আল্লাহ জিজ্ঞেস করছেন: আপনি ভেবে দেখুন তো, যদি আমি তাদেরকে বছরের পর বছর ভোগ-বিলাসে রেখে দিই? এই প্রশ্নের ভেতরে আছে এক নির্মম কিন্তু করুণ সত্য—দুনিয়ার দীর্ঘ সুখই সত্যের দলিল নয়। মানুষ কত বছর হেসেছে, কত দিন নিরাপদ থেকেছে, কত রাত নির্ভয়ে কেটেছে—এসব কিছুই আল্লাহর সামনে নির্ণায়ক হয়ে ওঠে না, যদি অন্তরে সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ না থাকে। আয়াতটি যেন আমাদের হৃদয়ের পর্দা সরিয়ে বলে দেয়: দীর্ঘ সময়ের আরামকে তুমি সফলতা ভেবো না; কারণ সময়ের প্রাচুর্য কখনো কখনো শুধু পরীক্ষা, কখনো অবকাশ, আর কখনো গাফিলতির পর্দা।

সূরা আশ-শু‘আরার ধারাবাহিকতায় এই আয়াত বিশেষভাবে হৃদয়কে নাড়িয়ে দেয়, কারণ এখানে নবীদের দাওয়াত, মিথ্যার অহংকার, এবং অবাধ্য জাতিগুলোর আত্মপ্রবঞ্চনার আবহ রয়েছে। তারা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তবু দুনিয়ার ভেতর তাদের আয়ু লম্বা হয়েছে—এতে তাদের মনে হয়তো জন্ম নিয়েছিল এই ভ্রান্ত ধারণা যে তারা নিরাপদ, তাদের বিরুদ্ধে কিছুই ঘটবে না। কিন্তু কুরআন আমাদের শেখায়, আল্লাহর ধৈর্যকে দুর্বলতা ভাবা ভয়ংকর ভুল। তিনি সময় দেন, অবকাশ দেন, সুযোগ দেন; যেন মানুষ ফিরে আসে। কিন্তু অবকাশকে যদি মানুষ বিজয় ভেবে বসে, তবে সে নিজের ধ্বংসের দিকেই হাঁটে।

এই আয়াত আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও অবিরাম আঘাত হানে। আমরা যখন দেখি কোনো মানুষ দীর্ঘদিন সুখে আছে, ক্ষমতায় আছে, আরামেই আছে, তখন হৃদয়ে প্রশ্ন জাগতে পারে—তাহলে কি সবই ঠিক? কুরআন বলে, নয়; ঠিকের মাপকাঠি আল্লাহর সন্তুষ্টি, ঈমানের দৃঢ়তা, এবং শেষ বিচারের সামনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি। দুনিয়ার ভোগ যত দীর্ঘই হোক, তা একদিন শেষ হবে; আর মানুষের সামনে থেকে যাবে তার রবের সামনে হিসাব। এই একটিমাত্র আয়াত যেন আমাদের অন্তরে জাগিয়ে তোলে—হে মানুষ, সুখের দৈর্ঘ্য দেখে মোহিত হয়ো না; দেখো, তুমি সত্যের সাথে আছ কি না, এবং সেই দিনের জন্য প্রস্তুত তো আছ কি না, যেদিন লম্বা ভোগ নয়, কেবল ন্যায়ের ফয়সালা কথা বলবে।

আপনি ভেবে দেখুন তো—যদি আল্লাহ কোনো জাতিকে বছরের পর বছর ভোগ-বিলাসে রেখে দেন, তবে কি তা সত্যের পক্ষে কোনো সনদ হয়ে যায়? এই আয়াত হৃদয়ের ভেতর জমে থাকা এক ভ্রান্ত মানচিত্র ছিঁড়ে ফেলে। মানুষ অনেক দিন বাঁচে, অনেক দিন হাসে, অনেক দিন নিজের চারপাশে নিরাপত্তার দেয়াল তুলে নেয়; তখন তার মনে হয় জীবনই যেন তার পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছে। কিন্তু কুরআন নীরবে বলে, দীর্ঘ সুখ আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রমাণ নয়। সময়ের প্রাচুর্য কখনো দয়া, কখনো পরীক্ষা, আর কখনো ধীরে ধীরে নেমে আসা সতর্কবার্তা—যে সতর্কবার্তা মানুষ শোনে না বলেই তা আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

দুনিয়া এমন এক মায়া, যেখানে সত্যের কণ্ঠস্বর কখনো কখনো দুর্বল শোনায় আর মিথ্যার রং অল্পক্ষণের জন্য খুব উজ্জ্বল লাগে। নবীদের দাওয়াতকে যারা অস্বীকার করেছিল, তারা বোধহয় ভেবেছিল দীর্ঘ জীবনই তাদের পক্ষে; দীর্ঘ আয়ু মানেই সঠিক পথের প্রমাণ। কিন্তু আল্লাহর ফয়সালা সময়ের দৈর্ঘ্যে মাপা যায় না, আর মানুষের বিলাসিতাও আখিরাতের তুলাযন্ত্রে ওজন পায় না। এই আয়াত আমাদের জাগিয়ে দেয়—যে নফস আরামকে সত্যের চেয়ে বড় মনে করে, সে ধীরে ধীরে নিজের অন্তরের বিচারবোধ হারায়; আর যে অন্তর আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি ভুলে যায়, তার দীর্ঘ জীবনও একদিন ফাঁকা হাতে শেষ হয়।
তাই এই আয়াত আমাদের হৃদয়ে ভয় ঢোকায়, আবার আশাও জাগায়: ভয় এই জন্য যে আল্লাহর দেওয়া অবকাশ যেন আমাদের ঘুম পাড়িয়ে না দেয়; আর আশা এই জন্য যে সত্যকে আঁকড়ে ধরা কোনো নবীর পথেই শেষ পর্যন্ত পরাজয় নেই। মানুষ হয়তো বছর গুনে, সম্পদ গুনে, সুখ গুনে; কিন্তু আল্লাহ গুনেন ঈমান, নম্রতা, সত্যের প্রতি আনুগত্য, এবং গাফিলতি ভেঙে জেগে ওঠার মুহূর্ত। সূরা আশ-শু‘আরার এই বাক্য যেন বলে—দেখো, দুনিয়ার দীর্ঘ আলোয় চোখ ঝলসে যেও না; কারণ শেষ আলোটি হবে কিয়ামতের, যেখানে বিলাসের ইতিহাস নয়, ঈমানের সত্যটাই কথা বলবে।

আল্লাহ যখন জিজ্ঞেস করেন, “আপনি ভেবে দেখুন তো, যদি আমি তাদেরকে বছরের পর বছর ভোগ-বিলাস করতে দিই”—তখন প্রশ্নটা শুধু অতীতের কোনো অবাধ্য জাতির দিকে নয়, বরং আজকের প্রতিটি আত্মপ্রস্তুতহীন হৃদয়ের দিকেও ফিরে আসে। মানুষ কত সহজে দীর্ঘ সুখকে নিজের নিরাপত্তা মনে করে, কত অনায়াসে বলে—এখন তো সবই ঠিক আছে, তাই হয়তো আমিই সঠিক। কিন্তু কুরআন হৃদয়কে জাগিয়ে দেয়: সময়ের দীর্ঘতা সত্যের সাক্ষ্য নয়, আর আরামের স্থায়িত্ব আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রমাণ নয়। কখনো কখনো দীর্ঘ ভোগ-বিলাস মানুষের উপর নেমে আসে পরীক্ষার চাদর হয়ে, যেন সে নিজেকেই ভুলে যায়, তার রবকেও ভুলে যায়, আর শেষ বিচারের দিনের কথা দূরে সরিয়ে রাখে।

এই আয়াতের মধ্যে এক ভয়ংকর করুণা আছে। ভয়ংকর, কারণ এতে গাফিল মানুষের আত্মতুষ্টি ভেঙে দেওয়া হয়; করুণ, কারণ আল্লাহ এখনো তাকে জাগাতে চান। তিনি সময় দেন, সুযোগ দেন, অবকাশ দেন—তাতে যেন মানুষ ফিরে আসে, নরম হয়, সত্যের সামনে দাঁড়ায়। কিন্তু যদি দুনিয়ার দীর্ঘ বসবাস হৃদয়কে আরও কঠিন করে তোলে, যদি ভোগের প্রসার মানুষকে আরও অহংকারী করে, তবে সে তার নিজের জন্যই অন্ধকার জমায়। সমাজ যখন আরামকে লক্ষ্য বানায়, তখন ন্যায়ের কণ্ঠ ক্ষীণ হয়; সত্যের দাওয়াতকে কবিতার মতো শুনে, কিন্তু জীবন দিয়ে গ্রহণ করে না। অথচ নবীদের কাহিনিগুলো আমাদের এটাই শেখায়—সত্যের পথে একাকিত্ব থাকতে পারে, দুনিয়ার সুবিধা নাও থাকতে পারে, তবু আল্লাহর পক্ষ থেকে থাকা মানেই নীরব পরাজয় নয়; সেটাই চূড়ান্ত বিজয়ের বীজ।

তাই এই আয়াত আমাদের হৃদয়ের সামনে আয়না ধরে। যে জীবন আজ এত দীর্ঘ, এত স্বস্তির, এত পরিচিত—তা একদিন আল্লাহর দরবারে এক সংক্ষিপ্ত হিসাব হয়ে দাঁড়াবে। সেখানে প্রশ্ন হবে না, কত বছর সুখে কাটল; প্রশ্ন হবে, সেই বছরগুলোতে অন্তর কতটা জেগেছিল, জিহ্বা কতটা সত্য বলেছিল, আমল কতটা তাঁর জন্য ছিল। ভোগ-বিলাস মানুষকে বড় করে না, যদি না সে বিনয়ের সঙ্গে রবের দিকে ফেরে। কুরআন আমাদের ভয়ও দেয়, আশাও দেয়—ভয় এই যে অবকাশের পরও যদি তওবা না আসে, তবে ধ্বংস নীরবভাবে ঘনিয়ে আসে; আর আশা এই যে, যত দীর্ঘই হোক পথভ্রষ্টতা, আল্লাহর দরজা খোলা থাকে ফিরে আসার জন্য। সুতরাং আজ যখন দুনিয়া আপনাকে দীর্ঘ আয়ু, প্রশস্ত রিজিক, আরামদায়ক দিন উপহার দেয়, তখন নিজের হৃদয়কে জিজ্ঞেস করুন—আমি কি সত্যিই আল্লাহর দিকে ফিরছি, নাকি শুধু সময়ের মধুরতায় নিজের হিসাব ভুলে যাচ্ছি?

দীর্ঘ ভোগ-বিলাস অনেক সময় মানুষের অন্তরকে নরম করে না; বরং আরও কঠিন করে। আল্লাহ যদি কাউকে বছরের পর বছর সুযোগ দেন, তা এই জন্য নয় যে তিনি ভুলে গেছেন—বরং কখনো তিনি অবকাশ দেন, যাতে অন্তরের আসল রং প্রকাশ পায়। বাহ্যিক সুখের পর্দা সরিয়ে এই আয়াত আমাদের সামনে দাঁড় করায় এক অস্বস্তিকর সত্য: দুনিয়ার দীর্ঘতা, নিরাপত্তা, আর আরামের বিস্তার কোনো মানুষের সত্যতা প্রমাণ করে না। নবীদের ডাকে যারা মুখ ফিরিয়েছে, তাদের অনেককেই দুনিয়া সাময়িকভাবে বহন করেছে; কিন্তু এই বহন করা ছিল সম্মান নয়, ছিল পরীক্ষা।
তাই আজ এই আয়াতের সামনে আমরা নিজেদেরকে জিজ্ঞেস না করে পারি না—আমার জীবন যদি দীর্ঘ হয়, তা কি আল্লাহর দিকে ফেরার জন্য, নাকি আরও গভীর গাফলতের জন্য? আমি যদি অনেক দিন হাসতে পারি, অনেক বছর জমাতে পারি, বহু রাত নিশ্চিন্তে কাটাতে পারি, তাতে কি আমার শেষ পরিণতি নিরাপদ হয়ে যায়? না। কারণ নিরাপত্তা সম্পদের মধ্যে নয়, নিরাপত্তা ঈমানের সত্যতায়, তওবার অশ্রুতে, এবং আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতিতে। দুনিয়ার সময় যত দীর্ঘ হোক, একদিন তা শেষ হবেই; আর সেই শেষ মুহূর্তে মানুষকে জিজ্ঞেস করা হবে না সে কত বছর ভোগ করেছে, বরং জিজ্ঞেস করা হবে সে কাকে সত্য বলে জেনেও কাকে অস্বীকার করেছে।
এই আয়াতের কাঁপুনি এখানেই—আল্লাহ আমাদের মনে করিয়ে দেন, দেরি মানে মাফ নয়, আর অবকাশ মানে নিরাপত্তা নয়। মানুষ যখন দুনিয়ার দীর্ঘ আলোতে নিজেকে হারিয়ে ফেলে, তখন আখিরাতের অন্ধকার হঠাৎ খুব কাছের হয়ে ওঠে। তাই আজ হৃদয়কে নরম করতে হবে, অহংকারকে নামাতে হবে, আর সেই রবের দিকে ফিরতে হবে যিনি সময়ও দেন, ক্ষমতাও রাখেন, এবং শেষ ফয়সালাও তাঁরই হাতে। যদি তিনি আমাদের এখনও সুযোগ দিয়ে থাকেন, তবে এ সুযোগকে তুচ্ছ ভেবো না; বরং এক চুপচাপ কাঁপতে থাকা তওবার মাধ্যমে বলো—হে আল্লাহ, আমাকে ভোগের দীর্ঘতায় নয়, আপনার দিকে প্রত্যাবর্তনের সত্যতায় জীবিত রাখুন।