ফিরআউন যখন বলল, “বিশ্বজগতের পালনকর্তা আবার কে?” তখন সে জিজ্ঞাসা করেনি জেনে নিতে; সে জিজ্ঞাসা করেছিল অস্বীকারকে শাণিত করতে, অহংকারকে উঁচু করতে, আর সত্যের সামনে নিজের ক্ষমতার ভান দাঁড় করাতে। এই একটি প্রশ্নের ভেতর লুকিয়ে আছে মানব-হৃদয়ের এক ভয়ংকর রোগ: জানা সত্ত্বেও না জানার ভান, সত্যের আলো কাছ থেকে দেখেও তার দিকে না তাকানো। মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াত ছিল সহজ, কিন্তু গভীর—এক আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, যিনি সমস্ত জগতের প্রতিপালক; আর ফিরআউনের প্রশ্ন ছিল সেই তাওহীদী ডাকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক শাসকের ঔদ্ধত্যপূর্ণ বিদ্রূপ। কুরআন এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আমাদের শিখিয়ে দেয়, সত্য কখনোই কেবল তথ্য নয়; সত্য হলো এমন এক আহ্বান, যা মানুষের অন্তরকে নত হতে বলে, এবং অহংকারকে ভেঙে দেয়।
এই আয়াতের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট, সর্বজনস্বীকৃত শানে নুযূলের বিবরণ এখানে ধরার মতো প্রয়োজন নেই; বরং সূরার বিস্তৃত প্রেক্ষাপটই যথেষ্ট। আশ-শুআরা সূরায় বারবার নবীদের কাহিনি এসেছে—প্রত্যেক নবীই একই তাওহীদের দাওয়াত নিয়ে গিয়েছেন, আর প্রত্যেক অস্বীকারকারী সমাজ একই ধরনের ভাষায় বাধা দিয়েছে, প্রশ্ন করেছে, বিদ্রূপ করেছে, মিথ্যা আর ক্ষমতার মোহে সত্যকে ঠেকাতে চেয়েছে। ফিরআউনের এই প্রশ্ন সেই চিরন্তন সংঘাতের একটি মুখ: নবি বলে, “রব্বুল আলামিন”; জালিম বলে, “আর কে?” অর্থাৎ, যে হৃদয় নিজের ভেতরে রবুবিয়্যাহর আলো মুছে ফেলতে চায়, সে জগতের প্রতিপালককে কেবল নামের মতো শুনে, কিন্তু তাঁর কর্তৃত্ব মেনে নিতে চায় না। তাই এই আয়াত শুধু অতীতের ইতিহাস নয়; এটি প্রতিটি যুগের তাগিদ—যখন মানুষ নিজের ক্ষমতা, জ্ঞান, পদ, বা অহংকার দিয়ে আল্লাহর পরিচয়কে ঝাপসা করতে চায়, তখন কুরআন এসে স্মরণ করায়: সমগ্র সৃষ্টির ওপরে একজনই আছেন, যিনি লালন করেন, শাসন করেন, জীবন দেন, মৃত্যু দেন, এবং যাঁর সামনে সব ফিরে যাবে।
ফেরাউনের এই প্রশ্নের ভেতরে প্রশ্ন নেই, আছে বিদ্রূপের তীক্ষ্ণ ছুরি। সে “বিশ্বজগতের পালনকর্তা” জেনে নিতে চায়নি; সে চেয়েছিল রব্বুল আলামিনের পরিচয়কে তুচ্ছ করে দেখাতে, যেন ক্ষমতার আসনে বসা মানুষই শেষ কথা। কিন্তু কুরআন এমন ভঙ্গিতে তার জবানকে তুলে আনে, যাতে বোঝা যায়—অহংকার কখনো সত্যকে নীরব করতে পারে না, কেবল নিজের শূন্যতাকে আরও স্পষ্ট করে। যে হৃদয় নিজের রবকে অস্বীকার করে, সে একদিন পৃথিবীকে নিজের মুঠোয় ভেবেই বিভ্রান্ত হয়; অথচ মুঠোর ভেতরেও সে নিজের প্রাণটুকু ধরে রাখতে পারে না। এই আয়াত যেন আমাদের অন্তরে ধাক্কা দেয়: মানুষ কত সহজে “আমি জানি না” বলে না, অথচ আসলে সে “আমি মানি না” বলেই ঘুরিয়ে দেয় মুখ।
রব্বুল আলামিন—এই নামের মধ্যেই আছে সৃষ্টি, প্রতিপালন, মালিকানা, দয়া, শাসন, এবং প্রত্যাবর্তনের সমস্ত সত্য। তিনি শুধু আকাশের কোনো দূরবর্তী অস্তিত্ব নন; তিনি সেই সত্তা, যিনি প্রতিটি প্রাণকে অস্তিত্ব দেন, প্রতিটি রিযিককে পৌঁছে দেন, প্রতিটি হৃদয়ের গোপন টানও জানেন। ফিরআউনের দুনিয়াবি জৌলুস ছিল সাময়িক, আর মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াত ছিল চিরন্তন: মানুষকে মানুষের গোলামি থেকে বের করে আল্লাহর দাসত্বে ফিরিয়ে আনা। এখানেই নবীদের কাহিনির গভীর ঐক্য—যুগ বদলায়, ভাষা বদলায়, শাসক বদলায়, কিন্তু তাওহীদের ডাক বদলায় না। সত্যের সামনে দাঁড়ালে সব শক্তি অবশেষে ক্ষুদ্র হয়ে যায়, আর আল্লাহর রবুবিয়্যাহর সামনে সমস্ত দাবিদাওয়া শিশিরবিন্দুর মতো মিলিয়ে যায়।
ফেরাউনের এই প্রশ্ন—“বিশ্বজগতের পালনকর্তা আবার কি?”—শুধু একটি জিজ্ঞাসা নয়; এটি অহংকারের মুখ থেকে বেরোনো সেই পুরোনো প্রতিরোধ, যা সত্যকে বুঝতে নয়, সত্যকে ঠেকাতে চায়। মানুষ যখন ক্ষমতার আসনে বসে, তখন তার চোখের সামনে পৃথিবীও ছোট হয়ে আসে, আর আকাশও যেন জবাবদিহির বাইরে চলে যায়। কিন্তু কুরআন এই একটি বাক্যের ভেতর আমাদের দেখায়, অন্তরের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্দা কীভাবে কাজ করে: জেনে শুনে অস্বীকার, নীরব বিদ্রূপ, এবং আল্লাহকে নামমাত্র প্রশ্নের টেবিলে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার দুঃসাহস।
মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াতের কেন্দ্রে ছিল একটাই সত্য: রব্বুল আলামিন তিনি, যিনি সৃষ্টি করেছেন, লালন করেছেন, নিয়ন্ত্রণ করেছেন, এবং প্রতিটি সত্তার উপর তাঁর মালিকানা প্রতিষ্ঠা করেছেন। ফেরাউন যেন সেই সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের শাসনকে চিরস্থায়ী ভাবছিল; অথচ মানুষ যত বড়ই হোক, সে কেবল এক ক্ষণস্থায়ী আমানতদার, রব নয়। এই আয়াত আমাদের অন্তরকে প্রশ্ন করে—আমরা কি কেবল শব্দ শুনছি, নাকি রুবুবিয়্যাহর এই জ্যোতি হৃদয়ে অবতীর্ণ হতে দিচ্ছি? কারণ আল্লাহর পরিচয় জানা মানে শুধু তথ্য জানা নয়; তা মানে নিজের দুর্বলতা, সীমা, ঋণ, এবং প্রতিটি নিঃশ্বাসের জবাবদিহি অনুভব করা।
আজকের সমাজেও ফেরাউনের রূপ বদলায়, কিন্তু তার আত্মা বদলায় না। কোথাও সে ক্ষমতার ভাষা হয়ে ওঠে, কোথাও অহংকারের মতবাদ, কোথাও এমন এক আত্মমুগ্ধতা, যা মানুষকে নিজেকে কেন্দ্র করে সবকিছু মাপতে শেখায়। এই আয়াত আমাদের থামিয়ে দেয়, যেন আমরা নিজের অন্তরকে জিজ্ঞেস করি—আমি কি আল্লাহকে চিনছি, নাকি আমার অভ্যাস, ভয়, গর্ব, আর স্বার্থই আমার ‘রব’ হয়ে দাঁড়িয়েছে? তাওহীদের আহ্বান কেবল ফেরাউনের বিরুদ্ধে নয়; এটি আমাদের ভিতরের ফিরআউনকেও ভাঙতে আসে। যে হৃদয় নত হয়, সে-ই সত্যকে গ্রহণ করতে পারে; আর যে হৃদয় অহংকারে শক্ত, সে-ই আল্লাহর অসীম ক্ষমতার সামনে সবচেয়ে বেশি অসহায়।
ফেরাউনের এই প্রশ্ন যেন শুধু এক শাসকের কণ্ঠস্বর নয়; এটি সেই অন্তরের ভাষা, যেখানে সত্যের সামনে দাঁড়িয়েও মানুষ নিজেকে অজানার অন্ধকারে ছুড়ে ফেলে। ‘বিশ্বজগতের পালনকর্তা আবার কে?’—এই একটি বাক্যে কত অহংকার, কত আত্মপ্রতারণা, কত হৃদয়হীন ক্ষমতার নেশা লুকিয়ে আছে! আল্লাহর রবুবিয়্যাহ কোনো দর্শনের তর্ক নয়; তা আমাদের অস্তিত্বের নিঃশ্বাস, প্রতিটি কণার চালনা, প্রতিটি জীবনের সূচনা ও সমাপ্তি। যিনি আকাশকে ধরে রেখেছেন, জমিনকে স্থির রেখেছেন, যিনি দুর্বলকে শক্তিশালী করেন, যিনি শাসকের গর্জনকেও একদিন নীরব করে দেন—তাঁকেই কি মানুষ ‘আবার কে’ বলে? এ প্রশ্নের মধ্যে আসলে সৃষ্টির বিস্মৃতি, আর স্রষ্টার প্রতি বিদ্রূপের বিষ জমে আছে।
তাই আশ-শুআরার এই আলো আমাদের কেবল ইতিহাস শেখায় না; আমাদের হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে। আমরা কি কখনো ফিরআউনের মতো সত্যকে প্রশ্ন বানিয়ে দিই, শুধু তাই-ই যেন তাকে মান্য না করতে হয়? আমরা কি কখনো জানি, তবু না জানার অভিনয় করি? এই আয়াত সামনে এলে নরম হয়ে যায় অহংকারী মন, কারণ এখানে নবীদের দাওয়াতের অপর পক্ষও প্রকাশিত হয়—একদল মানুষ সত্যকে চিনেও তার সামনে নত হয় না, আর একজন রাসূল আল্লাহর পক্ষ থেকে সরল, স্পষ্ট, নির্ভীক আহ্বান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। সুতরাং হৃদয় যদি আজও বেঁচে থাকে, তবে সে যেন নিজেকে বলে: আমি আর বিদ্রূপে বাঁচব না, অস্বীকারে শক্ত হব না; আমি আমার রবকে চিনব, তাঁর সামনে বিনীত হব, আর সেই রবের দিকে ফিরব, যিনি সত্যিই ‘রব্বুল আলামিন’—সমস্ত জগতের পালনকর্তা।