ফিরআউনের দরবারে দাঁড়িয়ে এক নির্মম বাক্য উচ্চারিত হচ্ছে: “তুমি সেই কাজ করেছ, যা তুমি করেছ; আর তুমি ছিলে কৃতঘ্নদের অন্তর্ভুক্ত।” বাহ্যত এটি এক অভিযোগের ভাষা, কিন্তু অন্তরে এ কথা কেবল অপরাধের স্মরণ নয়; এ হলো সত্যকে আড়াল করার পুরোনো রাজনৈতিক কৌশল। যখন বাতিল নিজেকে টিকিয়ে রাখতে চায়, তখন সে প্রথমে সত্যবাহককে অপরাধী বানায়, তারপর তার চারপাশে লজ্জা ও ভয় ছড়িয়ে দেয়। মূসা (আ.)-এর মতো আল্লাহ-প্রেরিত একজন নবীর বিরুদ্ধে এ ভাষা উচ্চারণ করে ফেরাউন আসলে নিজের অহংকারকেই প্রকাশ করে। সে সেই মানুষ, যে ক্ষমতার নেশায় সত্যকে সহ্য করতে পারে না, আর আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা হককে আঘাত করার জন্য পুরোনো এক অস্ত্র ব্যবহার করে—নিন্দা, অপমান, আর কৃতঘ্নতার অভিযোগ।
এই আয়াতের পেছনে আমরা দেখি নবীদের দাওয়াতের বিরুদ্ধে মানুষের এক চিরচেনা মনস্তত্ত্ব। যাকে আল্লাহ হিদায়াতের আলো দিয়েছেন, তার জীবনকে যদি কেউ কেবল আগের এক ভুলের মধ্যে বন্দি করে রাখতে চায়, তবে সে আসলে বর্তমান সত্যকে অস্বীকার করছে। মূসা (আ.) যখন আল্লাহর নির্দেশে ফেরাউনের দিকে গিয়েছেন, তখন তাঁর জীবনের এক ঘটনাকে ধরে তাঁকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা হয়েছে; কিন্তু নবীর জীবন কোনো একক ঘটনার গায়ে লেখা থাকে না, বরং তা থাকে ওহির দিশায় গঠিত এক পবিত্র যাত্রায়। এখানে “কৃতঘ্ন” শব্দটি শুধু অকৃতজ্ঞতার ব্যক্তিগত অভিযোগ নয়; এটি আল্লাহর নিদর্শন, নবী, ও হক পথে আহ্বানের প্রতি এক অন্ধ বিদ্রোহের নাম। ফেরাউন মূসা (আ.)-কে নয়, বরং সেই রাব্বকে অস্বীকার করছে, যিনি তাঁকে সৃষ্টি করেছেন, লালন করেছেন, এবং পরে তাঁর দিকেই ফিরিয়ে নিতে চাইছেন।
সূরা আশ-শুআরা-র এই অংশে নবীদের কাহিনি এমনভাবে আসছে, যাতে মক্কার মুশরিকদের হৃদয়ের আয়না ভেঙে যায়। কুরআন এখানে ইতিহাসকে শুধু গল্প বানায় না; ইতিহাসকে বানায় সতর্কবার্তা। ফেরাউনের মুখে উচ্চারিত এই বাক্য আমাদের শেখায়, সত্যের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ প্রায়ই নীতিগত না হয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ হয়—মানুষ বলে, ‘তুমি তো এমন ছিলে, এমন করেছিলে।’ অথচ আল্লাহর দৃষ্টিতে তওবা, হিদায়াত, ও নবুয়তের মর্যাদা সব কিছুর ওপর উঁচু। এ আয়াতের ভেতরে তাই কেবল একটি দরবারের দৃশ্য নেই; আছে প্রত্যেক যুগের সেই হৃদয়, যা নিজের পাপ ঢাকতে অন্যের নেকনামা মাটিতে মিশিয়ে দিতে চায়। আর আছে সেই নিশ্চল সত্য—আল্লাহ যাকে পাঠান, মানুষের কটু বাক্য তাকে কলুষিত করতে পারে না; বরং বাতিলের প্রতিটি নোংরা অভিযোগেই সত্যের দীপ্তি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ফিরআউনের মুখে উচ্চারিত এই বাক্যটি কেবল এক অতীত অপরাধের স্মরণ নয়; এটি সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাতিলের আত্মরক্ষামূলক চিৎকার। আল্লাহর নবী মূসা (আ.)-কে তার জীবনের এক পুরোনো ঘটনার সঙ্গে বেঁধে ফেলে যেন বলা হচ্ছে, তুমি আলোর পথ দেখাতে এসেছ, অথচ তোমার ইতিহাসে দাগ আছে। কিন্তু মানব-হৃদয়ের অন্ধকার ঠিক এখানেই প্রকাশ পায়: যখন সে সত্যকে গ্রহণ করতে পারে না, তখন সে সত্যবাহককে দোষী বানায়। যে কথা বাহ্যত অভিযোগ, অন্তরে তা অহংকারের ভাষা; আর সেই অহংকারই মানুষকে কৃতঘ্নতার গভীরে নামিয়ে দেয়—নিয়ামত পেয়েও নিয়ামতদাতার দিকে না তাকিয়ে, হককে চিনেও হককে অস্বীকার করার অন্ধ সাহস।
আজকের হৃদয়ের জন্য এই আয়াত এক আয়না। আমরা কি কখনও সত্যের কথা শুনে বক্তাকে ছোট করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি? নিজের ভুলকে বাঁচাতে অন্যের অতীতকে টেনে আনি? কুরআন আমাদের অন্তরকে জিজ্ঞেস করে: তুমি কি হকের মুখোমুখি, না শুধু আত্মসম্মানের মুখোশ পরে আছ? কারণ কৃতঘ্নতা শুধু মুখের অস্বীকার নয়; তা হলো আল্লাহর নূরকে দেখেও অন্ধ থাকার এক অন্তর্লিখিত বিদ্রোহ। আর যে অন্তর এই বিদ্রোহে অভ্যস্ত হয়ে যায়, সে শেষ পর্যন্ত সত্যকে শাস্তি দিতে চায়, কিন্তু নিজেরই হৃদয়কে শূন্য করে ফেলে।
এই একটি বাক্যের ভিতরে কত যে মিথ্যা-রাজনীতি লুকিয়ে থাকে! ফেরাউন মূসা (আ.)-এর অতীতের এক ঘটনাকে সামনে টেনে এনে তাঁর নবুওয়াতের আলো ঢেকে দিতে চায়। মানুষ যখন সত্যের সামনে দাঁড়াতে ভয় পায়, তখন সে ত্রুটি খোঁজে, পুরোনো দাগ টানে, চরিত্রের গায়ে কালি ছিটায়। অথচ আল্লাহর দরবারে কোনো বান্দার বিচার তার এক টুকরো অতীত দিয়ে হয় না; বিচার হয় বর্তমানের ইমান, অনুশোচনা, সত্যের প্রতি আনুগত্য আর আল্লাহর আহ্বানে সাড়া দেওয়ার দ্বারা। ফেরাউনের কণ্ঠে তাই আমরা শুধু এক শাসকের উদ্ধত অভিযোগ শুনি না, শুনি সেই হৃদয়ের রোগ, যে হৃদয় হককে মেনে নিতে পারে না বলে হকের বাহককে অপরাধী বানায়।
আর “তুমি কৃতঘ্নদের অন্তর্ভুক্ত” — এ কথা যেন মানুষের অন্তরের সবচেয়ে গভীর বিপদের দিকে আঙুল তোলে। কৃতঘ্নতা শুধু মুখের অস্বীকার নয়; আল্লাহর নিদর্শন দেখেও না দেখা, অনুগ্রহের মধ্যে বেঁচে থেকেও দাতা-সত্তাকে ভুলে যাওয়া, হিদায়াত এসে দরজায় কড়া নাড়লেও অহংকারের তালা না খোলা। ফেরাউন মূসা (আ.)-কে ছোট করতে চেয়েছে, কিন্তু আসলে নিজের ভেতরের অন্ধকারকে প্রকাশ করে দিয়েছে। সমাজ যখন ক্ষমতাকে সত্যের মাপকাঠি বানায়, তখন নিরপরাধও অভিযুক্ত হয়, আর মিথ্যাও সিংহাসনে বসে। এই আয়াত আমাদের শিখিয়ে দেয়, ক্ষমতা নয়, হকই চূড়ান্ত; জড়ো করা জনতা নয়, আল্লাহর সাক্ষ্যই স্থায়ী; আর মানুষ যত বড়ই হোক, কৃতজ্ঞতা হারালে সে নিজেরই বিপরীত স্রোতে ভেসে যায়।
এ জন্যই এই আয়াত কেবল মূসা (আ.)-এর বিরুদ্ধে উচ্চারিত এক সময়ের বাক্য নয়, বরং প্রতিটি যুগের হৃদয়ের সামনে এক আয়না। আমরা কি কখনো নিজেদের ভুলের ওপরে সত্যকে ঢেকে রাখি? কাউকে নিয়ে কথা বলার সময় কি তার সেরা সম্ভাবনাকে মুছে দিয়ে কেবল তার পতনকে বড় করে তুলি? আল্লাহর পথে ফেরার দরজা তখনই খুলে যায়, যখন বান্দা নিজের পক্ষ থেকে মিথ্যার প্রতিরক্ষা বন্ধ করে দেয়। মূসা (আ.)-এর ওপর আরোপিত এ অবজ্ঞা আমাদের শেখায়, সত্যের লোকদের পথ সবসময় সহজ ছিল না; তবু তারা হেরে যায়নি, কারণ তাদের শক্তি ছিল মানুষের প্রশংসায় নয়, আল্লাহর সমর্থনে। তাই আজও হৃদয়ের গোপন দরবারে এই আয়াত শোনা জরুরি: নিজেকে জিজ্ঞেস করো, আমি কি কৃতঘ্নতার ভাষায় কথা বলছি, নাকি ক্ষমা ও ফিরে আসার ভাষায়? কারণ শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক আত্মাই আল্লাহর দিকে ফিরবে, আর তখন অভিযোগের শব্দ নয়, সত্যের সামনে নত হওয়াই হবে মুক্তির একমাত্র ঠিকানা।
এই আয়াত আমাদেরও আয়না দেখায়। কতবার আমরা নিজেদের ভুলকে ছোট করে দেখেছি, আর অন্যের সত্যনিষ্ঠতাকে সন্দেহের ছায়ায় ঢেকেছি? কতবার আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা কোনো নসিহত, কোনো সতর্কতা, কোনো হিদায়াতের ডাককে আমরা অভিমান দিয়ে ঠেকিয়ে দিয়েছি? কৃতঘ্নতা শুধু জিহ্বার কথা নয়; এটি এক অন্তরের রোগ, যেখানে নেয়ামত দেখা যায়, কিন্তু মালিককে দেখা যায় না। যেখানে ক্ষমতা আছে, সেখানে যদি কৃতজ্ঞতা না থাকে, তবে সেই ক্ষমতাও একদিন ফিরআউনের মতোই ধসে পড়ে—কারণ আল্লাহর সামনে অহংকার টেকে না, আর হকের সামনে মিথ্যার দীর্ঘজীবন নেই।
আজ এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে অন্তর নরম হোক। আমাদের ভেতরের গোপন ফিরআউন যেন ভেঙে যায়; যে ফিরআউন নিজের ভুল ঢাকতে চায়, যে ফিরআউন অনুগ্রহের জবাবে অস্বীকার শেখায়, যে ফিরআউন সত্যের আলো সহ্য করতে পারে না। আল্লাহ আমাদের এমন হৃদয় দিন, যা দোষ দেখেই হককে প্রত্যাখ্যান করে না; বরং দোষ দেখে তাওবার দরজা খোঁজে। কারণ মানুষের প্রকৃত মুক্তি অপরাধ গোপন করার মধ্যে নয়, বরং আল্লাহর সামনে নত হয়ে স্বীকার করার মধ্যে। যেদিন বান্দা নিজের কৃতঘ্নতা বুঝে ফেলে, সেদিনই তার জন্য রহমতের আকাশ খুলে যেতে শুরু করে।