সূরা আন-নামলের এই আয়াতে হুদহুদের সংবাদে সুলায়মান আলাইহিস সালামের সামনে খুলে যায় এক বিস্ময়কর পৃথিবী—এক নারী, যে তার জাতির ওপর রাজত্ব করছে; তাকে “প্রায় সবকিছু” দেওয়া হয়েছে; আর তার আছে এক বিরাট আরশ। শব্দগুলো যেন দুনিয়ার প্রতাপকে এক ঝলকে দাঁড় করিয়ে দেয় আমাদের চোখের সামনে। কিন্তু কুরআন এখানে কোনো রাজকীয় গৌরবগাথা শোনাচ্ছে না; বরং এমন এক দৃশ্য তুলে ধরছে, যেখানে সিংহাসনের উচ্চতা, রাষ্ট্রের ক্ষমতা, সম্পদের প্রাচুর্য—সবই আল্লাহর এক নিঃশব্দ পরীক্ষার অংশ হয়ে যায়। মানুষ যতই বড় হোক, তার চারপাশ যতই জাঁকজমকে ভরে উঠুক, সে আল্লাহর সামনে ততটাই ক্ষুদ্র, ততটাই মুখাপেক্ষী।

এই আয়াতের তাফসিরে সাধারণভাবে বোঝা যায়, সাবার রানি ছিল ক্ষমতাবান ও সমৃদ্ধ এক শাসক; তার জাতির রাজনৈতিক সংগঠন, সম্পদের প্রাচুর্য, এবং রাজসিংহাসনের বিশালতা তাদের সভ্যতার প্রতাপের ইঙ্গিত দেয়। তবে কুরআন এসব বর্ণনা করছে কোনো ইতিহাসপ্রীতির জন্য নয়; বরং তাওহীদের আলোয় মানুষের সভ্যতাকে পরখ করার জন্য। যে সমাজের হাতে ধন আছে, ক্ষমতা আছে, ঐশ্বর্য আছে, তার অন্তর কি আল্লাহর দিকে নত, নাকি সে নিজস্ব প্রতাপের নেশায় অন্ধ? এই আয়াত সেই প্রশ্নই জাগিয়ে তোলে। কারণ দুনিয়ার সর্ববৃহৎ আরশও একদিন মাটির সঙ্গে মিশে যাবে, যদি তার উপর আল্লাহর হেদায়েত না থাকে।

সুলায়মান আলাইহিস সালামের যুগে বিভিন্ন জাতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার বাস্তবতা এই ঘটনার পটভূমি হিসেবে ধরা যায়, তবে নির্দিষ্ট কোনো সাবাবেন নুযুল এখানে প্রতিষ্ঠিত নয়। কুরআন আমাদের সামনে একটি বড় নৈতিক দৃশ্য আনে: নেতৃত্ব মানেই ন্যায্যতা নয়, ঐশ্বর্য মানেই সফলতা নয়, আর বড় সিংহাসন মানেই বড় সত্য নয়। সত্যের মানদণ্ড হলো আল্লাহর বান্দা হওয়া। তাই এই আয়াত শুধু সাবার রানির কাহিনি নয়; এটি প্রতিটি মানুষের জন্য আয়না—যে আয়নায় আমরা দেখি, আমাদের অন্তর কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, ক্ষমতার সামনে না কি রবের সামনে।

কুরআন যখন বলে, তিনি এক নারীকে তার জাতির উপর রাজত্ব করতে দেখলেন, তখন তা কেবল ইতিহাসের একটি তথ্য থাকে না; তা হয়ে ওঠে মানবসভ্যতার অন্তর্গত এক আয়না। রাজত্ব, প্রতাপ, শৃঙ্খলা, অভিজাততা—সব মিলিয়ে বাহ্যিক দৃশ্যটি কতই না উজ্জ্বল। কিন্তু এই উজ্জ্বলতার ভিতরেই লুকিয়ে থাকে মানুষের চিরন্তন দুর্বলতা: সে ক্ষমতার আসনে বসেও সত্যের কাছে নত হতে জানে না, যতক্ষণ না আল্লাহর পক্ষ থেকে নীরব এক আহ্বান তাকে কাঁপিয়ে তোলে। সাবার রানি সম্পর্কে এই বর্ণনা আমাদের শেখায়, নেতৃত্বের মুকুট যতই ভারী হোক, হৃদয়ের খালি জায়গা কোনো মুকুট পূরণ করতে পারে না; সম্পদ যতই ছড়িয়ে থাকুক, আত্মার তৃষ্ণা যদি তাওহীদের পানিতে সিক্ত না হয়, তবে অন্তর অনাহারে থেকেই যায়।

“তাকে সবকিছুই দেওয়া হয়েছিল”—এই বাক্য মানুষের দৃষ্টিতে পরিপূর্ণতার শিখর, কিন্তু কুরআনের দৃষ্টিতে তা পরীক্ষার গভীরতা। কারণ যা কিছু আমাদের কাছে পূর্ণতা বলে মনে হয়, তা-ই কখনো আল্লাহর সামনে আমাদের সর্বাধিক অসহায়ত্ব প্রকাশ করে। ধন-সম্পদ, নীহারিকা-সম প্রাচুর্য, রাজদরবারের আড়ম্বর, বিরাট সিংহাসন—সবই মানুষের দৃষ্টি টানে, কিন্তু এসবের কোনোটি আল্লাহর কাছে সিজদাহীন হৃদয়ের বদলি হতে পারে না। এখানে কুরআন দুনিয়ার সৌন্দর্যকে অস্বীকার করছে না; বরং বলছে, সৌন্দর্য যদি আল্লাহর দিকে না নিয়ে যায়, তবে তা কেবল এক ঝলক আলো, যার শেষে অন্ধকার আরও ঘন হয়ে আসে। প্রকৃত মালিকানা মানুষের নয়; মানুষ কেবল আমানতদার। আর আমানতের আসনে বসে যে নিজেকে চিরস্থায়ী মনে করে, সে-ই সবচে বেশি প্রতারিত।
আর “তার একটা বিরাট সিংহাসন আছে”—এই একটিমাত্র দৃশ্য যেন দুনিয়ার গৌরবকে নিঃশব্দে স্থির করে দেয়। সিংহাসনের উচ্চতা মানুষকে বড় করে না; বরং পরীক্ষা করে, সে উচ্চতায় দাঁড়িয়ে সে আল্লাহর দিকে আরো বিনয়ী হয় কি না। কুরআনের দৃষ্টিতে আরশ-সদৃশ প্রতাপও আল্লাহর নিদর্শনের সামনে একটি ক্ষণস্থায়ী ছায়া মাত্র। মানুষের সভ্যতা যতই বিস্ময়কর হোক, সে যদি এক আল্লাহর সামনে মাথা না নোয়ায়, তবে তার সর্ববৃহৎ আসনও শেষ পর্যন্ত শূন্যতার আসন। এই আয়াত আমাদের হৃদয়ে প্রশ্ন জাগায়: আমার কাছে যা কিছু আছে, তা কি আমাকে অহংকারে ফোলায়, না কি আমাকে রবের সামনে আরো ভেঙে দেয়? কারণ সত্যিকারের মহত্ত্ব সিংহাসনে বসে নয়, বরং সিংহাসনের জৌলুসের মাঝেও সিজদার ধুলো বুকে লেগে থাকা-তেই।

সুলায়মান আলাইহিস সালামের কাছে হুদহুদের সংবাদ শুধু এক রাণীর খবর নয়; তা যেন দুনিয়ার প্রতাপকে এক আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। এক নারী শাসন করছেন, জাতির ওপর কর্তৃত্ব করছেন, আর তাঁর জন্য প্রস্তুত আছে বিরাট সিংহাসন—কী অপূর্ব জৌলুস, কী দৃশ্যমান শক্তি! কিন্তু কুরআন এই দৃশ্যকে আমাদের চোখে মুগ্ধতার জন্য এঁকে দেয়নি; বরং আমাদের অন্তরকে জাগিয়ে তুলতে দিয়েছে। কারণ সিংহাসন যত বড়ই হোক, তা মানুষকে আল্লাহর থেকে বড় করে না। রাজত্ব যত বিস্তৃতই হোক, তাও হৃদয়ের সেই শূন্যতা পূর্ণ করতে পারে না, যা কেবল রবের পরিচয়ে ভরে। আজও মানুষের সমাজে ক্ষমতা, মর্যাদা, বৈভব—সবকিছু মিলিয়েও যদি তাওহীদের আলো না থাকে, তবে তা কেবল চমক, শান্তি নয়; বাহ্যিক শৃঙ্খলা, কিন্তু অন্তরের অস্থিরতা।

এই আয়াত আমাদের নিজের জীবনের দিকেও ফিরিয়ে আনে। আমাদেরও আছে ছোট-বড় সিংহাসন—কখনও ঘরের কর্তৃত্ব, কখনও চাকরির আসন, কখনও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, কখনও অর্থের উঁচুতা। আর আমরা কত সহজে সেসবকে নিরাপত্তা ভেবে বসি! অথচ এক মুহূর্তে যা দাঁড়িয়ে আছে, এক মুহূর্তেই তা নত হতে পারে। সাবার রাণীর বিরাট আরশ আমাদের বলে: দৃশ্যমান শক্তি যত বড়ই হোক, তা ক্ষণস্থায়ী; আর আল্লাহর সামনে বিনয়ই চিরস্থায়ী মহিমা। এই আয়াতের ভেতর ভয় আছে, কারণ মানুষ তার দুনিয়াকে যতই সাজাক, সে তবু জবাবদিহির পথে হাঁটে; আর আশা আছে, কারণ যাকে আল্লাহ দেখান, তাকে আল্লাহ ফিরিয়েও ডাকেন। তাই হৃদয় যদি সতর্ক হয়, তবে সে সিংহাসনের দিকে নয়, সিংহাসন-দাতার দিকে ফিরে যায়; ক্ষমতার দিকে নয়, ক্ষমতা-নিয়ন্তার দিকে; আর অবশেষে বুঝে, আসল বড়ত্ব হলো আল্লাহর সামনে ভেঙে পড়া, কারণ সেখানেই আত্মা নিজের আসল ঠিকানা খুঁজে পায়।

কুরআন এখানে আমাদের সামনে এক রাজদরবারের ছবি এঁকে দেয়, কিন্তু সেই ছবির কেন্দ্রবিন্দুতে আসলে রাজত্ব নয়—মানুষের ভেতরের শূন্যতা। যার হাতে সিংহাসন, যার চারদিকে সম্পদ, যার জাতির ওপর কর্তৃত্ব, তার সম্পর্কেও আল্লাহর কিতাব এমনভাবে কথা বলে যেন বোঝা যায়: দুনিয়ার সব আয়োজন একদিনের চোখ ধাঁধানো দীপ্তি মাত্র। আজ যে ক্ষমতা আমাদের চোখে অটুট মনে হয়, কাল তা-ই কাঁপতে শুরু করে। আজ যার জন্য মানুষ মাথা নত করে, কাল সে-ই এক অদৃশ্য দরজার সামনে নিরুপায় হয়ে দাঁড়ায়। আরশ, ধন, রাজত্ব—সবই শেষ পর্যন্ত আল্লাহর মালিকানার সামনে এক ফোঁটা ধুলোর মতো।

এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের অন্তর যদি একটু নরম না হয়, তবে তার হৃদয় সত্যিই কঠিন। কারণ এখানে কেবল সাবার রানির কথা বলা হচ্ছে না; বলা হচ্ছে আমাদের নিজেদের ভেতরের মুগ্ধতার কথা—যে মুগ্ধতা দুনিয়ার সাজসজ্জাকে বড় করে দেখে, অথচ মালিককে ভুলে যায়। কুরআন আমাদের শেখায়, বড় সিংহাসন নয়, বড় হৃদয়ই আসল; আর সেই হৃদয় বড় হয় তখনই, যখন সে আল্লাহর সামনে নত হয়। তাই ধন-সম্পদ দেখলে অহংকার নয়, কৃতজ্ঞতা আসুক; ক্ষমতা দেখলে গর্ব নয়, জবাবদিহির ভয় আসুক; আর দুনিয়ার বাহারি প্রতাপ দেখলে মনে হোক—যদি সবকিছুর শেষে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হয়, তবে আজ কেন আমরা তাঁর দিকে ফিরে যাচ্ছি না?