মানুষের জীবন শুরু হয় এমন এক গভীর শূন্যতায়, যেখানে নিজের সম্পর্কে তার কোনো জ্ঞান থাকে না, কোনো দাবি থাকে না, কোনো অহংকারও থাকে না। আল্লাহ তাআলা সেই নীরব, অসহায়, অজ্ঞ অবস্থার মধ্য থেকে মানুষকে বের করে আনেন। এরপর তিনি শুধু জীবনই দেন না; জীবনকে বুঝবার উপকরণও দান করেন—কর্ণ, চক্ষু, আর অন্তর। এই তিনটি নিয়ামত যেন মানুষের ভেতরে জেগে ওঠার তিন দরজা: শোনার দরজা, দেখার দরজা, আর উপলব্ধির দরজা। যদি কান না থাকত, মানুষ সত্যের আহ্বান শুনত না; যদি চোখ না থাকত, সে আল্লাহর নিদর্শন দেখত না; যদি অন্তর না থাকত, সে দেখা-শোনাকে অর্থ দিতে পারত না।
এই আয়াতের মর্মে আছে এক গভীর তাওহীদী শিক্ষা: মানুষ নিজে কিছুই ছিল না, আর যা কিছু তার আছে—ইন্দ্রিয়, বোধ, চেতনা, জ্ঞানগ্রহণের ক্ষমতা—সবই আল্লাহর দান। তাই কৃতজ্ঞতা কেবল মুখের শব্দ নয়; কৃতজ্ঞতা হলো আল্লাহর দেওয়া শক্তিকে আল্লাহর পছন্দের পথে ব্যবহার করা। যে কান সত্য শোনে না, যে চোখ সত্য দেখে না, যে অন্তর সত্যকে ধারণ করে না—সে আসলে নিয়ামতের মধ্যে থেকেও অকৃতজ্ঞ থেকে যায়। আর যে বান্দা নিজের জ্ঞানকে, নিজের উপলব্ধিকে, নিজের বোধকে আল্লাহর আমানত মনে করে, তার হৃদয়ে বিনয় নেমে আসে; সেই বিনয়ই ঈমানের কোমল ছায়া।
সূরা আন-নাহল-এর বৃহৎ সুরও এ কথাই বলে—আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শন, হালাল-হারামের সীমা, জীবন-জীবিকার রহস্য, মৌমাছির মতো ক্ষুদ্র সৃষ্টির ভেতর বিস্ময়—সবই মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, রব একজনই; কৃতজ্ঞতাও তাঁরই জন্য। এই আয়াতে কোনো বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা নেই; বরং এটি মানব-অস্তিত্বের সার্বজনীন বাস্তবতা। প্রত্যেক শিশু, প্রত্যেক মাতা, প্রত্যেক হৃদয় এই কথার সাক্ষী: আমরা জ্ঞান নিয়ে জন্মাইনি, কিন্তু জ্ঞানের সম্ভাবনা নিয়ে এসেছি। তাই জীবন যতই ব্যস্ত হোক, অন্তরের ভেতর এই প্রশ্ন জাগতেই হবে—আমি যে শুনি, দেখি, বুঝি, তার জবাবে আমি কার প্রতি কৃতজ্ঞ?
আল্লাহ মানুষকে শুধু অস্তিত্ব দেননি; দিয়েছেন গ্রহণের ক্ষমতা, উপলব্ধির জানালা, সত্যকে চিনবার ভিত। জন্মের সময় মানুষ ছিল নিঃস্ব, ভাষাহীন, মতহীন, দাবিহীন—এক ধরনের পবিত্র শূন্যতা। তারপর ধীরে ধীরে কান জেগেছে, চোখ জেগেছে, অন্তর জেগেছে। কিন্তু এই জাগরণ যেন আমাদের মনে গেঁথে দেয় এক কঠিন সত্য: আমরা যা জানি, তা আমাদের অর্জনের অহংকার নয়; তা মূলত করুণার উপহার। জ্ঞান আমাদের স্বত্বা নয়, আমানত। বোঝার শক্তি আমাদের মালিকানা নয়, দায়িত্ব। তাই মানুষ যখন নিজেকে জানে—আর এই জানা যদি তাকে আরও নরম, আরও বিনয়ী, আরও কৃতজ্ঞ না করে—তবে সে আসলে তার অস্ত্রকেই নিজের বিপক্ষে ব্যবহার করছে।
মানুষের জন্ম কোনো ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটা একেবারে খালি হাতের, নিরস্ত্র, নির্জ্ঞান এক প্রস্থান। মায়ের গর্ভ থেকে বেরিয়ে এসে সে কিছুই জানে না, কিছুই দাবি করতে পারে না, কিছুই প্রমাণ করতে পারে না। তারপরও আল্লাহ তাকে ছেড়ে দেন না। তিনি দেন কান, যাতে সত্যের ডাক তার কাছে পৌঁছায়; দেন চোখ, যাতে সে চারপাশে ছড়িয়ে থাকা নিদর্শন দেখে; দেন অন্তর, যাতে দেখা ও শোনার ভেতর দিয়ে অর্থ, বোধ, ভয়, আশা—সবকিছু জেগে ওঠে। এভাবে মানুষ শুধু বেঁচে থাকে না, বরং জাগার সুযোগ পায়। এই জাগরণই বান্দার ওপর প্রথম রহমত, আর এই রহমতের প্রতিশব্দই কৃতজ্ঞতা।
কিন্তু সমাজের দুর্ভাগ্য তখনই শুরু হয়, যখন এই নিয়ামতগুলো আমানত হিসেবে আর দেখা হয় না। কান সত্য শুনতে চায় না, চোখ সত্যের দিকে ফেরে না, অন্তর অহংকার, প্রবৃত্তি আর গাফিলতিতে মোটা হয়ে যায়। তখন মানুষ জ্ঞানী হওয়ার ভান করে, অথচ তার জ্ঞান তাকে আল্লাহর দিকে নেয় না; সে শোনে, কিন্তু মানে না; দেখে, কিন্তু শিক্ষাও নেয় না। এই আয়াত যেন নরম কিন্তু কাঁপিয়ে দেওয়া এক প্রশ্ন তুলে ধরে: তোমার কান, তোমার চোখ, তোমার অন্তর—এসব কি তুমি নিজের জন্য নাকি তোমার রবের ইবাদতের জন্য ব্যবহার করছ? যে হৃদয় নিজের অবস্থা নিয়ে জবাবদিহি করতে শেখে, সে ভয় ও আশার মাঝখানে সোজা পথে চলতে পারে। সে জানে, নিয়ামত বেড়ে ওঠে কৃতজ্ঞতায়, আর হারিয়ে যায় অকৃতজ্ঞতায়।
তাই এই আয়াত আমাদের আত্মার কাছে ফিরে আসতে ডাকে। যিনি তোমাকে না-থাকা থেকে থাকা দিলেন, তিনি কি তোমার অন্তরের খবর জানেন না? যিনি তোমার জ্ঞানের প্রথম দরজা খুলে দিলেন, তিনি কি তোমার শেষ হিসাব নেবেন না? মানুষ যখন নিজের অক্ষমতা স্মরণ করে, তখন অহংকার ভেঙে যায়; আর যখন আল্লাহর দান স্মরণ করে, তখন হৃদয় নরম হয়। এই নরম হওয়াই ঈমানের সৌন্দর্য। যে বান্দা তার কান দিয়ে কুরআন শোনে, চোখ দিয়ে সৃষ্টিজগতের নিদর্শন দেখে, আর অন্তর দিয়ে রবের দিকে ঝুঁকে পড়ে—সে আসলে কৃতজ্ঞতার সিজদায় দাঁড়িয়ে যায়।
মানুষের জীবনের প্রথম সত্যটি বড়ই নীরব: আমরা কিছুই জানতাম না। গর্ভের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে আমরা হঠাৎ আলো পাই, শব্দ পাই, মুখ পাই, পৃথিবীকে চিনবার সামান্য ক্ষমতা পাই। কিন্তু এই জাগরণও নিজের অর্জন নয়। আল্লাহই কর্ণ দিয়েছেন, চোখ দিয়েছেন, অন্তর দিয়েছেন—যাতে মানুষ শুধু বেঁচে না থাকে, বরং বুঝে বাঁচে; শুধু দেখে না, বরং নিদর্শন দেখে স্রষ্টাকে চিনে; শুধু শোনে না, বরং সত্যের আহ্বানকে হৃদয়ের গভীরে গ্রহণ করে। এই আয়াত আমাদের অহংকার ভেঙে দেয়, কারণ যে সত্তা আমাদের শূন্যতা থেকে জ্ঞান-দরজার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছেন, তাঁর সামনে বড়াই করার আর কীই-বা থাকে?
কিন্তু কত অদ্ভুত! যে কান দিয়ে কুরআন শোনা সম্ভব, সেই কানই অনেক সময় গাফিলতির শব্দে ভরে যায়; যে চোখ দিয়ে আসমান-জমিনের নিদর্শন দেখা সম্ভব, সেই চোখই কখনও হারামের দিকে অবাধে তাকায়; যে অন্তরকে সত্য চিনবার জন্য দেওয়া হয়েছিল, সেই অন্তরই দুনিয়ার ধুলোয় ভারী হয়ে যায়। তবু আল্লাহ আমাদের ধ্বংস করতে চান না—তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, যাতে আমরা কৃতজ্ঞ হই। আর কৃতজ্ঞতা মানে কেবল ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা নয়; কৃতজ্ঞতা মানে এই কানকে সত্যের পথে রাখা, এই চোখকে পবিত্রতার আমানত বানানো, এই অন্তরকে ইমানের ঘরে ফিরিয়ে আনা।
যখন বান্দা বোঝে, আমি আমার জ্ঞানও নিজের বানানো নই; আমি আমার বোধও নিজের ক্রেডিট দিয়ে পাইনি—তখন তার বুক নরম হয়ে যায়, অহংকার গলে যায়, তওবার দরজা খুলে যায়। এ আয়াত যেন ফিসফিস করে বলে: তোমার যা কিছু আছে, তা তোমার নয়; তা তোমাকে দেওয়া হয়েছে। তাই ফিরে এসো, কৃতজ্ঞ হও, নরম হও, আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ো। যে হৃদয় এই সত্য গ্রহণ করে, সে-ই আসলে জীবিত; আর যে হৃদয় নিয়ামতের মধ্যে থেকেও মালিককে ভুলে থাকে, সে এক অদ্ভুত মৃত্যু বয়ে বেড়ায়।