সুলায়মান আলাইহিস সালামের পত্রের প্রথম দৃশ্যেই কুরআন আমাদের সামনে এক বিস্ময় খুলে দেয়: শক্তির নয়, বরং তাওহীদের ভাষায় শুরু হয় সত্যের আহ্বান। এই আয়াতে তিনি পরিচয় দিচ্ছেন নিজের শাসনক্ষমতার নয়, বরং নিজের প্রেরণের উৎসের—“এটি সুলায়মানের পক্ষ থেকে, আর শুরু হচ্ছে পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে।” কত রাজকীয়, তবু কত বিনয়ী! কত প্রভাবশালী, তবু কত পরিষ্কারভাবে বান্দা-সুলভ! এখানেই হৃদয় বুঝে ফেলে, মুমিনের কাজের সৌন্দর্য তার শুরুতেই ধরা পড়ে; কারণ যে কাজ আল্লাহর নামে শুরু, সেটি দুনিয়ার চোখে ছোট হলেও আসমানের কাছে ভারী হয়ে ওঠে।

সূরা আন-নামলের এই অংশটি সাবার রাণীর কাছে সুলায়মানের বার্তা পৌঁছানোর ঘটনা-প্রবাহের মধ্যে এসেছে। এখানে কোনো কৃত্রিম জাঁকজমক নেই, নেই নিজের মহিমা প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও; বরং আছে নবুওয়াতের শিষ্টতা, আহ্বানের পবিত্রতা, এবং একমাত্র আল্লাহর দিকে ডেকে নেওয়ার নীরব কিন্তু দৃঢ় ভাষা। এ আয়াত আমাদের শেখায়, সত্যের দাওয়াত যখন ক্ষমতা, বুদ্ধি বা কৌশলের উপর দাঁড়ায় না, তখন তা হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে যায়; আর যখন তা আল্লাহর নাম দিয়ে শুরু হয়, তখন সে আহ্বানে রহমত নেমে আসে, বাক্যটি কোমল হয়, কিন্তু তার মর্ম শক্তিশালী থাকে।

এই “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” শুধু একটি সূচনা-বাক্য নয়; এটি ঈমানের ঘোষণাপত্র, তাওহীদের দরজা, এবং অন্তরের জন্য এক শান্ত অথচ জাগ্রত ডাক। আল্লাহর নাম উচ্চারণ মানে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করা, তাঁর অনুগ্রহ কামনা করা, এবং এই বিশ্বাস ধারণ করা যে সাফল্য মানুষের কৌশলে নয়, রবের রহমতেই। কুরআন বারবার আমাদের শেখায়—মানুষের সেরা পরিচয় তার মালিকানা নয়, তার বন্দেগি। আর এই আয়াতের প্রতিটি শব্দ যেন বলে, সত্যের পথের শুরুতে যদি আল্লাহ থাকেন, তবে শেষও আল্লাহই পরিচালনা করবেন।

সুলায়মানের পত্রে প্রথমেই যে বাক্যটি দাঁড়িয়ে যায়, তা কোনো রাজদরবারের গর্জন নয়, কোনো সাম্রাজ্যের আস্ফালনও নয়; বরং একটি নম্র অথচ অটল ঘোষণা—“এটি সুলায়মানের পক্ষ থেকে, আর তা শুরু হয়েছে দয়াময়ের, করুণাময়ের আল্লাহর নামে।” এখানে ক্ষমতার আসল রূপ উল্টে যায়। দুনিয়া যেখানে নিজের নাম উঁচু করতে চায়, সেখানে নবি নিজের নামকে আল্লাহর নামের নিচে রাখেন; দুনিয়া যেখানে জোরে কথা বলে, সেখানে ওহি বলে—প্রথম শব্দই হোক তাওহীদ। এটাই মুমিনের পরিচয়: তার শুরু, তার ভাষা, তার উদ্দেশ্য, সবকিছুর কেন্দ্র একমাত্র আল্লাহ।

‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ শুধু একটি বাক্য নয়; এটি হৃদয়ের দরজা খুলে দেওয়ার চাবি। এতে আছে শুরুর পবিত্রতা, কর্মের বরকত, আর অহংকার ভেঙে পড়ার শিক্ষা। যে কাজ আল্লাহর নামে শুরু হয়, তাতে বান্দা নিজের শক্তিকে উপাস্য বানাতে পারে না। তখন ভাষা নরম হয়, দৃষ্টি নত হয়, অন্তর জাগে। এই নামেই কেবল আমল জীবন পায়, দাওয়াত সৌন্দর্য পায়, শাসন ইনসাফ পায়, আর সম্পর্কগুলো করুণা শেখে। আল্লাহর নাম ছাড়া মানুষের বড় অর্জনও একদিন ধুলো হয়ে যায়; আর আল্লাহর নামে শুরু হওয়া ক্ষুদ্রতম কাজও আসমানের কাছে অর্থ পায়।
এই আয়াতের গভীরতায় আছে এক বিস্ময়কর শিক্ষা: সত্যের আহ্বান সবসময় আগে আসে আল্লাহর স্মরণ দিয়ে, তারপর মানুষের কাছে পৌঁছে। কারণ মানুষকে বদলাতে হলে আগে নিজের হৃদয়কে তাওহীদের অধীনে আনতে হয়। সুলায়মানের পত্র আমাদের শেখায়, দীনের ভাষা কখনো অহংকারের ভাষা নয়; তা রহমতের ভাষা, শৃঙ্খলার ভাষা, এবং আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার ভাষা। যে অন্তর ‘বিসমিল্লাহ’ উচ্চারণ করতে করতে বাঁচে, সে অন্তর আসলে নিজের সীমানা থেকে বের হয়ে আল্লাহর অসীম দয়ার মধ্যে প্রবেশ করে। আর সেখানেই মেলে শান্তি—যেখানে মানুষ নিজেকে নয়, তার রবকে বড় করে দেখে।

সুলায়মান আলাইহিস সালামের পত্রের এই একটি বাক্যই যেন মানুষকে তার আসল মাপে দাঁড় করিয়ে দেয়। যেখানে পৃথিবীর রাজারা নিজের নাম জাহির করে, সেখানে নবীর পত্র শুরু হয় আল্লাহর নামে; যেখানে ক্ষমতা নিজের ছায়া বড় করতে চায়, সেখানে দাওয়াত নিজের ছায়া ভেঙে শুধু রবের আলো দেখায়। এটি কেবল একটি চিঠির শুরু নয়, এটি মুমিনের অন্তরের শালীনতা—কাজের আগে নিয়তকে পবিত্র করা, উচ্চারণের আগে হৃদয়কে নত করা, আর প্রতিটি আহ্বানকে রহমতের ছায়ায় রাখা। যে সমাজ নিজের শক্তি, বংশ, ধন আর কৌশল নিয়ে অহংকারে মোহিত, এই আয়াত তার বুকের ওপর এক নীরব কিন্তু অটল আঘাত করে: তোমার আসল পরিচয় তোমার জৌলুসে নয়, তোমার রবের সঙ্গে সম্পর্কেই।

‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’—এই শব্দগুলো কেবল মুখের জন্য নয়, এগুলো জীবনকে বদলে দেওয়ার ঘোষণা। রহমান ও রাহিম—এই দুই নামের ভেতর একদিকে রয়েছে অফুরন্ত দয়ার ছায়া, অন্যদিকে রয়েছে বান্দাকে ফিরিয়ে আনার কোমল আহ্বান। আল্লাহর নামে শুরু মানে, আমি একা নই; আমার কথা, আমার পদক্ষেপ, আমার ক্ষমতা, আমার দায়িত্ব—সবকিছুই মালিকের সামনে জবাবদিহির মধ্যে বাঁধা। এ আয়াত আমাদের আত্মাকে জিজ্ঞেস করে: তুমি যা করছ, তা কি নিজের নামের জন্য, না আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য? তুমি যার দিকে ডাকছ, সে কি সত্যিই তাওহীদের দিকে ফিরছে, নাকি নফসের মোহে আরও দূরে সরে যাচ্ছে? এই প্রশ্নগুলো হৃদয়কে কাঁপায়, কিন্তু সেই কাঁপুনিতেই জাগে ইমান।

সাবার সামনে পৌঁছানো এই পত্রে শুধু একটি রাষ্ট্রের উদ্দেশে বার্তা নেই; আছে গোটা মানবতার জন্য শিক্ষা—আল্লাহর নাম ছাড়া কোনো বড় কাজই সত্যিকার অর্থে বড় নয়। তাওহীদই সত্যের প্রথম দরজা, আর রহমত সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করা আলোর বাতাস। যে ব্যক্তি আল্লাহর নামে শুরু করে, তার ভেতরে অহংকার একটু একটু করে গলে যায়; যে ব্যক্তি নিজের কাজকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেয়, তার ভেতরে ভয় ও আশা একসাথে জেগে ওঠে—ভয় এই জন্য যে আমি মালিকের সামনে নগণ্য, আর আশা এই জন্য যে তাঁর নামের মধ্যে আশ্রয় আছে। এই আয়াত আমাদের শেষ পর্যন্ত নিজেদের কাছে ফেরায়, আর নিজের ভেতর দিয়ে রবের দিকে; কারণ মানুষ যত দূরেই থাকুক, আল্লাহর নামে শুরু করলে পথ কখনোই অন্ধকার থাকে না।

সুলাইমান আলাইহিস সালামের পত্রের এই একটি বাক্য যেন আমাদের অন্তরের দরজায় ধীরে ধীরে কড়া নাড়ে। “এটি সুলায়মানের পক্ষ থেকে, আর শুরু হচ্ছে পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে”—এই বাক্যে রাজত্ব আছে, কিন্তু অহংকার নেই; কর্তৃত্ব আছে, কিন্তু আত্মপ্রদর্শন নেই; শক্তি আছে, কিন্তু শক্তির নেশা নেই। সত্যের দাওয়াত যখন আল্লাহর নামে শুরু হয়, তখন তা কেবল সংবাদ থাকে না, তা হয়ে ওঠে হৃদয়ের জন্য পরীক্ষা। আমি কি আল্লাহকে স্মরণ করে আমার কথা শুরু করি, নাকি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে? আমি কি তাঁর নামকে সামনে রাখি, নাকি নিজের নামের ছায়ায় সবকিছু ঢেকে ফেলতে চাই?

এই আয়াত আমাদের খুব নরমভাবে, কিন্তু খুব গভীরভাবে লজ্জা দেয়। কত কাজই তো আমরা করি, কত কথা বলি, কত সিদ্ধান্ত নিই—কিন্তু তার শুরুতে আল্লাহর নাম থাকে না, বরং থাকে তাড়াহুড়া, আত্মবিশ্বাস, কিংবা নিজের ছোট্ট অহংয়ের আগুন। অথচ নবীদের ভাষা শেখায়, দাওয়াতের প্রথম সৌন্দর্য হলো বিসমিল্লাহ; কাজের প্রথম পবিত্রতা হলো তাওহীদ; আর অন্তরের প্রথম নিরাপত্তা হলো রহমতের আশ্রয়। যে হৃদয় আল্লাহর নামে শুরু করতে শেখে, সে হৃদয় কেবল কাজের শুরু বদলায় না, সে জীবনের দিকও বদলে দেয়। আজ যদি এই পত্র আমাদের দিকে ফিরে আসে, তবে কি আমরাও নীরবে সাড়া দেব না—হে আল্লাহ, আমাদের কথার মধ্যে, আমাদের ঘরের মধ্যে, আমাদের সিদ্ধান্তের মধ্যে, আমাদের প্রতিটি শ্বাসের শুরুতে তুমি থাকো, কারণ তুমি ছাড়া শুরুও পূর্ণ হয় না, শেষও নিরাপদ হয় না?