“এবং আমরা সবাই সদা শংকিত”—ফেরাউনের সম্প্রদায়ের এই বাক্যটি কেবল একটি ভয়ভীতির ঘোষণা নয়, এটি সত্যের মুখোমুখি মানুষের আত্মরক্ষামূলক মনস্তত্ত্বের এক নগ্ন স্বীকারোক্তি। তারা যেন বলছে, আমরা সতর্ক, আমরা সাবধান, আমরা বিপদের আভাস পাই। কিন্তু তাদের এই সতর্কতা ছিল আলোকে স্বাগত জানানোর জন্য নয়; ছিল সেই আলো থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য। হৃদয় যখন অহংকারে জমে যায়, তখন সত্য তার কাছে আশ্রয় নয়, আতঙ্ক হয়ে ওঠে; আর আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা হিদায়াত তার কাছে মুক্তি নয়, হুমকি বলে মনে হয়। এই আয়াতে তাই শুধু একটি বাক্য নেই, আছে ভীত মানুষের কণ্ঠে লুকানো এক দীর্ঘ অস্বীকার।

সূরা আশ-শুআরার এই অংশে মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াতের প্রেক্ষাপটে কথাটি এসেছে। আল্লাহর নবী যখন তাওহীদের আহ্বান নিয়ে দাঁড়ান, তখন ফেরাউনের দরবারে শুধু রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াই জেগে ওঠেনি; জেগে উঠেছিল ক্ষমতার ভয়, সামাজিক ভাঙনের আশঙ্কা, এবং নিজেদের গড়া মিথ্যা ব্যবস্থাকে হারানোর আতঙ্ক। আয়াতের শব্দগুলো সেই মুহূর্তের মানসিক বাস্তবতাকে উন্মোচন করে—মানুষ অনেক সময় সত্যকে মিথ্যা বলে না, বরং সত্যকে এমন ভয় পায় যে তাকে নানা হিসাবের মধ্যে ডুবিয়ে দেয়। তারা বলে, আমরা সতর্ক; কিন্তু আসলে তারা আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে চায় না। তাদের শঙ্কা ছিল অন্তরের পবিত্রতা থেকে নয়, ছিল দম্ভের দুর্গ টিকিয়ে রাখার জন্য।

এই আয়াত আমাদেরও থামিয়ে দেয়। কারণ কেবল ফেরাউনের লোকেরাই নয়, মানুষের ভেতরে ভেতরে একটি ফেরাউনি প্রবণতা জেগে থাকতে পারে—যেখানে নসীহত এলে আমরা বলি, এখন সময় নয়; কুরআনের ডাক এলে বলি, পরে ভাবব; হকের দাবি সামনে এলে বলি, এত জটিলতা আছে। বাইরের জগতের বিপদ যেমন মানুষকে সতর্ক করে, তেমনি অন্তরের পাপ, অভ্যাস, আর অহংকারও মানুষকে এক ধরনের স্থায়ী শঙ্কায় বেঁধে রাখে। তখন সে সত্যকে গ্রহণ করার সাহস হারায়। এই আয়াতের গভীরতা এখানেই—ভয় মানুষের স্বভাব হতে পারে, কিন্তু সেই ভয় যদি আল্লাহর দিকে না নেয়, তবে তা মানুষকে সত্য থেকে আরও দূরে ঠেলে দেয়; আর নবীদের কাহিনি আমাদের শেখায়, নিরাপত্তা ক্ষমতায় নয়, আল্লাহর হক্বের সামনে নরম হয়ে যাওয়ার মধ্যেই।

মানুষ যখন সত্যকে ভালোবাসে না, তখন সে ভয়কেই নিজের বুদ্ধি বলে মনে করে। ফেরাউনের লোকদের এই কথা—“এবং আমরা সবাই সদা শংকিত”—শুধু এক দলে মানুষের সাবধানতা নয়; এটি সেই অন্তরের ভাষা, যেখানে আলো এসে পড়লেও দরজা খোলা হয় না। তারা আশঙ্কা করছে, কিন্তু কিসের? কেবল ক্ষতির? না—বরং তাদের ভেতরে যে মিথ্যা-নির্মিত নিরাপত্তা, ক্ষমতার ঘেরাটোপ, অভ্যাসের দেয়াল, এবং অবাধ্যতার আরাম; সেগুলো ভেঙে যাওয়ার। সত্য মানুষের হৃদয়কে ডাক দিলে, সে যদি সিজদার জন্য প্রস্তুত না থাকে, তবে সেই ডাকই তার কাছে বিপদের শব্দ হয়ে ওঠে।

এই বাক্যে এক নির্মম মনস্তত্ত্ব আছে। মানুষ অনেক সময় এমন শংকিত হয়, যাতে সে আল্লাহর দিকে ফিরতে পারে না; বরং আরও শক্ত হয়ে নিজের ভেতর গুটিয়ে যায়। নবীদের দাওয়াত সবসময় এমনই এক পরীক্ষা—কার কাছে তা রহমত, আর কার কাছে তা হুমকি। যাদের অন্তর নরম, তারা কাঁপে এবং ফিরে আসে; যাদের অন্তর শক্ত, তারা কাঁপে এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এ কারণেই কুরআন আমাদের শুধু ঘটনা শোনায় না, আমাদের নিজের ভেতরের মুখও দেখায়। আমরাও কি কখনো সত্য শুনে শান্ত হইনি, বরং অজুহাতের খোঁজ করেছি? আমরাও কি কখনো জানার পরও এড়াতে চেয়েছি, কারণ জানলে বদলাতে হয়?
এখানেই এই আয়াত হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়। আল্লাহর দাওয়াত কখনো দুর্বল নয়; দুর্বল হয় মানুষের আত্মসমর্পণহীন মন। ফেরাউনের লোকেরা নিজেদের শংকাকে প্রজ্ঞা ভেবেছিল, কিন্তু আসলে তারা ছিল হার মানার আগের শেষ প্রতিরোধে। আর মুমিনের শিক্ষা হলো—সত্যের সামনে শংকা থাকলে তা লুকিয়ে রাখা নয়, বরং সেই শংকাকে আল্লাহর সামনে এনে রাখা। কারণ আল্লাহই হৃদয়ের ভয়ের মালিক, তিনিই পথের নিরাপত্তা দান করেন। যে হৃদয় তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে, তার ভয়ও ইমানের অংশ হয়ে যায়; আর যে হৃদয় তাঁকে অস্বীকার করে, তার সতর্কতাও একদিন তাকে অন্ধকারেই বন্দী করে রাখে।

“এবং আমরা সবাই সদা শংকিত।” এই একটুকু বাক্যে কত বড় এক অন্তর্জগতের ছবি আঁকা আছে। বাহ্যত এটি সতর্কতার কথা, কিন্তু অন্তরে এটি ছিল সত্যের মুখোমুখি হয়ে সরে যাওয়ার অজুহাত। ফেরাউনের লোকেরা যেন বলছিল, আমরা বিপদ টের পাই, আমরা সম্ভাব্য ক্ষতি বুঝি, আমরা নিজেদের বাঁচাতে জানি। কিন্তু যে হৃদয় অহংকারে শক্ত হয়ে যায়, সে সত্যকে আর সত্য হিসেবে দেখে না; তাকে দেখে ঝুঁকি হিসেবে, তাকে দেখে নিজের নিরাপত্তার শত্রু হিসেবে। এভাবেই অনেক সমাজে নবীদের ডাক প্রথমে গ্রহণযোগ্যতা পায় না, কারণ দাওয়াত শুধু কথার সংঘাত নয়—এটি স্বার্থ, ভয়, এবং মিথ্যা ব্যবস্থার ভিত কাঁপিয়ে দেয়।

এই আয়াত আমাদেরও থামিয়ে জিজ্ঞেস করে: আমি কি সত্যের সামনে সত্যিই শংকিত, নাকি কেবল নিজের অভ্যাস ভাঙার ভয়ে কাঁপছি? অনেক সময় মানুষ পাপকে বিপদ বলে না, কিন্তু তাওহীদের আহ্বানকে বিপদ বলে মনে করে। কারণ তাওহীদ শুধু বিশ্বাসের কথা নয়; এটি অন্তরের রাজাকে সিংহাসনচ্যুত করে, অহংকারকে নামিয়ে আনে, মিথ্যার নিরাপদ দেয়াল ভেঙে দেয়। তাই যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে চায়, তাকে আগে নিজের ভেতরের এই ভয়ের মুখোমুখি হতে হয়। এই আয়াতে লুকিয়ে আছে এক নীরব ডাক—হৃদয়কে জাগাও, কারণ প্রকৃত নিরাপত্তা মানুষের সতর্কতায় নয়, আল্লাহর আশ্রয়ে। আর যে আল্লাহর ডাকে সাড়া দেয়, সে শুধু ভয় থেকে মুক্ত হয় না; সে নিজের রবের দিকে ফিরে গিয়ে সত্যিকার অর্থে বাঁচতে শেখে।

মানুষের ভয়েরও কত রকম নাম থাকে। কেউ প্রকাশ্যে বলে, আমরা সতর্ক; কেউ মনে মনে বলে, আমরা প্রস্তুত; কিন্তু অন্তরে অনেক সময় তারা সত্যকে নয়, নিজেদের অহংকারকে বাঁচাতে চায়। ফেরাউনের লোকদের এই কথা তাই কেবল আতঙ্কের স্বীকারোক্তি নয়, এটি এক আত্মরক্ষামূলক হৃদয়ের ভাষা—যে হৃদয় আলোর আগমনে আনন্দিত হওয়ার বদলে অন্ধকারের নিরাপত্তাই আঁকড়ে ধরে। নবীর ডাক যখন কানে আসে, তখন প্রশ্ন হয় না কে জিতবে; প্রশ্ন হয়, আমি কি আমার মিথ্যা স্বস্তি ছেড়ে আল্লাহর সত্যের কাছে নত হব? আর যে অন্তর নত হতে পারে না, সে কতই না শংকিত থাকে—বাইরে শান্ত, ভেতরে অস্থির; মুখে সাবধান, অন্তরে ভয়।

এই আয়াত আমাদেরও থামিয়ে দেয়। আমরা কি সত্য শুনে সত্যের দিকে এগোই, নাকি সত্যকে শুনেই নিজের পুরোনো অভ্যাস, নিজের পছন্দ, নিজের গর্বকে আগলে রাখি? আল্লাহর নবীদের কাহিনিগুলো বারবার এ কথাই শেখায়—হিদায়াতের সামনে মানুষের বড় শত্রু অনেক সময় অন্য কেউ নয়, তার নিজের ভীত-সন্তপ্ত অহংকার। আজও যদি কোনো কথায় হৃদয় কেঁপে ওঠে, তবে তা উপেক্ষার জন্য নয়; তা তাওবার জন্য। কারণ আল্লাহর দিকে ফেরার ভয় কখনো বিপদ নয়, বরং নিরাপদ হওয়ার পথ। যাদের অন্তর সত্যের জন্য খুলে যায়, তাদের আর ‘সদা শংকিত’ থাকতে হয় না; তারা জানে, একমাত্র আল্লাহই রক্ষাকারী, একমাত্র তিনিই আশ্রয়।