“وَمَآ أَدْرَىٰكَ مَا هِيَهْ” — আপনি জানেন তা কি? এই প্রশ্নটি কেবল তথ্যের অভাব বোঝায় না; এটি মানুষের জ্ঞানের শেষ সীমায় দাঁড় করিয়ে দেয়। কিয়ামতের সত্য, তার কম্পন, তার বিচার, তার পরিণতি—এসব কোনো সাধারণ সংবাদ নয়, যা চোখে দেখে বা বুদ্ধিতে মেপে পুরো ধারণা করা যায়। আল্লাহ যেন এই আয়াতে হৃদয়ের দরজা খুলে দিয়ে বলেন: যা আসছে, তা তোমার কল্পনার চেয়েও বড়; তোমার অনুমান সেখানে পৌঁছাবে না, তোমার ভাষা সেখানে থেমে যাবে।

সূরা আল-কারিয়াহর আগের আয়াতগুলোতে মানুষকে এক মহা আঘাতের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে—সেদিন মানুষের অবস্থা ছড়িয়ে পড়বে, আমলের ওজন নির্ধারিত হবে, আর যার পাল্লা হালকা হবে তার ঠিকানা হবে হাবিয়া। এই দশম আয়াত সেই ভয়াবহ ধারাবাহিকতার এক চূড়ান্ত প্রশ্ন—এ যেন বলা হচ্ছে, তুমি কি বুঝতে পারছো তুমি কোন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আছো? মক্কি পরিবেশে এই সূরা নেমে এসেছে এমন এক সময়ে, যখন মানুষ দুনিয়াকে স্থায়ী ভেবে নিশ্চিন্ত ছিল; তাই কুরআন তাদের টেনে আনে সেই দিনটির দিকে, যেদিন সমস্ত আত্মপ্রবঞ্চনা ভেঙে পড়বে।

এখানে কোনো নির্দিষ্ট, নির্ভরযোগ্য শান-নুযূলের বর্ণনা প্রতিষ্ঠিত নয়; কিন্তু সূরার সামগ্রিক সুরই তার প্রেক্ষাপট। এটি মানুষের অবহেলিত অন্তরকে জাগায়, যেন সে কেবল দুনিয়ার শব্দে না ডুবে থাকে, বরং তার নিজের আমল, তার অন্তরের ওজন, আর তার শেষ গন্তব্যের কথা ভেবে কেঁপে ওঠে। ‘আপনি জানেন তা কি?’—এই প্রশ্ন আমাদের অহংকার ভেঙে দেয়, আমাদের জ্ঞানের উপর পর্দা টেনে দেয়, এবং মনে করিয়ে দেয়: কিয়ামতের সত্যকে হালকা করে দেখার উপায় নেই; তার প্রতিটি আঘাত, প্রতিটি হিসাব, প্রতিটি পরিণতি মানুষের চেনা জগতকে ছাড়িয়ে যায়।

এ প্রশ্নের ভেতরে শুধু অজানা নয়, আছে আল্লাহর সামনে মানুষের চিরন্তন অসহায়তা। মানুষ কত কিছু জানে বলে গর্ব করে; কিন্তু কিয়ামতের প্রকৃত রূপের সামনে তার জ্ঞান একফোঁটা আলোর মতোও নয়। যতই ধারণা করি, যতই কল্পনা সাজাই, তবু সেই দিনের ভয়াবহতা অনুমানের সীমানা ভেঙে বেরিয়ে আসে। সূরা আল-কারিয়াহ আমাদের এমন এক দরজার সামনে দাঁড় করায়, যেখানে বুদ্ধি থেমে যায়, ভাষা কেঁপে ওঠে, আর হৃদয় শুধু অনুভব করে—আমি যে জগতে এত নিশ্চিন্ত ছিলাম, তার ভিতরে আসছে এমন এক সত্য, যার ভার বহন করার মতো শক্তি আমার নেই।

এই আয়াত যেন মানুষের ঘুম ভাঙানোর জন্য নাজিল হওয়া এক গভীর ধমক। যে জীবনকে আমরা সাধারণ মনে করি, যে আমলকে তুচ্ছ ভাবি, যে হিসাবকে দূরে সরিয়ে রাখি—সেই সবকিছুই সেদিন হঠাৎ করে প্রকাশিত হবে। দাঁড়িপাল্লা তখন কেবল প্রতীক থাকবে না; তা হবে ন্যায়ের চূড়ান্ত ঘোষণা, যেখানে দুনিয়ার ভণ্ডামি, আত্মপ্রবঞ্চনা, গোপন গুনাহ, এবং নীরব সওয়াব—সবকিছু আল্লাহর জ্ঞানের সামনে উন্মোচিত হবে। আর যে হৃদয় আজ আল্লাহকে স্মরণ করে না, তার জন্য এই প্রশ্নটি আরও কাঁপনধরা: তুমি কি সত্যিই জানো, সামনে কী আসছে?
এই জ্ঞানহীনতার মধ্যেই আমাদের জন্য আছে সবচেয়ে বড় শিক্ষা। মানুষ জানে না বলে আল্লাহকে অস্বীকার করার অধিকার পায় না; বরং না-জানার এই বোধই তাকে বিনীত করে, তার অহংকার ভেঙে দেয়, এবং তাকে তাওবার দিকে টেনে আনে। কিয়ামত এমন এক বাস্তবতা, যাকে মানুষের কল্পনা ধারণ করতে পারে না, কিন্তু ঈমান তার সামনে নতি স্বীকার করতে জানে। তাই এই আয়াত শুধু ভয় দেখায় না, পথও দেখায়—নিজেকে এখনই জাগাও, আমলকে ভারী করো, অন্তরকে শুদ্ধ করো, কারণ যেদিন সত্য উন্মোচিত হবে, সেদিন প্রশ্ন থাকবে না, থাকবে কেবল ফলাফল।

وَمَآ أَدْرَىٰكَ مَا هِيَهْ—আপনি জানেন তা কি? এই প্রশ্নে যেন মানুষের সমস্ত ধারণা থমকে দাঁড়ায়। আল্লাহ তাআলা এখানে শুধু একটি অজানা বিষয়ের সংবাদ দিচ্ছেন না; তিনি হৃদয়কে জানিয়ে দিচ্ছেন, কিয়ামতের বাস্তবতা এমন এক ভয়াবহতা, যা মানুষের ভাষা, অনুমান, অভ্যাস, এমনকি কল্পনার সীমাকেও অতিক্রম করে। আমরা দুনিয়ায় যা দেখি, যা মাপি, যা বুঝি—তার সবই সেদিনের সামনে ছোট হয়ে যাবে। এই আয়াত আমাদের অহংকার ভেঙে দেয়, কারণ মানুষ যতই জানুক, সে এখনও অজানার দ্বারপ্রান্তেই দাঁড়িয়ে থাকে।

সূরা আল-কারিয়াহর আগের আয়াতগুলোতে মানুষকে দেখানো হয়েছে—মহা আঘাতে সবকিছু ছিটকে পড়বে, আমল দাঁড়িপাল্লায় ওঠানামা করবে, আর যার নেকির ভার কম, তার পরিণতি হবে হাবিয়া। এই দশম আয়াত যেন সেই দৃশ্যের সামনে এক নীরব বজ্রধ্বনি: তুমি কি জানো, তুমি আসলে কোন দিনের কথা শুনছ? যেদিন দুনিয়ার শ্রেণিবিভাগ, মর্যাদা, সম্পদ, পদ, পরিচয়—সবই অর্থহীন হয়ে যাবে, সেদিন একমাত্র সত্য হবে মানুষের আমল। তাই এই প্রশ্ন আমাদেরকে আতঙ্কিত করার জন্য নয়, জাগিয়ে তোলার জন্য; যেন আমরা এখনই নিজের হিসাব শুরু করি, নিজের অন্তরকে যাচাই করি, আর আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিই।

কিয়ামতের কথা স্মরণ মানে শুধু ভয় পাওয়া নয়, ফিরে আসার ডাক শোনা। এই অজ্ঞতার সীমা আমাদের শেখায়: যে রব আজ আমাদের আড়াল থেকে দেখছেন, কাল তাঁর সামনে কিছুই লুকোনো থাকবে না। সুতরাং যে হৃদয় আজ কাঁপে, সে হৃদয়ই হয়তো তাওবার আলো পাবে; আর যে হৃদয় এখনও গাফেল, তার জন্য এই আয়াত একটি করুণ দরজা খুলে দেয়। আমরা যেন নিজেদের আমলকে হালকা না করি, মানুষের প্রশংসায় ধোঁকা না খাই, আর দুনিয়ার শব্দে আখিরাতকে বিস্মৃত না হই। কারণ আল্লাহ যেদিন বলবেন, তুমি জানো তা কি?—সেদিন জবাব দিতে পারবে না জ্ঞান, শুধু কাজই কথা বলবে।

“وَمَآ أَدْرَىٰكَ مَا هِيَهْ”—আপনি জানেন তা কি? এই এক প্রশ্নে মানুষের সব অহংকার স্তব্ধ হয়ে যায়। যে জ্ঞান নিয়ে আমরা পৃথিবীর পথে হাঁটি, যে বুদ্ধি দিয়ে হিসাব মেলাই, যে অভিজ্ঞতাকে নিরাপত্তা ভেবে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরি—তার সবই কিয়ামতের সামনে এসে কেঁপে ওঠে। আল্লাহ যেন জানিয়ে দেন, সেই দিনের বাস্তবতা কোনো কল্পনার উপকরণ নয়, কোনো গল্পের দৃশ্য নয়; তা এমন এক ভয়, যার গভীরতা জানার আগেই হৃদয় হিম হয়ে যায়। মানুষ অনেক কিছু জানে, কিন্তু সবচেয়ে জরুরি সত্যটির সামনে সে কত অজ্ঞ—এই আয়াত সেই অজ্ঞতাকে প্রকাশ করে দেয়।
সূরা আল-কারিয়াহ আমাদের কেবল ভয় দেখায় না; আমাদের জাগিয়ে তোলে। মহা আঘাতের পর আমল ওজন হবে, এবং যার পাল্লা হালকা হবে তার গন্তব্য হবে হাবিয়া। এই আয়াতের প্রশ্ন তাই শুধু পরকাল সম্পর্কে নয়; এটি আমাদের আজকের জীবনকেই প্রশ্ন করে—আমাদের ভেতরে কি এমন কিছু আছে, যা দাঁড়িপাল্লায় ভার হয়ে উঠবে? না কি আমরা কেবল বাহ্যিক নিরাপত্তার ছায়ায় বাঁচছি, অথচ অন্তরে নেকির দীপ্তি জমছে না? যে হৃদয় আল্লাহকে ভুলে গিয়ে নিজেকে বড় ভেবে ফেলে, সে আসলে সবচেয়ে ছোট; আর যে হৃদয় ভয়ে, তওবায়, বিনয়ে আল্লাহর সামনে নত হয়, সে-ই সত্যিকার নিরাপদ।
তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করার কিছু নেই, আছে কেবল চোখ নত করা। আজই নিজের আমলকে দেখে নেওয়ার সময়—নামাজ, তওবা, হালাল-হারাম, মানুষের হক, গোপন পাপ, প্রকাশ্য উদাসীনতা—সবকিছুই সেই অদৃশ্য মিজানের সামনে একদিন উপস্থিত হবে। আল্লাহ আমাদের এমন হৃদয় দিন, যা এই প্রশ্ন শুনে পাথর হয় না, বরং নরম হয়ে যায়; এমন আত্মা দিন, যা মৃত্যুকে ভুলে থাকে না, আখিরাতকে দূরে ঠেলে না, এবং হাবিয়ার ভয়কে উপেক্ষা করে না। কারণ শেষ পর্যন্ত যে জিনিসটি মানুষকে রক্ষা করবে, তা ধন নয়, নাম নয়, কেবল আল্লাহর রহমতে ভেজা সত্যিকার ঈমান ও সংশোধিত আমল।