পাহাড় কেটে ঘর তোলা যায়—কিন্তু সেই ঘর কি হৃদয়ের ভাঙন সারাতে পারে? এই আয়াতে হূদ (আ.)-এর জাতির এক চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে মানুষ শুধু আশ্রয় বানায় না, বরং আশ্রয়ের মধ্যেও জাঁকজমক, শক্তির প্রদর্শন আর নিজের কৃতিত্বের নেশা ঢেলে দেয়। “ফারিহীন” শব্দের ভেতরে যে আত্মমুগ্ধতা, যে উল্লাসভরা অহংকার, তা যেন বলে: আমরা পারি, আমরা গড়ি, আমরা জিতি। কিন্তু কুরআন সেই দৃশ্যকে প্রশংসা করে না; বরং এমন নির্মাণের আড়ালে লুকানো আত্মপ্রদর্শনকে উন্মোচন করে দেয়। মানুষের হাত পাহাড় কাটে, কিন্তু আল্লাহর সামনে তার অহংকার কতটুকুই বা দাঁড়ায়?

সূরা আশ-শুআরা নবীদের কাহিনি এনে আমাদের সামনে একটি গভীর সত্য বারবার স্থাপন করে: জাতিগুলো ধ্বংস হয় শুধু অবাধ্যতায় নয়, সত্যকে উপহাস করার মানসিকতায়ও। এখানে বিশেষ কোনো নির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য শানে নুযূলের উল্লেখ পাওয়া যায় না; তবে বৃহত্তর প্রেক্ষাপট স্পষ্ট—এটি সেই সমাজের কথা, যারা শক্তি, সভ্যতা, স্থাপত্য, সমৃদ্ধি দিয়ে নিজেদের অমর ভাবতে চেয়েছিল। মানুষ যখন বাহ্যিক উন্নতিকে অন্তরের বিশুদ্ধতার বিকল্প বানায়, তখন তার উত্থানই তার পতনের ভূমি হয়ে যায়। কুরআন এই আয়াতে আমাদের শেখায়, সভ্যতা যত উঁচু হোক, যদি তা আল্লাহকে ভুলে অহংকারের ওপর দাঁড়ায়, তবে তা আসলে কাঁচের মিনারের মতোই নাজুক।

এই আয়াতের কাঁপন এখানেই—পাহাড় কেটে গৃহ নির্মাণের ক্ষমতা মানুষের আছে, কিন্তু সে ক্ষমতার মালিকানা মানুষের নয়। প্রকৃত মালিক আল্লাহ; আর মানুষ কেবল আমানতদার। তাই জাঁকজমক যখন অন্তরকে গ্রাস করে, তখন ঘর থাকে, কিন্তু সাকিনাহ থাকে না; প্রাচীর থাকে, কিন্তু নিরাপত্তা থাকে না; প্রভাব থাকে, কিন্তু স্থায়িত্ব থাকে না। কুরআন আমাদের চোখ ফেরাতে বলে বাহ্যিক মহিমা থেকে অন্তরের সত্যের দিকে—কারণ আল্লাহর সামনে মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার দম্ভ নয়, তার বিনয়।

পাহাড় মানুষ কেটে ফেলে, আর সেই কাটা পাথরের ভেতরেই সে নিজের গৌরবের প্রাসাদ খুঁজে নেয়। কিন্তু কুরআন এই নির্মাণকে দেখায় এক অস্থির উল্লাসের ভাষায়—ফারিহীন, মানে আত্মতৃপ্ত, আত্মমুগ্ধ, সীমাহীন অহংকারে ভরা এক মন। বাহ্যিক জৌলুশ যখন অন্তরের শূন্যতাকে ঢাকতে চায়, তখন ঘর আর ঘর থাকে না; তা হয়ে ওঠে মানুষের নিজেকে বড় প্রমাণ করার মঞ্চ। স্থাপত্য তখন শুধু আশ্রয় নয়, বরং এক নীরব ঘোষণা—আমি আছি, আমি পারি, আমি টিকে যাব। অথচ আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে মানুষ যা-ই গড়ুক, তার প্রতিটি ইটের উপরই লেখা থাকে: তুমি মরবে, আর তোমার নির্মাণও একদিন মাটির কাছে নত হবে।

এই আয়াত আমাদের হৃদয়ে এক নির্মম প্রশ্ন ফেলে দেয়—যে জাতি পাহাড় কেটে প্রাসাদ তোলে, সে কি নিজের অন্তরের কঠিন পাথরও কখনো কাটে? দৃষ্টির সামনে ঐশ্বর্য থাকলেই কি আত্মা নিরাপদ হয়? মানুষের সভ্যতা যত উঁচু হয়, তার যদি বিনয় না থাকে, তবে সেই উঁচুতাই পতনের উচ্চতা হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহর আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা বুঝি, শক্তি দিয়ে গড়া প্রতিটি অহংকার একদিন আল্লাহর ইচ্ছার সামনে কাঁপতে থাকে। বাহ্যিক নির্মাণ মানুষকে বিস্মিত করতে পারে, কিন্তু তা কখনোই আল্লাহর কাছে মর্যাদার প্রমাণ নয়; মর্যাদা আসে ঈমানের নম্রতায়, কৃতজ্ঞতার নরমতায়, সত্যকে মানার সাহসে।
ফারিহীন শব্দটির মধ্যে তাই শুধু আনন্দ নেই; আছে এক বিপজ্জনক উন্মাদনা, যা মানুষকে মনে করিয়ে দেয় সে নিজেই তার প্রতিষ্ঠাতা, নিজেই তার রক্ষক। কিন্তু কুরআন এই মোহ ভেঙে দেয়—কারণ প্রকৃত শক্তি পাহাড় কাটা হাতে নয়, বরং সেই হৃদয়ে, যা আল্লাহর সামনে নত হতে জানে। যে মানুষ নিজের ক্ষমতায় মুগ্ধ হয়, সে আসলে আল্লাহর নিদর্শনের উপর দিয়ে হেঁটে যায়, কিন্তু তা দেখে না। আর যে মানুষ আল্লাহর সামনে নিজের ক্ষুদ্রতা অনুভব করে, তার জন্য একটি বিনয়ী ঘরও মহিমান্বিত হয়, কারণ সেখানে অহংকারের ধুলো নেই। এই আয়াত আমাদের শেখায়, জাঁকজমক চিরস্থায়ী নয়; চিরস্থায়ী কেবল সেই রবের ক্ষমতা, যিনি পাহাড়ও বানান, আবার পাহাড়কেও ধ্বসিয়ে দিতে পারেন।

পাহাড় কেটে ঘর তোলা যায়—কিন্তু সেই দৃশ্যের মধ্যে কুরআন যে জিনিসটি আমাদের সামনে এনে দাঁড় করায়, তা কেবল স্থাপত্য নয়; তা হলো মানুষের আত্মপ্রসাদের নগ্ন মুখ। ‘ফারিহীন’—এই একটি শব্দে ধরা পড়ে এমন এক উল্লাস, যেখানে শক্তি আছে, কৌশল আছে, ঐশ্বর্য আছে, কিন্তু নেই বিনয়ের শীতল ছায়া, নেই আল্লাহর সামনে মাথা নত করার অনুভব। মানুষ যখন পাহাড়কে বস্তু বানিয়ে ফেলে, তখন সে হয়তো ভাবে সে প্রকৃতির ওপর বিজয়ী; কিন্তু আসলে সে নিজের অন্তরের উপরই হেরে যায়। বাহ্যিক জাঁকজমক যত উঁচু হোক, হৃদয়ের শূন্যতা ততই গভীর হতে থাকে।

এই আয়াত আমাদের সমাজকেও কাঁপিয়ে দেয়। কারণ সভ্যতার নামে, সাফল্যের নামে, সৌন্দর্যের নামে আমরা কত কিছু গড়ে তুলি, অথচ নিজের ভেতরের সত্য, ন্যায়, সংযম আর বন্দেগিকে ধীরে ধীরে ভেঙে ফেলি। কেউ ঘর বানায় নিরাপত্তার জন্য, কেউ বানায় প্রদর্শনের জন্য; কেউ প্রয়োজন মেটায়, কেউ অহংকার পোষে। কুরআন এখানে নির্মাণকে নিষিদ্ধ করছে না, বরং নির্মাণের ভিতরে লুকিয়ে থাকা আত্মমুগ্ধতাকে উন্মোচন করছে। মানুষ পাহাড় কেটে প্রাসাদ বানাতে পারে, কিন্তু মৃত্যু এসে দাঁড়ালে সেই প্রাসাদের দেয়ালও তাকে আল্লাহর হিসাব থেকে আড়াল করতে পারে না।

এই আয়াত তাই আমাদের অন্তরে একটি কঠিন প্রশ্ন ফেলে: আমি যা গড়ছি, তা কি আমাকে আল্লাহর কাছে আরও নিকট করছে, নাকি আমাকে নিজের চোখে আরও বড় করে তুলছে? যে হৃদয় আল্লাহকে ভুলে জৌলুশে ডুবে যায়, সে যত উন্নতই হোক, আসলে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়। আর যে হৃদয় সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টাকে স্মরণ করে, তার ছোট্ট ঘরও নুরে ভরে ওঠে। পাহাড় কেটে বাসস্থান বানানো যায়, কিন্তু আত্মার আসল বাসস্থান তো বানাতে হয় ইমান দিয়ে, তওবা দিয়ে, বিনয় দিয়ে। এই আয়াত নীরবে বলছে—যা চোখে ঝলমল করে, তা সবই স্থায়ী নয়; আর যা আল্লাহর কাছে মূল্যবান, তা অনেক সময় চোখে খুব সাধারণ দেখায়।

মানুষ পাহাড় কেটে গৃহ তোলে, ইটের পর ইট সাজিয়ে নিজের নামকে বড় মনে করে, আর ভেবে বসে—এই দৃশ্যই বুঝি স্থায়িত্ব। কিন্তু সময়ের নিঃশব্দ হাত একদিন সেই গর্বের গায়ে ধুলো মেখে দেয়। চোখে দেখা জৌলুশ আর অন্তরের খালি কক্ষের মধ্যে যে দূরত্ব, তা এই আয়াত যেন এক দীর্ঘ নীরবতায় শোনায়। বাহ্যিক শক্তি যতই উঁচু হোক, আল্লাহর সামনে তা এক বিন্দু দুর্বলতা ছাড়া কিছু নয়। মানুষের কীর্তি পাহাড়কে কেটে ফেলে, কিন্তু নিজের অহংকারকে কাটতে পারে না; সেখানেই তার পতন শুরু হয়।

এ আয়াত আমাদেরকে শুধু এক জাতির নির্মাণকৌশল দেখায় না, দেখায় হৃদয়ের ভেতরের নির্মম বাস্তবতা—যে হৃদয় আল্লাহকে ভুলে নিজের সাফল্যে মত্ত হয়, সে যতই ঘর তোলে, তার ভেতরেই ধ্বংসের বীজ বয়ে বেড়ায়। আমরা কি আমাদের জীবনেও এমন জাঁকজমক গড়ছি না, যা দৃষ্টি টানে কিন্তু আত্মাকে বাঁচায় না? আল্লাহর কাছে বড় হওয়া যায় ধন-সম্পদে নয়, ক্ষমতার প্রদর্শনীতে নয়; বড় হওয়া যায় বিনয়ে, সত্যে, তওবায়। যে হৃদয় নিজের ক্ষুদ্রতা বুঝে সিজদায় নত হয়, সেই হৃদয়ই আল্লাহর রহমতের ছায়ায় নিরাপদ। আর যে হৃদয় পাহাড় কেটে গৃহ তোলে, কিন্তু রবের সামনে নত হতে শেখে না, তার সমস্ত নির্মাণই একদিন কাঁপতে কাঁপতে পড়ে যাবে।