রান্তে কেবল আফসোস থাকে।
“আমি সেথায় অপর দলকে পৌঁছিয়ে দিলাম”—এই সংক্ষিপ্ত ঘোষণার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক ভয়াল দৃশ্য। মানুষ যতই নিজেকে দূরে মনে করুক, যতই সে ভাবুক আমি নিরাপদ, আমি শক্তিশালী, আমি পৌঁছাব না—আল্লাহর ফয়সালা এলে দূরত্বের সব ধারণা ভেঙে পড়ে। ফেরাউন ও তার বাহিনীর মতো এক জাতি যখন সত্যকে অস্বীকার করে অহংকারকে আশ্রয় করে, তখন তাদের পেছনে শুধু ধ্বংসই ধাওয়া করে না; আল্লাহ নিজেই তাদেরকে এমন পরিণতির খুব কাছে এনে দেন, যেখান থেকে ফিরবার কোনো রাস্তা থাকে না। এই কাছে আনা কেবল স্থান বদল নয়, এটি হৃদয়ের উপর নেমে আসা এক অমোঘ ঘেরাও—যেন মিথ্যার সব কূটকৌশল এক মুহূর্তে নিঃশ্বাসহীন হয়ে যায়।
এই আয়াত আমাদের সমাজকেও নাড়া দেয়। মানুষ কতবার সত্যের ডাক শুনেও দেরি করে, কতবার নিজের ক্ষমতা, পদ, দল, সম্পদ আর সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ঢাল বানিয়ে আল্লাহর সতর্কবার্তাকে ঠাট্টা করে! কিন্তু আল্লাহ চাইলে সেই অবহেলাকারীকেই এমন অবস্থায় এনে দাঁড় করান, যেখানে তার মুখোশ খুলে যায়, তার ভরসা ভেঙে যায়, আর তার ভেতরের দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে পড়ে। নবীদের দাওয়াত সবসময়ই মানুষকে এক চূড়ান্ত বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়—তুমি কার পক্ষে? সত্যের পক্ষে, না নাফরমানির অন্ধকারের পক্ষে? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু মীমাংসা এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে নিজের অন্তরকে জিজ্ঞেস করতে হয়: আমি কি সত্যের কাছাকাছি আসছি, নাকি গাফিলতির কারণে ধীরে ধীরে এমন জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছি যেখানে ফিরে আসার পথ সংকীর্ণ হয়ে আসবে? আল্লাহর কুদরত ভয়েরও, আশারও। ভয়ের, কারণ তাঁর ধরাছোঁয়ার বাইরে কেউ নয়; আশার, কারণ তিনি চাইলে দূরকে কাছে এনে যেমন বিচার সামনে দাঁড় করান, তেমনি পথভ্রষ্ট হৃদয়কেও তওবার দিকে ফিরিয়ে দিতে পারেন। যে বান্দা নিজের দুর্বলতা বুঝে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তার জন্য এই নৈকট্য শাস্তি নয়, রহমত হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যে হককে অস্বীকার করে, সে যতই পিছিয়ে থাকতে চাইুক—একদিন তাকে সত্যের মুখোমুখি এনে দাঁড় করানো হবেই।
এই একটি বাক্যে কত বড় হুঁশিয়ারি! আল্লাহ বলেন, “আমি সেথায় অপর দলকে পৌঁছিয়ে দিলাম”—যেন মানুষ ভাবতে না শেখে যে সে দূরে আছে, নিরাপদ আছে, বা সময় এখনো বাকি। ফেরাউন তার শক্তি নিয়ে এগিয়েছিল, সৈন্য নিয়ে এগিয়েছিল, অহংকার নিয়ে এগিয়েছিল; কিন্তু সত্যের সীমানায় পৌঁছে সে দেখল, শক্তি আসলে পথ খুলে না, বরং কখনো কখনো পথকে আরও সংকীর্ণ করে দেয়। আল্লাহ চাইলে দূরে থাকা দলকেও কাছে এনে দেন, এমন কাছে যে তখন আর মুখ ফিরিয়ে থাকা যায় না, পালানোর ফাঁকও থাকে না, অস্বীকারের আশ্রয়ও থাকে না। এ শুধু ইতিহাস নয়; এ মানুষের প্রতিটি যুগের জন্য আল্লাহর নিঃশব্দ ঘোষণা—তুমি যতই দূরে সরে যাও, শেষ সিদ্ধান্ত আল্লাহর হাতে।
তাই এই আয়াত আমাদের অন্তরে ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসার ডাকও জাগায়। আজ যে সত্যকে এড়িয়ে চলছে, যে কুরআনের আহ্বানকে হালকা ভাবছে, যে গুনাহকে দীর্ঘদিনের সঙ্গী বানিয়ে ফেলেছে, সে কি জানে—আল্লাহ চাইলে তাকে এমন এক মুহূর্তে সত্যের সামনে দাঁড় করাতে পারেন, যখন অজুহাতও থমকে যায়? মানুষের জীবনে এমন অনেক সমুদ্র আছে, যেখানে বাহ্যত সব পথ বন্ধ; কিন্তু বিশ্বাসীর জন্য সেখানেই আল্লাহর কুদরত খুলে যায়, আর অবিশ্বাসীর জন্য সেখানেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়। এই আয়াত আমাদের শেখায়, শক্তিমান কে—তা মানুষ নয়, আল্লাহই; এবং সাফল্য কার—তা কেবল তারই, যে ভয় নিয়ে নয়, ঈমান নিয়ে তাঁর দিকে ফিরে আসে।