সূরা আশ-শুআরার এই আয়াত নবীদের দাওয়াতের এক নির্মল ঘোষণা। তাঁরা মানুষকে আল্লাহর দিকে ডেকেছেন, কিন্তু সেই আহ্বানকে কখনো নিজেদের জীবিকার হাতিয়ার বানাননি। আয়াতটি যেন হৃদয়ের দরজায় ধীরে ধীরে কড়া নাড়ে: আমি তোমাদের কাছে এর জন্য কোনো প্রতিদান চাই না; আমার পুরস্কার তো কেবল বিশ্বপালনকর্তার কাছে। এখানে দাওয়াতের পবিত্রতা, নিয়তের স্বচ্ছতা, আর সত্যের প্রতি আত্মসমর্পণের এক দীপ্ত ভাষা শোনা যায়। নবীর কণ্ঠে যখন এমন কথা উচ্চারিত হয়, তখন বোঝা যায়—সত্যের ডাক কোনো বাজারদর নয়, কোনো পারিশ্রমিক-নির্ভর পেশাও নয়; এটি আল্লাহর জন্য উৎসর্গিত আমানত।
এই সূরার বিস্তৃত প্রবাহে আমরা দেখি বিভিন্ন নবীর কাহিনি বারবার ফিরে আসে, আর প্রতিবারই একটি মৌলিক সুর জেগে ওঠে—তাদের দাওয়াত এক, তাদের উদ্দেশ্য এক, তাদের হৃদয়ের গভীরে কোনো লোভ নেই। মক্কার মুশরিক সমাজে যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতকে কখনো কবিতা, কখনো ব্যক্তিগত প্রভাব, কখনো মানবিক স্বার্থের মতো করে দেখার চেষ্টা করা হচ্ছিল, তখন কুরআন এই আয়াতের মাধ্যমে সত্যকে পরিষ্কার করে দেয়: নবীদের আহ্বান মানুষের কাছ থেকে কিছু নেওয়ার জন্য নয়, বরং মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোতে টেনে আনার জন্য। নির্ভরযোগ্যভাবে কোনো একক বিশেষ কারণ-নুযূল নির্ধারিত না থাকলেও, সূরার সামগ্রিক প্রেক্ষাপট স্পষ্টভাবে এই প্রতিরক্ষামূলক ও তাওহিদি বক্তব্যকে সামনে আনে।
এ আয়াত আমাদের অন্তরকেও প্রশ্ন করে। আমরা যখন সত্যের কথা বলি, তখন কি তাতে নিজের নাম, মর্যাদা, প্রশংসা, কিংবা লাভের সামান্য গোপন আকাঙ্ক্ষাও মিশে যায়? নবীদের ভাষা আমাদের শেখায়—আল্লাহর পথে ডাক দিতে হলে বুককে দুনিয়ার লেনদেন থেকে মুক্ত করতে হয়। কারণ যে দাওয়াত মানুষের কাছে মূল্য খোঁজে, তার দীপ্তি ক্ষীণ হয়ে যায়; আর যে দাওয়াতের প্রতিদান আল্লাহর ওপর সঁপে দেওয়া হয়, তা সময়ের ধুলোয় মুছে যায় না। এই একটি আয়াতে সত্যের আহ্বান, নিষ্কাম দাওয়াত, এবং রব্বুল আলামিনের কাছে প্রত্যাশার পূর্ণ সৌন্দর্য একসাথে জ্বলে ওঠে।
নবীদের কণ্ঠে এ এক অদ্ভুত জ্যোতি—তাঁরা ডাকেন, কিন্তু দাবি করেন না; বোঝান, কিন্তু বোঝা চাপান না; সত্যকে তুলে ধরেন, কিন্তু তার ওপর নিজের নামের ছাপ বসান না। এই আয়াত আমাদের শেখায়, দাওয়াতের আসল সৌন্দর্য সেখানে, যেখানে আহ্বানকারীর হৃদয় দুনিয়ার লাভ-লোকসানের ঊর্ধ্বে উঠে যায়। যে মানুষ আল্লাহর পথে ডাকে, তার কথার ওজন তখনই বাড়ে, যখন সে নিজের জন্য কিছু চায় না। কারণ স্বার্থ মিশে গেলে বাণী মলিন হয়, আর নিয়ত পবিত্র থাকলে সামান্য কথা-ই হৃদয় ভেঙে দেয়, অন্ধকারে আলো জ্বেলে দেয়।
আমাদের সময়েও এই আয়াত বুকের ভেতর প্রশ্ন জাগায়: আমরা কি সত্য বলি আল্লাহর জন্য, নাকি নিজের মর্যাদার জন্য? আমরা কি দাওয়াত দিই মানুষের হৃদয় বাঁচাতে, নাকি নিজের অবস্থান উঁচু করতে? নবীদের এই ঘোষণা তাই শুধু ইতিহাসের বাক্য নয়, আত্মশুদ্ধির মর্মান্তিক আয়না। যে হৃদয় আল্লাহর প্রতিদানের উপর ভরসা রাখে, সে মানুষে-মানুষে বিঘ্নিত হয় না; সে নীরবে, ধৈর্যে, নিষ্ঠায় এগিয়ে যায়। শেষ বিচারে পুরস্কার মানুষের হাতে নয়—বিশ্বপালনকর্তার হাতে। আর সেই হাতের প্রতিদানই যথেষ্ট, কারণ তা দুনিয়ার সব প্রশংসার চেয়ে বড়, সব বিনিময়ের চেয়ে পবিত্র, সব হারানোর চেয়ে স্থায়ী।
নবীদের দাওয়াতের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকগুলোর একটি হলো—তাদের আহ্বান মানুষের কাছে, কিন্তু তাদের দৃষ্টি মানুষের হাতে নয়; তাদের মুখে সত্য, কিন্তু হৃদয়ে লোভের ছায়াও নেই। এই আয়াত সেই পবিত্র ঘোষণাকে আরও উজ্জ্বল করে: আমি তোমাদের কাছে এর জন্য কোনো প্রতিদান চাই না, আমার প্রতিদান তো বিশ্বপালনকর্তার কাছেই। যেন সত্যের ডাককে কোনো পার্থিব লেনদেনের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে চাওয়া অন্ধকারের মুখে আল্লাহ নিজেই বলে দিলেন, নূরের মাপ বাজারে হয় না। যে দাওয়াতের উৎস ও লক্ষ্য উভয়ই আল্লাহ, তা মানুষের প্রশংসায় বড় হয় না, নিন্দায় ছোটও হয় না; সে দাওয়াত নিজের বিশুদ্ধতা নিয়েই দাঁড়িয়ে থাকে, আকাশের মতো প্রশস্ত, মাটির মতো বিনয়ী।
এই কথার মধ্যে আমাদের সমাজের জন্যও এক কঠিন আয়না আছে। আমরা কি কাজ করি আল্লাহর জন্য, নাকি মানুষের সনদ, স্বীকৃতি, বাহবা আর লাভের জন্য? দীনকে যদি কেউ উপার্জনের সিঁড়ি বানায়, তবে সে আসলে দাওয়াতের শরীর রেখে রূহ হারায়। আর যে মুমিন নিজের অন্তরকে জিজ্ঞেস করে, আমি কী চাই—মানুষের মুখের ধন্যবাদ, নাকি রবের সন্তুষ্টি—সে ধীরে ধীরে আত্মশুদ্ধির পথে হাঁটে। এই আয়াত আমাদের ভয়ও জাগায়, আশা-ও দেয়: ভয়, যদি নিয়ত ভেঙে যায়; আশা, যদি এক বিন্দু ইখলাস নিয়েও কাজগুলো আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়। শেষ পর্যন্ত ফিরে যেতে হবে সেই রবের কাছেই, যাঁর কাছে গোপন নিয়তও প্রকাশ, আর ক্ষুদ্রতম নেকিও অপচয় হয় না। তখনই বোঝা যাবে, সত্যের পথে চলা কখনো বৃথা যায় না—যদি তা হয় কেবল বিশ্বপালনকর্তার জন্য।
নবীদের পথে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হয়তো এই নয় যে, তাঁরা অলৌকিক নিদর্শন দেখিয়েছেন; বরং এই যে, তাঁরা মানুষের প্রশংসা, উপহার, স্বীকৃতি—কিছুই নিজের জন্য চাননি। যেখানে মানুষের হৃদয় নিজের লাভের অংকে জড়িয়ে যায়, সেখানেই সত্যের কণ্ঠস্বর ম্লান হয়ে পড়ে। কিন্তু নবীদের ডাক এমন নয়। তা এসেছে আকাশের নির্ভেজাল সুর হয়ে, যেখানে কোনো ব্যক্তিগত হিসাব নেই, আছে শুধু রবের সন্তুষ্টির জন্য এক নিঃশব্দ নিবেদন। এ কারণেই তাদের আহ্বান আজও জীবিত; কারণ মানুষের কাছ থেকে নেওয়া নয়, আল্লাহর কাছে সোপর্দ করাই ছিল তাদের পথ।
আমাদের সময়েও দ্বীনের কথা বলা সহজ, কিন্তু দ্বীনের জন্য হৃদয়কে খালি করা কঠিন। আমরা কত দ্রুত মানুষের স্বীকৃতি চাই, কত তাড়াতাড়ি নিজের কষ্টের হিসাব তুলে ধরি, কত অল্পেই মনে করি প্রাপ্য বুঝি আমাদেরই। অথচ এই আয়াত নরম কিন্তু তীব্র এক প্রশ্ন রাখে: তুমি কি আল্লাহর জন্য ডেকেছ, নাকি নিজের জন্য? যদি সত্যিই দাওয়াত হয়, তবে তার মজুরি মানুষের হাতের মুদ্রা হতে পারে না; তার প্রতিদান দিতে পারেন কেবল বিশ্বপালনকর্তা, যাঁর কাছে কোনো আমল হারায় না, কোনো নিয়ত অপচয় হয় না। তাই হৃদয়কে আজ একটু নত করা দরকার—যেন আমরা বুঝি, ইবাদত, দাওয়াত, খেদমত, ত্যাগ—সবকিছুর প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই জন্ম নেয়, যখন তা শুধু আল্লাহর জন্য হয়।