সূরা আশ-শুআরার এই আয়াতটি এক ভয়ানক দৃশ্যের শেষে দাঁড়িয়ে আছে। “এক বৃদ্ধা ব্যতীত, সে ছিল ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত”—এখানে কেবল একটি পারিবারিক পরিচয় নয়, বরং একটি চূড়ান্ত পরিণতির ঘোষণা আছে। তিনি ছিলেন এমন এক দলের অংশ, যাদের সামনে সত্যের আলো জ্বলে উঠেছিল, কিন্তু তারা সেই আলোকে গ্রহণ করেনি; বরং অস্বীকার, জেদ ও নৈতিক পতনের অন্ধকারেই রয়ে গিয়েছিল। “الغابرين” শব্দটি এখানে কেবল পেছনে পড়ে থাকা নয়, বরং ধ্বংসের ভেতর বিলীন হয়ে যাওয়া এক দুর্ভাগ্যজনক অবস্থাকে মনে করিয়ে দেয়।
এই আয়াতের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট নবী লূত আলাইহিস সালামের কাহিনি। এখানে কোনো আকস্মিক ব্যক্তিগত আক্রোশ নেই, নেই আবেগের উত্তাপ থেকে ওঠা কোনো সিদ্ধান্ত; বরং আছে আল্লাহর ন্যায়বিচারের এক স্পষ্ট, নির্ভুল প্রকাশ। লূত আলাইহিস সালামের জাতি প্রকাশ্য অশ্লীলতা, অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘনের মধ্যে ডুবে গিয়েছিল—আর তাদের সামনে সতর্কবার্তা, দাওয়াত, নসীহত বারবার এসেছে। তবু যখন সত্যকে প্রত্যাখ্যানের অভ্যাস পাকা হয়ে যায়, তখন সম্পর্ক, ঘর, পরিচয়, সামাজিক নৈকট্য—কিছুই মানুষকে আল্লাহর বিচার থেকে বাঁচাতে পারে না। এই আয়াতে সেই কঠিন বাস্তবতাই নীরবে কথা বলে: নবীর পরিবারভুক্ত হওয়াও যদি আনুগত্যের বদলে অবাধ্যতার পাশে দাঁড়ায়, তবে তা মুক্তির নয়, বরং পরীক্ষার কারণ হয়।
এখানে মানবহৃদয়ের জন্য এক গভীর সতর্কতা আছে। কখনো মানুষ ভাবে, আমি তো অমুকের সাথে, আমি তো অমুক ঘরের, অমুক পরিবেশের, অমুক পরিচয়ের—তাই আমি নিরাপদ। কিন্তু কুরআন শেখায়, নিরাপত্তা জন্মে না নাম থেকে; জন্মে হৃদয়ের সিজদা থেকে, ঈমানের সত্যতা থেকে, আল্লাহর সামনে নত হওয়ার সাহস থেকে। এক বৃদ্ধা, দলে থেকেও সত্যের সাথে না দাঁড়ালে, ধ্বংসের স্রোতে হারিয়ে যান। আর যে ব্যক্তি সত্যকে গ্রহণ করে, যদিও সে একা, সে আল্লাহর রহমতের দিকে উঠে যায়। তাই এই আয়াত আমাদের শুধু অতীতের এক ভগ্ন ইতিহাস দেখায় না; এটি আজকের আত্মাকেও জিজ্ঞেস করে—তুমি কি সত্যের পাশে, নাকি কেবল ভিড়ের পাশে?
এক বৃদ্ধা ব্যতীত—এই ক্ষুদ্র বাক্যটি কেবল একটি পরিবারের শেষ পরিণতি নয়, মানুষের ভেতরের সত্য-অস্বীকারের ইতিহাস। আল্লাহ যখন কোনো জাতিকে সতর্ক করেন, তখন তাঁর সতর্কবাণী শুধু আকাশ থেকে নেমে আসা শব্দ থাকে না; তা ঘরের ভেতর, বিবেকের ভেতর, সম্পর্কের ভেতর, এবং নীরবতার ভেতরও কাঁপন তোলে। তবু কেউ কেউ সত্যকে দেখে না, শুনে না, মানেও না। তারা অবাধ্যতাকে অভ্যাস বানায়, সীমালঙ্ঘনকে পরিচয় বানায়, আর অন্ধকারকে এমন সঙ্গী করে নেয় যে আলোর সামনে দাঁড়ালেও তাদের হৃদয় নরম হয় না।
এই আয়াত হৃদয়ে ফিসফিস করে বলে—সত্যকে তুচ্ছ কোরো না, কারণ সত্য কখনোই তুচ্ছ নয়। আল্লাহর ক্ষমতা কেবল শাস্তি দেওয়ার শক্তি নয়; তা ন্যায় প্রতিষ্ঠার এমন অটল ঘোষণা, যেখানে প্রত্যেকের অবস্থান প্রকাশ পেয়ে যায়। যারা সতর্কবার্তাকে অবজ্ঞা করে, তারা মনে করে সময় তাদের পক্ষে; কিন্তু সময় আসলে আল্লাহর হাতে। আর যখন তাঁর ফয়সালা আসে, তখন সবচেয়ে আপন সম্পর্কও অবাধ্যতাকে ঢেকে রাখতে পারে না। তাই মুমিনের ভয় এই নয় যে সে দুনিয়ায় কী হারাবে; তার আসল ভয় এই যে, যেন সে সত্য শুনেও অন্তরে পেছনে পড়ে না যায়, যেন সে আল্লাহর সামনে ‘الغابرين’—পিছনে পড়ে যাওয়া, ধ্বংসের ভেতর নিঃশেষ হয়ে যাওয়া মানুষদের মধ্যে না হয়ে যায়।
“এক বৃদ্ধা ব্যতীত”—এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটি যেন ইতিহাসের বুক চিরে নেমে আসা এক বিধ্বংসী নীরবতা। কত সম্পর্ক, কত পরিচয়, কত ঘনিষ্ঠতা; কিন্তু সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে সম্পর্ক রক্ষা করে না, সমাজ বাঁচায় না, বংশ মর্যাদা দেয় না। লূত আলাইহিস সালামের জাতির সামনে নসীহত এসেছিল, স্পষ্ট সতর্কবার্তা এসেছিল, তবু তারা নিজেদের পাপ, নিজেদের জেদ, নিজেদের অন্ধ অভ্যাসকে আঁকড়ে ধরেছিল। সেই বৃদ্ধা ছিল ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত—এতে করুণার দরজা বন্ধ হয়ে যায় না, বরং এ কথা আরও ভয়াবহভাবে জানান দেয় যে আল্লাহর বিচার কারও আত্মীয়তা দেখে থামে না, আর কারও বয়স, পরিচয় বা ঘরের ছায়া তাকে রক্ষা করতে পারে না। সত্যকে অস্বীকারের পরিণতি কখনও এক দিনে তৈরি হয় না; তা ধীরে ধীরে হৃদয়ের ওপর জমে, তারপর একদিন মানুষকে তার নিজের অপচয়ের ভেতরেই ফেলে রাখে।
এই আয়াত আমাদের অন্তরকে নিজের দিকে ফিরিয়ে আনে। আমি কি সেই লোকদের দলে নই, যারা সত্য শুনে নরম হয় না, বরং আরো শক্ত হয়ে যায়? আমার পরিবার, আমার পরিবেশ, আমার সমাজ—এসব কি আমাকে আল্লাহর নৈকট্যে টানছে, নাকি ধ্বংসের পথে স্বাভাবিক করে তুলছে? “الغابرين” শব্দটি যেন কানে কানে বলে, যারা পেছনে পড়ে যায় তারা কেবল পথেই পড়ে না, তারা ঈমানের আলো থেকে, রহমতের আমন্ত্রণ থেকে, তওবার সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়ে। তাই ভয়ও চাই, আবার আশা-ও চাই; কারণ যে ব্যক্তি নিজের ভেতরের ভুলকে চিনে অশ্রুসিক্ত হৃদয়ে রবের দিকে ফিরে আসে, তার জন্য এখনও দরজা খোলা। কিন্তু যে অবাধ্যতাকে স্বভাব বানায়, আর নষ্ট সমাজের স্বস্তিকে নিরাপত্তা ভেবে নেয়, সে একদিন দেখবে—নিষ্ঠুরতা নয়, বরং সত্যের নীরব বিচারই তাকে গ্রাস করেছে। আজ এই আয়াত হৃদয়ে রাখি: আল্লাহর সামনে টিকে থাকে শুধু সেই অন্তর, যে নত হতে জানে।
মানুষ কত সহজে ভাবে—আমার ঘর, আমার আত্মীয়তা, আমার পরিচয়, আমার পুরোনো সম্পর্ক, এসবই আমাকে আগলে রাখবে। কিন্তু এই আয়াত যেন নীরবে বলে দেয়, আল্লাহর আদালতে কাউকে রক্তের টান বাঁচায় না, কাউকে নামের জোর রক্ষা করে না, কাউকে ঘরের আশ্রয়ও নিরাপত্তা দেয় না। সত্য যখন আসে, তখন তার সামনে মানুষের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটিও পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। যে হৃদয় জেদে শক্ত হয়ে যায়, সে শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের সঙ্গেই থেকে যায়; আর যে হৃদয় ভয়ে কেঁপে ওঠে, সে তওবার দরজা খুঁজে পায়। এখানে এক বৃদ্ধার কথা শুধু একজন নারীর কথা নয়; এটি সেই করুণ চিহ্ন, যেখানে অবাধ্যতার সঙ্গী হয়ে গেলে শেষ পরিণতিও অনিবার্য হয়ে ওঠে।
আমাদের জীবনেও এমন কত কিছু আছে, যা সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে চায় না। আমরা শুনি, বুঝি, কেঁপে উঠি, আবার ভুলের পরিচিত ছায়ায় ফিরে যাই। কিন্তু সূরা আশ-শুআরা আমাদের শেখায়—নবীদের কাহিনি কেবল অতীতের গল্প নয়, বরং আজকের হৃদয়ের জন্য আল্লাহর সতর্ক ঘন্টা। কবিতার ভাষা নয়, অহংকারের রঙ নয়, বাহ্যিক সান্ত্বনা নয়; সত্যের সামনে আত্মসমর্পণই মুক্তি। তাই এই আয়াত পড়তে গিয়ে নিজের দিকে তাকানো ছাড়া উপায় থাকে না: আমি কি সত্যকে গ্রহণ করছি, নাকি সত্যের বিরুদ্ধেই নিজের অভ্যাস, কামনা আর জেদের দেয়াল তুলে দাঁড়াচ্ছি? আল্লাহ আমাদের অন্তরকে কোমল করুন, দেরি হওয়ার আগেই চোখে অশ্রু, জিহ্বায় ইস্তিগফার, আর মনে সঠিক পথের তৃষ্ণা দান করুন।