“কখনই নয়”—মূসা আলাইহিস সালামের এই দুটি শব্দ যেন ভয়কে দাঁড়াতেই দেয় না। সামনে সাগরের জল, পেছনে ফেরাউনের সেনা, আর মাঝখানে এক মানবহৃদয়ের সীমান্তহীন বিপর্যয়; তবু তাঁর মুখে আতঙ্কের বিলাপ নেই, আছে তাওয়াক্কুলের অটল ঘোষণা: “আমার সাথে আছেন আমার রব। তিনি আমাকে পথ বলে দেবেন।” এই আয়াতে শুধু একটি ঘটনা বলা হয়নি, বলা হয়েছে ঈমানের ভাষা—যে ভাষায় বান্দা নিজের দুর্বলতাকে স্বীকার করেও আল্লাহর অশেষ কুদরতের ওপর নির্ভর করতে শেখে।
সূরা আশ-শুআরার এ অংশে মূসা আলাইহিস সালাম ও ফেরাউনের কাহিনি মানুষের সামনে সত্য ও মিথ্যার লড়াইকে এক জীবন্ত রূপে তুলে ধরে। এটি কেবল ইতিহাসের স্মৃতি নয়; এটি দাওয়াতের পথের চিরন্তন বাস্তবতা—সত্যের আহ্বান অনেক সময় একাকী মনে হয়, কিন্তু আল্লাহর সহায়তা কখনো একাকী নয়। যে নবী আল্লাহর বার্তা নিয়ে দাঁড়ান, তিনি বাহ্যিক শক্তির ওজন দিয়ে পথ খোঁজেন না; তিনি আসমানী হেদায়াতের দিকে তাকান, কারণ পথ দেখানো আল্লাহরই কাজ, আর হৃদয়কে স্থির রাখা তাঁরই রহমত।
এই আয়াতে সুনির্দিষ্ট কোনো পৃথক আসবাবুন নুযূলের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা না থাকলেও, এর প্রসঙ্গ কুরআনের ধারাবাহিক বয়ানের মধ্যেই স্পষ্ট: ফেরাউনের অত্যাচার, মূসা আলাইহিস সালামের কওমকে উদ্ধারের মুহূর্ত, এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এমন এক সহায়তা যা মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। এখানেই মুমিনের জন্য শিক্ষা—সংকট যত ঘনিয়ে আসুক, বান্দার কাজ হলো আল্লাহর দিকে ফিরে বলা, “আমার সাথে আছেন আমার রব।” এই বিশ্বাসই অন্তরকে ভাঙে না, বরং ভাঙনের মধ্যেও সজীব রাখে; কারণ যে হৃদয়ে রবের সান্নিধ্যবোধ জাগে, সেখানে অন্ধকারও শেষ পর্যন্ত হেদায়াতের দরজা হয়ে যায়।
মানুষের সমস্ত হিসাব যখন ভেঙে পড়ে, তখনই ঈমানের আসল উচ্চারণ শোনা যায়। মূসা আলাইহিস সালামের মুখে উচ্চারিত “কখনই নয়” কোনো অবহেলার বাক্য নয়; এটি সেই হৃদয়ের কণ্ঠস্বর, যে হৃদয় সাগরের সামনে দাঁড়িয়েও জানে—পথ দেয়াল দিয়ে নয়, রব দিয়ে খোলে। পেছনে শত্রুর তাড়া, সামনে অনিশ্চয়তার অন্ধকার; তবু তিনি আতঙ্ককে নিজের সিদ্ধান্ত বানাননি। তিনি নিজের চারপাশের দৃশ্যকে নয়, তাঁর রবের সান্নিধ্যকে সত্য বলে গ্রহণ করেছেন। এই একটিমাত্র বাক্যে দাওয়াতের পথের সমস্ত মহত্ত্ব আছে: বাহ্যিক শক্তি না থাকলেও সত্য দুর্বল নয়, কারণ সত্যের সঙ্গে থাকে আল্লাহর হেদায়াত।
এ কারণেই এই আয়াত শুধু মূসা আলাইহিস সালামের নয়, প্রত্যেক মুমিনের অন্তরের আয়াত। যখন সত্য কথা বলা কঠিন হয়, যখন দায়িত্ব ভারী লাগে, যখন সামনে কেবল জটিলতা আর পেছনে কেবল ভয়—তখন এই বাক্য হৃদয়ে নামিয়ে আনতে হয়: “আমার সাথে আছেন আমার রব।” যে বান্দা এই বিশ্বাসে বাঁচে, সে পথ হারালেও হারায় না; কারণ তার পথনির্দেশ বাহ্যিক সম্ভাবনায় নয়, আল্লাহর ইচ্ছা ও হিকমতে বাঁধা। আর এভাবেই নবীদের কাহিনি আমাদের শেখায়—আল্লাহর দিকে ফেরাই শেষ আশ্রয়, আর সেই আশ্রয়ে পৌঁছে গেলে ভয়ও একদিন সেজদার মতো নত হয়ে যায়।
ভয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তে মূসা আলাইহিস সালামের মুখ থেকে যে কথা বের হয়, তা কোনো সাধারণ সান্ত্বনা নয়; তা ঈমানের এমন এক ঘোষণা, যেখানে বান্দা নিজের সব উপায়-উপকরণ ক্ষীণ জেনেও রবের ওপর ভরসার দীপ্তি হারায় না। পেছনে শত্রুর চাপ, সামনে সমুদ্রের বিস্তার, আর অন্তরে এক অদৃশ্য ডাক—এই সংকটের মাঝখানে তিনি বলেন, “কখনই নয়, আমার সাথে আছেন আমার পালনকর্তা। তিনি আমাকে পথ বলে দেবেন।” মানুষের চোখে যেখানে পথ শেষ, মুমিনের চোখে সেখানে শুরু হয় আল্লাহর হেদায়াত। কারণ পথ শুধু মাটির ওপর আঁকা রেখা নয়; পথ হলো সেই নূর, যা আল্লাহ বান্দার অন্তরে নাজিল করেন, যখন বান্দা নিজের অসহায়ত্বকে সত্যভাবে চিনে তাঁর দিকে ফিরে যায়।
এই আয়াত আমাদের সমাজের এক নির্মম সত্যও মনে করিয়ে দেয়: বাহ্যিক শক্তি সর্বদা ভয় দেখায়, ক্ষমতার দাম্ভিকতা চারপাশকে অন্ধকার করে, আর মানুষ অনেক সময় সংখ্যার জোরে সত্যকে চাপা দিতে চায়। কিন্তু নবীদের ইতিহাস শেখায়, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো মানে অন্ধ সাহস নয়; বরং এমন আত্মসমর্পণ, যেখানে হৃদয় বলে—আমি জানি না, কিন্তু আমার রব জানেন; আমি পারি না, কিন্তু তিনি পথ দেখাতে সক্ষম। আজও যে আত্মা গুনাহ, সংশয়, দুশ্চিন্তা, অথবা মানুষের চাপের সামনে কেঁপে ওঠে, এই আয়াত তাকে জাগিয়ে তোলে: আল্লাহর সাথে সম্পর্কই নিরাপত্তা, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলই উদ্ধার, আর আল্লাহর হেদায়াতই সংকটের মধ্যে সবচেয়ে নিশ্চিত গন্তব্য। মূসা আলাইহিস সালামের এই উচ্চারণ আমাদেরও আত্মজিজ্ঞাসার সামনে দাঁড় করায়—আমি কি ভয়কে আমার রবের চেয়ে বড় করছি, নাকি সত্যিই আমার সাথে আছেন যিনি আমাকে পথ বলে দেবেন, এই বিশ্বাসে হৃদয় স্থির করছি?
যখন মানুষের সামনে পথ বন্ধ হয়ে আসে, তখনই ঈমানের প্রকৃত চেহারা দেখা যায়। মূসা আলাইহিস সালাম সাগরের কিনারে দাঁড়িয়ে এই কথা বলেছেন বলে কুরআন আমাদের সামনে এমন এক হৃদয় খুলে দেয়, যেখানে ভয় থাকলেও ভয়কে নেতৃত্ব দিতে দেওয়া হয়নি। তিনি পরিস্থিতিকে অস্বীকার করেননি, কিন্তু পরিস্থিতিকে রবের চেয়ে বড়ও বানাননি। এটাই তাওয়াক্কুল—নিজের অসহায়তা স্বীকার করে আল্লাহর সক্ষমতায় আশ্রয় নেওয়া। মানুষের হিসাব যেখানে শেষ, সেখান থেকেই আল্লাহর হেদায়াত শুরু হতে পারে; বান্দা শুধু এতটুকু জানে, তার রব আছেন, আর সেই রব কখনো দিশাহীন রাখেন না।
আজ আমাদের জীবনের অনেক সংকটে এই আয়াত আয়নার মতো দাঁড়িয়ে থাকে। কখনো পাপের অন্ধকারে, কখনো জীবিকার টানাপোড়েনে, কখনো সম্পর্কের জটিলতায়, কখনো হকের পথে একা মনে হলে হৃদয় ফিসফিস করে বলে—এখন কী হবে? তখন মূসা আলাইহিস সালামের এই ঘোষণা আমাদের শেখায়, ভয়ে সরে যাওয়া নয়, বরং ভয়ের মাঝেই রবকে ডাকা। যে বান্দা আল্লাহর দিকে ফিরে, তার পথ আল্লাহ নিজে খুলে দেন—কখনো এমন দরজা দিয়ে, যা মানুষ কল্পনাও করেনি; কখনো এমন প্রশান্তি দিয়ে, যা ঝড়ের মাঝেও অন্তরকে অটল রাখে।
অতএব আজ যদি অন্তর ক্লান্ত হয়, যদি নিজের শক্তি ভেঙে পড়ে, তাহলে এই আয়াতের সামনে নরম হয়ে দাঁড়াও। মুখে শুধু উচ্চারণ নয়, হৃদয়ে সত্যি করে বলো: আমার সাথে আছেন আমার রব। তাঁর উপরই আমার ভরসা, তাঁর দিকেই আমার প্রত্যাবর্তন। আর এই ভরসাই মুমিনকে বাঁচিয়ে রাখে—অহংকার থেকে, হতাশা থেকে, এবং আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার ভয়াবহ অন্ধকার থেকে।