এই আয়াতে সালেহ (আ.)-এর কণ্ঠ যেন পাথরের বুক চিরে ওঠা এক জীবন্ত ডাক। তিনি তাদেরকে কেবল শাসন করেন না, দূর থেকে দোষারোপও করেন না; বরং বলেন, তোমাদের ভেতরকারই একজন, তোমাদেরই আপনজন, তোমাদের স্মৃতির, রক্তের, সমাজের একজন—এই ‘ভাই’ই তোমাদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করছেন, তোমরা কি ভয় কর না? এখানে ভয় মানে কেবল আতঙ্ক নয়; বরং আল্লাহর মহিমা, তাঁর হিসাব, তাঁর ন্যায়বিচার, এবং পাপের পরিণতি সম্পর্কে জাগ্রত হওয়া। এই প্রশ্নের মধ্যে নবীর দরদ আছে, সত্যের কঠোরতা আছে, আর সবচেয়ে গভীরে আছে মমতার কাঁপুনি।

সূরা আশ-শুআরার এই ধারাবাহিকতায় একের পর এক নবীর দাওয়াত এসেছে—একই সত্য, ভিন্ন জাতি, ভিন্ন অবাধ্যতা, কিন্তু একই মানবিক দুর্ভাগ্য: মানুষ যখন অহংকারে জেগে থাকে, তখন নিদ্রার চেয়েও গভীর হয় তার অন্তর্দৃষ্টি-অন্ধত্ব। সালেহ (আ.)-এর আহ্বান কোনো আলাদা খণ্ডিত বাক্য নয়; এটি সেই বড় কোরআনিক ধারার অংশ, যেখানে নবীরা মানুষকে নিজের পরিচয়ের ভিতর থেকেই জাগান—আল্লাহর দিকে ফিরে আস, অন্যায় থেকে ফিরে আস, মিথ্যার সাজসজ্জা ভেঙে ফেল, নফসের ধোঁকা থেকে বেরিয়ে এস। এই আয়াতের ভেতরে তাই শুধু একটি জাতির নয়, প্রতিটি যুগের অন্তরাল লুকানো আত্মপ্রবঞ্চনার ছবি ধ্বনিত হয়।

কুরআনের এই বর্ণনায় ঐতিহাসিক পটভূমির একটি সাধারণ সত্য স্পষ্ট: সালেহ (আ.)-এর কওম নিজস্ব সমাজ, ক্ষমতা, ও অহংকারে মত্ত ছিল; নবী তাদের কাছে এলেন দূরের কেউ হয়ে নয়, বরং আপনজনের মতো। এর মধ্যে দাওয়াতের এক গভীর আদব আছে—সত্যের আহ্বান হৃদয় থেকে আসে, বিদ্বেষ থেকে নয়; মুমিন কেবল তর্ক জেতাতে চায় না, বরং হারিয়ে যাওয়া আত্মাকে ফিরিয়ে আনতে চায়। তাই ‘তোমরা কি ভয় কর না?’ প্রশ্নটি শুধু নৈতিক সতর্কতা নয়, এটি আত্মাকে জাগিয়ে তোলার দরজা: যদি অন্তরে সামান্যও তাকওয়া জাগে, তবে মানুষ নিজের পথ, নিজের গর্ব, নিজের পরিণতি নতুন চোখে দেখতে শুরু করে।

সালেহ (আ.)-এর এই ডাকের ভেতরে এক আশ্চর্য কোমলতা আছে। তিনি দূর থেকে নেমে আসা কোনো অপরিচিত সতর্ককারী নন; তিনি তাদেরই “ভাই”। কোরআন যেন এখানে আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সত্যের আহ্বান প্রথমে সম্পর্ক ভাঙার জন্য নয়, সম্পর্ককে নাজাতের দিকে টেনে নেওয়ার জন্য আসে। আপনজনের মুখে যখন আল্লাহভীতির প্রশ্ন ওঠে, তখন সেই প্রশ্ন আর কেবল বাক্য থাকে না; তা হয়ে ওঠে অন্তরের দরজায় রাখা কড়া এক কুপকপি। “তোমরা কি ভয় কর না?”—এই জিজ্ঞাসা আসলে তাদের ঘুমন্ত বিবেককে নাড়া দেয়: তোমরা কি বুঝছ না, জীবন এমন এক সফর যেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাস হিসাবের দিকে এগোচ্ছে?

এখানে ভয় মানে নিষ্প্রাণ আতঙ্ক নয়; এটি তাকওয়ার জাগরণ। যে হৃদয়ে আল্লাহর মহিমা স্থান পায়, সেখানে গাফলত কমে, অহংকার নরম হয়, আর অন্যায়কে সুন্দর বলে মানার সাহস ভেঙে যায়। সালেহ (আ.)-এর আহ্বান তাই কেবল এক জাতির অতীত কাহিনি নয়; এটি প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য আয়না। মানুষ যখন নিজের শক্তি, গোত্র, সম্পদ, নির্মাণ, কিংবা অভ্যাসের ওপর ভরসা করে আল্লাহকে ভুলে যায়, তখন ভিতর থেকে সে ভেঙে পড়তে শুরু করে—দেয়াল দাঁড়িয়ে থাকলেও আত্মা ধসে যায়। নবীর প্রশ্ন সেই ধসের আগেই কানে বাজা এক রহমত: এখনও ফিরে আসার সময় আছে, এখনও সৎ হওয়ার সুযোগ আছে, এখনও হৃদয়ে আলোর দরজা খোলা আছে।
সূরা আশ-শুআরার ধারাবাহিকতায় এই আয়াত আমাদের শেখায়, নবীর দাওয়াতের ভাষা কখনো কেবল তিরস্কার নয়, কখনো কেবল যুক্তির শুষ্কতা নয়; তা হচ্ছে মমতার ভিতর থেকে উঠে আসা সত্যের বজ্রধ্বনি। সালেহ (আ.)-এর কণ্ঠে আমরা দেখি, আল্লাহর পথে ডাকা মানে মানুষকে তার নিজেরই ভুল বিস্মৃতি থেকে জাগিয়ে তোলা। ভাইয়ের মতো আহ্বান, কিন্তু সত্যের ব্যাপারে কোনো আপস নেই; স্নেহ আছে, কিন্তু জাগরণের শর্তে নরমতা নেই। এই এক বাক্য আজও আমাদের দরজায় দাঁড়িয়ে বলে—তোমরা কি ভয় কর না? যদি সত্যিই হৃদয়ে সামান্যও ঈমানের স্পর্শ থাকে, তবে এই প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না; কারণ এটি আল্লাহর দিকে ফেরার ডাক, নফসের ঘুম ভাঙানোর ডাক, আর ধ্বংসের আগেই নাজাতকে আঁকড়ে ধরার ডাক।

সালেহ (আ.)-এর এ ডাকের মধ্যে দূরের কোনো নবীর কণ্ঠ নয়, বরং আপনজনের অন্তরছোঁয়া এক সতর্কতা শোনা যায়। কোরআন তাঁকে ‘তাদের ভাই’ বলে পরিচয় করিয়ে দেয়—যেন সত্যের আহ্বান প্রথমে শত্রুর ভাষায় নয়, আপনতার ভাষায় আসে। তিনি ভীতি ছড়াতে আসেননি; তিনি জাগাতে এসেছেন। ‘তোমরা কি ভয় কর না?’—এই প্রশ্নে আছে এমন এক মমতা, যা মানুষকে লজ্জিত করে, আবার বাঁচার পথও দেখায়। কারণ প্রকৃত ভয় মানে আতঙ্কে কাঁপা নয়; প্রকৃত ভয় মানে নিজের গাফিলতিকে চিনে নেওয়া, আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর কথা ভুলে না থাকা।

এই আয়াতের ভেতরে সমাজের এক তীক্ষ্ণ আয়না ধরা আছে। যখন কোনো জাতি অহংকারে নিজের ভেতরকার কণ্ঠকে চাপা দেয়, তখন তাদের চোখ খোলা থাকলেও তারা সত্যকে আর দেখে না; কানে শব্দ বাজে, কিন্তু হৃদয় জাগে না। সালেহ (আ.)-এর প্রশ্ন সেই ঘুমন্ত বিবেকের দরজায় কড়া নাড়া—তোমরা কি নিজের কাজের পরিণতি ভাবছ না, আল্লাহর ন্যায়বিচারকে স্মরণ করছ না, পাপের পথে এগিয়ে গিয়ে নিজেদেরই ধ্বংস ডেকে আনছ না? নবীদের ভাষা এমনই; তারা মানুষকে তাদেরই ভুলের সামনে দাঁড় করান, যাতে অজুহাতের আবরণ ছিঁড়ে পড়ে এবং অন্তর স্বীকার করতে শেখে।

আজও এই আয়াত আমাদের দিকে ফিরে তাকায়। আমরা কি এমনভাবে বেঁচে আছি, যেন হিসাবের দিন নেই? নাকি অন্তরের গভীরে এক নিঃশব্দ কাঁপুনি আছে—যে কাঁপুনি মানুষকে তওবার দিকে, নম্রতার দিকে, সত্যের দিকে ফিরিয়ে আনে? সালেহ (আ.)-এর এই আহ্বান আমাদের শেখায়, আল্লাহভীতি কোনো দুঃখের নাম নয়; এটি হৃদয়ের জাগরণ। যে হৃদয় জাগে, সে আর মিথ্যার সাজে মোহিত হয় না, জুলুমকে স্বাভাবিক মনে করে না, গুনাহকে তুচ্ছ ভাবে না। সে জানে, আল্লাহর দিকে ফেরা মানেই নিজের ভাঙা আত্মাকে আবার সত্যের আলোয় দাঁড় করানো।

যখন সালেহ (আ.) বললেন, “তোমরা কি ভয় কর না?”—এই প্রশ্নের ভেতর নবীদের সেই চিরন্তন রীতি ধ্বনিত হয়, যেখানে সত্য প্রথমে আঘাত করে না, আগে জাগিয়ে তোলে। তিনি তাদের কাছে বাইরের কোনো অপরিচিত কণ্ঠ নন; তিনি তাদেরই ভাই। এটাই কোরআনের গভীর রহমত—অবাধ্যতার মাঝেও সম্পর্কের উষ্ণতা নষ্ট হয় না, দাওয়াতের মাঝেও মমতা মরে না। কিন্তু মানুষ কত অদ্ভুত! নিজের ঘরের মানুষকেও অবহেলা করতে পারে, আর আসমানী সত্যকে তো আরও সহজে এড়িয়ে যায়। সালেহ (আ.)-এর এই একটিমাত্র বাক্য আমাদেরও থামিয়ে দেয়: আমি কি এমন জীবন কাটাচ্ছি, যেখানে আল্লাহর ভয় নেই, কিন্তু আত্মপক্ষের অজুহাতের শেষ নেই?

তাকওয়া মানে ভয়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া নয়; বরং সেই ভয়, যা মানুষকে অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনে, গুনাহের সৌন্দর্য ভেঙে দেয়, আর অন্তরকে আল্লাহর সামনে নত করে। এই প্রশ্ন আজও জীবিত—প্রতিটি অহংকারে, প্রতিটি অবিচারে, প্রতিটি গাফিল ঘুমে: তুমি কি ভয় কর না? যখন বান্দা ভয় হারায়, তখন সে শুধু আদেশ অমান্য করে না; সে নিজের হৃদয়ের দরজাও বন্ধ করে দেয়। আর যখন সে জাগে, তখন হয়তো অনেক দেরি হয়ে গেছে—তবু আল্লাহর দয়ার দরজা ভাঙে না। তাই সালেহ (আ.)-এর ডাককে আজ নিজের ভেতর শুনি। যিনি আমাদের আপন, যিনি আমাদের অবস্থা জানেন, যিনি আমাদের দুর্বলতা জানেন—তিনি আমাদের ফিরতে বলেন। হে অন্তর, যদি আজও একটু আলো অবশিষ্ট থাকে, তবে তা এই প্রশ্নের সামনে নরম হয়ে যাক: আমরা কি সত্যিই ভয় করি না?