সূরা আশ-শুআরার এই আয়াতে একটি গভীর, কাঁপানো ঘোষণা আছে—“আমি এর জন্য তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না। আমার প্রতিদান তো বিশ্ব-পালনকর্তা দেবেন।” নবীদের কণ্ঠে সত্য কখনোই বাজারদর ছিল না, ছিল না ব্যক্তিগত সুনাম, ক্ষমতা, বা মানুষের প্রশংসা পাওয়ার লোভ। দাওয়াতের এই বাক্যটি যেন মনের গভীরে আলো ফেলে দেয়: আল্লাহর জন্য যে কথা বলা হয়, তা মানুষের কাছ থেকে কিছু আদায় করতে আসে না; বরং মানুষের অন্তরকে জাগিয়ে, তাদের রবের দিকে ফিরিয়ে নিতে আসে। এখানে নবী-সন্তানদের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তাঁরা পথ দেখান, কিন্তু পথের মজুরি মানুষকে চাপিয়ে দেন না; তাঁরা ডাকেন, কিন্তু ডাকের বিনিময়ে দুনিয়া চান না।
এই আয়াতের তাৎপর্য শুধু এক ব্যক্তির বিনয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দাওয়াতের পবিত্রতার মানদণ্ড। সূরা আশ-শুআরার ধারাবাহিকতায় একের পর এক নবীর কথা এসেছে—নূহ, হুদ, সালেহ, লূত, শুআইব আলাইহিমুস সালাম—যেন আল্লাহ দেখিয়ে দিচ্ছেন, সকল যুগেই সত্যের আহ্বান একই রকম: মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকা, সংশোধনের পথে ফেরানো, আর নিজের কাজকে একমাত্র রবের সন্তুষ্টির সঙ্গে বাঁধা। মক্কার কাফিররা যখন নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সত্যবাণীকে কবিতা, জাদু, বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে চেয়েছিল, এই আয়াত সেই অপবাদকে ভেঙে দেয়। এই কণ্ঠ বলে, সত্যের আহ্বান কোনো পার্থিব ব্যবসা নয়; এটি এমন এক আমানত, যার পুরস্কার মানুষ দেয় না, মানুষ দিতে পারেও না—শুধু “রব্বুল আলামীন” দেন।
এখানে একটি অন্তর্গত শিক্ষা আছে, যা কেবল নবীদের জন্য নয়, সত্যের পথে চলতে চাওয়া প্রত্যেক মানুষের জন্য। যে হৃদয় আল্লাহর জন্য কাজ করে, সে মানুষের স্বীকৃতির অভাবে ভাঙে না, আর মানুষের প্রশংসায়ও বিভ্রান্ত হয় না। কারণ তার দৃষ্টি থাকে প্রতিদানদাতার দিকে—যিনি গোপন নিয়তও জানেন, ত্যাগও দেখেন, কষ্টও জানেন, এবং সেই সবকিছুর পূর্ণ মর্যাদা দেন। এই আয়াত তাই আমাদের দাওয়াত, ইলম, নসিহত, সেবা—সবকিছুর মধ্যে এক গভীর শুদ্ধতার ডাক দেয়: কাজ হবে নিঃস্বার্থ, কথা হবে সত্যনিষ্ঠ, হৃদয় থাকবে রবের দিকে ফিরে। মানুষের কাছে কিছু না চাওয়ার এই সাহসই আসলে ঈমানের সবচেয়ে সুন্দর মুক্তি।
এই আয়াতের ভেতর নবীদের দাওয়াতের এমন এক পবিত্রতা ঝলমল করে, যা মানুষের সমস্ত হিসাব-নিকাশকে ভেঙে দেয়। তাঁরা সত্যের কথা বলেন, কিন্তু সত্যকে পণ্য বানান না; তারা মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকেন, কিন্তু সেই ডাকার বিনিময়ে মানুষের ঝুড়ি থেকে কিছু নিতে চান না। এটাই নবুওতের মহত্ত্ব—দাওয়াত যখন খাঁটি হয়, তখন তার কেন্দ্রে থাকে রবের সন্তুষ্টি, মানুষের বাহবা নয়; মানুষের দিকে হাত বাড়ানো নয়, বরং মানুষের হৃদয়কে আসমানের দিকে ফিরিয়ে দেওয়া।
এই বাক্যটি হৃদয়ের গভীরে এক সূক্ষ্ম শিক্ষা রেখে যায়: সত্যের পথে চলা মানে দুনিয়ার বাজারে নাম লেখানো নয়। আল্লাহর পথে যে কাজ হয়, তার মূল্য মানুষ নির্ধারণ করে না; তার মূল্য নির্ধারণ করেন তিনি, যিনি সমস্ত জগতের রব। তাই যে ব্যক্তি ঈমানের আলো বহন করে, তার উচিত নিজের নিয়তকে বারবার ধুয়ে নেওয়া—যেন কাজের মধ্যে লুকিয়ে না থাকে স্বীকৃতির ক্ষুধা, সুনামের লোভ, কিংবা প্রতিদানের দাবি। কারণ শেষ পর্যন্ত সম্মানও তাঁরই, পুরস্কারও তাঁরই, আর সেই রবের কাছে ক্ষুদ্র একটি নিঃস্বার্থ কাজও অসীম রহমতের দোর খুলে দিতে পারে।
আমি এর জন্য তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না—এই একটি বাক্যই সত্যের মুখে থাকা সব সন্দেহকে নীরবে ভেঙে দেয়। নবীর দাওয়াত ছিল না কোনো ব্যক্তিগত লাভের দরজা, ছিল না মানুষের প্রশংসা কুড়োনোর কৌশল, ছিল না ক্ষমতা বা স্বার্থের হিসাব। তিনি আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিলেন, আর বাণীর ওজন মানুষের পকেটে নয়, মানুষের হৃদয়ে। তাই সত্য যখন নিঃস্বার্থ হয়, তখন তার শুদ্ধতা জেগে ওঠে; আর মানুষ বুঝে, এই আহ্বান দুনিয়ার জন্য নয়, রবের জন্য।
এই আয়াত আমাদের সমাজের আয়না হয়ে দাঁড়ায়। আজ যখন অনেক কথা স্বার্থে মিশে যায়, যখন নেকির মুখোশে দুনিয়ার চাহিদা ঢুকে পড়ে, তখন নবীদের এই ঘোষণা অন্তরকে কাঁপিয়ে দেয়: দাওয়াতের সম্মান মানুষের থেকে নয়, আল্লাহর কাছে। যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে ডাকে, সে মানুষের উপর বোঝা চাপায় না; সে হৃদয়কে জাগায়, আত্মাকে ফিরিয়ে আনে, আর নিজের হিসাবও আল্লাহর সামনে রেখে দেয়। এখানে ভয়ও আছে, আশা-ও আছে—ভয় এই যে, আমরা যেন দীনকে উপার্জনের উপায় বানিয়ে না ফেলি; আর আশা এই যে, খাঁটি নিয়তে করা একটি কথা, একটি আহ্বান, একটি অশ্রুও রাব্বুল আলামিনের কাছে হারিয়ে যায় না।
সবশেষে এই আয়াত আমাদেরকে নিজেদের দিকে ফিরিয়ে আনে: আমি যা করছি, তা কার জন্য করছি? মানুষের দৃষ্টি, সুনাম, সুবিধা, না কি সেই রবের সন্তুষ্টি—যিনি গোপনকে জানেন, দুর্বলতাকে দেখেন, আর ইখলাসের সামান্য কণাকেও মূল্য দেন? দাওয়াত, ইবাদত, সেবা, ত্যাগ—সবকিছুই তখনই বেঁচে থাকে, যখন তার প্রতিদান মানুষের হাতে নয়, আল্লাহর হাতে রাখা হয়। বিশ্ব-পালনকর্তাই যথেষ্ট; তিনিই দেন এমন পুরস্কার, যা ক্ষয়ে যায় না, হারিয়ে যায় না, আর কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য লজ্জার নয়, বরং নাজাতের আলো হয়ে দাঁড়ায়।
এই আয়াত আমাদের দাওয়াতের মুখে এক অদ্ভুত লজ্জা এনে দেয়। কত কথা আমরা বলি, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে স্বীকৃতির ক্ষুধা; কত সেবার ভান করি, কিন্তু অন্তরের ভাঁজে থাকে নাম, প্রশংসা, সুবিধা, প্রভাবের আকাঙ্ক্ষা। অথচ নবীদের কণ্ঠে সত্যের আহ্বান ছিল এমন নির্মল, এমন নির্ভার, যেখানে হাত পেতে নেওয়ার কিছু নেই, কেবল হৃদয় জাগানোর তাগিদ আছে। তাঁরা মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকতেন, যেন দুনিয়ার হাটে নয়, আখিরাতের দরজায় তাদের দাঁড় করাতে পারেন। আর এই নিঃস্বার্থতা-ই সত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি; কারণ যে কথা আল্লাহর জন্য, সে কথা মানুষের মালিকানায় বন্দি থাকে না।
যখন একজন নবী বলেন, আমি তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না, তখন তা শুধু এক ব্যক্তিগত ঘোষণা নয়; তা হলো সত্যের স্বভাব, দাওয়াতের আদব, আর ঈমানের পবিত্রতা। যে কাজের মজুরি মানুষের কাছে, সে কাজ মানুষকে খুশি করতে চায়; আর যে কাজের প্রতিদান আল্লাহর কাছে, সে কাজ অন্তরকে বদলাতে চায়। তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের নিজের অন্তরকে প্রশ্ন করতে হয়—আমরা কি সত্য বলছি আল্লাহর জন্য, নাকি মানুষকে ধরে রাখার জন্য? আমরা কি পথ দেখাচ্ছি, নাকি নিজের জন্য পথ বানাচ্ছি? হে রব, আমাদের অন্তরকে লোকদেখানো থেকে বাঁচান, আমাদের আমলকে শুদ্ধ করুন, আমাদের কথা ও নীরবতা—দুটোকেই আপনার সন্তুষ্টির পথে ফিরিয়ে দিন। কারণ শেষ পর্যন্ত পুরস্কারও আপনার, আশ্রয়ও আপনার, এবং বিশ্ব-পালনকর্তা ছাড়া আর কারও কাছে কিছু চাওয়ার মতো কিছু নেই।