সূরা আন-নামলের এই আয়াতে এক বিস্ময়কর মুহূর্তের দরজা খুলে যায়। সুলায়মান আলাইহিস সালামের দরবারে এমন এক ব্যক্তি কথা বলেন, যাঁর কাছে কিতাবের কিছু জ্ঞান ছিল। তিনি বলেন, আপনি চোখের পলক ফেলার আগেই আমি তা আপনার কাছে এনে দেব। কত অল্প শব্দ, কিন্তু তার ভেতরে যেন আল্লাহর কুদরতের এক নীরব বজ্রধ্বনি। মানুষের সীমা যেখানে শেষ, আল্লাহর অনুমতিতে সেখানে শুরু হয় অদৃশ্য জগতের বিস্তার। এই আয়াত আমাদের শিখিয়ে দেয়, কারণের পৃথিবী যতই বড় হোক, মুমিন কখনো কারণকে উপাস্য বানায় না; সে জানে, সব কারণের ওপরে আছেন কারণ-স্রষ্টা আল্লাহ।
এখানে নির্দিষ্ট কোনো আলাদা শানে নুযুলের বর্ণনা নেই; বরং এটি সুলায়মান ও সাবার কাহিনির ভেতরের একটি জীবন্ত পর্ব। কুরআন কোনো কল্পকাহিনি শোনাচ্ছে না, বরং এমন এক ঘটনা তুলে ধরছে যেখানে রাজত্ব, জ্ঞান, শক্তি, এবং অলৌকিক সহায়তা—সবকিছুই আল্লাহর বিধানের অধীন। এই অংশে মানুষের জ্ঞান নিজেই বিনয়ের ছায়ায় দাঁড়িয়ে যায়। যে ব্যক্তি কিতাবের কিছু জ্ঞান পেয়েছে, সে নিজের শক্তির ঘোষণা দেয় না; সে এমনভাবে সক্ষমতার কথা বলে, যেন তা আল্লাহর ইচ্ছারই এক ক্ষীণ প্রতিফলন।
আর সুলায়মান আলাইহিস সালামের প্রতিক্রিয়া আরও গভীর। তিনি বস্তুটি উপস্থিত দেখে বলেন, এটি আমার রবের অনুগ্রহ, আমাকে পরীক্ষা করার জন্য—আমি কৃতজ্ঞ হই, না অকৃতজ্ঞ হই। এখানেই আয়াতের হৃদয়। নিয়ামত পেয়ে মানুষ সাধারণত উত্তেজিত হয়, কিন্তু নবী-শিক্ষা হলো শান্তি, স্বীকৃতি, এবং শোকর। শোকর মানে শুধু মুখে ধন্যবাদ নয়; শোকর মানে নিয়ামতকে দাতার দিকে ফিরিয়ে দেখা। আর অকৃতজ্ঞতা মানে নিয়ামতকে নিজের যোগ্যতা ভাবা। তাই আল্লাহ বলেন, যে কৃতজ্ঞ হয় সে নিজেরই উপকার করে, আর যে অকৃতজ্ঞ হয়, তার রব তো অভাবমুক্ত, কৃপাশীল। মানুষের কৃতজ্ঞতায় আল্লাহর মহিমা বাড়ে না, আর মানুষের অকৃতজ্ঞতায় তাঁর রাজত্বে কোনো ঘাটতিও আসে না; বরং এই আয়াতের ভেতরে আমাদের বুক কাঁপিয়ে দেওয়া সত্যটি হলো—নিয়ামতের আসল পরীক্ষার নাম শোকর।
আয়াতের এই অংশে বিস্ময়ের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে বিনয়। যে ব্যক্তি কিতাবের কিছু জ্ঞান পেয়েছিল, সে নিজের দিকে তাকায়নি, তাকিয়েছে রব্বুল আলামীনের অনুমতির দিকে। চোখের পলক ফেলার আগেই এক অগম্য বস্তু হাজির হয়ে গেল—এ যেন মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, দৃশ্যমান জগতের দেয়াল যতই কঠিন হোক, আল্লাহ চাইলে তা মুহূর্তেই সরে যায়। কিন্তু সুলায়মান আলাইহিস সালামের অন্তর সেখানে থেমে থাকেনি বিস্ময়ে; তিনি দ্রুতই সেই বিস্ময়কে তাওহীদের দরজায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর মুখে প্রথম শব্দ হলো না, “আমি পেয়েছি”; বরং তিনি বললেন, “এটা আমার রবের অনুগ্রহ।” এটাই নবীসুলভ হৃদয়—প্রাপ্তিকে নিজের কৃতিত্ব মনে না করে, প্রাপ্তির পেছনে অনুগ্রহদাতা আল্লাহকে দেখতে শেখা।
এই আয়াত মানুষের আত্মগর্বকে নীরবে ভেঙে দেয়। কারণ জ্ঞান, ক্ষমতা, দ্রুততা, প্রভাব—এসবই যদি আল্লাহর ফজল হয়, তবে মুমিনের ভাষা হবে কৃতজ্ঞতার ভাষা, দম্ভের নয়। সুলায়মানের মুখে যে স্বীকারোক্তি ফুটে ওঠে, তা শুধু একজন নবীর কথা নয়; তা প্রতিটি হৃদয়ের জন্য এক আয়না। আমরা যা পাই, তা যদি আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে না দেখি, তবে ধন-সম্পদও আমাদের জন্য অন্ধকার হয়ে উঠতে পারে, আর যদি শোকর করি, তবে অল্পও নূরে ভরে যায়। এই আয়াত যেন ফিসফিস করে বলে: প্রাপ্তির মুহূর্তে অন্তর যেন অহংকারে না ফুলে ওঠে; বরং যেন ভেঙে পড়ে কৃতজ্ঞ সেজদায়। কারণ আল্লাহর দরবারে সবচেয়ে সুন্দর হৃদয় সেই, যে নিয়ামতের মাঝে নিয়ামতদাতাকে ভুলে না।
যখন চোখের পলক ফেরার আগেই তা এসে গেল, তখন সুলায়মান আলাইহিস সালাম বিস্ময়ে থেমে গেলেন; কিন্তু তাঁর বিস্ময় অহংকারে রূপ নেয়নি, রূপ নিয়েছে সিজদার অন্তর্দৃষ্টিতে। তিনি বললেন, এটা আমার রবের অনুগ্রহ। কী গভীর স্বীকৃতি! যে হৃদয় সত্যিই আল্লাহকে চেনে, সে নিজের হাতে পৌঁছানো নিয়ামতকেও নিজের ক্ষমতার ফল বলে না। সে জানে, অর্জনের প্রতিটি দরজা খোলে তাঁর অনুমতিতে, আর প্রত্যেক প্রাপ্তির ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক নীরব প্রশ্ন: তুমি কৃতজ্ঞ হবে, না অকৃতজ্ঞ হবে? দুনিয়ার মানুষেরা যখন সাফল্য পায়, তখন অনেকেই নিজের নাম বড় করে; কিন্তু নবীদের শিক্ষা হলো, নিয়ামত যত বড়ই হোক, প্রথম উচ্চারণ হবে রবের প্রশংসা।
এই আয়াত আমাদের সমাজের অন্তর-অবস্থাকেও কাঁপিয়ে দেয়। কারণ মানুষ শুধু অভাবেই নয়, প্রাচুর্যেও পরীক্ষিত হয়; শুধু কষ্টেই নয়, সহজ প্রাপ্তিতেও। সম্পদ, মর্যাদা, জ্ঞান, প্রভাব—সবই হতে পারে অন্তরের আয়না, আবার অন্তরের পর্দাও হতে পারে। কৃতজ্ঞতা আত্মাকে নরম করে, অহংকার তাকে পাথর করে তোলে। শোকর মানে কেবল মুখের প্রশংসা নয়; শোকর মানে নিয়ামতকে আল্লাহর পথে দেখা, নিজের উপকারে ব্যবহার করা, মানুষের হক নষ্ট না করা, আর অন্তরকে এই সত্যে জাগ্রত রাখা যে যা কিছু আছে, সবই আমানত। যে কৃতজ্ঞ হয়, সে নিজেরই হৃদয়কে আলো দেয়; আর যে কুফর করে, সে আল্লাহকে ক্ষতি করে না—সে শুধু নিজেরই অন্ধকার বাড়ায়।
আর এখানেই ভয় ও আশার মিশ্র সুর। আল্লাহ বলেন, আমার রব অভাবমুক্ত, কৃপাশীল। মানুষের শোকর আল্লাহর প্রয়োজন নয়, বরং মানুষের নাজাতের পথ। তিনি চান না আমাদের জিহ্বার প্রশংসা দিয়ে তাঁর রাজত্ব বেড়ে যাক; তিনি চান আমাদের আত্মা তাঁর দিকে ফিরে আসুক, তাঁর নেয়ামতকে চিনুক, তাঁর সামনে বিনয়ী হোক। এই আয়াত যেন প্রতিটি মুমিনকে নিজের ভেতরে তাকাতে বলে: আমার হাতে যা আছে, তা নিয়ে আমি কী করছি? আমি কি নিয়ামতকে ইবাদতে রূপ দিচ্ছি, নাকি গাফলতে ডুবিয়ে দিচ্ছি? শেষ পর্যন্ত একজন মুমিনের সৌন্দর্য এখানেই—সে পায়, এবং বলে আলহামদুলিল্লাহ; সে জানে, পাওয়াও পরীক্ষা, না-পাওয়াও পরীক্ষা; আর উভয় অবস্থাতেই ফেরার ঠিকানা একটাই: আল্লাহ।
এই আয়াতের শেষ প্রান্তে এসে সুলায়মান আলাইহিস সালামের মুখ থেকে যে বাক্যটি বের হয়, তা শুধু এক বাদশাহর কৃতজ্ঞতা নয়; তা একজন নবীর অন্তর থেকে ওঠা তাওহীদের সাক্ষ্য। তিনি দেখলেন, তাঁর দরবারে এসে পৌঁছেছে এমন এক বিস্ময়, যা মানুষের চোখে ক্ষমতার প্রদর্শন হতে পারত; কিন্তু তাঁর হৃদয়ে তা হয়ে উঠল আল্লাহর অনুগ্রহের নিদর্শন। তিনি বললেন, এটি আমার রবের ফযল। যেন তিনি শেখালেন, নিয়ামত যখন আসে, তখন প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত না “আমি কত বড় হলাম”, বরং “আমার রব আমাকে দিয়ে কী দেখতে চান”—আমি কৃতজ্ঞ হব, না অহংকারে হারিয়ে যাব। মানুষের জীবনে যত কিছু আসে, সেগুলো স্থায়ী মালিকানার সনদ নয়; সেগুলো পরীক্ষা, আমানত, এবং অন্তরের গোপন অবস্থা প্রকাশের উপায়।
এখানেই শোকরের গভীরতা। কৃতজ্ঞতা আল্লাহর কোনো লাভের জন্য নয়, মানুষের আত্মার জন্য। যে শোকর করে, সে নিজের হৃদয়কে পরিষ্কার করে; আর যে অকৃতজ্ঞ হয়, সে নিজেরই ক্ষতিকে বড় করে তোলে। আল্লাহ কারও কৃতজ্ঞতার মুখাপেক্ষী নন, কারণ তিনি গনী, অভাবমুক্ত, কৃপাশীল। আমাদের নিয়ামত-ভরা জীবন, আমাদের জ্ঞান, সম্পদ, পরিবার, নিরাপত্তা, সময়—সবই এই আয়াতের আয়নার সামনে দাঁড়ায়। আমরা কি এগুলোকে মালিক হয়ে গেছি মনে করি, নাকি আমানতদার হয়ে বেঁচে থাকি? আমাদের চোখের পলক, আমাদের শ্বাস, আমাদের আগামী মুহূর্ত—সবই যদি তাঁর দান হয়, তবে অন্তরের সবচেয়ে স্বাভাবিক উচ্চারণ হওয়া উচিত বিনয়। সুলায়মানের এই বাক্য আমাদের শেখায়, প্রকৃত ঈমান বিস্ময়ে থেমে যায় না; তা বিস্ময়কে সেজদায় রূপ দেয়।