কখনো একটি বাক্যই মানুষের জীবনকে থামিয়ে দাঁড় করায়। এই আয়াতে লূত (আ.) তাঁর কওমকে খুব কাছের, খুব আপন ভাষায় সম্বোধন করছেন: “তোমাদের ভাই লূত”। আল্লাহ তাআলা এই শব্দচয়নেই এক অদ্ভুত কাঁপন এনে দিয়েছেন। তিনি দূরের কোনো অচেনা তিরস্কারকারী নন; তিনি তাদেরই একজন, তাদের সমাজের মানুষ, তাদের পরিচিত মুখ, তাদের হৃদয়ের ভাষা জানেন এমন নবী। আর সেই আপনতার ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসে সবচেয়ে নির্মম, সবচেয়ে মমতাময় প্রশ্ন: তোমরা কি ভয় কর না? অর্থাৎ, অন্তর কি এখনো এতটুকু জাগে না যে, আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর দিনটিকে স্মরণ করে কেঁপে ওঠে?
এই প্রশ্নে শুধু একটি বাহ্যিক অপরাধের নিন্দা নেই; এর ভেতরে আছে মানুষের বিবেককে নাড়া দেওয়ার কৌশল, আত্মাকে জাগানোর নবুওয়তি পদ্ধতি। লূত (আ.) তাদেরকে ভয় দেখাতে চাননি মানুষের ভয়ে, তিনি তাদের সামনে খুলে ধরতে চেয়েছেন আল্লাহভীতির দরজা। কারণ ভয় যদি থাকে, তবে তা হবে পাপের অন্ধকারে হাঁটার আগে; লাঞ্ছনার আগে; সত্যকে জেনেও অস্বীকার করার আগে। সূরা আশ-শুআরার এই ধারায় আমরা নবীদের আহ্বানের একটি সাধারণ রূপ দেখি—তাঁরা শুধু বিধান বলেন না, হৃদয়কে ডাকেন, অন্তরকে ধাক্কা দেন, বিস্মৃত আত্মাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, মানুষকে একদিন জবাব দিতে হবে।
এই আয়াতের ঐতিহাসিক ও সামাজিক পটভূমি বুঝতে হলে কুরআনের সামগ্রিক ভাষা স্মরণ করতে হয়। লূত (আ.)-এর জাতির নৈতিক বিপর্যয় ছিল তাদের সমাজজীবনের গভীরে প্রোথিত; এ কারণেই কুরআন বারবার তাদের সামনে নবি-সুলভ সতর্কবাণীকে তুলে ধরে। এখানে কোনো কল্পিত গল্প নয়, বরং মানবসমাজের সেই চিরন্তন বাস্তবতা ধরা পড়েছে—যখন পাপ স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন নবীর প্রথম কাজ হয় বিবেককে পুনর্জাগ্রত করা। আর “ভাই” শব্দটি মনে করিয়ে দেয়, দাওয়াতের শুরু হয় সম্পর্কের মমতা দিয়ে; কিন্তু মমতার শেষ সীমানায় এসে দাঁড়ায় সত্যের কঠিন প্রশ্ন। আল্লাহর ভয় জাগ্রত হলে মানুষ কেবল একটি কাজ থেকে নয়, বরং নিজের ভেতরের ধ্বংসের পথ থেকেও ফিরে আসতে পারে।
লূত (আ.)-এর এই প্রশ্নের মধ্যে শুধু তিরস্কার নেই, আছে এক ধরনের করুণ জাগরণ। নবীরা মানুষকে ভেঙে ফেলতে আসেন না; তারা ভাঙা হৃদয়ের ভেতরে আলোর ফাটল তুলে দেন। “তোমরা কি ভয় কর না?”—এ প্রশ্নে মনে হয়, যেন বিবেকের দরজায় আলতো করাঘাত পড়ছে। মানুষ যখন পাপকে অভ্যাস বানিয়ে ফেলে, তখন সে আর পাপকে পাপ বলে টের পায় না; তখনই নবীর কণ্ঠ এসে আত্মাকে জাগিয়ে তোলে। ভয় এখানে আতঙ্ক নয়, বরং সজাগ হওয়া—আল্লাহর নৈকট্যকে ভুলে গিয়ে যে জীবন নির্বিকার হয়ে পড়ে, তাকে আবার কাঁপিয়ে তোলা।
আরও গভীরভাবে দেখলে, এ আয়াতে নবীর দাওয়াতের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে: তিনি অপরাধীকে শত্রু মনে করে ধ্বংস করতে চান না, বরং ভাইয়ের মতো ডেকে বলেন—সচেতন হও, অন্তরকে বাঁচাও। নবুওয়ত মানুষের ভেতরের হারানো সম্ভ্রমকে ফিরিয়ে আনার ডাক। যে সমাজ আল্লাহকে ভয় করা ভুলে যায়, সে সমাজ ধীরে ধীরে নিজেরই বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়; আর যে হৃদয় আল্লাহকে ভয় করে, সে হৃদয় অন্ধকারের মাঝেও দিক খুঁজে পায়। তাই লূত (আ.)-এর এই প্রশ্ন আজও জীবন্ত: আমাদের কাজ, আমাদের অভ্যাস, আমাদের গোপন সিদ্ধান্ত—এসবের সামনে কি কখনো আমরা থমকে জিজ্ঞেস করি, আমি কি আল্লাহকে ভয় করছি? এই একটিমাত্র প্রশ্নই অনেক সময় তওবার দরজা খুলে দেয়।
লূত (আ.)-এর এই সম্বোধনে নবুওয়তের এক অসামান্য কোমলতা আছে। তিনি শত্রুদের সামনে দাঁড়িয়ে কেবল তিরস্কার করেননি; তিনি তাদেরকে তাদেরই ভাই বলে ডেকেছেন। অর্থাৎ সম্পর্ক ছিঁড়ে ফেলার আগে তিনি হৃদয়ের শেষ দরজাটিও খুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আপনতার ভেতরেই উচ্চারিত হলো সবচেয়ে তীক্ষ্ণ প্রশ্ন: তোমরা কি ভয় কর না? এই ভয় কোনো কাপুরুষতা নয়; এই ভয় হলো সেই জেগে ওঠা অনুভব, যা মানুষকে নিজের প্রবৃত্তির অন্ধ দাবির চেয়ে আল্লাহর হুকুমকে বড় মনে করতে শেখায়। যখন সমাজে নৈতিকতার শিরদাঁড়া ভেঙে পড়ে, তখন নবীর কণ্ঠ মানুষের ঘুম ভাঙায়—শরীরকে নয়, বিবেককে।
এই আয়াত আমাদেরও দরজায় কড়া নাড়ে। কতবার আমরা এমনভাবে বেঁচে থাকি, যেন কেউ দেখছে না; যেন পাপের অভ্যাসই স্বাভাবিক হয়ে গেছে; যেন সময়ের ধুলোয় আত্মার আয়না ঝাপসা হয়ে যাওয়াই জীবনের নিয়ম। অথচ লূত (আ.)-এর প্রশ্ন আজও জীবন্ত: তোমরা কি ভয় কর না? অর্থাৎ, আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর দিনের কথা কি একবারও মনে পড়ে না? এই প্রশ্নের মধ্যে শাস্তির ভয় আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে ফিরে আসার ডাক। কারণ নবীরা মানুষকে ধ্বংসের কিনারায় ফেলে রেখে চলে যান না; তাঁরা অন্তরের মৃত কোণে আলো ফেলেন, যাতে লজ্জা জাগে, অনুতাপ জন্ম নেয়, আর বান্দা নিজের ভেতরেই আল্লাহর দিকে ফেরার পথ খুঁজে পায়।
লূত (আ.)-এর এই প্রশ্নের সামনে এসে মানুষ আর বাহানা খুঁজে পায় না; কারণ নবী এখানে শুধু ন্যায়ের কথাই বলেননি, তিনি বিবেকের দরজায় কড়া নাড়েছেন। আপনি যখন কোনো পাপকে “স্বাভাবিক” বলে মেনে নিতে শুরু করেন, তখন আসলে ভয়টা আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর থাকে না, ভয়টা থাকে শুধু সমাজের কথা, অভ্যাসের টান, আর নিজের নফসের দাবির। অথচ সত্যিকারের তাকওয়া হলো সেই অদৃশ্য ভীতির নাম, যা মানুষকে গোপন অন্ধকারেও সোজা রাখে, একা থাকলেও লজ্জাকে জাগিয়ে রাখে, আর ভুলকে ভুল বলার শক্তি দেয়। লূত (আ.)-এর এ আহ্বান আমাদেরও জিজ্ঞেস করে: তোমাদের অন্তর কি এখনো নরম আছে? তোমরা কি সেই দিনের কথা ভেবেছ, যেদিন কোনো পর্দা থাকবে না, কোনো অজুহাত থাকবে না, আর আল্লাহর সামনে সবকিছু প্রকাশিত হবে?
কখনো কখনো আল্লাহর একটি আয়াত আমাদের ভেতরের বহু বছরের জমাট অন্ধকারে আলো ফেলে দেয়। এই প্রশ্ন তাই কেবল এক জাতির ইতিহাস নয়; এটি আজও জীবিত। যে হৃদয় নিজেকে ভয় থেকে মুক্ত মনে করে, সে আসলে নিজের ধ্বংসের পথেই হাঁটে। আর যে হৃদয় “আল্লাহকে ভয় করি” বলে কাঁদে, সে-ই বাঁচে। তাই এই আয়াতকে শুধু পাঠ করার জন্য নয়, নিজের দিকে ফেরার জন্য পড়তে হয়। আমাদের মধ্যে যেটুকু দেরি, যেটুকু জেদ, যেটুকু লজ্জাহীনতা, যেটুকু পাপকে হালকা মনে করা—সবকিছুর ওপর যেন এই এক বাক্য নেমে আসে: তোমরা কি ভয় কর না? হয়তো এই প্রশ্নই আজ আমাদের জন্যও একটি শেষ সুযোগ, যাতে অন্তর নরম হয়, চোখ ভিজে ওঠে, আর মানুষ নিজের রবের দিকে ফিরে যায়।