ফেরাউন তার পরিষদবর্গকে বলল, “তোমরা কি শুনছ না?”—এ প্রশ্নের ভেতরে কেবল একটি বাক্য নেই, আছে এক ক্ষমতাবানের অস্থির আত্মপ্রকাশ। মূসা আলাইহিস সালামের সত্যদায়ী আহ্বান যখন রাজদরবারের দরজায় এসে আঘাত করে, তখন ফেরাউনের মুখে প্রথম যে প্রতিক্রিয়া জাগে তা তর্ক নয়, বরং অস্বস্তি; কারণ সত্য এমন এক শব্দ, যা অন্তরের ভিতর নাড়া না দিয়ে পারে না। সে যেন তার চারপাশের লোকদের দিকে তাকিয়ে বলছে, “এই যে কণ্ঠ, এই যে কথার দৃঢ়তা—তোমাদের কি কানে যাচ্ছে না?” কিন্তু আসল প্রশ্ন কানে শোনা নয়; আসল প্রশ্ন হৃদয় কী শুনতে প্রস্তুত।

কুরআনের এই দৃশ্য আমাদের সামনে ক্ষমতা, অহংকার আর দাওয়াতের এক চিরন্তন সংঘাতকে তুলে ধরে। ফেরাউন ছিল শক্তির প্রতীক, আর মূসা ছিলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো হেদায়াতের আহ্বান। শক্তি নিজের চারপাশে এক ধরনের শব্দ-জাল তৈরি করে; সে সত্যের আলোকে অবহেলা করতে চায়, মানুষকে প্রভাবিত করতে চায়, আর শেষ পর্যন্ত নিজের দ্বিধাকে অন্যদের ভাষায় ঢেকে ফেলে। তাই তার প্রশ্নে কৌতুক নেই, আছে আশঙ্কা; উপহাস নেই, আছে আত্মরক্ষার তাড়না। যখন সত্য মানুষের সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন অহংকার কখনো নীরব থাকে না—সে কথা বলে, কিন্তু সেই কথার ভেতরেই তার দুর্বলতা প্রকাশ পায়।

এই আয়াতের বিস্তৃত কুরআনিক প্রেক্ষাপট আমাদের শেখায়, নবীদের দাওয়াত কখনো কেবল তথ্যের আদান-প্রদান ছিল না; তা ছিল অন্তরকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান। ফেরাউনের দরবারে যারা বসেছিল, তারা বাহ্যিকভাবে শুনছিল, কিন্তু তাদের ভেতরের শ্রবণশক্তি কতটা জাগ্রত ছিল—সেটাই ছিল আসল পরীক্ষা। আজও মানুষ অনেক কিছু শোনে, কিন্তু সত্যের আওয়াজ শুনতে পায় না; অনেক কথা স্মরণ রাখে, কিন্তু আল্লাহর ডাককে অন্তরে নামাতে পারে না। এই একটি প্রশ্ন আমাদেরও জাগিয়ে তোলে: আমি কি কেবল শব্দ শুনছি, নাকি সত্যকে চিনছি? কারণ যে কান শুধু আওয়াজ নেয়, সে পথ হারায়; আর যে হৃদয় আল্লাহর বাণী শোনে, তার অন্ধকারেও হেদায়াতের আলো নেমে আসে।

ফেরাউনের এই প্রশ্নে এক অদ্ভুত কাঁপন আছে। যে মানুষ নিজেকে সর্বোচ্চ ভাবত, যার চারদিকে ছিল আনুগত্যের ভিড় আর ভয়ের নীরবতা, সে-ই আজ সত্যের কণ্ঠ শুনে সঙ্গীদের দিকে ফিরে বলছে, “তোমরা কি শুনছ না?” মনে হয়, সে কেবল মূসা আলাইহিস সালামের কথা নয়, নিজের ভেতরের ভাঙনও টের পাচ্ছে। সত্য যখন স্পষ্ট উচ্চারণে আসে, তখন অহংকারের প্রাসাদে প্রথম যে শব্দ ওঠে, তা তর্কের নয়—অস্বস্তির। কারণ সত্য মানুষের কানে শুধু পৌঁছায় না, সে মানুষের মরীচিকা ভেদ করে অন্তরের গভীরে আঘাত করে। ফেরাউনের দৃষ্টিতে এটি ছিল এক রাজনৈতিক মুহূর্ত; কুরআনের আলোয় এটি হয়ে ওঠে আত্মার সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়া সত্যের দৃশ্য।

মানুষের চারপাশে অনেক সময় এমন এক পরিষদ গড়ে ওঠে, যারা সত্য শোনে বটে, কিন্তু শুনে নীরব থাকতে শেখে। তারা কানে তো রাখে, কিন্তু অন্তরে নেয় না; তারা কথা শোনে, কিন্তু হেদায়াতের ডাক শুনতে ভয় পায়। ফেরাউনের প্রশ্ন সেই ভয়কেই প্রকাশ করে। সে যেন তার লোকদের দিয়ে নিজের অস্বস্তিকে বৈধতা দিতে চাইছে, যেন বহু কণ্ঠের সমর্থন পেলে সত্যকে ছোট করা যায়। অথচ আল্লাহর নিদর্শন এমন নয় যে তা সংখ্যার দ্বারা মাপা যায়। মূসার দাওয়াত একাই ছিল, তবু তাতে ছিল আসমানের ওজন; আর ফেরাউনের রাজসভা ভরা ছিল, তবু সেখানে ছিল অন্তরের দারিদ্র্য। এই আয়াত আমাদের শেখায়, সত্যের সামনে বড় সমস্যা অন্ধ শত্রুতা নয়, বরং শ্রবণশক্তিহীন হৃদয়।
আজও এই আয়াত আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে। আমরা কি সত্য শুনতে প্রস্তুত, নাকি নিজের স্বার্থ, অভ্যাস, দল, কিংবা অহংকারকে বাঁচাতে শুনেও না শোনার অভিনয় করি? কুরআন কেবল কানে পৌঁছানোর কথা বলে না, হৃদয় খুলে দেওয়ার কথা বলে। ফেরাউনের যুগ পেরিয়ে গেলেও তার মানসিকতা রয়ে গেছে—যখন মানুষ আল্লাহর কথা শুনে ভিতরে কেঁপে ওঠে, তখন সে নিজের চারপাশের মানুষকে ডেকে বলে, ‘তোমরা কি শুনছ না?’ কিন্তু ঈমানের পথ সেখানে, যেখানে বান্দা নিজের পক্ষের বাহিনী গুনে না, বরং আল্লাহর সত্যের সামনে নত হয়। এই আয়াত মনে করিয়ে দেয়, শ্রবণ কেবল শব্দ গ্রহণ নয়; শ্রবণ মানে সত্যের সামনে আত্মসমর্পণের প্রথম দরজা খুলে দেওয়া।

ফেরাউনের এই প্রশ্নে শুধু শাসকের কণ্ঠ শোনা যায় না, শোনা যায় সেই হৃদয়ের অস্থিরতা, যে হৃদয় সত্যের মুখোমুখি হয়ে নিজের ভেতরের দুর্বলতা লুকাতে চায়। সে “তোমরা কি শুনছ না?” বলছে, অথচ আসলে সে নিজেই শুনতে চায় না; কারণ সত্যের আওয়াজ কানে পৌঁছালে তা হৃদয়ের রাজপ্রাসাদেও ঢুকে পড়ে, আর সেখানকার মিথ্যা সিংহাসন কেঁপে ওঠে। কত মানুষ আছে, যারা আল্লাহর কথা শোনে, কুরআনের আহ্বান শোনে, নরম-নির্মল উপদেশ শোনে, তবু অন্তরের কানে তালা লাগিয়ে রাখে। শুনে ফেলা আর শোনা এক জিনিস নয়; কেউ শুধু শব্দ গ্রহণ করে, কেউ আবার সেই শব্দের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে।

এই আয়াত আমাদের সমাজেরও আয়না। যখন অহংকারের কণ্ঠ উঁচু হয়, তখন সত্যের কণ্ঠকে অবজ্ঞা করার ভাষাও খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষমতা নিজের চারপাশে এমন এক বৃত্ত তৈরি করে, যেখানে ভুলকে স্বাভাবিক আর হেদায়াতকে অস্বস্তিকর মনে হতে থাকে। কিন্তু মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াত আমাদের শেখায়, আল্লাহর সত্য মানুষের জমায়েতে হেরে যায় না; বরং মানুষের ভিড়ের মধ্যেই তার আসল পরীক্ষা হয়। যে হৃদয় নরম, সে সত্যের একটি বাক্যেই জেগে ওঠে; আর যে হৃদয় পাথরের মতো শক্ত, সে আসমানের আলো দেখেও বলে—তোমরা কি শুনছ না? তখন প্রশ্ন শাসকের মুখে থাকলেও, জবাবের প্রয়োজন পড়ে প্রতিটি আত্মার ভেতরে: আমি কি শুনছি, নাকি শুনেও অস্বীকার করছি?

আজকের মানুষও এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হিসাব নিতে পারে। আমার অন্তর কি এমন যে, নসিহত এলে কেঁপে ওঠে, নাকি প্রতিরোধে শক্ত হয়ে যায়? আমি কি সত্যকে শুনে নিজের পথে ফিরি, নাকি নিজের অস্বস্তি ঢাকতে অন্যদের দিকে তাকিয়ে থাকি? ফেরাউনের এই এক বাক্য আমাদের শেখায়, ক্ষমতা বড় হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর সামনে তা কখনো নিরাপদ নয়; আর সত্যের ডাক কত নরম হলেও তা অবশেষে পৌঁছে যায় অন্তরের গভীরে। তাই ভয়ও থাকুক, আশা-ও থাকুক: ভয় এই জন্য যে, হৃদয় যদি বন্ধ হয়ে যায় তবে ডুবে যাওয়া সহজ; আর আশা এই জন্য যে, আল্লাহর দিকে ফিরে আসার দরজা কখনো বন্ধ হয় না। যে ব্যক্তি আজ নিজের ভেতরের শ্রবণশক্তিকে জাগিয়ে তোলে, সে-ই ধীরে ধীরে দুনিয়ার শব্দের ভেতর থেকে আখিরাতের আহ্বান শুনতে শেখে, আর তখন তার জীবন শুধু শব্দ শোনে না—সত্যের দিকে ফিরে যায়।

ফেরাউনের সেই প্রশ্ন আমাদেরও থামিয়ে দেয়। মানুষ যখন সত্যের মুখোমুখি হয়, তখন তার ভেতরেও এমনই এক অস্থিরতা জাগে—সে শুনতে পায়, তবু স্বীকার করতে চায় না; বুঝতে পারে, তবু নত হতে চায় না। অহংকারের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক এই যে, সে কানকে বন্ধ করে না, বরং হৃদয়কে অবশ করে দেয়। তাই কুরআনের এই একটি বাক্য শুধু ফেরাউনের কাহিনি নয়; এটি প্রতিটি আত্মগর্বী অন্তরের দরজায় কড়া নাড়ছে—তোমার চারপাশে যারা আছে, তারা কি সত্যিই শুনছে, নাকি তুমি তাদের দিয়েই নিজের অস্বস্তিকে চাপা দিচ্ছ?

আর এইখানেই মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াতের মহিমা আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তিনি কণ্ঠ তুলেছিলেন মানুষের জন্য, কিন্তু নির্ভর করেছিলেন আল্লাহর ওপর; তিনি ক্ষমতার দরবারে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু মাথা নত করেছিলেন একমাত্র রবের সামনে। সত্যের ডাক কখনো জোরে নয়, তবু তার ভার এত গভীর যে তা রাজপ্রাসাদের দেয়াল কাঁপিয়ে দেয়, অন্তরের জমাট বরফ গলিয়ে দেয়, আর যাদের তৌফিক হয়, তাদের অন্ধকার থেকে আলোয় টেনে আনে। আজও আমাদের জন্য প্রশ্ন একই—আমরা কি শুনছি? কানে নয়, হৃদয়ে। যদি হৃদয় সত্যের জন্য নরম না হয়, তবে শব্দের ভিড়ে পথ হারানো ছাড়া আর কিছু থাকে না। আল্লাহ আমাদের এমন শ্রবণ দান করুন, যা শুধু শব্দ ধরে না, বরং হিদায়াতকে গ্রহণ করে; এমন অন্তর দান করুন, যা অহংকারে শক্ত হয় না, বরং তওবায় ভেঙে পড়ে; আর এমন ঈমান দান করুন, যা ফেরাউনের মতো জবাব দেয় না, বরং মূসার পথে সিজদায় শান্তি খুঁজে নেয়।