যারা আখিরাতকে বিশ্বাস করে না, তাদের ভেতরে একটি ভয়ংকর বিপর্যয় নেমে আসে—সত্যের মানদণ্ড বিকৃত হয়ে যায়। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিচ্ছেন, তারা নিজেরাই যে পথে হাঁটছে, সেটাকেই সুন্দর মনে করতে থাকে; তাদের কর্ম তাদের চোখে সুশোভিত হয়ে ওঠে। ফলে পাপ পাপ বলে ধরা পড়ে না, অবাধ্যতা অবাধ্যতা বলে বোঝা যায় না, আর হৃদয়ের ভেতরে ন্যায়ের জন্য যে স্বচ্ছ আলো দরকার, তা ক্রমে নিভে যায়। তখন মানুষ এগোয় বটে, কিন্তু সেই অগ্রসর হওয়া আসলে গন্তব্যের দিকে নয়; তা হয় ঘোরার মতো, দিশাহীন, ক্লান্ত, বিভ্রান্ত।

এটি কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক অস্বীকারের কথা নয়; এটি আত্মার এমন এক অন্ধকার, যেখানে মানুষ পরকালকে অস্বীকার করে দুনিয়ার সাময়িক চাকচিক্যকেই চূড়ান্ত সত্য ভেবে বসে। কুরআন বারবার স্মরণ করায়, আখিরাতের বিশ্বাস মানুষের চোখে ও হৃদয়ে ভারসাম্য আনে; কারণ তখন সে জানে, প্রতিটি কাজের হিসাব আছে, প্রতিটি গোপন অভিপ্রায়ও একদিন প্রকাশ পাবে। আর যখন সেই বিশ্বাস উঠে যায়, তখন কাজের সৌন্দর্যও ভুল মাপে মাপা হয়—যা নষ্ট, তা-ই নরম আলোয় রাঙানো মনে হয়। এই হলো বিভ্রান্তির সূচনা, আর সেই বিভ্রান্তির ভেতরেই মানুষ নিজের ধ্বংসকে সাজানো ঘরের মতো দেখে।

সূরা আন-নামলের শুরুতে আল্লাহর নিদর্শন, কুরআনের হেদায়েত, সুলায়মান আলাইহিস সালামের রাজত্ব, পিঁপড়ার ক্ষুদ্র জগৎ, সাবার জনপদ—এসব সবই এক মহাসত্যের দিকে আহ্বান করে: সৃষ্টি যত বিস্ময়করই হোক, সবই এক আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন। তাই এখানে আখিরাত অস্বীকারকারীদের কথা তুলে এনে কুরআন যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে, নিদর্শনসমূহ চোখের সামনে থাকলেও হৃদয়ে যদি পরকালের বিশ্বাস না থাকে, তবে মানুষ তা থেকে শিক্ষা নেয় না; বরং নিজের পছন্দকেই সত্য বলে গ্রহণ করে। এভাবেই এই আয়াত আমাদের কাঁপিয়ে দেয়—হৃদয় যদি আখিরাতকে ভুলে যায়, তবে দুনিয়ার মোহই তার জন্য পথ হয়ে দাঁড়ায়, আর পথই তাকে আরও গভীর ভ্রান্তির দিকে নিয়ে যায়।

আখিরাতের বিশ্বাস যখন হৃদয় থেকে সরে যায়, তখন মানুষের ভেতরে এক অদ্ভুত বিকার শুরু হয়। সে আর সত্যকে তার ওজন দিয়ে দেখে না; বরং নিজের প্রবৃত্তি, অভ্যাস, স্বার্থ আর পরিবেশের আলোয় দেখে। তখন যা ক্ষতিকর, তা-ই তাকে উপকারী মনে হয়; যা পতনের পথ, তা-ই নিরাপদ আশ্রয় বলে মনে হয়। আল্লাহ তাআলা এখানে এমন এক মানসিক ও আত্মিক বাস্তবতার দিকে ইশারা করছেন, যেখানে মানুষ নিজের হাতের গড়া অন্ধকারকেই রঙিন পর্দায় ঢেকে দেখে। এ যেন অন্তরের চোখে মেঘ জমে যাওয়া—বাইরে সূর্য আছে, তবু দেখা যায় না; বাইরের জগৎ আছে, তবু হৃদয় তার সত্য রূপ ধরতে পারে না।

এই আয়াত কেবল একদল মানুষের কথা বলে না; এটি প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য সতর্কবার্তা। কারণ যখন আখিরাতের জবাবদিহি মুছে যায়, তখন আমলের মানদণ্ডও বদলে যায়। ন্যায়ের জায়গায় আসে সুবিধা, পবিত্রতার জায়গায় আসে প্রবৃত্তি, আর হক্বের জায়গায় দাঁড়ায় নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার তৃষ্ণা। তখন মানুষ উদভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু তার ঘোরার মধ্যে কোনো দিশা থাকে না; এগোনো থাকে, কিন্তু গন্তব্য থাকে না; কথা থাকে, কিন্তু সত্য থাকে না। কুরআন আমাদের জাগাতে চায়—যে হৃদয় আখিরাতকে ভুলে যায়, সে আসলে শুধু মৃত্যুর পরে কী হবে তা-ই ভুলে যায় না, সে জীবনের মানেও হারিয়ে ফেলে।
সূরা আন-নামলের সূচনা থেকেই আমরা দেখছি, আল্লাহর নিদর্শন কত বিস্ময়কর, সুলায়মান আলাইহিস সালামের রাজত্ব কত ন্যায়ভিত্তিক, পিঁপড়ার জগতেও কী নিখুঁত শৃঙ্খলা, সাবার কাহিনিতে কী গভীর শিক্ষা। এই সব নিদর্শন আমাদের একটাই দিকে ডাকে—তাওহীদের দিকে, এবং সেই তাওহীদের সঙ্গে আখিরাতের বিশ্বাসও জড়িয়ে আছে। যে আল্লাহ সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, তিনি হিসাবও নিবেন; যে আল্লাহর কুদরতে ক্ষুদ্র পিঁপড়াও কথা বলতে পারে, তাঁর সামনে মানুষের গোপন কর্ম কখনো অগোচর থাকতে পারে না। তাই এই আয়াত আমাদের হৃদয়ে কাঁপন ধরায়: নিজের কাজকে সুন্দর মনে করলেই কি কাজ সুন্দর হয়ে যায়? না; সত্যিকারের সৌন্দর্য সেই আমলে, যা আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার যোগ্য।

এই আয়াত আমাদের অন্তরকে এমন এক আয়নার সামনে দাঁড় করায়, যেখানে মানুষ নিজেকে যেমন, তেমন দেখার সাহস পায়। পরকালকে ভুলে গেলে আত্মসমালোচনার দরজাও বন্ধ হতে থাকে; তখন নিজের নফসই বিচারক হয়ে বসে, আর প্রবৃত্তিই হয়ে যায় পথপ্রদর্শক। মানুষ ভাবে, যা সে করছে তা-ই বোধহয় ঠিক, যা তার মনকে খুশি করে তা-ই বোধহয় সুন্দর। অথচ এই সৌন্দর্য অনেক সময় আল্লাহর দেওয়া শান্তি নয়, বরং পরীক্ষা। বাহ্যিক ঝিলিকের ভেতরে লুকিয়ে থাকে অন্তরের শূন্যতা, আর সেই শূন্যতা মানুষকে ধীরে ধীরে সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করে।

আখিরাতের বিশ্বাস সমাজকেও সোজা রাখে। কারণ, যখন মানুষ জানে তার কাজ একদিন প্রকাশিত হবে, তখন সে জুলুমে হাত কাঁপে, আমানতে সতর্ক হয়, সম্পর্ককে পবিত্র রাখে, এবং অপরাধের আড়ালে আত্মপ্রশংসা করে না। কিন্তু এই বিশ্বাস যখন মুছে যায়, তখন ন্যায়-অন্যায়, হালাল-হারাম, জুলুম-ইনসাফের রেখা ঝাপসা হয়ে পড়ে। তখন মানুষ সমষ্টিগতভাবেও বিভ্রান্ত হয়; ক্ষমতা, ভোগ, আর বাহ্যিক সাফল্যকে সত্যের মানদণ্ড বানিয়ে ফেলে। কুরআন তাই আমাদের শেখায়, ঈমান কেবল ব্যক্তিগত অনুভব নয়; এটি একটি সমাজের নৈতিক দিকনির্দেশ, একটি হৃদয়ের ভেতর বসানো আলোর নাম।

তবু এই আয়াতের ভেতর ভয় দেখানোর পাশাপাশি আশা-জাগানিয়া আহ্বানও আছে। কারণ আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্টতায় ছেড়ে দেন, তাকেও ফিরিয়ে আনতে পারেন যদি সে ফিরে আসে, অনুতপ্ত হয়, আর সত্যের সামনে নত হয়। মানুষের দায়িত্ব হলো নিজের আমলকে প্রতিদিন যাচাই করা—আমি কি সত্যিই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এগোচ্ছি, নাকি আমার নিজের পছন্দকে ধর্মের পোশাক পরিয়ে দিচ্ছি? হৃদয় যখন আখিরাতকে স্মরণ করে, তখন তার ভেতরের দিকভ্রান্তি কমে যায়, আর দুনিয়ার মোহও তার জায়গা হারায়। তখন মানুষ বুঝতে শেখে, জীবনের শেষ গন্তব্য আল্লাহর দিকেই; আর সেখানেই সব কাজের আসল রং উন্মোচিত হবে।

এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে ভয়ের এক গভীর নীরবতা নামে। মানুষ যখন আখিরাতকে বিশ্বাস হারায়, তখন কেবল ভবিষ্যৎ নয়, তার বর্তমানও বিকৃত হতে থাকে; সে নিজের ভেতরের আঁধারকে আলো মনে করে, নিজের প্রবৃত্তির সজ্জাকে সত্যের অলংকার ভেবে ভুল করে। আল্লাহর পক্ষ থেকেই এই সজ্জা, কিন্তু তা অনুগ্রহ নয়; তা এক কঠিন বিচারও হতে পারে—কারণ অন্তর যখন বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও ফিরে আসে না, তখন তাকে তারই পছন্দের পথেই ছেড়ে দেওয়া হয়। আর সেই ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে আছে ভয়ংকর এক দিশাহীনতা, যেখানে চোখ দেখে, কিন্তু হৃদয় চিনতে পারে না; পা চলে, কিন্তু আত্মা পৌঁছায় না।

তাই সূরা আন-নামলের এই আয়াত আমাদের কানে শুধু হুঁশিয়ারি নয়, একান্ত আত্মজিজ্ঞাসাও ফিসফিস করে: আমি কি এমন কোনো আমলকে সুন্দর ভাবছি, যা আমাকে রবের স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে? আমি কি দুনিয়ার চাকচিক্যে এমনভাবে মুগ্ধ, যে আখিরাতের হিসাব আমার ভেতরে আর কাঁপন তোলে না? সুলায়মানের রাজত্ব, পিঁপড়ার ক্ষুদ্র বোধ, সাবার নত হওয়া—সবই তো এই সূরার ভেতরে সাক্ষ্য দেয় যে আল্লাহর নিদর্শন সামনে থাকা সত্ত্বেও মানুষ অন্ধ হতে পারে, আবার ক্ষুদ্র এক সৃষ্টিও সত্য চিনে নিতে পারে। অতএব, আজ যদি হৃদয়ে সামান্য আলো বেঁচে থাকে, তবে তাকে অবহেলা কোরো না; চোখে যা সুন্দর লাগে, তা সবসময় নাজাতের পথ নয়। প্রভু আমাদের এমন অন্তর দিন, যা পরকালকে ভুলে গিয়ে নয়, বরং পরকালকে মনে রেখেই দুনিয়াকে দেখে; এবং এমন তাওফিক দিন, যাতে আমরা দিশাহীন ঘুরে বেড়ানো মানুষ না হয়ে, তাঁর হিদায়াতের দিকে ফিরে আসতে পারি।