আল্লাহ ইচ্ছা করলে মানুষকে একই পথের, একই মতের, একই স্বভাবের একটিমাত্র উম্মতে পরিণত করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। এই আয়াতের মধ্যে লুকিয়ে আছে মানুষের জন্য এক কঠিন অথচ করুণাময় সত্য: দুনিয়া হলো বেছে নেওয়ার, পরীক্ষা দেওয়ার, এবং নিজের অন্তরকে কোন ডাকে সাড়া দিচ্ছে তা প্রকাশ করার ময়দান। কেউ হিদায়াতের দিকে ঝুঁকে পড়ে, কেউ গাফিলতির অন্ধকারে হারিয়ে যায়। এখানে আল্লাহর ক্ষমতা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে, আর মানুষের দায়িত্বও অব্যাহতি পায় না। তিনি যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত হতে ছেড়ে দেন, যাকে ইচ্ছা পথ দেখান—এ কথায় ভয় আছে, আবার রহমতের দরজাও আছে; কারণ সত্যের দিকে ফিরতে চাওয়া হৃদয়ের জন্য পথ এখনো খোলা।
সূরা আন-নাহল জুড়ে আল্লাহর নেয়ামত, তাঁর একত্ব, হালাল-হারামের বিধান, আর মানুষের অকৃতজ্ঞতা বারবার সামনে আসে। মৌমাছির মতো ক্ষুদ্র এক সৃষ্টিতেও যেমন তাঁর কুদরতের নিদর্শন প্রকাশিত, তেমনি মানুষের ইতিহাসেও স্পষ্ট যে হিদায়াত কোনো বংশ, কোনো গোত্র, কোনো সামাজিক মর্যাদার সম্পত্তি নয়। কেউ আল্লাহর নিদর্শন দেখেও মুখ ফিরিয়ে নেয়, কেউ সেগুলোকে নিয়ে অন্তর নরম করে। এ আয়াত ঠিক সেই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমাদের শেখায়—সত্যকে জানা আর সত্যকে গ্রহণ করা এক জিনিস নয়। আল্লাহর দ্বীনকে কেবল বাহ্যিক স্বীকৃতিতে বাঁচিয়ে রাখা যায় না; অন্তরের সুর, আমলের সত্যতা, আর নিয়তের দিকনির্দেশ—সবকিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
এই আয়াতে কোনো নির্দিষ্ট, নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত একক শানে নুযুলের ওপর নির্ভর না করে বৃহত্তর কুরআনিক প্রেক্ষাপটকে বোঝা জরুরি। মক্কার সমাজে যেমন তাওহীদের ডাক, মূর্তির ভ্রান্তি, আর মানুষের পছন্দ-অপছন্দের সংঘাত ছিল; তেমনি আজও এই আয়াত আমাদের বলে—বিভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু জবাবদিহি এড়ানো যাবে না। শেষ বাক্যটি হৃদয় কাঁপিয়ে দেয়: তোমরা যা কর, সে বিষয়ে অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে। অর্থাৎ শুধু বিশ্বাসের দাবি নয়, প্রতিটি কথা, প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি হালাল-হারামের সীমা মানা বা ভাঙা—সবকিছুই একদিন আলোর সামনে আসবে। তাই এই আয়াত আমাদের ভয় দেখিয়ে থামায় না; বরং জাগিয়ে তোলে, যেন আমরা হিদায়াতের মূল্য বুঝি, কৃতজ্ঞতার ভাষা শিখি, আর নিজের আমলকে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর উপযুক্ত করে গড়ে তুলি।
আল্লাহ চাইলে এই পৃথিবীর সব হৃদয়কে এক সুরে বেঁধে দিতে পারতেন, সব মতের ভিড় থামিয়ে একটিমাত্র পথকে সকলের সামনে উন্মুক্ত করে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি—এতেই মানুষের পরীক্ষা আরও গভীর, আর দায়িত্ব আরও ভারী হয়ে উঠেছে। কারণ হিদায়াত কেবল একটি তথ্য নয়; এটি অন্তরের এমন এক জীবন, যা আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ার মধ্যে জন্ম নেয়। আর বিভ্রান্তি কেবল অজ্ঞানতার নাম নয়; তা কখনো অহংকারের ছায়া, কখনো নিয়ামতের অকৃতজ্ঞতা, কখনো সত্যকে জেনেও তার সামনে নত না হওয়ার কঠিন শাস্তি। এই আয়াত যেন কানের কাছে খুব শান্তভাবে বলে, তোমার অন্তর কোন দিকের ডাকে সাড়া দিচ্ছে, সেটাই তোমার সত্য পরিচয়।
তবে এই প্রশ্নের ভয়ই ঈমানদারের জন্য রহমত। কারণ যে আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, তিনিই পথও দেখান; যে আল্লাহ কাউকে ভ্রষ্টতার দিকে ছেড়ে দিতে পারেন, তিনিই কাউকে তাওবায় ফিরিয়ে আনতে পারেন। তাই দাওয়াতের পথেও হেদায়াতের মালিকানা মানুষের হাতে নেই; আমাদের কাজ শুধু সত্যকে ভালোবাসা, ধৈর্যের সঙ্গে তা পৌঁছে দেওয়া, আর নিজের আমলকে আল্লাহর সামনে লজ্জাহীন না হতে দেওয়া। এই আয়াত হৃদয়ে কাঁপন জাগায়, কারণ এটি স্মরণ করিয়ে দেয়—আজ যে কাজকে আমরা তুচ্ছ ভাবছি, কাল সেটাই হয়তো হিসাবের অক্ষরে দাঁড়িয়ে যাবে। আর যে অন্তর আজ আল্লাহর দিকে নরম হয়ে আছে, সেটিই বোধহয় সবচেয়ে বড় নেয়ামত: হিদায়াতের জন্য খোলা এক দরজা, যার চাবি আল্লাহর হাতে, কিন্তু কড়া নড়ানোর সাহস আমাদের ইখলাস ও দো‘আতেই।
আল্লাহ ইচ্ছা করলে এই পৃথিবীর সব মানুষের কণ্ঠ, সব পছন্দ, সব ঝোঁক, সব মেজাজকে এক রঙে রাঙিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। এ না করার মধ্যেই মানুষের পরীক্ষা, সমাজের বৈচিত্র্য, মতভেদের ভেতর সত্যকে খুঁজে নেওয়ার কঠিন দায়িত্ব, আর হৃদয়ের গোপন দিকগুলো প্রকাশ পাওয়ার সুযোগ রেখে দিয়েছেন। তাই কোথাও পথহারা মানুষের ভিড় দেখলে মনে হবে না, সত্য দুর্বল হয়ে গেছে; আবার কোথাও হিদায়াতপ্রাপ্ত অল্প কিছু মানুষ দেখলে মনে হবে না, সত্য সংখ্যার মুখাপেক্ষী। হিদায়াত আল্লাহর অনুগ্রহ, আর গোমরাহি মানুষের অন্তরের অন্ধকারের জন্য এক ভয়ংকর পরিণতি। এই আয়াত আমাদের চোখের সামনে এক অনিবার্য আয়না তুলে ধরে—কেউ আলোর দিকে এগোয়, কেউ নিজেই অন্ধকারকে বেছে নেয়, আর সেই বেছে নেওয়ার হিসাব কোনো দিনই অদৃশ্য থাকে না।
এই সূরায় নিয়ামতের কথা এসেছে, মৌমাছির মতো নরম অথচ বিস্ময়কর সৃষ্টির ভেতর আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন এসেছে, হালাল-হারামের সীমারেখা এসেছে, কৃতজ্ঞতার ডাক এসেছে; আর এই আয়াতে এসে সবকিছুর ভেতরকার গভীর অর্থ যেন স্পষ্ট হয়ে যায়: মানুষ শুধু ভোগের জন্য নয়, জবাব দেওয়ার জন্যও সৃষ্টি। আমরা যে কাজকে ছোট ভাবি, যে শব্দকে হালকা মনে করি, যে নিয়তকে নিজের কাছেই লুকিয়ে রাখতে চাই, সেগুলোও একদিন উন্মোচিত হবে। সমাজের বিভ্রান্তি, মতবাদের জট, দাওয়াতের পথে কষ্ট, সত্যের পথে একাকীত্ব—কোনোটাই এই জবাবদিহির সামনে অজুহাত হতে পারে না। আল্লাহর ইচ্ছা অচল নয়, কিন্তু তাঁর বিচারও অবিচল; তাই মুমিনের হৃদয় একসাথে ভয় ও আশায় কাঁপে।
আয়াতটি আমাদের বলছে, হিদায়াত কোনো বাহ্যিক পরিচয়ের উত্তরাধিকার নয়; তা আল্লাহর দান, এবং সেই দান চাওয়ার জন্য বিনয় লাগে, তাওবার আগুন লাগে, সত্যকে ভালোবাসার সাহস লাগে। যে হৃদয় নিজের ভুলের জন্য অজুহাত খোঁজে, সে ধীরে ধীরে নিজের পথ নিজেই অন্ধ করে ফেলে; আর যে হৃদয় আল্লাহর সামনে নতি স্বীকার করে, তার জন্য তাওবাই হয়ে ওঠে নতুন জন্ম। তাই আজ এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে—আমার জীবনের গতি কি আল্লাহর দিকে, নাকি আমার প্রবৃত্তির দিকে? আমি কি সত্যকে চাই, নাকি কেবল শান্ত মুখোশ? কারণ শেষ বিচারে প্রশ্ন হবে একটিই: তোমরা যা করতে, তা নিয়ে তোমাদেরকে অবশ্যই জিজ্ঞেস করা হবে। আর এই প্রশ্নের কাঁপনই মুমিনকে জাগিয়ে তোলে, নরম করে, এবং শেষমেশ রবের দিকে ফিরিয়ে আনে।
আর সেই দিন প্রশ্নটি হবে আমাদের আমল নিয়ে। মুখের কথা নয়, নামের ভার নয়, পরিচয়ের অহংকার নয়—জিজ্ঞাসিত হবে কাজের সত্য, অন্তরের দিক, জীবনের গোপন ঝোঁক। সূরা আন-নাহলে যেভাবে আল্লাহর নেয়ামত একের পর এক উন্মুক্ত হয়েছে—মধুর স্বাদে, মৌমাছির বিস্ময়ে, হালালের প্রশান্তিতে, তাওহীদের নির্মল আলোয়—সেভাবেই শেষ কথাটি আমাদের সামনে দাঁড় করায় এক নীরব কিন্তু ভয়ংকর হিসাব। যে হৃদয় কৃতজ্ঞ, সে নেয়ামতে আল্লাহকে দেখে; যে হৃদয় অহংকারী, সে নিদর্শন দেখেও অন্ধ থাকে। যে আল্লাহকে ভয় করে, সে নিজের পথ বদলায়; যে নিজেকে নিরাপদ ভাবে, তার জন্যই জবাবদিহির দিন সবচেয়ে কঠিন।
আজ এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের উচিত কোমল স্বরে কিন্তু ভাঙা হৃদয়ে বলা: হে আল্লাহ, তুমি যাকে হিদায়াত দাও, কেউ তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না; আর তুমি যাকে ছেড়ে দাও, তার জন্য নিজের ভেতরের অন্ধকারই যথেষ্ট। আমাদের অন্তরকে একা ছেড়ে দিয়ো না। আমাদের নিয়ামতকে কৃতজ্ঞতায়, আমাদের জ্ঞানকে আনুগত্যে, আমাদের দ্বীনকে সত্যবাদিতায়, আমাদের জীবনকে তোমার সামনে জবাবদিহির প্রস্তুতিতে রূপ দাও। কারণ শেষ পর্যন্ত আমরা পালাতে পারব না—আমাদের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি নিয়ত, প্রতিটি উপেক্ষা, সবকিছুরই হিসাব আছে। আর সেই হিসাবের আগে যদি আজই আমরা নত হয়ে যাই, তবে এ ভাঙা সিজদাই হতে পারে আমাদের বাঁচার শুরু।