আল্লাহ আকাশ থেকে পানি নামান। তারপর সেই পানি একা থাকে না; মাটি, উপত্যকা, ঢাল, গভীরতা—সবাই নিজ নিজ ধারণক্ষমতা অনুযায়ী তাকে গ্রহণ করে। কোথাও স্রোত ভরে ওঠে, কোথাও কম বয়ে যায়, কোথাও দ্রুত, কোথাও ধীর। এই এক দৃশ্যের ভেতরেই আমাদের জীবনকে যেন আল্লাহ বুঝিয়ে দেন: তাঁর দান এক, কিন্তু গ্রহণের ভঙ্গি সবার এক নয়। ওহীও এমনই। কুরআনের আলো একই, কিন্তু এক হৃদয় তা ধরে হেদায়াতের স্রোত হয়ে ওঠে, আরেক হৃদয় তা ছুঁয়ে কেবল শব্দের ফেনা নিয়ে থাকে।

স্রোতের মুখে যেমন ফেনা উপরে ভেসে ওঠে, তেমনি বাতিলও অনেক সময় প্রথমে উঁচু দেখায়—তার শব্দ বেশি, বাহ্যিক চাকচিক্য বেশি, দাবি বেশি। কিন্তু ফেনার প্রকৃতি এই যে, তা ভরসা দেওয়ার মতো কিছু নয়; তা ফুলে ওঠে, তারপর মিলিয়ে যায়। আর যা সত্যিকার উপকারে আসে, তা নীরবে, গভীরভাবে, স্থির হয়ে থাকে। আল্লাহ এই উপমার মাধ্যমে শুধু প্রকৃতির একটি নিয়ম দেখান না; তিনি আমাদের অন্তরেরও একটি আইন জানিয়ে দেন—সত্যকে চেনার উপায় হলো তার স্থায়িত্ব, তার উপকারিতা, তার দিকনির্দেশ, তার জীবনদায়ী শক্তি।

এই আয়াতের বাহ্যিক পরিসর অনেক বড়: বৃষ্টি, স্রোত, ধাতু গলানো আগুন—সবই আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন। আর এর আধ্যাত্মিক পরিসর আরও গভীর: মানুষের জীবনেও কখনো সংকট নামে, কখনো পরীক্ষা আসে, কখনো সত্য-মিথ্যার সংঘাত তীব্র হয়। তখন মনে হয়, কে টিকে থাকবে? কে ভেসে যাবে? আল্লাহ বলে দেন, যা ফেনা, তা শুকিয়ে হারিয়ে যাবে; আর যা মানুষের জন্য উপকারী, তা পৃথিবীতে রয়ে যাবে। এই কথায় মুমিনের অন্তর প্রশান্ত হয়, কারণ সে বুঝে যায়—তাকদিরের নদীতে আল্লাহ বাতিলকে সাময়িক উঁচুতে তুললেও স্থায়ী আসন দেন না। স্থায়ী আসন শুধু সেই সত্যের, যা তিনি নিজে নাজিল করেছেন।

আল্লাহর এই উপমায় এক ভয়ংকর শান্তি আছে। বৃষ্টি নেমে এলে মাটি নড়ে, উপত্যকা জেগে ওঠে, স্রোত নিজের পরিমাণে বয়ে চলে; আর সেই স্রোতের মাথায় ভেসে ওঠে ফেনা—ফুলে ওঠা, চঞ্চল, উজ্জ্বল, কিন্তু অন্তঃসারশূন্য। মানুষের ইতিহাসও যেন এমনই। সত্য যখন নেমে আসে, তখন তার পথে বাধা, উত্তেজনা, প্রতিরোধ, উন্মাদনা—সবই উঠতে থাকে। বাতিলও ঠিক সেই ফেনার মতোই প্রথমে নিজেকে বড় দেখায়; সে শব্দ করে, চোখ ধাঁধায়, নিজের উচ্চতা নিয়ে গর্ব করে। কিন্তু তার গর্বের মধ্যে স্থায়িত্ব নেই। আল্লাহর সামনে যা টিকে না, মানুষের ভিড়েও তা টেকে না।

এই আয়াত আমাদের অন্তরকে এমন এক বিচারশক্তি দেয়, যেখানে বাহ্যিক জৌলুস আর অন্তর্নিহিত সত্য এক নয়। স্বর্ণ গলানোর আগুনেও ফেনা ওঠে; অর্থাৎ বিশুদ্ধ জিনিসকে পৃথক করতে গেলে অপ্রয়োজনীয় অংশ উপরে উঠেই আসে। জীবনেও তেমন। সংকট, পরীক্ষা, মতবিরোধ, সময়ের উত্তাপ—এসবের মধ্যে কে আসল আর কে নকল, কে উপকারী আর কে ক্ষণস্থায়ী, তা স্পষ্ট হয়ে যায়। তাই তাকদিরের প্রবাহে সবকিছু একসঙ্গে দেখা গেলেও, আল্লাহর হিকমত ভেতরে ভেতরে বেছে নেয়; যা মানুষের উপকারে আসে, তা মাটিতে থেকে যায়, গভীরে মিশে যায়, জীবনকে ধারণ করে। আর যা কেবল প্রদর্শন, তা শুকিয়ে যায়, ছড়িয়ে পড়ে, জফা হয়ে বিলীন হয়।
এখানেই কুরআনের ভাষা হৃদয়কে নরম করে দেয়। সত্যের শক্তি চিৎকারে নয়; তার শক্তি স্থায়িত্বে, বরকতে, উপকারে, আত্মার প্রশান্তি জাগানোর ক্ষমতায়। যে সত্য মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে, যে সত্য অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে, যে সত্য বান্দাকে ন্যায়, সংযম ও তাওহীদের দিকে টানে—সেই সত্যই জমিনে থাকে। আর বাতিল? সে যতই উঁচুতে উঠুক, তার পরিণতি ফেনার মতোই। এই আয়াত যেন আমাদের শেখায়: চোখে যা দেখা যায়, তা-ই চূড়ান্ত নয়; আল্লাহর কাছে চূড়ান্ত হলো সেই জিনিস, যা উপকার বয়ে আনে। অতএব, হৃদয়কে ফেনার প্রেম থেকে বাঁচাও, কারণ ফেনা মোহিত করে কিন্তু ধরে রাখতে পারে না। আর সত্যকে আঁকড়ে ধরো, কারণ সত্য নীরব হলেও সে-ই থাকে, বেঁচে থাকে, এবং একদিন সবকিছুর ওপর আল্লাহর হককে প্রতিষ্ঠিত করে।

আল্লাহ আমাদের সামনে এমন এক ছবি তুলে ধরেন, যেখানে ফেনা আর ফল একসাথে দেখা যায়, কিন্তু পরিণতি এক নয়। চোখে যে বেশি পড়ে, তা-ই যে বেশি সত্য—এমন ধারণাকে এই আয়াত ভেঙে দেন। অনেক কিছুই জীবনে এমনভাবে উথলে ওঠে, যেন সে-ই সবকিছু; কথার জোর, শক্তির দাপট, প্রচারের শব্দ, ভান করা গৌরব, ক্ষণিকের জৌলুস। কিন্তু ফেনার আয়ু অল্প। তা মুহূর্তের জন্য আকাশ ছুঁতে চায়, অথচ পরক্ষণেই ধসে পড়ে। মানুষও কখনও এমন ফেনার মতো হয়ে ওঠে—অন্তরে উপকার নেই, কিন্তু বাহিরে উচ্ছ্বাস আছে; সত্য নেই, কিন্তু শব্দ আছে; তাকওয়া নেই, কিন্তু প্রদর্শনী আছে। আর আল্লাহর সামনে এ সবের কোনো স্থায়ী ওজন নেই। তিনি দেখেন, কোনটা কেবল ভেসে উঠছে, আর কোনটা মানুষের উপকারে নীরবে জমে থাকছে।

এই আয়াত তাই আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার সামনে দাঁড় করায়। আমি কি ফেনার জীবন বাঁচছি, নাকি উপকারী সত্যের জীবন? আমার কথা কি শুধু উঁচু হয়ে ওঠে, নাকি হৃদয়ে আলো জ্বালে? আমার আমল কি কেবল বাহ্যিক ঝলক, নাকি আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য স্থায়িত্ব? সমাজও এ আয়াতের আয়নায় নিজেকে দেখতে পারে: যেখানে মিথ্যা বেশি চেঁচায়, সেখানে মানুষ দিশেহারা হয়; যেখানে সত্য কম কথা বলে কিন্তু জীবন বদলে দেয়, সেখানে পৃথিবী শান্তি পায়। কুরআনের পথ ঠিক এমনই—শব্দে নয়, প্রভাবে; দাবিতে নয়, হেদায়েতে; ফেনায় নয়, উপকারে। তাই যে হৃদয় নিজের রবের কাছে ফিরে যেতে চায়, সে বাহ্যিক উত্তেজনায় মোহিত হয় না। সে জানে, সব স্রোতের উৎস আল্লাহ, সব প্রবাহের পরিমাণও তাঁর নির্ধারিত, আর সব কিছুর শেষে থাকবে শুধু সেটাই—যা মানুষের কল্যাণে, আর আল্লাহর সন্তুষ্টিতে স্থির হয়ে থাকে।

আল্লাহর এই উপমা আমাদের অহংকারকে ভেঙে দেয়। আমরা কত কিছুকে সত্য ভেবে আঁকড়ে ধরি, কারণ তা চোখ ধাঁধানো, শব্দময়, মুহূর্তের জন্য জ্বলজ্বলে। কিন্তু বৃষ্টি থেমে গেলে ফেনা কোথায় থাকে? আগুনের উত্তাপে ওঠা ভাসা-ভাসা আবর্জনা কোথায় যায়? যা সত্যিই ভার বহন করে, যা মানুষের কাজে লাগে, তা-ই মাটিতে থেকে যায়; তা-ই জমিনকে উর্বর করে, ঘরকে উপকৃত করে, জীবনকে বাঁচায়। বাতিলের ভাগ্যে কেবল উঁচু হওয়া, তারপর মুছে যাওয়া। আর সত্যের ভাগ্যে নিঃশব্দে থাকা, গভীরে নেমে যাওয়া, সময়কে অতিক্রম করা। তাই ঈমান মানে শুধু বিশ্বাসের কথা বলা নয়; ঈমান মানে নিজের চোখের বিভ্রমের চেয়েও আল্লাহর দেখানো বাস্তবতাকে বড় মনে করা। এই আয়াত যেন অন্তরকে জিজ্ঞেস করে: তোমার জীবনে ফেনা বেশি, না উপকার বেশি? তোমার কথায়, তোমার ইচ্ছায়, তোমার আমলে, তোমার অন্তরের ভেতরে—কতটা আছে ক্ষণিকের জৌলুস, আর কতটা আছে স্থায়িত্বের সততা? আল্লাহ আকাশ থেকে যেমন পানি নামান, তেমনি তিনি হৃদয়ে হিদায়াতের আলো নামান; কিন্তু গ্রহণের পরিমাণ সবার এক নয়। কেউ তা দিয়ে আত্মাকে সজীব করে, কেউ তা উপেক্ষা করে নিজের ভেতরেই শুকিয়ে যায়। আজ তাই ফিরে আসতে হয়। যে কুরআন সত্যকে সত্য আর বাতিলকে বাতিল বলে দেয়, তার সামনে মাথা নত করতে হয়। হে আল্লাহ, আমাদের অন্তর থেকে ফেনার মতো অহংকার, প্রতারণা, ও ক্ষণিকের মোহ সরিয়ে দিন; আমাদের ভেতরে এমন সত্য স্থাপন করুন, যা মানুষের উপকারে আসে এবং আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য থাকে। আমরা যেন বুঝতে পারি—যা থাকে, তা আপনারই দেওয়া হক; আর যা যায়, তা ছিল কেবল ফাঁপা ভ্রম। আল্লাহ আমাদের সেই স্থায়ী সত্যের মানুষ করে দিন, যা শেষ পর্যন্ত জমিনে থাকে, আর আখিরাতে আলো হয়ে ওঠে। সত্যের সামনে আমাদের হৃদয় নরম হোক, তওবার সামনে আমাদের চোখ ভিজুক, আর ঈমানের সামনে আমাদের জীবন নত হোক।

article_lines_extra