তখন তাদের ভাই হূদ তাদেরকে বললেন: তোমাদের কি ভয় নেই? এই একটি প্রশ্নেই যেন কাঁপতে শুরু করে মানুষের অহংকার, দম্ভ আর আত্মপ্রবঞ্চনার প্রাচীর। নবী হূদ (আ.)-এর কণ্ঠ এখানে আঘাত করে না; বরং জাগিয়ে তোলে। তিনি শত্রুর মতো দূর থেকে ডাকছেন না, তিনি “তাদের ভাই” হিসেবে ডাকছেন—নিজ সম্প্রদায়ের ভেতর থেকে, আপনজনের করুণায় ভেজা হৃদয় নিয়ে। এই ভ্রাতৃত্বের ডাকের মধ্যেও কত গভীর সতর্কতা! মানুষ যখন সত্যকে অবহেলা করে, তখন প্রথমে তার সামনে যুক্তি রাখা হয় না, রাখা হয় হৃদয়ের দরজা খুলে দেওয়ার আহ্বান। “তোমাদের কি ভয় নেই?”—অর্থাৎ, তোমাদের অন্তর কি একটুও কেঁপে ওঠে না সেই রবের সামনে, যিনি দেখছেন, শুনছেন, বিচার করবেন?
সূরা আশ-শুআরার এই অংশে নবীদের কাহিনি বারবার এক বিশাল সত্যের দিকে ইশারা করে: দাওয়াতের মূল ভাষা হলো তাকওয়া। কবিতা, অলংকার, জনতার বাহবা—এসবের চেয়ে বড় হলো সত্যের ভার। নবী-রাসূলগণ মানুষের সামনে কেবল যুক্তির তীর ছোড়েননি; তারা আত্মাকে নাড়া দিয়েছেন, বিবেককে ডাক দিয়েছেন, গাফিলতিকে ভেঙেছেন। হূদ (আ.)-এর এই প্রশ্ন তাদের সামষ্টিক জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত ছিল—কুফর, অহংকার, আল্লাহর নিদর্শন অস্বীকার, শক্তির নেশা, এবং নিজেকে নিরাপদ ভাবার ভ্রান্তি। যখন কোনো জাতি ক্ষমতা, প্রাচুর্য বা শক্তির ওপর ভর করে আল্লাহকে ভুলে যেতে থাকে, তখন প্রথম ঘা লাগে তাদের হৃদয়ে নয়, বরং তাদের ভয়-অনুভূতিতে; আর তাই নবীর প্রথম ডাক হয়: ভয় কোথায় হারাল?
এই আয়াত শুধু অতীতের এক জনগোষ্ঠীর জন্য নয়; এটি আজকের অন্তরের জন্যও একই রকম তীক্ষ্ণ। মানুষ যখন পাপকে স্বাভাবিক মনে করে, অন্যায়কে অভ্যাসে পরিণত করে, আর আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর কথা ভুলে যায়, তখন এই প্রশ্ন এসে দাঁড়ায় দরজায়—তোমাদের কি ভয় নেই? এতে কোনো কৃত্রিম আতঙ্ক নেই; আছে সত্যের সামনে নত হওয়ার আহ্বান। আল্লাহভীতি মানুষকে ভেঙে ফেলে না, বরং তাকে সোজা করে; তাকে অপমান করে না, বরং জাগিয়ে তোলে। হূদ (আ.)-এর কণ্ঠে তাই আমরা শুনি দাওয়াতের চিরন্তন সুর: শক্তি কারও নিজের নয়, সময় কারও হাতে স্থায়ী নয়, আর সত্য একদিন মানুষের সব মুখোশ ছিঁড়ে ফেলবেই। সেই দিনের কথা মনে রেখে যদি হৃদয়ে একটু তাকওয়া জন্মায়, তবে এই প্রশ্নই হয়ে ওঠে মুক্তির প্রথম দরজা।
নবীর এই প্রশ্নে আছে ভাঙা ঘরের জানালার মতো এক দরজা—যেখানে আলো ঢোকে, কিন্তু জোর করে নয়; হৃদয় যদি একটু জায়গা দেয়, তবে সত্য এসে দাঁড়ায়। হূদ (আ.) তাদেরকে “ভাই” বলে ডাকেন, আর এই সম্বোধনেই প্রকাশ পায় দাওয়াতের পবিত্র শিষ্টতা: শত্রুতার তীর নয়, আপনজনের মমতা। তবু মমতার ভেতরেও তিনি সত্যকে মোলায়েম করেন না। “তোমাদের কি ভয় নেই?”—এ প্রশ্ন মানুষের অন্তরকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়। যে ভয় জাগে না, তার ভিতরে অনেক সময় যুক্তি থাকে, কিন্তু জীবন থাকে না; ভাষা থাকে, কিন্তু জবাবদিহির অনুভব থাকে না।
হূদ (আ.)-এর প্রশ্নের মধ্যে আমরা নিজেদেরও শুনি: আমরা কি সত্যের সামনে কেঁপে উঠি, নাকি অভ্যাসের মোহে পাথরের মতো স্থির হয়ে যাই? অনেক সময় মানুষ আল্লাহকে অস্বীকার করে না, বরং আল্লাহকে মনে রেখেও এমনভাবে বাঁচে যেন হিসাবের দিন নেই। এই আয়াত সেই আত্মপ্রবঞ্চনার পর্দা ছিঁড়ে দেয়। দুনিয়ার কোলাহল, জনতার প্রশংসা, ক্ষমতার গর্ব—সবই ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর মুহূর্ত চিরস্থায়ী সত্য। তাই এই একটি প্রশ্ন—“তোমাদের কি ভয় নেই?”—আসলে প্রতিটি হৃদয়ের দরজায় নীরব কড়া নাড়া: ফিরে এসো, জেগে ওঠো, তোমার রবকে ভুলে যেয়ো না।
নবীর কণ্ঠে এই প্রশ্নটি বড়ই সরল, অথচ এর ভেতরে লুকিয়ে আছে অন্তর কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো এক আদালত। “তোমাদের কি ভয় নেই?”—এ প্রশ্ন মানুষের বাহ্যিক শক্তিকে নয়, তার ভিতরের ভাঙনকে স্পর্শ করে। যখন সমাজ সত্যকে শুনেও শুনতে চায় না, আল্লাহর নিদর্শন দেখেও চোখ বুজে থাকে, তখন নবী হূদ (আ.)-এর মতো একজন রাসূল সামনে এসে দাঁড়ান এবং স্মরণ করিয়ে দেন: মানুষের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা তার ক্ষমতা নয়, তার তাকওয়া। যার অন্তরে আল্লাহভীতি জাগ্রত, সে অন্যায়কে সঙ্গী করে না; সে জানে, দম্ভের প্রাচীর একদিন ধুলো হয়ে যাবে, আর রবের সামনে দাঁড়াতে হবে নিঃস্ব হৃদয় নিয়ে।
এই আয়াতে হূদ (আ.)-এর ভ্রাতৃত্বও কত গভীরভাবে হৃদয়ে লাগে। তিনি দূরের কেউ নন; তিনি তাদেরই একজন, “তাদের ভাই”। সত্যের আহ্বান যখন আপনজনের মুখে আসে, তখন তা আরও বেশি নাড়া দেয়, কারণ এর মধ্যে শত্রুতার তীক্ষ্ণতা নেই, আছে মমতার ভার। নবীদের দাওয়াত এমনই—তারা মানুষকে অপমান করতে আসেন না, বরং গাফিলতিতে ঘুমিয়ে পড়া হৃদয়কে জাগাতে আসেন। হূদ (আ.) যেন বলছেন, তোমরা কি সত্যিই এতটাই ডুবে গেছ যে নিজের আত্মার হিসাব, কাজের ফল, আর আল্লাহর সামনে জবাবদিহির কথা একবারও ভাবছ না?
এই প্রশ্নের মধ্যে ভয় আছে, কিন্তু সেই ভয় নিঃসঙ্গ আতঙ্ক নয়; এটি জাগরণের ভয়, যা মানুষকে ধ্বংসের কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনে। তাকওয়া মানে কেবল কাঁপা নয়, বরং কাঁপতে কাঁপতেই সোজা হয়ে দাঁড়ানো—নিজেকে সংশোধন করা, অন্যায় ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া, এবং রবের দিকে ফিরে যাওয়া। সূরা আশ-শুআরার এই ধারাবাহিকতায় নবীদের কাহিনি আমাদের শেখায়, সত্য কখনো বাহ্যিক চাকচিক্যে মাপা যায় না; সত্যের ওজন থাকে আল্লাহর কাছে। আজও এই আয়াত প্রতিটি অন্তরকে প্রশ্ন করে: তুমি কি শুধু মানুষের দৃষ্টি এড়িয়ে চলছ, নাকি আল্লাহর সামনে থেকেও বেপরোয়া হয়ে আছ? যদি একটুও হৃদয় নড়ে, তবে সেটাই রহমতের দরজা—সেখান থেকেই তওবা, তাকওয়া, আর ফিরে আসার শুরু।
কত অদ্ভুত মানুষের অন্তর! ভয় যখন দুনিয়ার জন্য জেগে ওঠে, তখন বুক কেঁপে যায়; আর যখন আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর কথা আসে, তখন হৃদয় যেন পাথর হয়ে যায়। হূদ (আ.)-এর এই সরল প্রশ্ন আসলে এক দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে দেয়—তোমাদের কি ভয় নেই? অর্থাৎ, কি তোমাদের হৃদয় এক মুহূর্তও থেমে ভাবতে শেখে না যে, যার নেয়ামতে জীবন চলছে, তাঁর অবাধ্যতায় কী ভয়াবহ পরিণতি লুকিয়ে আছে? নবী কেবল সতর্ক করলেন; কিন্তু সেই সতর্কতার ভেতর ছিল অনন্ত মেহেরবানি। কারণ সত্যিকার নসিহত কারও ধ্বংস চায় না, সে চায় মানুষের জাগরণ, ফিরে আসা, তাওবার দরজা খুঁজে পাওয়া।
আজ এই আয়াত আমাদের ঘাড়ের ওপরও হাত রাখে। আমরা কত কথা বলি, কত ব্যাখ্যা দাঁড় করাই, কত গর্বের দেয়াল তুলে ফেলি; কিন্তু হৃদয়ের গভীরে কি সেই একটিমাত্র প্রশ্ন জেগে ওঠে—আল্লাহর সামনে আমার অবস্থান কী? এটাই তাকওয়ার শুরু, এটাই ঈমানের জীবন্ত দোলা। যে অন্তর ভয় পায়, সে ভেঙে পড়ে না; সে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। যে অন্তর আল্লাহকে ভয় করে, সে মানুষকে তুষ্ট করতে গিয়ে সত্যকে বিক্রি করে না। তাই আজ এই আয়াত আমাদের শেখায়: ভয়ের আসল জায়গা দুনিয়ার হুমকি নয়, মানুষের রায় নয়; ভয় সেই দিনের, যেদিন প্রতিটি অহংকার নিঃশব্দ হবে, আর প্রতিটি আত্মপ্রবঞ্চনা খুলে যাবে। হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরে এমন ভয় দাও, যা আমাদেরকে তোমার দিকে ফিরিয়ে আনে; আর এমন তাকওয়া দাও, যা আমাদের ভেতরকে নরম করে, সত্যকে গ্রহণ করার শক্তি দেয়।