“তারা বলল, কোনো ক্ষতি নেই। আমরা আমাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তন করব।” — এই একটি বাক্য যেন ভয়কে পরাভূত করা ঈমানের সংক্ষিপ্ত কিন্তু অদম্য উচ্চারণ। ফেরাউনের হুমকি, শাস্তির ভয়, দুনিয়ার ক্ষমতার হুংকার—সবকিছুর মুখে মুমিন হৃদয়ের জবাব কত শান্ত, কত দৃঢ়, কত আখিরাতমুখী! ক্ষতি? দুনিয়ার সাময়িক ক্ষতি তো ক্ষতিই নয়, যদি শেষ ঠিকানা হয় রবের দিদার, রবের বিচার, রবের রহমত। এখানে ঈমানের ভাষা কেঁপে ওঠে না; বরং মৃত্যুকেও সে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের দরজা হিসেবে দেখে।
সূরা আশ-শুআরার এই অংশে হযরত মূসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে ফেরাউনের মোকাবিলার ঐতিহাসিক দৃশ্য ধরা পড়ে, আর তারই ছায়ায় ঈমানের সত্যতা ও মিথ্যার অহংকার মুখোমুখি দাঁড়ায়। নির্দিষ্ট কোনো পৃথক শানে নুযূলের ওপর ভর না দিয়ে কুরআনের নিজস্ব বর্ণনাই এখানে স্পষ্টভাবে বলে দিচ্ছে—সত্যের আহ্বান যখন ক্ষমতার প্রাসাদে আঘাত করে, তখন জালিম সাধারণত ভয় দেখিয়ে মানুষকে ফিরিয়ে আনতে চায়। কিন্তু আল্লাহ যাদের অন্তরকে দীপ্ত করেন, তারা জানে: দেহ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, সম্মান ক্ষুণ্ন হতে পারে, পৃথিবীর হিসাব বদলে যেতে পারে; কিন্তু রবের পথে অটল থাকলে পরাজয় নেই।
এই আয়াতে আখিরাত-সচেতনতার সঙ্গে তাওয়াক্কুলের এমন এক গভীর মিলন দেখা যায়, যেখানে মুমিন নিজেকে দুনিয়ার স্থায়ী অধিপতি মনে করে না, বরং পথিক মনে করে—আর পথিকের আসল গন্তব্য তো ফিরে যাওয়া। ‘আমরা আমাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তন করব’—এখানে শুধু মৃত্যুর স্বীকৃতি নেই, আছে দায়িত্বের স্মৃতি, আছে বিচারের ভয়, আছে রহমতের আশ্রয়। যে হৃদয় জানে সে অবশেষে রবের কাছে ফিরবে, সে ফেরাউনের হুমকিতে কাঁপে না; কারণ তার ভয় বৃহত্তর, তার ভরসাও বৃহত্তর।
ফেরাউনের হুমকি মানুষের গলায় যে ভয় বসাতে চেয়েছিল, এ আয়াতে মুমিন হৃদয় তার বিপরীতে এক অদ্ভুত প্রশান্তি তুলে ধরে। তারা বলে, লা দির—কোনো ক্ষতি নেই। এ কোনো উদাসীনতার বাক্য নয়; এ হলো এমন এক ঈমান, যে ঈমান দুনিয়ার আঘাতকে চূড়ান্ত মনে করে না। মানুষের কাছে ক্ষতি মানে ক্ষমতা হারানো, দেহের কষ্ট, জীবনের অনিশ্চয়তা; কিন্তু যার চোখ আখিরাতের দিকে খোলা, তার কাছে প্রকৃত ক্ষতি হলো রবকে ভুলে যাওয়া, সত্য থেকে সরে যাওয়া, এবং চিরস্থায়ী ঠিকানাকে হারানো। তাই তারা ভয়ের ভাষায় কথা বলে না; তারা প্রত্যাবর্তনের ভাষায় কথা বলে।
এই আয়াত আমাদের শেখায়, ঈমানের শক্তি মুখের উচ্চারণে নয়, অন্তরের অবস্থানে। বাহ্যিকভাবে শত্রু জিতছে মনে হতে পারে, কিন্তু মুমিনের ভেতরে যখন আখিরাত জেগে ওঠে, তখন দুনিয়ার হুমকি তার কেন্দ্র ছুঁতে পারে না। লা দির—এমন একটি মনোভাব, যা কেবল তখনই জন্মায় যখন মানুষ বুঝে ফেলে, জীবনের মালিকও আল্লাহ, মৃত্যুর মালিকও আল্লাহ, বিচারও তাঁর, পুরস্কারও তাঁর। তাই সত্যপথের পথিকের সান্ত্বনা এই যে, দেহ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আত্মা হারায় না; বরং সে ধৈর্য, তাওয়াক্কুল আর রবের দিকে প্রত্যাবর্তনের অটল বিশ্বাসে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
ফেরাউনের হুমকির মুখে এই আয়াত যেন ঈমানের এক নিঃশব্দ বজ্রধ্বনি: “তারা বলল, কোনো ক্ষতি নেই।” মানুষের দৃষ্টিতে ক্ষতি ছিল—ভয়, অত্যাচার, শাস্তির আশঙ্কা, দুনিয়ার নিরাপত্তা হারানোর সম্ভাবনা। কিন্তু মুমিনের দৃষ্টি দুনিয়ার মাপে বাঁধা নয়। সে জানে, শরীরকে আঘাত করা যায়, কিন্তু সত্যকে মুছে ফেলা যায় না; সাময়িক কষ্ট দেওয়া যায়, কিন্তু রবের পথে প্রত্যাবর্তনের সৌভাগ্য কেড়ে নেওয়া যায় না। তাই এই বাক্যে কোনো উচ্ছ্বাস নেই, আছে অটল তাওয়াক্কুল; কোনো দম্ভ নেই, আছে আখিরাতকে জীবন্তভাবে অনুভব করার শান্ত দৃঢ়তা।
“আমরা আমাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তন করব”—এই ঘোষণা শুধু মৃত্যুর স্বীকৃতি নয়, আত্মসমর্পণের পূর্ণতা। মানুষ যখন নিজের শেষ ঠিকানাকে ভুলে যায়, তখন সে ক্ষমতাকে ভয় করে, মানুষের মুখাপেক্ষী হয়, জালিমের চোখে চোখ রাখার শক্তি হারায়। আর যে রবের দিকে ফিরতে জানে, তার জন্য দুনিয়ার হুমকি আর চূড়ান্ত সত্য থাকে না। সে নিজের হিসাব নিজেই নিতে শেখে: আমি কার জন্য বাঁচছি, কার ভয় আমার হৃদয়কে চালাচ্ছে, আমার লাভ-ক্ষতির মানদণ্ড কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? এই প্রশ্নগুলো মুমিনের ভেতর জাগ্রত হলে জীবন আর কেবল বেঁচে থাকা থাকে না; তা হয়ে ওঠে আল্লাহমুখী সফর।
এই আয়াত সমাজকেও নাড়া দেয়, কারণ যেখানে মানুষ দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ক্ষমতাকে সর্বোচ্চ সত্য মনে করে, সেখানে ভয় জন্ম নেয়, মিথ্যা শক্তি পায়, আর ন্যায় চুপ হয়ে যায়। কিন্তু যখন হৃদয়ে আখিরাত জেগে ওঠে, তখন শাসকের হুংকারও ক্ষীণ হয়ে পড়ে। সত্যের পথিক জানে—আজকের কষ্ট শেষ নয়, রবের কাছে ফিরে যাওয়াই শেষ ও সত্যিকারের ফয়সালা। তাই এই আয়াত আমাদের শেখায়: ক্ষতি দেখে ভেঙে পড়ো না, রবকে ভুলে গিয়ে নিরাপত্তা খুঁজো না; বরং নিজের অন্তরকে জাগিয়ে বলো, আমরা ফিরছি তাঁরই কাছে, যাঁর হাতে জীবন, মৃত্যু, বিজয় এবং প্রতিদান—সবকিছু।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা যেন নিজের অন্তরকে জিজ্ঞেস করি—আমার ভয় কিসের? কার হুমকিতে আমার ভেতর কেঁপে ওঠে? কতবার আমি অল্প লাভের জন্য সত্যকে সরিয়ে দিয়েছি, আর কতবার অল্প ক্ষতির ভয়ে ন্যায়ের পাশে দাঁড়াতে দেরি করেছি! আজ এই এক বাক্য আমাদের অহংকার ভেঙে দিক, আমাদের অস্থিরতা থামিয়ে দিক, আমাদের দুনিয়ার মোহের ভিত নরম করে দিক। যদি প্রত্যাবর্তনই সত্য হয়, তবে প্রস্তুতি কোথায়? যদি রবের দিকেই ফিরতে হয়, তবে অন্তর কেন এখনো এত দূরে?
হে আল্লাহ, আমাদের এমন অন্তর দাও, যা ক্ষতির শব্দে ভেঙে পড়ে না; এমন তাওয়াক্কুল দাও, যা মানুষকে নয়, তোমাকেই ভরসা করে; এমন ঈমান দাও, যা তোমার দিকে প্রত্যাবর্তনকে ভয় নয়, বরং প্রশান্তি জানে। আমাদেরকে সত্যের পথে স্থির রাখো, যখন চারদিকে ফেরাউনের ভাষা—হুমকি, ভয়, দম্ভ—আমাদের ডাক দেয়। আর আমাদের মৃত্যুর আগে এমন তওবা দাও, যাতে আমরা খালি হাতে নয়, লজ্জাভরা হৃদয় নিয়ে হলেও, তোমার দরবারে ফিরে আসতে পারি।