এই আয়াতটি খুব ছোট, কিন্তু এর ওজন আকাশের চেয়েও ভারী: “নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” সূরা আশ-শুআরায় নবীদের কাহিনি, দাওয়াতের কষ্ট, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষের একাকিত্ব, আর মিথ্যার আত্মম্ভরিতা—এসবের ভেতর দিয়ে এক মহান সত্য বারবার জ্বলে ওঠে: আল্লাহ বান্দার কথা শোনেন, তার নীরবতাও শোনেন; তার প্রকাশিত দাবি জানেন, তার গোপন সংকোচও জানেন। মানুষ যখন মুখে সত্য বলে কিন্তু অন্তরে ভয় পোষণ করে, অথবা মুখে অস্বীকার করে কিন্তু ভেতরে সত্যের ডাকে কেঁপে ওঠে—সবকিছুর শেষ সাক্ষী মানুষ নয়, আল্লাহ।
নবীদের কাহিনিগুলোতে এই আয়াত যেন আকাশের মতো ছায়া হয়ে নেমে আসে। যে নবী দাওয়াত দিয়েছেন, যে জাতি প্রত্যাখ্যান করেছে, যে মিথ্যা শক্তি নিজের শোরগোলে সত্যকে ঢেকে দিতে চেয়েছে—সবই আল্লাহর কানে পৌঁছেছে, আল্লাহর জ্ঞানে উন্মুক্ত থেকেছে। কুরআনের এই সুর আমাদের শেখায়, দাওয়াত মানে কেবল ভাষণের জোর নয়; দাওয়াত মানে এমন এক কথা, যা আল্লাহর সামনে বলা, আল্লাহর জন্য বলা, আর আল্লাহর ওপর ভরসা করে বলা। তাই নবীদের পথ কখনো মানব-প্রশংসার ওপর দাঁড়ায় না; তা দাঁড়ায় সেই সত্তার ওপর, যিনি সব শোনেন এবং সব জানেন।
এই আয়াতের তাৎক্ষণিক কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনা এখানে ঘোষিত হয়নি; বরং এটি সূরার বিস্তৃত বয়ানের অন্তিম সুরের একটি অংশ, যেখানে কবিতা, ভাষণ, মিথ্যা দাবি, সত্যের সাক্ষ্য এবং আল্লাহর ক্ষমতা—সবকিছু একত্রে বিচারাধীন হয়ে যায়। আর এখানেই অন্তর কেঁপে ওঠে: আমাদের উচ্চারণগুলো কি শুধু মানুষের সামনে সাজানো? না কি আমরা জানি, নিঃশব্দ অভ্যন্তরীণ প্রতারণাও শোনা হচ্ছে? “সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ” — এই দুই শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে ভয়, শান্তি, তওবা, এবং জবাবদিহির এক অপূর্ব দরজা। যে হৃদয় এই সত্য গ্রহণ করে, সে আর কথাকে তুচ্ছ মনে করতে পারে না; কারণ প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি অশ্রু, প্রতিটি গোপন অভিপ্রায়—সবই আল্লাহর দরবারে উপস্থিত।
মানুষের পৃথিবীতে অনেক শব্দ থাকে, কিন্তু সব শব্দের ওজন এক নয়। কারও কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তবু অন্তরের গভীরে পৌঁছায় না; আর কারও নীরবতা বাইরে নিঃশব্দ, কিন্তু আসমানের দরজায় কড়া নাড়ে। এই আয়াত সেই অন্তর্গত সত্যের দিকে ফিরিয়ে নেয়—নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। নবীদের কাহিনির ভেতর, দাওয়াতের ক্লান্ত পথে, সত্য-মিথ্যার সংঘাতে, মানুষের বাহ্যিক অবস্থান যতই শক্ত হোক না কেন, আল্লাহর শ্রবণ ও জ্ঞানের সামনে তা কাঁচের মতো স্বচ্ছ। যে অন্তর সত্যকে লুকাতে চায়, যে মুখ সত্য উচ্চারণ করে কিন্তু ভেতরে দ্বিধা লালন করে, যে সমাজ শোরগোল তুলে আলোর আহ্বানকে চাপা দিতে চায়—সবই তিনি শোনেন, সবই তিনি জানেন।
মানুষের সামনে অনেক কিছুই আড়ালে থাকে, কিন্তু আল্লাহর সামনে কিছুই আড়াল নয়। মুখে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ, অন্তরে জমে থাকা প্রতিটি কাঁপন, দাওয়াতের পথে ধৈর্যের প্রতিটি নিঃশ্বাস, সত্যের বিপরীতে মিথ্যার প্রতিটি কৌশল—সবই তিনি শোনেন, সবই তিনি জানেন। নবীদের কাহিনিতে এই সত্য বারবার স্পষ্ট হয়: একজন রাসূল যখন একাকী দাঁড়ান, তখন মানুষ তাঁকে দুর্বল ভাবতে পারে; কিন্তু যিনি প্রেরণ করেন, তিনি তো সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। তাই সত্যের পথের মর্যাদা মানুষের শোরগোলে নয়, আল্লাহর জ্ঞানে। যে কথা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বলা হয়, তা বাতাসে হারায় না; আর যে মিথ্যা নিজেকে খুব জোরে জাহির করে, সেটিও তাঁর শ্রবণ ও জ্ঞানের বাইরে নয়।
এই আয়াত হৃদয়ের ভেতরে জবাবদিহির দীপ্তি জ্বালিয়ে দেয়। সমাজে কত কথা, কত দাবি, কত স্লোগান, কত বাহ্যিক ধর্মভাষা—কিন্তু আল্লাহ জানেন কার ভাষা সত্য, কার ভাষা কেবল আবরণ। তিনি জানেন কে নরম কণ্ঠে কাঁদছে, কে কঠিন মুখে অস্বীকার করছে; কে অন্তরে হককে চিনেও দেরি করছে, আর কে ঈমানের জন্য নিঃশব্দে সংগ্রাম করছে। তাই মুমিনের জন্য এ আয়াত একদিকে ভয়ের, অন্যদিকে আশার। ভয়—কারণ প্রতিটি গোপন পাপও শুনছেন তিনি; আশা—কারণ প্রতিটি ভাঙা অন্তর, প্রতিটি নিঃশব্দ তওবা, প্রতিটি অজানা আর্তি তাঁর কাছে অজানা নয়। যখন বান্দা এই সত্যে জেগে ওঠে, তখন তার আত্মা নিজের কথার জন্যও সজাগ হয়, নীরবতার জন্যও সজাগ হয়, এবং অবশেষে সে ফিরে আসে সেই রবের দিকে, যিনি সব শোনেন, সব জানেন।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, মানুষের বিচার আসলে কত ক্ষুদ্র, আর আল্লাহর সাক্ষ্য কত অনন্ত। আমরা যে কথা লুকাই, যে কান্না গিলে ফেলি, যে দুঃখের নাম দিই না, যে সত্যকে উচ্চারণ করতে ভয় পাই—সবই তাঁর কর্ণে পৌঁছে যায়। আর যে মিথ্যা মুখে হাসে, যে দাওয়াতকে উপহাস করে, যে অন্তরে হককে চিনেও দূরে সরে—সেও তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয়। নবীদের কাহিনির ভেতর দিয়ে কুরআন যেন এ কথাই আবারও শেখায়: সত্যকে একা মনে করো না, কারণ আল্লাহ তার শ্রোতা; আর মিথ্যাকে শক্তিশালী ভেবো না, কারণ আল্লাহ তারও জানেন।
এমন এক রবের সামনে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, যিনি শুধু উচ্চারিত শব্দ শোনেন না, হৃদয়ের কম্পনও জানেন; শুধু প্রকাশিত কাজ দেখেন না, নিয়তের অন্ধকারও পড়েন। তাই দাওয়াতের পথে, সত্যের পথে, ত্যাগের পথে মানুষের প্রশংসা বড় আশ্রয় নয়—আল্লাহর জানা-শোনা-দেখাই মূল আশ্রয়। এই জ্ঞান মানুষকে ভেঙে দেয় না, বরং নরম করে; অহংকারকে গলিয়ে দেয়, আর অন্তরে তাওবার দরজা খুলে দেয়। হে অন্তর, আজ আর নিজেকে আড়াল কোরো না। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ—অতএব তাঁরই দিকে ফিরে যাও, তাঁরই সামনে সত্য হও, তাঁরই করুণায় বাঁচো।