নূহ আ.-এর দাওয়াতের সামনে অবিশ্বাসীদের মুখ থেকে যে কথাটি বের হয়, তা শুধু একটি তুচ্ছ প্রশ্ন নয়; তা হলো হৃদয়ের ভেতরে জমে থাকা অহংকারের ভাষা। তারা বলে, আমরা কি তোমাকে মেনে নেব, অথচ তোমার অনুসরণ করছে সমাজের চোখে ‘ইতর’ বলে গণ্য কিছু মানুষ? অর্থাৎ, সত্যকে তারা যাচাই করছে সত্য দিয়ে নয়, মানুষের সামাজিক অবস্থান দিয়ে। কুরআন এখানে এক ভয়ংকর রোগ উন্মোচন করে—যখন অন্তর আল্লাহকে নয়, মানুষের শ্রেণিবিভাগকে মানদণ্ড বানায়, তখন হেদায়াতও তার কাছে অসম্মানিত হয়ে ওঠে।

এই আয়াত নবীদের কাহিনির ধারাবাহিকতায় শুধু নূহ আ.-এর যুগের ঘটনা বলেই থেমে থাকে না; এটি মানবসমাজের পুরনো ব্যাধিকে আজও সামনে আনে। দাওয়াতের প্রথম যুগগুলোতে অনেক সময় ধন-সম্পদ, বংশমর্যাদা বা সামাজিক প্রতিপত্তি হারানো লোকেরাই আগে সাড়া দিয়েছে, আর তা দেখে অহংকারীরা বিদ্রূপ করেছে। কিন্তু কুরআনের দৃষ্টিতে ঈমানের সৌন্দর্য কোনো শ্রেণির অনুগ্রহে জন্মায় না, বরং আল্লাহ যাকে চান তাকেই সত্যের আলোয় দাঁড় করান। মানুষের চোখে দুর্বল, নগণ্য বা প্রান্তিক বলে যারা বিবেচিত, তাদের কাতারেই কখনো কখনো আসমানি সত্যের প্রথম সাক্ষীরা দাঁড়িয়ে যায়।

এখানে একটি গভীর শিক্ষা আছে: সত্যের মর্যাদা মানুষের মর্যাদার মাপে ছোট-বড় হয় না। যারা আল্লাহর পথে হাঁটে, তাদের মূল্য পদ, প্রতিপত্তি, ভাষা বা বংশে নির্ধারিত নয়; তাদের মূল্য নির্ধারিত হয় ঈমান, তাওহীদ, এবং আত্মসমর্পণে। নূহ আ.-এর নবুওয়তের সামনে এই তাচ্ছিল্য শেষ পর্যন্ত সত্যকে ছোট করতে পারেনি; বরং কারা অন্ধ ছিল, কারা অহংকারে ডুবে ছিল, তা প্রকাশ করে দিয়েছে। আজও যখন কেউ ঈমানদারদের সামাজিক স্তর দেখে তুচ্ছ করে, সে আসলে নিজের হৃদয়ের মানদণ্ডটাকেই ফাঁস করে দেয়—কারণ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাবান সে-ই, যে সত্যকে বিনা শর্তে গ্রহণ করে।

কখনো কখনো সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের জবান শুধু যুক্তি হারায় না, তার ভেতরের অহংকারও নিজেকে প্রকাশ করে ফেলে। “আমরা কি তোমাকে মেনে নেব?”—এ প্রশ্নে আসলে নূহ আ.-কে নয়, তারা অস্বীকার করছিল নিজেদের গড়া সামাজিক মাপকাঠিকে। তাদের চোখে সত্যের ওজন নির্ধারিত হচ্ছিল কারা তা গ্রহণ করেছে, সেই ভিড়ের পরিচয়ে; অথচ আল্লাহর কাছে হেদায়াতের মর্যাদা মানুষের পদমর্যাদায় বাঁধা নয়। নবীদের কাহিনিতে বারবার এই দৃশ্যই ফিরে আসে: যাদের অন্তর নরম, যাদের জীবন ভাঙা, যাদের ওপর সমাজের দৃষ্টি পড়ে অবহেলার ছায়া—তারাই আগে সত্যের ডাক শোনে। আর অহংকারীরা সেই সত্যকে হালকা করে দেখে, কারণ তারা আল্লাহকে নয়, মানুষকে মানদণ্ড বানিয়ে ফেলে।

এই আয়াত আমাদের হৃদয়ের গভীরে আঘাত করে। কারণ “ইতরজনেরা” বলে অবজ্ঞা করার রোগ কেবল নূহ আ.-এর কওমের মধ্যেই ছিল না; এই রোগ যুগে যুগে রূপ বদলে ফিরে আসে। কখনো তা বংশের অহংকার, কখনো সম্পদের ঔদ্ধত্য, কখনো শিক্ষার দাম্ভিকতা, কখনো সামাজিক মর্যাদার নেশা। কিন্তু ঈমানের সৌন্দর্য এমন এক আলো, যা গরিবের কাঁধে পড়লেও ক্ষীণ হয় না, আর ধনীর কপালে পড়লেও উজ্জ্বল হয় না যদি অন্তর খালি থাকে। আল্লাহর পথে কারা আগে এসেছে, তা নয়; বরং কার হৃদয়ে সত্য নেমেছে, সেটাই আসল। মানুষের তুচ্ছতা আর আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যতা এক জিনিস নয়—এ কথা বুঝতে না পারলে বান্দা সম্মানকে সত্যের ওপর বসিয়ে দেয়, আর সেখানেই তার পতন শুরু হয়।
নূহ আ.-এর দাওয়াত তাই শুধু এক নবীর ডাক ছিল না; তা ছিল মানবজাতির কাছে এক চিরন্তন প্রশ্ন—তোমরা কি সত্যকে মানবে, নাকি সত্যের দিকে আসাদের সামাজিক পরিচয় খুঁটিয়ে তার ওজন কমাবে? কুরআন এখানে নীরবে নয়, খুব গভীরভাবে বলে দেয়: আল্লাহর দরবারে মানুষের শ্রেণিবিন্যাস ভেঙে পড়ে; সেখানে শ্রেষ্ঠত্ব হয় তাকওয়ার, আনুগত্যের, বিনয়ের। যে হৃদয় আল্লাহর কাছে নত, সে যদি সমাজের চোখে নগণ্যও হয়, তবু সে আলোর পথে আছে। আর যে হৃদয় অহংকারে ফুলে ওঠে, সে যদি জনতার মুকুটও পরে, তবু সে অন্ধকারেই থাকে। এই আয়াত আমাদের শেখায়—সত্যকে তুচ্ছ করার সবচেয়ে বিপজ্জনক ভাষা হলো শ্রেণিবাদের ভাষা; আর সত্যকে গ্রহণের প্রথম শর্ত হলো হৃদয়কে মানুষের নজর থেকে মুক্ত করে আল্লাহর সামনে দাঁড় করানো।

নূহ আ.-এর দাওয়াতের সামনে এই কথাটি উচ্চারিত হয়—“আমরা কি তোমাকে মেনে নেব, অথচ তোমার অনুসরণ করছে ইতরজনেরা?” বাহ্যত এটি অনুসরণের প্রশ্ন, কিন্তু অন্তরে এটি ছিল অহংকারের ঘোষণা। তারা সত্যকে মাপছিল মানুষের চেহারা, পেশা, সম্পদ, এবং সমাজে কারা কতটা গ্রহণযোগ্য—এসব মানদণ্ডে। অথচ আল্লাহর দরবারে হেদায়াতের মাপকাঠি এইসব নয়; সেখানে কাজ করে শুধু অন্তরের সত্যনিষ্ঠা, বিনয়ের কান্না, এবং রবের সামনে আত্মসমর্পণ। কত অদ্ভুত মানুষের হৃদয়—যে পথে আল্লাহ ডাকছেন, সেই পথেই পা রাখার আগে সে আগে দেখে, কারা ইতিমধ্যে হাঁটছে। যেন সত্যের ওজন মানুষের কাঁধে ওঠা শ্রেণির ভারে নির্ধারিত হবে!

এই আয়াত আমাদের সমাজের পুরনো রোগটিকে চিনিয়ে দেয়। নবীদের আহ্বান প্রায়ই প্রথমে সেই হৃদয়গুলোই গ্রহণ করেছিল, যাদের সমাজ তুচ্ছ ভেবেছিল; কারণ দুনিয়ার অহংকার অনেক সময় হৃদয়ের দরজা বন্ধ করে দেয়, আর প্রান্তিকতার ভেতরেও মানুষ আল্লাহর দিকে ফিরবার বেশি সুযোগ পায়। কিন্তু যারা নিজেদের অবস্থান, নাম, বংশ বা প্রভাব নিয়ে গর্ব করে, তাদের জন্য সত্য হয়ে ওঠে অপমানের মতো। তারা ঈমানকে যাচাই করে না, বরং ঈমানকে বিচার করে নিজেদের অহংকার দিয়ে। এ আয়াত যেন আমাদের কানে কানে বলে: তুমি কি কখনও আল্লাহর সত্যকে এভাবে ছোট করে দেখেছ, কারণ সেটি তোমার সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে মেলে না? তুমি কি কখনও কোনো নেক মানুষকে হালকা ভেবেছ শুধু এই কারণে যে তার দুনিয়ার পোশাক, ভাষা, বা অবস্থান তোমার মতো নয়?

অতএব এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে প্রত্যেকে নিজের অন্তরকে জিজ্ঞেস করুক: আমি কি সত্যের অনুসারী, নাকি মানুষের দৃষ্টির বন্দি? আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, তুমি কার সাথে ছিলে—সততার সাথে, না অহংকারের সাথে। আজও যদি কোনো হৃদয় শ্রেণিবিভাগের ঊর্ধ্বে উঠে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তবে সে “ইতর” নয়; সে আল্লাহর কৃপায় সম্মানিত। আর যদি কোনো সমাজ ঈমানদারদের তুচ্ছ করে, তবে সে নিজেরই ক্ষতিকে ভদ্রতার মুখোশ পরিয়ে রাখে। এই আয়াতের ভেতর ভয়ও আছে, আশা-ও আছে: ভয়, যদি আমরা সত্যকে অহংকারে প্রত্যাখ্যান করি; আশা, যদি আমরা বিনম্র হয়ে আল্লাহর পথে ফিরে যাই। কারণ শেষ বিচারে মানুষকে মানুষ নয়, তার রবই চিহ্নিত করবেন—কোন হৃদয় সত্যকে চিনেছিল, আর কোন হৃদয় শ্রেণির দম্ভে সত্যকে অস্বীকার করেছিল।

মানুষের শ্রেণিবিভাগ অনেক সময় সত্যের পথকে ঢেকে ফেলে; কিন্তু আল্লাহর কাছে মানুষের মূল্য তার বাহ্যিক জৌলুশে নয়, তার অন্তরের ঈমানে। এই আয়াত আমাদের সামনে এক অদ্ভুত আয়না ধরে—আমি কি কখনও এমনভাবে কথা বলি, এমনভাবে ভাবি, এমনভাবে বিচার করি, যেখানে কারো পোশাক, পেশা, উচ্চারণ, দারিদ্র্য, পরিচয় বা সামাজিক অবস্থানের কারণে তার সত্যকে ছোট করে দেখি? নূহ আ.-এর প্রতিপক্ষদের মুখের এই বাক্য শুধু ইতিহাস নয়; এটি আমাদের ভেতরের অহংকারেরও পরীক্ষা। কারণ অনেক সময় আমাদের নীরব বিদ্রূপও এই একই ভাষায় কথা বলে—“ওরাও নাকি হক্কের পথে!”

কিন্তু হক্ক কখনো মানুষের টেবিলে বসে সম্মান পায় না; হক্ক নিজের আলোতেই সম্মানিত। যারা আল্লাহকে চেনে, তারা জানে—দুর্বল বলে যাকে অবজ্ঞা করা হয়, সম্ভবত তার হৃদয়ে এমন এক ভাঙন আছে, যেখানে আল্লাহর রহমত নেমে আসে। আর যে নিজেকে বড় ভাবছে, তার জন্য বিপদ অনেক কাছাকাছি, কারণ অহংকার সত্যের দরজা বন্ধ করে দেয়। এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে অন্তর কেঁপে ওঠে: আমি কি সেই দলেই আছি, যারা সত্যের মানুষকে দেখে নয়, তাদের সমাজ-অবস্থান দেখে রায় দেয়? যদি তাই হয়, তবে আজই হৃদয়ের এই অন্ধকার থেকে ফিরে আসতে হবে; নইলে একদিন সত্যের সামনে আমাদের শ্রেণিগর্ব, আমাদের মুখোশ, আমাদের সব আপাত-সম্মান মাটিতে মিশে যাবে। আল্লাহ আমাদেরকে এমন অন্তর দিন, যা মানুষের পদমর্যাদা নয়, সত্যের আলোককেই মর্যাদা দেয়।