“তারা বলে, তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে বলো, এই ওয়াদা কখন পূর্ণ হবে?”—এই একটিমাত্র প্রশ্নে কত বড় এক অন্তরের রোগ ধরা পড়ে। প্রশ্নটি যেন জানতে চাওয়ার ভঙ্গিতে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তা তাচ্ছিল্য, অস্বীকার, আর সত্যকে দেরির অজুহাতে খাটো করে দেখার এক কৌশল। মানুষ যখন আখিরাতকে দূরে ঠেলে দেয়, তখন সে আল্লাহর ওয়াদাকেও সময়ের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। কিন্তু আল্লাহর ওয়াদা মানুষের ঘড়ির বশে চলে না; তা সত্য, তা অবশ্যম্ভাবী, তা নির্ধারিত—শুধু মানুষের জানা নেই কখন, কারণ জানা না-জানার মধ্যে পার্থক্য আছে, আর বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মধ্যে আরও গভীর পার্থক্য আছে।

সূরা আন-নামলের বিস্তৃত ধারায় এই আয়াতটি যেন কুরআনিক এক চূড়ান্ত জাগরণবাণীর অংশ। এখানে কেবল আখিরাতের কথা নয়, বরং তাওহীদের সেই দৃঢ় ভিত্তির কথাও মনে করিয়ে দেওয়া হয়, যার উপর পুরো সূরাটি দাঁড়িয়ে আছে—আল্লাহর নিদর্শন, সুলায়মান আলাইহিস সালামের বিস্ময়কর কর্তৃত্ব, পিঁপড়ার সূক্ষ্ম জগতে থাকা ইশারা, সাবার কাহিনিতে প্রকাশিত ক্ষমতার সীমা, আর সব কিছুর ওপরে একমাত্র উপাস্যের কর্তৃত্ব। যে হৃদয় এসব নিদর্শন দেখে তবু অন্ধ থাকে, সে-ই আবার শেষ বিচারের ওয়াদাকেও বিদ্রূপের প্রশ্নে নামিয়ে আনে। অথচ এই প্রশ্নের জবাব প্রশ্নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে: যদি তিনি সত্যবাদী হন—অর্থাৎ যদি সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানো হয়—তবে জানা যাবে, আল্লাহর খবর কখনো খেলাচ্ছলে উচ্চারিত হয় না।

ঐতিহাসিকভাবে এই ধরনের বাক্য মক্কার মুশরিক মানসিকতার সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যায়—যারা পুনরুত্থান, বিচার, পুরস্কার-শাস্তির সংবাদ শুনে তড়িঘড়ি করে তারিখ জানতে চাইত, যেন সত্যকে মাপা যায় কেবল বিলম্ব আর তাড়াহুড়োর মানদণ্ডে। কিন্তু কুরআন মানুষের কৌতূহলকে নরমভাবে নয়, ন্যায়ের কঠোরতায় শোধরায়: সত্যের কাজ সময় বোঝানো নয়, হৃদয় জাগানো। তাই এই আয়াত আমাদের শেখায়, ওয়াদার দেরি দেখে যারা হতাশ হয় তারা মূলত ওয়াদার মালিককে বুঝতে পারেনি। আল্লাহ যখন প্রতিশ্রুতি দেন, তখন তা অনিশ্চয়তার ভাষা নয়; তা নিশ্চিত বাস্তবতা—শুধু একদিন মানুষ তার নিজের অস্বীকারের সামনে লজ্জিত হয়ে দেখবে, যে কথাকে সে উপহাস করেছিল, সেটাই ছিল সর্বাধিক সত্য।

কিন্তু লক্ষ্য করুন, এই প্রশ্ন কেবল সময় জানার কৌতূহল নয়; এর ভেতরে আছে হৃদয়ের এক গোপন বিদ্রূপ। সত্যকে যখন মানুষ মানতে চায় না, তখন সে সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে তারিখ চায়, তারিখ না পেলে তাচ্ছিল্যকে ঢাল বানায়। আল্লাহর ওয়াদাকে সে দূরের কোনো ঘটনা মনে করে, যেন দেরি মানেই অস্বীকারের সুযোগ। অথচ মানুষের অস্থির মন যাকে “বিলম্ব” ভাবে, আল্লাহর হিকমত সেখানে থাকে নিখুঁত মাপে। আকাশের নক্ষত্র, জমিনের নিদর্শন, সুলায়মানের রাজত্ব, পিঁপড়ার ক্ষুদ্র ভাষা, সাবার উত্থান-পতন—সবই বলে দেয়, সৃষ্টিজগত নিজে নিজে নয়; এটি একমাত্র রবের ইচ্ছায় চলে। যে রব এত সূক্ষ্মভাবে সবকিছু পরিচালনা করেন, তাঁর ওয়াদা কি অনিশ্চিত হতে পারে?

এই আয়াতের ভেতর দাঁড়িয়ে মানুষ নিজেরই অন্তর্দ্বন্দ্ব শুনতে পায়। মুখে সে বলে, “কখন?” কিন্তু অন্তরে সে বলতে চায়, “হয়তো কখনোই নয়।” এই সন্দেহের অন্ধকারই সত্য অস্বীকারের সবচেয়ে পরিচিত রূপ। কুরআন আমাদের শেখায়, আখিরাত কোনো কল্পকাহিনি নয়; এটি তাওহীদের অবিচ্ছেদ্য পরিণতি। যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনিই বিচার করবেন। যিনি জীবন দিয়েছেন, তিনিই ফিরিয়ে নেবেন। যিনি প্রতিটি গোপনকে জানেন, তিনিই প্রকাশ্য দিনের হিসাব নেবেন। তাই আল্লাহর ওয়াদা নিয়ে প্রশ্ন করা মানে কেবল ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রশ্ন করা নয়; বরং নিজের আত্মাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো—আমি কি সত্যের জন্য প্রস্তুত, নাকি শুধু সময়ের আড়ালে পালিয়ে বেড়াচ্ছি?
সূরা আন-নামলের এই ধারায় আয়াতটি আমাদের কাঁপিয়ে দেয়, কারণ এটি বাহ্যিক প্রশ্নের আড়ালে লুকানো আত্মিক রোগকে উন্মোচন করে। যারা আল্লাহর নিদর্শন দেখেও চিন্তা করে না, তারা শেষ পর্যন্ত ওয়াদার সময় নিয়েই ব্যস্ত থাকে; আর যারা অন্তর দিয়ে দেখে, তারা প্রশ্ন করে না কখন, বরং জিজ্ঞেস করে কীভাবে আমি প্রস্তুত হব। এটাই ঈমানের জাগরণ: যখন মানুষ সময়ের হিসাব ছেড়ে দেয় এবং আস্থার পথে ফিরে আসে। আল্লাহর ওয়াদা দেরি করে না; মানুষই বরং গাফিল হয়ে পড়ে। আর যে হৃদয় কুরআনের সামনে নরম হয়, সে বুঝে যায়—এই জগতের সব বিস্ময়, সব ক্ষমতা, সব ক্ষুদ্রতা ও সব মহত্ত্ব একটিই সত্যের দিকে ইশারা করছে: মালিক এক, হাকিম এক, এবং তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতি অবশ্যম্ভাবী।

তারা বলে, “এই ওয়াদা কখন পূর্ণ হবে?”—এ প্রশ্নে শুধু কৌতূহল নেই; আছে তাচ্ছিল্যের ধুলো, আছে অন্তরের কঠোরতা, আছে সেই আত্মিক অন্ধতা, যা সত্যকে দূরে সরিয়ে রেখে নিজেকেই নিরাপদ ভাবতে চায়। মানুষ যখন আখিরাতকে বিশ্বাসের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেয়, তখন আল্লাহর প্রতিশ্রুতিও তার কাছে হয়ে ওঠে উপহাসের বিষয়। কিন্তু মুমিন জানে, আল্লাহর ওয়াদা কোনো দুর্বল উচ্চারণ নয়; তা এমন এক সত্য, যা সময়কে অতিক্রম করে, আর মানুষের অবজ্ঞা দিয়ে যার কোনো ক্ষতি হয় না।

সূরা আন-নামলের বিস্তৃত আলোকধারায় এই প্রশ্ন যেন আরও গভীরভাবে কেঁপে ওঠে। এখানে সুলায়মান আলাইহিস সালামের রাজত্বও আল্লাহর নিদর্শন, পিঁপড়ার ক্ষুদ্র জগৎও আল্লাহর হিকমত, সাবার গৌরবও আল্লাহর সামনে তুচ্ছ, আর কুরআনের প্রতিটি ইঙ্গিতও একটিই ঘোষণার দিকে ডাকে—সার্বভৌমত্ব একমাত্র তাঁর। যে মানুষ এসব নিদর্শন দেখেও জেগে ওঠে না, সে পরকালকেও “কবে”র প্রশ্নে নামিয়ে আনে। কিন্তু আল্লাহর ফয়সালা মানুষের অস্থির জিজ্ঞাসার অধীন নয়; তিনি দেরি করান বলেই হয়তো বান্দাকে সময় দেন, যাতে সে ফিরে আসে, কাঁদে, তাওবা করে, এবং নিজের অন্তরের ভেতর জমে থাকা অস্বীকারকে চিনে ফেলে।

এই আয়াত আমাদেরও থামিয়ে জিজ্ঞেস করে—আমি কি সত্যিই আল্লাহর ওয়াদায় বিশ্বাসী, নাকি আমি শুধু দূরের সত্যকে নিয়ে কথা বলি? আখিরাত যখন স্মরণে আসে, তখন মুমিনের অন্তর কেঁপে ওঠে; সে আনন্দিতও হয়, আবার ভয়ও পায়, কারণ সে জানে ফিরে যাওয়ার দিনটি কল্পনা নয়। আজকের সমাজে মানুষ সবকিছুর সময় জানতে চায়, সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, কিন্তু মৃত্যু, হিসাব, পুনরুত্থান—এসবই সেই সীমা, যেখানে মানুষের সব জ্ঞান নত হয়ে যায়। তাই এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সময়ের সংখ্যা নয়; উত্তর হলো তাওবার ডাক, আত্মসমালোচনার ডাক, এবং সেই দোরগোড়ায় ফিরে আসা, যেখানে আল্লাহর ওয়াদা ভয়ংকরও, আবার আশ্রয়ও।

কিন্তু মানুষের প্রশ্ন যদি শেষ পর্যন্ত এই জায়গাতেই এসে দাঁড়ায়—“এই ওয়াদা কখন পূর্ণ হবে?”—তবে বুঝতে হবে, প্রশ্নের মধ্যে কৌতূহলের চেয়ে অস্বীকারের জেদ বেশি। যে হৃদয় আল্লাহর নিদর্শনে নরম হয় না, সে আখিরাতের কথাতেও শান্ত হয় না; সে শুধু সময় জানতে চায়, যাতে সত্যকে আরও একটু পিছিয়ে দিতে পারে, আর নিজের গাফিলতিকে একটু আরাম দিতে পারে। অথচ সময়ের মালিক তো মানুষ নয়। পৃথিবীর প্রতিটি সকাল, প্রতিটি মৃত্যু, প্রতিটি নিঃশ্বাস আমাদের শেখায়—ওয়াদা দূরে নয়, আমরা বরং তার সত্যকে অনুভব করার মতো জাগ্রত নই। আল্লাহ যখন বলেন, তখন তা শুধু সংবাদ থাকে না; তা হয়ে দাঁড়ায় সৃষ্টির বুকের উপর অদৃশ্য কিন্তু অবশ্যম্ভাবী সত্য।

এই সূরার ভেতর সুলায়মান আলাইহিস সালামের জ্ঞান, পিঁপড়ার ক্ষুদ্র জগতে আল্লাহর কুদরত, সাবার উত্থান-পতন, আর কুরআনের আহ্বান—সব মিলিয়ে যেন একটিই শিক্ষা: একমাত্র আল্লাহই হক্কানি, একমাত্র তিনিই শক্তির, জ্ঞানের, হুকুমের, ও প্রত্যাবর্তনের মালিক। তাই আজ এই আয়াত আমাদেরকে প্রশ্ন করতে শেখায় না, জাগতে শেখায়। “কবে?”—এ প্রশ্নের উত্তরের চেয়ে বড় প্রয়োজন হলো “আমি প্রস্তুত কি না?” এই মুহূর্তে যদি অন্তর নরম হয়, যদি তওবা জাগে, যদি তাওহীদের সামনে অহংকার গলে যায়, তবে দেরির হিসাবও রহমতে বদলে যেতে পারে। আর যদি হৃদয় কঠিনই থাকে, তবে সময় জানলেও লাভ কী? আল্লাহর ওয়াদা সত্য, এবং তাঁর ডাকে ফিরে আসাই মুক্তি।