ফেরআউনের কাছে গিয়ে বলো—আমরা বিশ্বজগতের পালনকর্তার প্রেরিতদূত। এই একটি বাক্যে সত্যের সমস্ত আভিজাত্য, সমস্ত নির্ভরতা, আর সমস্ত নরম অথচ অটল শক্তি জমা হয়ে আছে। মূসা ও হারুন আলাইহিমাস সালামের মুখে যে বার্তা উঠছে, তা কোনো ব্যক্তিগত মত নয়, কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, কোনো মানবিক কৌশলও নয়; তা এসেছে সেই রবের কাছ থেকে, যিনি আসমান-জমিন, মানুষ-জিন, ক্ষমতা-দুর্বলতা—সব কিছুর মালিক। ফেরআউনের মতো অহংকারী শাসকের প্রাসাদে দাঁড়িয়ে “আমরা বিশ্বজগতের রবের রসূল” বলা মানে হলো, মানুষের তৈরি শক্তির সামনে আল্লাহর পরিচয়কে উঁচু করে ধরা; আর এই উঁচু পরিচয়ই নবীদের দাওয়াতের প্রাণ।

সূরা আশ-শুআরা-র এই ধারাবাহিক অংশে আল্লাহ তাআলা নবীদের কাহিনি তুলে ধরে সত্য ও মিথ্যার সংঘাতকে হৃদয়ের সামনে এনে দেন। এখানে কোনো নির্দিষ্ট, বিচ্ছিন্ন কারণ-নুযূল নির্ভর বর্ণনা প্রতিষ্ঠিত নয়; বরং পুরো সূরার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটই স্পষ্ট—মক্কার মুশরিকদের সামনে নবুওয়াতের সত্যতা, কুরআনের সপ্রতিভ ভাষা, আর আল্লাহর কুদরতের সামনে মানব-অহংকারের ক্ষুদ্রতা। ফেরআউন শুধু একজন শাসক নন; তিনি প্রতিটি যুগের সেই জুলুমের প্রতীক, যে জুলুম সত্যের ডাক শুনেও নরম হয় না, বরং আরও কঠিন হয়। তাই এই আয়াত আমাদের শেখায়, দাওয়াতের বাহককে আগে নিজের মর্যাদা নয়, নিজের প্রেরণের উৎসকে পরিচয় দিতে হয়; কারণ রসূলের সম্মান তার ব্যক্তিত্বে নয়, তার রবের পক্ষ থেকে বহন করা আমানতে।

এই আয়াতের কাঁপানো শিক্ষা হলো—যেখানে মানুষ ভয় পায়, সেখানেই আল্লাহর বান্দা তার পরিচয় আরো পরিষ্কার করে উচ্চারণ করে। শক্তির সামনে সত্যকে ম্লান না করে, দাওয়াতকে নিচু না করে, নবীরা বলেন: আমরা তোমাদের মতো আরেকজন মানুষ হতে পারি, কিন্তু আমাদের পাঠানো হয়েছে সেই সত্তার কাছ থেকে, যিনি সকল জগতের পালনকর্তা। এ কথা শুধু মূসা আলাইহিস সালামের ইতিহাস নয়; এটা প্রত্যেক মুমিনের অন্তরে জাগ্রত এক ডাক। যখন মিথ্যা বড় হয়ে দাঁড়ায়, যখন ফেরআউনের দরবার নতুন পোশাক পরে ফিরে আসে, তখনও আল্লাহর বার্তা থামে না। বরং সেই বার্তাই জানিয়ে দেয়—সত্যের কণ্ঠ কখনো সংখ্যায় মাপা হয় না, তার ওজন মাপে রব্বুল আলামিনের সমর্থন।

ফেরআউনের কাছে যাও—কত সংক্ষিপ্ত, কত কঠিন, আর কত অনন্ত ভারে ভরা এই নির্দেশ। মানুষের চোখে সে ছিল শক্তির নাম, প্রাসাদের নাম, ভয়ের নাম; অথচ আল্লাহর হুকুমে সে-ও কেবল এক দাস, এক সীমাবদ্ধ সৃষ্টি। নবীদের কণ্ঠ এখানে ক্ষমতার ভাষায় কথা বলে না, তারা দরবারে ঢুকে দরবারের মোহে বদলে যায় না। তারা নিয়ে আসে সেই পরিচয়, যা রাজসিংহাসনের চেয়েও উচ্চ: আমরা বিশ্বজগতের পালনকর্তার রসূল। এ-একটি বাক্যে পৃথিবীর সব অহংকার কেঁপে ওঠে, কারণ এতে মানুষের কাছে মানুষকে নয়, মানুষের ওপরে আল্লাহকে হাজির করা হয়। সত্যের প্রথম শর্তই হলো এই—আমি কারও প্রতিনিধি নই, কারও স্বার্থের বাহক নই; আমি সেই রবের বার্তাবাহক, যাঁর সামনে ফেরআউনও ধূলি, আর মুমিনের অন্তরও সমানভাবে অনুগত।

এই আয়াতে দাওয়াতের এমন এক সৌন্দর্য আছে, যেখানে ভয়কে অস্বীকার করা হয় না, কিন্তু ভয়কে সিদ্ধান্তের অধিকারও দেওয়া হয় না। মূসা ও হারুন আলাইহিমাস সালামের জন্য পথ সহজ ছিল না; তবু আল্লাহ তাঁদের মুখে এমন পরিচয় দিলেন, যা অন্তরের ভিতর সাহসের প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয়। রসূলের কাজ নিজের ব্যক্তিত্বকে বড় করা নয়, বার্তার ওজনকে বহন করা। তাই সত্যিকারের দাওয়াত কখনো হিংসার ভাষা হয় না, আবার মিথ্যার সামনে নতজানুও হয় না। সে কোমল, কিন্তু দুর্বল নয়; মৃদু, কিন্তু নীরব নয়; বিনয়ী, কিন্তু অমীমাংসিত নয়। মানুষের তৈরি সব কর্তৃত্বের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যখন বান্দা বলে, আমি রব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে এসেছি, তখন তার কণ্ঠে আর কেবল শব্দ থাকে না—থাকে আসমানের সাক্ষ্য, থাকে হেদায়েতের ডাক, থাকে অন্ধকারকে বিদীর্ণ করার ক্ষমতা।
এ কারণেই সূরা আশ-শুআরা আমাদের শুধু ইতিহাস শোনায় না; হৃদয়ের ভেতরে এক নিরব বিপ্লব ঘটায়। ফেরআউন আজও রয়ে গেছে প্রতিটি আত্মগরিমায়, প্রতিটি জুলুমে, প্রতিটি এমন ব্যবস্থায় যেখানে মানুষ নিজেকে চূড়ান্ত মনে করে। আর এই আয়াত আজও আমাদের শেখায়, সত্যের বাহক হতে হলে প্রথমে নিজের ভেতরের ফেরআউনকে ভাঙতে হয়—অহংকার, ভয়, আত্মমুগ্ধতা, ক্ষমতার লোভকে। যখন বান্দা নিজের পরিচয়কে রবের পরিচয়ের নিচে নামিয়ে আনে, তখনই সে সত্যের যোগ্য হয়ে ওঠে। তখন তার মুখে উচ্চারিত হয় এমন এক বাক্য, যা দুনিয়ার কোলাহল ছাপিয়ে আসমানের দরজায় পৌঁছে যায়: আমরা বিশ্বজগতের পালনকর্তার রসূল।

ফেরআউনের কাছে যাও—এই আদেশের ভেতরেই আছে ভয়কে ভেঙে দেওয়ার এক আসমানী শিক্ষা। ফেরআউন ছিল দম্ভের নাম, ক্ষমতার মুখোশ, মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করার প্রতীক। কিন্তু আল্লাহর নবীরা যখন তার দরবারের দিকে অগ্রসর হন, তারা নিজের শক্তি নিয়ে যান না; যান রব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে বহন করা বার্তা নিয়ে। এটাই দাওয়াতের অন্তরসার—সত্যের বাহক নিজের পরিচয়ে বড় নয়, সে বড় সেই রবের নিদর্শনে, যিনি তাকে পাঠিয়েছেন। তাই মূসা ও হারুন আলাইহিমাস সালামের মুখে “আমরা বিশ্বজগতের পালনকর্তার রসূল” ঘোষণা কেবল একটি পরিচয় নয়; এটি জালিমের প্রাসাদে সত্যের শির উঁচু করে দাঁড়ানো, এবং মানবক্ষমতার ভিড়ে আল্লাহর অধিকারকে আবার সামনে এনে দেওয়া।

এই আয়াত আমাদের সমাজের দিকে তাকাতে শেখায়। যেখানে অহংকার বড় হয়, সেখানে মানুষ সত্য শুনতে ভয় পায়; যেখানে ক্ষমতা দেবতা হয়ে ওঠে, সেখানে মিথ্যা নিজেকে আইন বলে দাবি করে। ফেরআউনের দরবার শুধু এক ব্যক্তির কাহিনি নয়, তা প্রতিটি যুগের সেই সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে দুর্বলকে চেপে ধরা হয়, সত্যবাদীকে উপহাস করা হয়, আর আল্লাহর বান্দাদের কণ্ঠকে সন্দেহের ছায়ায় ঢেকে দিতে চাওয়া হয়। অথচ নবীদের ভাষা কখনো চিৎকারে নয়, দায়িত্বে উচ্চ হয়; তাদের দাওয়াত কঠিন হৃদয়ের সামনে নম্র, কিন্তু নত নয়; কোমল, কিন্তু আত্মসমর্পণহীন। এই আয়াত যেন আমাদের বলে, সত্যের পথে দাঁড়াতে হলে আগে অন্তরের ফেরআউনকে চিনতে হবে—অহংকার, নিয়ন্ত্রণপ্রিয়তা, আত্ম-দম্ভ, আর হক্বের সামনে অবনত না হওয়ার অভ্যাসকে ভেঙে ফেলতে হবে।

আর এ কথা স্মরণে রাখলে হৃদয় কেঁপে ওঠে—যে রবের রসূল হয়ে মূসা ও হারুন ফেরআউনের দরবারে গেলেন, সেই রবের কাছেই একদিন আমাদেরও ফিরতে হবে। তখন কোনো প্রাসাদ থাকবে না, কোনো বাহিনী থাকবে না, কোনো জ্বলন্ত ক্ষমতার নেশাও থাকবে না; থাকবে শুধু আমল, নিয়ত, আর আল্লাহর সামনে খালি হয়ে যাওয়া হৃদয়। এই আয়াত তাই শুধু নবীদের ইতিহাস নয়, এটি আত্মসমালোচনার আয়না: আমি কি সত্যের পক্ষে দাঁড়াই, নাকি শক্তির দিকে ঝুঁকি? আমি কি আল্লাহর পক্ষের বান্দা হয়ে কথা বলি, নাকি মানুষের ভয় আমাকে নত করে? যে বান্দা বুঝে নেয় তার আসল পরিচয় আল্লাহর রসূলের বার্তাকে গ্রহণ করা, সে আর জগতের কোনো ফেরআউনের সামনে অন্তর দিয়ে মাথা নোয়ায় না; কারণ তার ভরসা মানবের হাতে নয়, বিশ্বজগতের রবের হাতে।

ফেরআউনের দরবারে এই বাক্য উচ্চারিত হওয়া মানে শুধু এক শাসকের কাছে দুজন নবীর যাওয়া নয়; এটি হলো পৃথিবীর সব গৌরবকে আল্লাহর সামনে মাপার এক চিরন্তন মানদণ্ড। মানুষ যখন নিজেকে বড় ভাবতে শেখে, তখন সে সত্যের ভাষাকে সহ্য করতে পারে না। কিন্তু আল্লাহর রসূলের কণ্ঠ কোনো সিংহাসনের অনুমতি নিয়ে ওঠে না। সে কণ্ঠ আসে সেই রবের কাছ থেকে, যাঁর সামনে ফেরআউনের প্রাসাদও ধূলিকণার মতো, আর দম্ভের তখ্‌তও একদিন নিঃশব্দ হয়ে যাবে। নবীদের আদেশ ছিল নির্ভীক হওয়া, কিন্তু অহংকার করা নয়; দৃঢ় হওয়া, কিন্তু নিজের শক্তিতে নয়; নরম ভাষায় সত্য বলা, কিন্তু সত্যকে খাটো না করা।

এই আয়াত আমাদের ভেতরের ফেরআউনকে নাড়া দেয়। কতবার আমরাও শক্তির ভাষার সামনে নুয়ে পড়ি, মানুষের রায়কে আল্লাহর রায়ের চেয়ে বড় মনে করি, নিজের নিরাপত্তার জন্য সত্যকে আড়াল করি। অথচ মূসা ও হারুন আলাইহিমাস সালামকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল বিশ্বজগতের রবের পক্ষ থেকে কথা বলা। যে হৃদয়ে এই বিশ্বাস জেগে ওঠে, সে আর কারও ভয়ে সত্য থেকে সরে যায় না। সে জানে, রিজিকের মালিক আল্লাহ, সম্মানের মালিক আল্লাহ, বিজয়ের মালিক আল্লাহ। তাই দাওয়াতের পথ যত কঠিনই হোক, সেখানে হেরে যাওয়ার নাম নেই; আছে শুধু আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, চোখে অশ্রু, অন্তরে ইখলাস, আর মুখে সেই পরিচয়—আমরা বিশ্বজগতের পালনকর্তার রসূলের আহ্বান বহন করছি।