এই আয়াতের শব্দগুলো ছোট, কিন্তু ভেতরে আছে বজ্রের মত এক ডাক। “ফেরাউনের সম্প্রদায়ের নিকট; তারা কি ভয় করে না?”—এখানে ভয় মানে কেবল আতঙ্ক নয়, বরং সেই জাগ্রত তাকওয়া, যা মানুষকে জুলুমের অন্ধকার থেকে টেনে বের করে আল্লাহর সামনে নত হতে শেখায়। সূরা আশ-শুআরার এই ধারায় মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াত ফেরাউনের দরবারে পৌঁছে যাচ্ছে—এক এমন দরবার, যেখানে ক্ষমতা ছিল, অহংকার ছিল, দম্ভ ছিল; কিন্তু ছিল না হৃদয়ের নরমতা, ছিল না রবের ভয়। তাই প্রশ্নটি শুধু ফেরাউনের জাতির প্রতি নয়, বরং প্রতিটি হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়া: সত্য যখন সামনে আসে, আমরা কি তাকে ভয় করব, নাকি সেই রবকে ভয় করব যিনি সত্যের অধিকারী?
এই বাক্যের ভেতরে কুরআনের এক গভীর দাওয়াতি ভঙ্গি দেখা যায়। নবীদের কাজ ছিল কেবল তথ্য পৌঁছে দেওয়া নয়; তারা মানুষের ঘুমন্ত বিবেককে জাগাতে আসতেন। ফেরাউনের কওমের প্রসঙ্গ এখানে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তারা শুধু একটি জাতি ছিল না—তারা ছিল এমন এক সমাজের প্রতীক, যেখানে শাসন শক্তির উপর দাঁড়িয়েছিল, আর শক্তি নিজেকে সত্য বলে দাবি করত। এই আয়াত তাদের সামনে ভয় দেখিয়ে নয়, বরং ভয় জাগিয়ে তুলে; কারণ যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা আসে, তখন মানুষের সবচেয়ে বড় বিপদ হয় অবহেলা, আর সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হয় তাকওয়া। তাদের কি ভয় করে না—এই প্রশ্নে যেন বলা হচ্ছে, তোমাদের হৃদয় কি এতটাই শক্ত হয়ে গেছে যে ফেরেশতাদের নয়, আল্লাহর নয়, সত্যের নয়, শুধু নিজের শক্তিকেই মানে?
আয়াতটি যে ঐতিহাসিক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে, তা মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াত ও ফেরাউনের জুলুমপূর্ণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত; তবে এখানে কোনো নির্দিষ্ট একক ঘটনার সীমায় পাঠ থেমে যায় না। এটি মানবসমাজের চিরন্তন রোগকে উন্মোচন করে: ক্ষমতা যখন বুক ফুলিয়ে ওঠে, তখন আল্লাহভীতি প্রথমে মরে যায়। আর যখন আল্লাহভীতি মরে, তখন সত্যকে তুচ্ছ করা সহজ হয়, নবীদের কণ্ঠকে বিদ্রূপ করা সহজ হয়, মানুষকে দাস বানানো সহজ হয়। তাই এই আয়াত আমাদেরও প্রশ্ন করে—আমাদের অন্তরে কি কোনো ফেরাউন বাস করে না? আমরা কি নিজের গুনাহ, নিজের অহংকার, নিজের আত্মপ্রেমে এতটাই মোহিত যে রবের সতর্ক আহ্বান শুনেও কাঁপি না? কুরআন এখানে ভয় শেখায় না; কুরআন ভয়কে তার সঠিক ঠিকানায় ফিরিয়ে দেয়, যেন মানুষ সৃষ্টির সামনে নয়, স্রষ্টার সামনে জবাবদিহির অনুভবে জেগে ওঠে।
ফেরাউনের সম্প্রদায়ের দিকে এই প্রশ্ন ছুটে যায়, আর তার সাথে যেন ইতিহাসের সবচেয়ে পুরোনো অথচ সবচেয়ে তাজা জিজ্ঞাসাটি আমাদের বুকেও এসে পড়ে: তারা কি ভয় করে না? কুরআন এখানে শুধু এক জাতির নাম উচ্চারণ করছে না; সে এক আত্মম্ভরী সভ্যতার মুখোশ টেনে ধরছে, যেখানে শক্তি ছিল, ভয় ছিল না; শাসন ছিল, কিন্তু আল্লাহর সামনে নত হওয়ার হৃদয় ছিল না। নবীর দাওয়াত যখন ক্ষমতার দরজায় পৌঁছে, তখন প্রথম আঘাতটা তলোয়ারে নয়, বিবেকে লাগে। কারণ সত্য মানুষের ভিতরের সেই জমাট অহংকারকে ভেঙে দিতে চায়, যা নিজেকে অপরাজেয় ভাবতে শিখেছে।
আর তাই এই আয়াত আজও থেমে থাকে না; সে আমাদের সময়ের দরবারেও এসে দাঁড়ায়। যখন মানুষ নিজের মত, পদ, দল, ক্ষমতা, কিংবা অভ্যাসকে সত্যের ওপর বসিয়ে দেয়, তখন সে ফেরাউনের সম্প্রদায়ের সুরেই কথা বলতে শুরু করে—যদিও তার রাজপ্রাসাদ না থাকে, তবু অহংকারের রাজ্য তার ভেতরে গড়ে ওঠে। কুরআনের এই সংক্ষিপ্ত বাক্য আমাদেরকে নরম কিন্তু তীব্র এক জাগরণের দিকে ডাকে: আল্লাহকে ভয় না করলে মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজেরই বন্দী হয়ে যায়। আর যে হৃদয় আল্লাহভীতিতে জীবিত, সে-ই সত্যকে চিনে নেয়, সত্যের সামনে ঝুঁকে পড়ে, এবং অন্ধকারের ভিড়ে হিদায়াতের আলো খুঁজে পায়।
ফেরাউনের সম্প্রদায়ের দিকে এই প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া মানে কেবল একটি জাতিকে অভিযুক্ত করা নয়; এটি এক ক্ষমতামত্ত সমাজের অন্তঃসারশূন্যতাকে উন্মোচন করা। যখন অন্যায় আইন হয়ে দাঁড়ায়, জুলুম শাসনের ভাষা হয়ে ওঠে, আর মানুষ নিজের শক্তিকে চূড়ান্ত মনে করতে শেখে, তখন তার সবচেয়ে বড় ঘাটতি থাকে তাকওয়া। আয়াতের এই সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন—“তারা কি ভয় করে না?”—প্রকৃতপক্ষে মানুষের ভেতরে জমে থাকা অহংকারের উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে এক থমকে দেওয়ার ডাক। যে হৃদয় রবকে ভয় করে, সে আর দুর্বলকে পিষে ফেলতে পারে না; যে অন্তর আখিরাতের জবাবদিহি স্মরণ করে, সে আর ক্ষমতাকে দেবতা বানায় না।
এইখানে ভয় শব্দটি অন্ধ আতঙ্কের নয়; এটি এমন সচেতন জাগরণ, যা মানুষকে সোজা করে দাঁড় করায়, ভিতরে নম্রতা এনে দেয়, আর সত্যের সামনে আত্মসমর্পণ শেখায়। ফেরাউনের জাতি ছিল এমন এক সমাজের প্রতীক, যেখানে বাহ্যিক জৌলুস ছিল, কিন্তু ঈমানের আলো নিভে গিয়েছিল। তাই মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াত তাদের সামনে এসে শুধু তাওহিদের ঘোষণা দেয় না, বরং তাদের নৈতিক বিবেককে জিজ্ঞেস করে—তোমরা কি সেই সত্তাকে ভয় করো না, যিনি রাজত্বেরও মালিক, জীবন-মৃত্যুরও মালিক? এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে দাওয়াতের কোমলতা, আর সতর্কতার বজ্রধ্বনি; কারণ সত্য কখনো শুধু তর্কে জেতে না, সত্য জেতে হৃদয়কে জাগিয়ে।
আজও এই আয়াত আমাদের সমাজের দরজায় দাঁড়িয়ে একই প্রশ্ন করে। যখন মানুষ ক্ষমতা, অর্থ, দল, পরিচয় বা সম্মানের আড়ালে সত্যকে ঠেলে সরিয়ে দেয়, তখন সে আসলে ফেরাউনের মানসিকতার উত্তরসূরি হয়ে ওঠে—যদিও তার নাম ফেরাউন না-ও হয়। কুরআন আমাদের শেখায়, আল্লাহভীতি কোনো বাহ্যিক চিহ্ন নয়; এটি হৃদয়ের ভিতরের বিচারবুদ্ধি, যা মানুষকে নিজের সীমা মনে করিয়ে দেয়। তাই এই আয়াত শুনে নিজের দিকে তাকাতে হয়: আমি কি সত্যের ডাক শুনে নরম হচ্ছি, নাকি অহংকারে কঠিন হয়ে যাচ্ছি? আমি কি এমন এক রবকে ভয় করছি, যাঁর সামনে একদিন ফিরতেই হবে? ফেরাউনের সম্প্রদায়ের জন্য যে প্রশ্ন উঠেছিল, তা আজও প্রতিটি আত্মার দরজায় কড়া নাড়ে—তারা কি ভয় করে না?
ফেরাউনের জাতির দিকে এই প্রশ্ন, “তারা কি ভয় করে না?”—এ প্রশ্ন যেন আমাদের ভেতরের জমাট অন্ধকারে আলোর সূচালো খোঁচা। কারণ মানুষ যখন ক্ষমতার নেশায় ডুবে যায়, তখন সে শুধু আল্লাহকে ভুলে না; সে নিজের শেষকেও ভুলে যায়। ফেরাউনের কওমের ইতিহাস কেবল অতীতের কাহিনি নয়, তা প্রতিটি যুগের সেই মানুষদের মুখে লাগানো আয়না, যারা সত্য শুনেও কানে দেয় না, নসিহত শুনেও হৃদয় নরম করে না, আর গুনাহের উপর গুনাহ রেখে নিজেদের নিরাপদ মনে করে। অথচ নিরাপত্তা তো সেখানে, যেখানে রবের ভয় আছে; আর ধ্বংস তো সেখানেই, যেখানে ভয় নেই—শুধু দাম্ভিকতার দেয়াল আছে।
এই একটি বাক্য আমাদেরও জিজ্ঞেস করে: আমরা কি সত্যিই ভয় করি? না কি ভয় করি মানুষের কথা, দুনিয়ার ক্ষতি, সুনামের ভাঙন, নিজের প্রতিপত্তির কমে যাওয়া? কিন্তু আল্লাহভীতি মানে এই জগতের কোলাহলের চেয়ে বড় এক নীরব জাগরণ—যেখানে হৃদয় বুঝে ফেলে, আমি কার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, এবং আমার হাতে কী জবাব আছে। আজ যদি এই আয়াত অন্তরে কাঁপন তোলে, তবে সেটাই রহমত। কারণ যে অন্তর ভয় পায়, সে-ই নরম হয়; আর যে অন্তর নরম হয়, সে-ই তাওবার দরজা খুঁজে পায়। ফেরাউনের কওমের মতো শক্ত হয়ে থাকা নয়, বরং মাটির মতো বিনীত হয়ে রবের দিকে ফিরে আসাই মুমিনের পথ। সত্য যখন দরজায় কড়া নাড়ে, তখন তার জবাব কেবল নীরবতা নয়; জবাব হতে হয় অশ্রু, আত্মসমর্পণ, আর “হে আল্লাহ, আমাকে আপনার ভয় দান করুন”—এই ভাঙা কিন্তু জীবন্ত মিনতি।