আল্লাহ তাআলা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, তিনি সামুদ জাতির কাছে তাদেরই একজনকে—সালেহ (আ.)-কে—প্রেরণ করেছিলেন এই মহান, সরল, কিন্তু জীবন-উল্টে দেওয়া আহ্বান নিয়ে: তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত কর। নবীর মুখ থেকে এই ডাক কোনো নতুন দর্শন ছিল না, কোনো জটিল তত্ত্বও নয়; এটি ছিল মানুষের স্বভাবের গভীরে গেঁথে থাকা সত্যকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান। যে সত্যে সৃষ্টির সবকিছু ফিরে আসে, সেই সত্যের নাম তাওহীদ। আর কুরআন যখন এই ঘটনা স্মরণ করায়, তখন তা শুধু ইতিহাস বলে না—আমাদের হৃদয়কে প্রশ্ন করে, আজ আমি কার সামনে নত হচ্ছি?

কিন্তু এই আহ্বানের সামনে মানুষের প্রতিক্রিয়া এক হয়নি। আয়াতটি বলে, অতঃপর তারা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে বিতর্কে প্রবৃত্ত হল। এ বিভক্তি শুধু মতের পার্থক্য ছিল না; এটি ছিল হৃদয়ের অবস্থান, অহংকারের চূড়ান্ত প্রকাশ। একদল সত্যকে চিনে নিলেও তা গ্রহণ করল, আরেকদল প্রভাব, অভ্যাস, ক্ষমতা কিংবা আত্মম্ভরিতার কারণে বিরোধিতায় দাঁড়াল। আল্লাহর ডাকে হৃদয় নরম হয়; কিন্তু যখন মানুষ নিজের নফসকে কেন্দ্র বানায়, তখন সে সত্যের আলোতেও ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।

সামুদের কাহিনি এভাবেই কুরআনে বারবার ফিরে আসে, কারণ এটি কেবল একটি মৃত জাতির স্মৃতি নয়; এটি জীবন্ত এক সতর্কবাণী। সমাজে যখন আল্লাহর ইবাদতের ডাক আসে, তখন সেই ডাক মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করায়, কিন্তু একই সঙ্গে প্রকাশ করে দেয় কার অন্তর সত্যের দিকে ঝুঁকে আছে আর কার অন্তর মতভেদ ও প্রতিরোধকে বেছে নিয়েছে। তাই এই আয়াত আমাদের শেখায়—তাওহীদ কোনো বাহ্যিক স্লোগান নয়, বরং অন্তরের ভাঙন থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর সামনে একনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ানো। যারা সত্যের আহ্বানকে গ্রহণ করে, তারা বিচ্ছিন্ন হয় না; বরং তারা আল্লাহর রহমতে একত্র হয়। আর যারা অহংকারকে বেছে নেয়, তাদের ভেতরেই জন্ম নেয় বিভক্তি, তর্ক, এবং শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের বীজ।

আল্লাহ তাআলা যখন বলেন, সালেহ (আ.)-কে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে পাঠানো হয়েছিল এই ঘোষণা নিয়ে—“তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর”—তখন এ এক নবীসুলভ আহ্বানের চিরন্তন মহিমা আমাদের সামনে খুলে যায়। ভাষা সোজা, দাবি স্পষ্ট, পথ একটাই: মানুষের বানানো অন্ধকার থেকে বের হয়ে স্রষ্টার দিকে ফেরা। নবীদের ডাক কখনো জটিলতার ভারে সত্যকে আড়াল করে না; বরং সত্যকে এমনভাবে উন্মুক্ত করে যে, যে হৃদয় জীবিত, সে যেন তৎক্ষণাৎ বুঝে যায়—এটাই তার মূল ঠিকানা, এটাই তার মুক্তি।

কিন্তু কুরআন সঙ্গে সঙ্গেই আরেকটি কঠিন বাস্তবতা জানিয়ে দেয়: তারা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেল, মতবিরোধে জড়িয়ে পড়ল। এখানে বিভক্তি কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক মতভেদ নয়; এটি অন্তরের পরীক্ষা। একই নিদর্শন চোখের সামনে, একই সত্যের আহ্বান কানে, তবু কেউ মাথা নোয়ায়, কেউ বুক শক্ত করে দাঁড়িয়ে যায়। অহংকার মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরায়, আর বিনয় তাকে আলোর দিকে টানে; তাই অনেক সময় ফয়সালা হয় না যুক্তির ঘাটতিতে, ফয়সালা হয় হৃদয়ের ব্যাধিতে।
এই আয়াত আমাদেরও নীরবে জিজ্ঞেস করে: আমি কি আল্লাহর ডাকে একমুখী হচ্ছি, নাকি নিজের রুচি, অভ্যাস, গৌরব আর গোষ্ঠীবোধ আমাকে খণ্ডিত করে দিচ্ছে? তাওহীদের আহ্বান আজও ঠিক তেমনই তীক্ষ্ণ, তেমনই নির্মল, তেমনই অবিচল। কুরআন যখন কোনো জাতির ইতিহাস স্মরণ করায়, তখন তা শুধু অতীতের ধ্বংসাবশেষ দেখায় না; আমাদের বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা সামান্য অহংকার, সামান্য জেদ, সামান্য আত্মপ্রবঞ্চনাকেও নাড়িয়ে দেয়। কারণ সত্যের সামনে মানুষ একদিন অবশ্যই দুইভাগে বিভক্ত হয়—যারা সিজদার দিকে এগোয়, আর যারা তর্কের ধুলোতে হারিয়ে যায়।

আল্লাহ তাআলা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, তিনি সামুদ জাতির কাছে তাদেরই একজন ভাই সালেহ (আ.)-কে পাঠিয়েছিলেন এই একমাত্র সত্যের ডাক নিয়ে—আল্লাহরই ইবাদত কর। নবীর আহ্বান মানুষের হৃদয়ে পৌঁছালে তা কেবল একটি কথা থাকে না; তা হয়ে ওঠে আত্মার সামনে দাঁড়ানো এক আয়না। সেখানে মানুষ নিজের আসল রূপ দেখে—কে আল্লাহর দিকে ঝুঁকে আছে, আর কে অভ্যাস, অহংকার, বংশগৌরব কিংবা স্বার্থের অন্ধকারে বন্দি। তাওহীদের ডাক সব সময়ই সহজ, কিন্তু তার সামনে নত হওয়া সহজ নয়; কারণ নত হতে হলে মানুষকে আগে নিজের মিথ্যা প্রভুদের সিংহাসন ভাঙতে হয়।

অতঃপর তারা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে বিতর্কে প্রবৃত্ত হল—এই বাক্যটি শুধু এক জাতির ইতিহাস নয়, বরং মানবসমাজের চিরচেনা মানসিকতার ছবি। সত্য যখন আসে, তখন মানুষ একসঙ্গে এক কাতারে দাঁড়ায় না; কেউ সত্যকে আলিঙ্গন করে, কেউ তাকে ঘিরে প্রশ্ন তোলে, কেউ সন্দেহকে আশ্রয় করে, আর কেউ প্রকাশ্য বিরোধিতায় দাঁড়িয়ে যায়। সমাজের বিভক্তি অনেক সময় মতের নয়, বরং হৃদয়ের; বাইরে একই ভাষা, একই ভূমি, একই সম্পর্ক থাকলেও ভেতরে কেউ আল্লাহর ডাকে, কেউ নিজের নফসের ডাকে সাড়া দেয়। এ আয়াত আমাদের সামনে সেই নীরব কিন্তু ভয়ংকর বাস্তবতা তুলে ধরে—আল্লাহর কথা শুনেও মানুষ বিভক্ত হতে পারে, যদি তার অন্তর সত্য গ্রহণের জন্য প্রস্তুত না থাকে।

এইজন্য কুরআন আমাদের কেবল অতীত শোনায় না, নিজের অবস্থানও দেখায়। আজও সালেহ (আ.)-এর সেই আহ্বান আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে: তুমি কার ইবাদত করছ? কার সন্তুষ্টিকে জীবনের মানদণ্ড বানিয়েছ? কার সামনে তোমার অন্তর নত, আর কার কথা শুনলে তুমি কেঁপে ওঠো? যে হৃদয় আল্লাহর ইবাদতে ফিরে আসে, তার জন্য এ ডাক আশা; আর যে হৃদয় অহংকারে কঠিন, তার জন্য এ ডাক সতর্কবার্তা। মুমিনের জন্য এই আয়াত তাই ভয়েরও, আশারও—ভয় এই কারণে যে, সত্য জেনেও বিভক্তদের কাতারে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে; আর আশা এই কারণে যে, আল্লাহর দিকে ফিরে আসা কখনো দেরি হয়ে যায় না। মানুষের বিতর্ক থেমে যায়, সমাজের মুখোশ ভেঙে পড়ে, কিন্তু আল্লাহর তাওহীদের আহ্বান চিরকাল একই থাকে—আর আত্মা একদিন না একদিন সেই ডাকের দিকেই ফিরে যেতে চায়।

সালেহ (আ.)-এর ডাক ছিল খুবই সোজা, কিন্তু মানুষের অন্তর ছিল জটিল। আল্লাহর ইবাদতের এই আহ্বান তাদের সামনে এসে দাঁড়াল, আর সেখানেই প্রকাশ পেল কার হৃদয় সত্যের জন্য প্রস্তুত, আর কার হৃদয় কেবল নিজের অভ্যাস, অহংকার, কিংবা লোকচক্ষুর কাছে বন্দী। কুরআন যেন আমাদেরও থামিয়ে দেয়—যখন আল্লাহর বাণী আমাদের কাছে আসে, আমরা কি সত্যের সামনে নত হই, নাকি তর্কের আড়ালে নিজেদের অস্বীকারকে সাজাই? কখনো বিভক্তি বাইরের নয়; তা আগে জন্ম নেয় বুকে। মানুষ যখন নিজের ইচ্ছাকেই মানদণ্ড বানায়, তখন একই সত্যের সামনে কেউ সিজদায় ঝুঁকে পড়ে, কেউ দূরে সরে গিয়ে কথার যুদ্ধ শুরু করে।
এই আয়াতের নিঃশব্দ শাসন বড় কঠিন। নবীর আহ্বান আসলে তা প্রথমে হৃদয়কে আলোকিত করতে চায়, দল গড়তে নয়; কিন্তু মানুষই তাকে পক্ষ-বিপক্ষের মাপে ভেঙে ফেলে। সামুদের ইতিহাস আমাদের কাছে কেবল এক জাতির কাহিনি নয়; এটি সেই সব হৃদয়ের আয়না, যারা আল্লাহর নিদর্শন দেখেও আত্মঅহংকারকে ছাড়তে পারে না। তাওহীদ কোনো তর্কের বিষয় নয়—এটি সৃষ্টির শিরা-উপশিরায় বয়ে যাওয়া একমাত্র সত্য। আর যে সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ বিভক্ত হয়, সে বিভক্তি আসলে প্রমাণ করে যে, তার অন্তর এখনো আল্লাহর দিকে পুরোপুরি ফেরেনি।
হে অন্তর, আজ তোমার ভেতরেও কি সেই দ্বিধা নেই? তুমি কি আল্লাহর ডাকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছ, নাকি নফসের স্বরে ভাগ হয়ে গেছ? সালেহ (আ.)-এর আহ্বান আজও বাতাসের মতো এসে লাগে—আল্লাহর ইবাদত করো। এই আহ্বানেই মুক্তি, এই আহ্বানেই একত্ব, এই আহ্বানেই প্রাণের বিশ্রাম। যে ব্যক্তি নিজের ভাঙন দেখতে পায়, তার জন্য তাওবা এখনো দরজা খোলা রেখে দেয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সামনে নিজেকে ছোট করে, তার জন্য সত্য আর দূরের কিছু থাকে না। কুরআনের এই আয়াত আমাদের কাঁপিয়ে দিয়ে বলে: বিতর্ক দিয়ে নয়, সমর্পণ দিয়ে বাঁচো; পক্ষপাত দিয়ে নয়, সত্য দিয়ে দাঁড়াও; আর সবশেষে সেই এক রবের দিকে ফিরে যাও, যাঁর ইবাদতই সৃষ্টির আসল পরিচয়।