সূরা আশ-শুআরার এই আয়াতটি যেন গাফলতির পর্দায় একটি হঠাৎ বজ্রাঘাত। মানুষ যখন নিজের ধারণা, নিজের শক্তি, নিজের সময়ের ওপর ভরসা করে নিশ্চিন্ত হয়ে যায়, তখন আল্লাহর নির্ধারিত পরিণতি এক মুহূর্তে এসে দাঁড়ায় তার সামনে। বাগ্তাতান—অচমকা, অপ্রত্যাশিত, হঠাৎ—এই শব্দটি শুধু ঘটনার গতিই বোঝায় না; এটি মানুষের ভেতরের ভ্রান্ত নিরাপত্তাবোধও ভেঙে দেয়। তারা বুঝতেও পারে না, কারণ তাদের অন্তর আগে থেকেই বুঝতে চায়নি। সত্যকে অস্বীকার করতে করতে মানুষ কখনো কখনো এমন ঘুমে ডুবে যায়, যেখানে আসন্ন বিপদও সে অনুভব করতে পারে না।
এ আয়াতের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট, সর্বসম্মত কারণ-উৎপত্তি বর্ণনা করা না থাকলেও এর বৃহত্তর কুরআনিক প্রেক্ষাপট স্পষ্ট। সূরা আশ-শুআরায় বারবার নবীদের কাহিনি এসেছে—একই আহ্বান, একই অস্বীকার, একই আত্মমুগ্ধতা, একই পরিণতি। এখানে কেবল অতীতের কোনো জাতি নয়, বরং প্রতিটি যুগের মানুষই সম্বোধিত। যারা সত্য শুনেও তা ঠেলে দেয়, যারা দাওয়াতকে তুচ্ছ ভেবে দিন কাটায়, যারা মনে করে সময় এখনো অনেক—তাদের জন্য এই আয়াত এক কঠিন আয়না। আল্লাহর ফয়সালা দেরি করতে পারে, কিন্তু হারিয়ে যায় না; আর সে ফয়সালা যখন আসে, তখন মানুষের প্রস্তুতি নয়, তার গাফলতিই প্রথম প্রকাশ পায়।
এই বাণী আমাদের হৃদয়ে ভয় জাগাতে এসেছে নিষ্ঠুর ভয়ের জন্য নয়, বরং জাগরণের জন্য। কারণ কুরআন কেবল শাস্তির সংবাদ দেয় না, সে শাস্তির আগেই ঘুম ভাঙাতে চায়। যে অন্তর আজ আল্লাহকে স্মরণ করে, সত্যের সামনে নরম হয়, নিজের ভুলকে স্বীকার করে, তার জন্য হঠাৎ এসে পড়া ভয় নয়; বরং তা হতে পারে রহমতের আগেই জেগে ওঠা। কিন্তু যে অন্তর গর্বে কঠিন, সত্যকে দূরে ঠেলে অভ্যস্ত, তার জন্য অজানা বিপদই সবচেয়ে বড় শিহরণ। এই আয়াত যেন কানে কানে বলে: এমনভাবে বেঁচে থেকো না, যেন কিছুই ঘটবে না; বরং এমনভাবে জেগে থেকো, যেন প্রতিটি মুহূর্তই তোমাকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনতে পারে।
মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত থাকে, যখন সে মনে করে সবকিছু তার হাতের মুঠোয়। সময়, সুযোগ, শক্তি, নিরাপত্তা—সবকিছু যেন তার ইচ্ছার অধীন। কিন্তু এই আয়াত সেই ভরসার ভিত কাঁপিয়ে দেয়। ফَيَأْتِيَهُم بَغْتَةًۭ—অতঃপর তা এসে পড়ে আকস্মিকভাবে। আল্লাহর নির্ধারিত পরিণতি কখনো কখনো ধীরে ধীরে নয়, বরং এমন হঠাৎ এসে উপস্থিত হয় যে, মানুষের হিসাব, পরিকল্পনা, আর আত্মপ্রবঞ্চনার দেয়াল এক নিমেষে ধসে যায়। এই হঠাৎ আসা কেবল শাস্তির ঘটনা নয়; এটি মানুষের অন্তরের ঘুম ভাঙানোর জন্য এক নীরব বজ্রধ্বনি।
সূরা আশ-শুআরার বৃহৎ সুরে নবীদের কাহিনি আমাদের শেখায়, সত্যের আহ্বান বারবার এসেছে, আর মানুষ বারবার তা ঠেকিয়ে দিতে চেয়েছে। ভাষা বদলেছে, যুগ বদলেছে, কিন্তু আত্মগর্ব, অস্বীকার, আর অবহেলার রোগ একই থেকেছে। তাই এই আয়াত আজও জীবন্ত—যে মানুষ আল্লাহকে ভুলে আত্মনির্ভরতার ভেতর ঘুমিয়ে পড়ে, তার কাছে পরিণতি অচমকাই। মুমিনের জন্য এ বাণী আতঙ্কের সঙ্গে রহমতেরও দরজা খুলে দেয়: দ্রুত তাওবা, দ্রুত ফিরে আসা, দ্রুত সত্যের দিকে ঝুঁকে পড়া। কারণ যে চোখ আজ অশ্রু দিয়ে জাগে, কাল তা ভয় দিয়ে জাগার আগেই আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে পারে।
মানুষের জীবনে কত সময়ই না এমন আসে, যখন সে মনে করে সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে আছে। শাসন, সম্পদ, সুযোগ, অবকাশ, স্বপ্ন—সবকিছু যেন তার হাতের মুঠোয়। কিন্তু এই আয়াত সেই মুঠো আলগা করে দেয়। হঠাৎ করে, অচেনা মুহূর্তে, আল্লাহর নির্ধারিত সত্য এসে পড়ে মানুষের সামনে। তখন তার হিসাব থেমে যায়, তার কল্পনা ভেঙে যায়, তার অবহেলা স্তব্ধ হয়ে যায়। বَغْتَةً শব্দটি শুধু আকস্মিকতার নয়, এটি অহংকারে মোড়ানো নিরাপত্তাবোধের মৃত্যুবার্তা। মানুষ দেখে না, কারণ সে দেখতে চায় না; বুঝতে পারে না, কারণ সে বুঝবার জন্য হৃদয়কে খোলা রাখে না।
সূরা আশ-শুআরা-র সামগ্রিক সুরেও এই কথাই বারবার জেগে ওঠে—নবীরা এসেছেন সত্য নিয়ে, আর তাদের জাতিরা এসেছে অস্বীকার, তাচ্ছিল্য, গাফলতি নিয়ে। কেউ মিথ্যাকে সাজিয়েছে, কেউ দাওয়াতকে কবিতা ভেবেছে, কেউ আবার সময়ের দীর্ঘ ছায়াকে নিরাপত্তা ভেবেছে। কিন্তু আল্লাহর সিদ্ধান্ত মানুষের ধীরতার কাছে বাধ্য নয়। সমাজ যখন সত্যকে নিয়ে খেলতে শেখে, যখন অন্যায়কে স্বাভাবিক করে, যখন অন্তরগুলো নরম হওয়ার বদলে শক্ত হয়ে যায়, তখন হঠাৎ পতন আসে কেবল শাস্তি হয়ে নয়, এক নির্মম জাগরণ হয়ে। এই জাগরণই শেখায়—মানুষ নিজের চোখে যতই ভবিষ্যৎ আঁকে, আল্লাহর তাকদীর তার চেয়ে অনেক গভীর।
তাই এই আয়াত ভয় জাগায়, আবার রহমতের দিকও খুলে দেয়। ভয়, কারণ অবহেলায় কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত একদিন অচেনা দরজায় কড়া নাড়তে পারে; আর আশা, কারণ যে আজ জেগে ওঠে, সে আজই ফিরে আসতে পারে। মুমিন এই বাণী শুনে কেঁপে ওঠে, কিন্তু ভেঙে পড়ে না; সে নিজের নফসকে জিজ্ঞেস করে—আমি কি সত্যকে দেরি করিয়ে দিচ্ছি? আমি কি এমন গাফলতির ঘুমে আছি, যেখানে আমার অন্তরও আর সাড়া দিচ্ছে না? এই প্রশ্নই আত্মসমালোচনার দরজা খুলে দেয়। আর যে দরজা একবার খুলে যায়, সেখানে তওবার বাতাস ঢুকে পড়ে। হঠাৎ এসে পড়া পরিণতি মানুষের জন্য যেমন ভয়ের, তেমনি তওবা-ফেরা হৃদয়ের জন্য তা এক গভীর আহ্বান: এখনই জাগো, এখনই ফেরো, কারণ আল্লাহর কাছে ফিরে আসার সময় কখনোই খুব দেরি নয়—যতক্ষণ শ্বাস আছে, ততক্ষণ দরজাও খোলা।
এই ‘বাগ্তাতান’ শব্দটি যেন মানুষের অহংকারের দরজায় নীরব আঘাত। আমরা কত সহজে ভাবি, সবকিছু আজকের মতোই চলবে; জীবনের হিসাব, অবকাশ, স্বাদ, ব্যস্ততা—সব কিছু আমাদের ইচ্ছামতো দীর্ঘ হবে। কিন্তু আল্লাহর সিদ্ধান্ত মানুষের ধারণার মতো ধীরে হাঁটে না। তা আসে যখন গাফলতি গভীর হয়, যখন জবাবদিহির ভাবনা দূরে সরে যায়, যখন হৃদয় নিজেরই তৈরি অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তখন হঠাৎই বুঝতে হয়, যার কাছে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল, তাঁর কাছেই এতদিন ফিরে যাইনি।
এ আয়াত আমাদেরকে ভয় দেখানোর জন্য নয়; জাগিয়ে তোলার জন্য। যেন আমরা আজই নিজের ভেতরের ঘুম টের পাই। নবীদের কাহিনি আমাদের শেখায়, সত্য কখনো নিঃশব্দে হারিয়ে যায় না; বরং মানুষই তাকে উপেক্ষা করতে করতে নিজের জন্য হঠাৎ পতনের পথ প্রস্তুত করে। তাই এখনই প্রয়োজন নম্র হওয়া, ফিরে আসা, অশ্রুর মতো সহজ হয়ে যাওয়া, আর বলার সাহস পাওয়া—হে আল্লাহ, আমি আমার গাফলতিকে চিনে ফেলেছি। যদি আজ আমি তোমার দিকে না ফিরি, তবে কাল হয়তো আমার জন্য খুব দেরি হয়ে যাবে।