কিয়ামতের ময়দানে দাঁড়িয়ে যখন সত্য আর অস্বীকারের মাঝখানে আর কোনো পর্দা থাকে না, তখন মানুষের অন্তর থেকে ভেসে ওঠে এমন এক আর্তি—“হায়, যদি কোনোভাবে আমরা আবার ফিরে যেতে পারতাম, তবে অবশ্যই মুমিন হয়ে যেতাম।” এই আয়াতে আল্লাহ সেই করুণ মনস্তত্ত্বকে তুলে ধরেছেন, যেখানে শাস্তির দৃশ্য দেখার পর অবিশ্বাসী বুঝতে পারে, সত্যকে অস্বীকার করা কত বড় ক্ষতি ছিল। কিন্তু এই উপলব্ধি আর তাওবা নয়; এটি হলো হারিয়ে ফেলা সুযোগের সামনে দাঁড়িয়ে করা এক অসহায় দীর্ঘশ্বাস। ঈমান তখন তাদের মুখে আসে, যখন ঈমানের পরীক্ষা শেষ, দুনিয়ার দরজা বন্ধ, আর আখিরাতের হিসাব শুরু হয়ে গেছে।
সূরা আশ-শুআরা সামগ্রিকভাবে নবীদের দাওয়াত, সত্য-মিথ্যার সংঘাত, এবং আল্লাহর ক্ষমতার সামনে মানবজাতির হঠকারী অহংকারকে সামনে আনে। এই আয়াতটি সেই বৃহত্তর সুরেরই এক তীক্ষ্ণ ধ্বনি: যাদের কাছে সত্য বারবার পৌঁছেছে, কিন্তু তারা তা ঠেলে সরিয়েছে, তাদের অন্তরে অবশেষে অনুতাপ জাগে—তবে সে অনুতাপ ফলহীন। এখানে কোনো নির্দিষ্ট, নির্ভরযোগ্য একটি ঘটনাকে আলাদা করে চিহ্নিত করার চেয়ে আয়াতের সার্বজনীন সতর্কবাণীটাই বেশি স্পষ্ট: দুনিয়ার সময়টুকু সত্য গ্রহণের জন্য, আখিরাতে এসে নয়। মানুষের বড় দুর্বলতা হলো, সে দেরিতে বুঝতে শেখে; আর সবচেয়ে ভয়ংকর দেরি হলো ঈমানের দেরি।
এই কথার মধ্যে শুধু অবিশ্বাসীর আফসোস নেই, আছে মানুষের মর্মান্তিক আত্মপ্রতারণার উন্মোচনও। দুনিয়ায় তারা ভাবে, পরে ফিরেও আসা যাবে, পরে তাওবা করব, পরে সত্য মানব। কিন্তু মৃত্যু যখন পর্দা সরিয়ে দেয়, তখন “পরে” শব্দটির আর কোনো মানে থাকে না। তাই এই আয়াত অন্তরকে কাঁপিয়ে বলে—যে ঈমান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নয়, শাস্তির ভয়ে একেবারে শেষ মুহূর্তে জেগে ওঠে, সে ঈমান নয়; সে হলো বিলম্বিত অনুশোচনা। আর কুরআন আমাদের সামনে এই দৃশ্য এঁকে দেয়, যেন আমরা আজই জেগে উঠি, আজই নরম হই, আজই সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করি, কারণ ফিরে আসার আকুতি সবচেয়ে করুণ হয় তখনই, যখন ফিরে আসার রাস্তা আর খোলা থাকে না।
কিয়ামতের মুখে দাঁড়িয়ে মানুষ তখন বুঝবে—সত্যকে অবহেলা করা মানে শুধু একটি ভুল ধারণা আঁকড়ে ধরা নয়, বরং নিজের আত্মাকে এমন এক শূন্যতার দিকে ঠেলে দেওয়া, যেখান থেকে আর ফেরার পথ থাকে না। তখন মুখে বেরিয়ে আসে আফসোসের কাঁপা স্বর: হায়, যদি কোনোভাবে আবার দুনিয়ায় ফেরা যেত! হায়, যদি দ্বিতীয়বার সুযোগ মিলত! কিন্তু এই আকুতি আর ঈমানের সৌন্দর্য হয়ে ওঠে না; এটি হয় বিলম্বের যন্ত্রণা। কারণ ঈমানের আসল মূল্য তখনই, যখন অদৃশ্যকে বিশ্বাস করার সময় থাকে, যখন সত্যকে গ্রহণ করা দুঃখের মাঝেও নির্বাচনের বিষয়, শাস্তি দেখার পরের বাধ্যতামূলক স্বীকারোক্তি নয়।
এই আয়াত আমাদের আজই জাগিয়ে তোলে। কারণ মৃত্যুর আগে যে ঈমান, সেটাই মুক্তি; শাস্তি দেখার পরে যে বিশ্বাস, সেটি শুধু পরাজয়ের স্বীকারোক্তি। মানুষ যদি এখনই আল্লাহর দিকে ফিরে না আসে, তবে একদিন তারই অন্তর এই বাক্য উচ্চারণ করবে, কিন্তু তখন তা কবুলের দরজা খুলবে না—তা হবে শুধু হারানো জীবনের কাঁদুনি। তাই প্রত্যাবর্তনের আকুতি যেন আখিরাতে না জন্মায়; তা যেন আজই তাওবার রূপ নেয়। আল্লাহ আমাদের এমন জীবিত হৃদয় দিন, যে হৃদয় সত্যকে দেখার পর নয়, সত্যকে শোনার সঙ্গেই নরম হয়ে যায়, আর মৃত্যুর আগেই রবের কাছে ফিরে আসে।
কিয়ামতের সেই মুহূর্তে মানুষের ভেতরের সব বাহাদুরি ভেঙে পড়ে, আর মুখে উঠে আসে এই তীব্র আফসোস: “হায়, যদি কোনোভাবে আমরা আবার দুনিয়ায় ফিরে যেতে পারতাম, তবে আমরা অবশ্যই মুমিন হয়ে যেতাম।” এ কোনো সত্যিকারের ঈমানের বিজয় নয়; এটি শাস্তির মুখে দাঁড়িয়ে জেগে ওঠা বিলম্বিত বোধ, যা আর কোনো উপকারে আসে না। দুনিয়ায় যখন আল্লাহর আয়াত সামনে এসেছে, নবীদের ডাকে সত্যের আলো জ্বলে উঠেছে, তখন যদি হৃদয় নরম না হয়, যদি অহংকার আর গাফিলতি বারবার তাকে ঠেলে সরিয়ে দেয়, তবে আখিরাতে সেই হৃদয় শুধু আফসোসই করতে জানে। সেদিন মানুষ বুঝবে, যে বিশ্বাস আজ এত প্রয়োজন, সেটিকে কালকের জন্য ফেলে রাখা ছিল আত্মাকে শুষে নেওয়া এক ভয়ংকর প্রতারণা।
এই আয়াত আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে এক কাঁপুনি জাগায়: আমি কি ঈমানকে আজকের কাজ মনে করি, নাকি আগামীকালের ভরসা? কারণ মানুষের জীবনে সবচেয়ে মর্মান্তিক পরাজয় হলো—সত্যকে জেনেও তাকে দেরি করা, তাওবাকে বিলম্বিত করা, আল্লাহর দিকে ফেরা স্থগিত রাখা। সমাজ যখন মিথ্যাকে স্বাভাবিক করে, যখন দুনিয়ার চাকচিক্য অন্তরকে বধির করে, তখন এই আয়াত যেন জোরে বলে ওঠে: ফিরে আসার আকুতি তখন আর মুক্তির দরজা খুলবে না, যদি দুনিয়ায় থাকা অবস্থায় হৃদয় জাগ্রত না হয়। তাই আজই সে সময়, যখন বান্দা চোখের জল, ভাঙা অহংকার আর নরম হৃদয় নিয়ে রবের সামনে দাঁড়াতে পারে। কারণ আল্লাহর রহমত বিস্তৃত, কিন্তু অবহেলার সময় খুব সংক্ষিপ্ত; আর মৃত্যু, কিয়ামত, হিসাব—সবই আমাদের কল্পনার চেয়ে অনেক বেশি নিকটে।
কিয়ামতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষের এক গভীরতম দুর্বলতা প্রকাশ পায়—সে তখন বুঝতে পারে, যেটা সে জীবিত অবস্থায় অবহেলা করেছিল, সেটাই ছিল তার আসল জীবন-সম্বল। এই আয়াতের “কররা” শব্দে যেন ধরা পড়ে ফিরে পাওয়ার অস্থির আকুতি, আবার শুরু করার আকুতি, সব ভুল মুছে ফেলার আকুতি। কিন্তু আখিরাত কোনো দ্বিতীয় সুযোগের মায়াবী নাম নয়। সেখানে সত্য উন্মোচিত হয়ে যায়, আর বিলম্বিত ঈমানের কান্না আর কাজের সুযোগ হয় না। দুনিয়ায় যে হৃদয় সত্যকে শুনেও নরম হয়নি, সে-ই আজ শাস্তির সামনে দাঁড়িয়ে কেঁপে ওঠে; যে মুখ দম্ভ করে বলেছিল, এখন সেই মুখই কাঁপা স্বরে বলে, হায়, যদি আরেকবার ফেরা যেত! এই আর্তি আমাদের জন্যও এক আয়না। মানুষ কত সহজে ভাবে, সময় আছে; পরে তওবা করব, পরে নামাজ ধরব, পরে সত্যকে মানব। কিন্তু পরে শব্দটির ভেতর কত অদৃশ্য মৃত্যুর ছায়া লুকিয়ে থাকে, তা শুধু আখিরাতের দরজায় পৌঁছে বোঝা যায়। সূরা আশ-শুআরার ধারাবাহিক বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নবীদের আহ্বান ছিল জীবনের দিকে, আর অস্বীকারকারীর জিদ ছিল ধ্বংসের দিকে। আজ যদি হৃদয় কিছুটা নরম হয়, তবে সেটাই রহমত; আজ যদি চোখ ভিজে ওঠে, তবে সেটাই জাগরণের সূচনা। কারণ কাল যখন হিসাবের দিন এসে যাবে, তখন ঈমান চেয়ে নেওয়া নয়, ঈমানের ওপর টিকে থাকা-ই হবে সবচেয়ে বড় নাজাত। তাই আজই সেই দরজায় ফিরে আসা উচিত, যেখানে আল্লাহর রহমত এখনো খোলা, আর মানুষের কান্না এখনো অর্থবহ।
এই আয়াতের বেদনাটি এখানেই—সত্যকে অস্বীকার করা যায়, কিন্তু সত্যের সামনে একদিন দাঁড়াতেই হয়। তখন মানুষ দেখে, তার অহংকার ছিল কত ক্ষণস্থায়ী, আর আল্লাহর ক্ষমতা কত অপ্রতিরোধ্য।