আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে এমন এক অন্তর্দশার ছবি এঁকেছেন, যা শুধু কবির ক্ষেত্রেই নয়, প্রতিটি পথহারা কথকের ভেতরেও দেখা যায়: তারা প্রতিটি ময়দানে ঘুরে বেড়ায়, প্রতিটি দিকেই নিজেদের ছড়িয়ে দেয়, কিন্তু কোনো এক সত্যে স্থির হয় না। আজকের ভাষায় বললে, তাদের শব্দের গতি আছে, কিন্তু দিক নেই; তাদের বাগ্মিতা আছে, কিন্তু দায় নেই; তাদের কল্পনা আছে, কিন্তু সত্যের মাটিতে দাঁড়ানোর সাহস নেই। আর এই ভ্রান্তির সবচেয়ে করুণ দিক হলো, মানুষ অনেক সময় শব্দের ঝলকানিতে মুগ্ধ হয়, অথচ ভেতরের শূন্যতা টের পায় না। কুরআন এখানে কবিতাকে নিষিদ্ধ করছে না; বরং স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, শব্দ যদি সত্যের সেবা না করে, তবে তা মানুষকে বিভ্রান্তির মরুভূমিতে আরও দূরে ঠেলে দেয়।

সূরা আশ-শুআরা-র সমগ্র প্রবাহ আমাদেরকে এই কথাই শেখায়—নবীদের দাওয়াত ছিল একটিই: আল্লাহর একত্ব, সত্যের প্রতি প্রত্যাবর্তন, এবং মানুষের অন্তরকে গর্ব ও অন্ধ অনুকরণ থেকে মুক্ত করা। এই আয়াত সেই বৃহৎ মক্কী প্রেক্ষাপটে এসেছে, যখন সত্যের বিরোধীরা কখনো কুরআনের বক্তব্যকে, কখনো নবী-আল্লাহর দূতের মর্যাদাকে, কখনো আবার ভাষা ও কবিতার আবেগকে ব্যবহার করে সত্যকে আড়াল করতে চাইত। তাই এখানে বক্তব্যের নৈতিক মানদণ্ড স্থাপন করা হয়েছে: কে কত সুন্দর বলল, সেটা শেষ কথা নয়; সে কোথায় দাঁড়িয়ে বলল, কিসের জন্য বলল, আর তার কথার ভেতর আল্লাহভীতি আছে কি না—সেই প্রশ্নই আসল।

এই আয়াত হৃদয়কে আয়নার মতো পরিষ্কার করে দেয়। আমরা কি নিজেরাও কখনো প্রতিটি ময়দানে দৌড়াই না? কখনো প্রশংসার পেছনে, কখনো বিতর্কে, কখনো আবেগে, কখনো আত্মপ্রদর্শনে? বাহ্যিকভাবে তা সৃজনশীলতা মনে হলেও, যদি তা আল্লাহর হিদায়াতের দিকে না ফেরে, তবে তা একরকম আত্মভ্রষ্ট ভ্রমণই। কুরআন মানুষকে শব্দের ক্রীতদাস হতে নিষেধ করে; বরং শব্দকে সত্যের দাস হতে শেখায়। আর এখানেই এই আয়াত আমাদের জন্য তীব্র এক আত্মজিজ্ঞাসা হয়ে ওঠে: আমার জিহ্বা কি সত্যকে বহন করছে, নাকি সত্যকে আড়াল করে আমাকে আরও দূরে নিয়ে যাচ্ছে?

আল্লাহ তাআলা এখানে কেবল একটি সাহিত্যিক প্রবণতার কথা বলেননি; তিনি মানুষের ভেতরের সেই বিপন্ন নড়াচড়াকে উন্মোচন করেছেন, যেখানে চিন্তা স্থির হতে পারে না, হৃদয় এক সত্যে থামতে পারে না, আর জিহ্বা প্রতিটি উপত্যকায় গিয়ে নিজেকেই হারিয়ে ফেলে। এক ময়দানে গর্ব, আরেক ময়দানে তাচ্ছিল্য; একদিকে প্রশংসা, অন্যদিকে নিন্দা; এক ক্ষণে সত্যের সাজ, পরক্ষণেই মিথ্যার মুখোশ—এমন জীবন আল্লাহর সামনে দাঁড়াবার যোগ্যতা হারায়। কারণ সত্য মানুষকে একদিকে ডাকে, কেন্দ্রে ডাকে, আল্লাহর দিকে ডাকে; আর বাতিল তাকে ছড়িয়ে দেয়, ভাঙে, বহুগুণে বিভক্ত করে। তাই এই আয়াতের ধাক্কা শুধু কবির গলায় নয়, আমাদেরও অন্তরে লাগে: আমাদের কথাও কি কখনো এভাবেই প্রতিটি হাওয়ার সঙ্গে বদলে যায়? আমাদের অবস্থান কি মানুষের প্রশংসায় ফুলে ওঠে, আবার মানুষের বিরোধিতায় মুছে যায়?

সূরা আশ-শুআরা-র এই প্রবাহে নবীদের কাহিনি আমাদের শেখায়—দাওয়াতের মর্যাদা শব্দের বাহুল্যে নয়, সত্যের আনুগত্যে। নবী-রাসূলদের কথা ছিল সোজা, নির্মল, ভারী; তারা মুগ্ধ করার জন্য আসেননি, জাগানোর জন্য এসেছেন। আর যে হৃদয় আল্লাহর হিদায়াত পেয়ে যায়, সে আর প্রতিটি উপত্যকায় উন্মাদভাবে ছুটে বেড়ায় না; সে এক কিবলার মানুষ হয়ে যায়, এক রবের দিকে ফিরে যায়। এই আয়াত তাই আত্মার আয়না: যদি আমাদের ভাষা মানুষের আবেগকে ছুঁয়ে, কিন্তু আল্লাহর সত্যকে না ছোঁয়; যদি আমাদের শিল্প মানুষকে চমকে দেয়, কিন্তু সিজদার দিকে না নেয়; তবে বুঝতে হবে, আমাদের ভেতরেও উদভ্রান্তির ধুলো জমেছে। সত্যের সামনে স্থির হওয়াই ঈমানের সৌন্দর্য—আর আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া মানেই ছড়িয়ে পড়া জীবনকে একত্র করে দেওয়া, ভগ্ন শব্দকে হিদায়াতের আলোয় আবার অর্থবান করে তোলা।
আল্লাহ তাআলা এখানে শুধু কিছু কবির কথা বলেননি; তিনি মানুষের ভেতরের সেই বিপথগামী প্রবণতাকেই উন্মোচন করেছেন, যখন শব্দ হৃদয়ের নূর না হয়ে অহংকারের খেলনা হয়ে দাঁড়ায়। প্রতি ময়দানে উদভ্রান্ত হয়ে ঘোরা মানে কেবল দিক বদলানো নয়, নীতি বদলানো, সত্যের সামনে স্থির না থাকা, আর নিজের কথাকে নিজেরই উপাস্য বানিয়ে ফেলা। এমন মানুষ অনেক কিছু বলে, কিন্তু তার কথায় কোনো জবাবদিহির ছায়া থাকে না; সে প্রশংসাকে ভালোবাসে, সংশোধনকে ভয় পায়, আর যেখানে সত্যের দাবি কঠিন, সেখানে সে নতুন রঙে নতুন মুখোশ পরে হাজির হয়।

কুরআনের এই সতর্কতা আমাদের সমাজের জন্যও অগ্নিসংকেতের মতো। যে সমাজে কথা দিয়ে মানুষকে মুগ্ধ করা হয়, কিন্তু ন্যায় দিয়ে মানুষকে উদ্ধার করা হয় না; যেখানে বাগ্মিতা আছে, কিন্তু আমানত নেই; যেখানে বাহ্যিক দীপ্তি আছে, কিন্তু অন্তরের সিজদা নেই—সেখানে বিভ্রান্তি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। তাই এই আয়াত শুনে মুমিনের উচিত নিজের জবানকে জিজ্ঞেস করা: আমি কি সত্যের সেবা করছি, নাকি কেবল আবেগের বাজারে নিজেকে বিক্রি করছি? আমার কথা কি মানুষকে আল্লাহর দিকে টানছে, নাকি মানুষকে মানুষের দিকে বাঁধছে?

এই প্রশ্নের ভেতরেই তওবার দরজা খুলে যায়। কারণ আল্লাহ যাকে সতর্ক করেন, তাকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য নয়; তাকে ফিরিয়ে আনার জন্যই সতর্ক করেন। মানুষের কণ্ঠ যতই উঁচু হোক, সত্যের সামনে তা ক্ষণস্থায়ী; আর আল্লাহর হিদায়াত যত নীরবই মনে হোক, তা-ই হৃদয়ের গভীরে স্থায়ী হয়। যে অন্তর আজ নিজের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পথের কথা বুঝতে পারে, সে-ই একদিন একেবারে সোজা পথে ফিরে আসতে পারে। আর সেই পথের নামই ইমান—যেখানে শব্দ নয়, আল-হক্কই শেষ আশ্রয়; যেখানে বিভ্রান্তি নয়, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনই জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য।

মানুষের মুখে যখন সত্যের বদলে কেবল চমক থাকে, তখন সে এক ময়দান থেকে আরেক ময়দানে ছুটে বেড়ায়; কিন্তু তার ভেতরে কোনো কাবাঘর থাকে না, কোনো কিবলা থাকে না, কোনো স্থিরতা থাকে না। আজও এমন বহু কথা আছে, যা শুনতে মধুর, কিন্তু হৃদয়কে আল্লাহর দিকে ফেরায় না; এমন বহু ভঙ্গি আছে, যা বাহ্যত উজ্জ্বল, কিন্তু অন্তরে জ্বালায় না হিদায়াতের প্রদীপ। এই আয়াত যেন আমাদের কাঁধে হাত রেখে বলে, শব্দের সৌন্দর্যকে পূজা কোরো না; দেখো, তা তোমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। মানুষকে মুগ্ধ করা আর মানুষকে জাগানো এক জিনিস নয়। মুগ্ধতা ক্ষণিকের; জাগরণ আত্মার।

তাই যে কণ্ঠ সত্যকে ধারণ করে না, তার দৌড় যতই দ্রুত হোক, গন্তব্য নেই; আর যে কণ্ঠ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নত হয়, তার কথা অল্প হলেও তা অন্তর ভেদ করে যায়। নবীদের দাওয়াত ছিল এই নরম অথচ অটল সত্য—আল্লাহ এক, মানুষের ফিরে যাওয়া তাঁরই দিকে, আর হৃদয়ের মুক্তি আসে অহংকার ভেঙে পড়লে। এই সূরার ভেতর দিয়ে বারবার যে আলো জ্বলে ওঠে, তা আমাদের শেখায়: মিথ্যা কখনো নিজের সাজসজ্জাকে দীর্ঘদিন বাঁচাতে পারে না। একদিন না একদিন তার পা পিছলে যায়, তার জৌলুস ম্লান হয়, তার কৃত্রিম আকাশ ভেঙে পড়ে।

অতএব, আমাদেরও ভয় হওয়া উচিত নিজের কথার ব্যাপারে, নিজের ভালো লাগার ব্যাপারে, নিজের প্রশংসা-লোভের ব্যাপারে। আমরা যেন এমন না হই, যারা প্রতিটি ময়দানে নিজেদের ছড়িয়ে দেয়, অথচ একটি সত্যের সামনে আত্মসমর্পণ করতে শেখে না। হে হৃদয়, আজ একটু থামো। নিজের শব্দের ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলো না। আল্লাহর সামনে দাঁড়ালে কোনো অলংকার কাজে আসবে না; কাজে আসবে শুধু সেই হৃদয়, যা তাঁর সত্যকে ভালোবেসেছে, তাঁর দিকে ফিরেছে, এবং নীরবে বলে উঠেছে: হে রব, আমাকে ভ্রান্ত কথার মোহ থেকে বাঁচান, আমাকে আপনার সত্যের সঙ্গে বেঁধে দিন।