আল্লাহ তাআলা যখন মানুষের দিকে নেয়ামতের দরজা খুলে দেন, তখন সেই দরজা কৃতজ্ঞতারও হতে পারে, আবার অকৃতজ্ঞতারও হতে পারে। এই আয়াতে এক ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরা হয়েছে: মানুষকে দান করা হলো, অথচ সে সেই দানকে অস্বীকার করতে লাগল। অর্থাৎ নেয়ামত হাতে পেয়েও নেয়ামতের মালিককে ভুলে যাওয়া, উপকার পেয়ে উপকারীর মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, রিজিক পেয়ে রিজিকদাতাকে অবজ্ঞা করা। কুরআন যেন খুব শান্ত স্বরে আমাদের হৃদয়ের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়—আল্লাহর দান শুধু ভোগের বস্তু নয়; তা এক একটি সাক্ষী, যা মানুষের শোকর নাকি কুফর, তা প্রকাশ করে।

‘অতএব মজা ভোগ করে নাও’—এই বাক্যে ধমকের ভেতরে এক নির্মম শূন্যতা আছে। দুনিয়ার সুখ, আরাম, সুযোগ, সম্মান—এসব কিছুই স্থায়ী ঠিকানা নয়; এগুলো কেবল পরীক্ষার সাময়িক পর্দা। মানুষ যখন মনে করে এখনই সব, তখনই সে সবচেয়ে বেশি ধোঁকার মধ্যে থাকে। আয়াতের শেষ ঘোষণা, ‘সত্বরই তোমরা জানতে পারবে’, কেবল ভবিষ্যতের কোনো সাধারণ জ্ঞান নয়; এটা সেই মুহূর্তের প্রতিশ্রুতি, যখন পর্দা সরে যাবে, অজুহাত নিঃশেষ হবে, আর প্রতিটি নেয়ামতের হিসাব স্পষ্ট হয়ে উঠবে। আজ যে সত্যকে উপহাস করা হয়, কাল সেটাই হবু বান্দার সামনে সবচেয়ে কঠিন সত্য হয়ে দাঁড়াবে।

এই সূরার বৃহত্তর প্রবাহে নেয়ামত, তাওহীদ, কৃতজ্ঞতা এবং দাওয়াতের ধৈর্য একে অপরের সঙ্গে বাঁধা। মৌমাছির আশ্চর্য সৃষ্টিতে যেমন আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন আছে, তেমনি মানুষের অন্তরের ভেতরেও এক আহ্বান আছে—কে তোমার পালনকর্তা, কে তোমার রিজিকদাতা, কে তোমার পথপ্রদর্শক? কুরআন এখানে কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের চিরন্তন নাফরমানির স্বভাবকে উন্মোচন করছে। কখনো নিয়ামতকে মিথ্যা বলা হয় মুখে, কখনো আচরণে, কখনো জীবনে আল্লাহর একত্বকে স্বীকার না করে। এই আয়াত সেইসব হৃদয়ের জন্য সতর্কবার্তা, যারা দুনিয়ার স্বাদে ডুবে গিয়ে আখিরাতের হিসাবকে দূরে ঠেলে দেয়।

আল্লাহর দান যখন হৃদয়ে শোকরের আলো জ্বালায় না, তখন সে দানই মানুষের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। নেয়ামত পাওয়া মানে কেবল সুখ পাওয়া নয়; এর মানে হলো পরীক্ষার মধ্যে প্রবেশ করা। কে এই দানের ভেতর দিয়ে দাতাকে চিনবে, আর কে সেই দানকে নিজের অধিকার ভেবে অহংকারে ডুবে থাকবে—এই আয়াত যেন নীরবে সেই সত্যই উন্মোচন করে। মানুষ যখন রিজিককে দেখে, কিন্তু রিজিকদাতাকে দেখে না; যখন আরামকে আঁকড়ে ধরে, কিন্তু রহমতের মালিকের সামনে মাথা নত করে না—তখন সে আসলে নিজের অন্তরকে শূন্যতার দিকে ঠেলে দেয়।

তাই কুরআনের এই সতর্কবাক্য আমাদের কানে শুধু ধমক নয়, হৃদয়ে এক গভীর কাঁপন হয়ে নামে: ভোগ করে নাও, কিন্তু জেনে রেখো, এই ভোগের আয়ু ক্ষণস্থায়ী। দুনিয়ার মধুরতা এমন এক পর্দা, যা সত্যকে পুরোপুরি লুকাতে পারে না; কেবল কিছু সময়ের জন্য দেরি করাতে পারে। মানুষ ভাবে সে উপভোগ করছে, অথচ অনেক সময় সে নিজের আত্মাকে আরো গভীরে অন্ধকারে নামিয়ে নিচ্ছে। যে নেয়ামত শোকরের দিকে নেয় না, তা ধীরে ধীরে অকৃতজ্ঞতার বিষে বদলে যায়; আর অকৃতজ্ঞতার শেষ পরিণতি হলো হৃদয়ের কঠিন হয়ে যাওয়া, সত্যকে অবজ্ঞা করা, এবং আল্লাহর সামনে জবাবদিহির কথা ভুলে যাওয়া।
‘সত্বরই তোমরা জানতে পারবে’—এই বাক্যটিই যেন দুনিয়ার সমস্ত ভানকে থামিয়ে দেয়। আজ অস্বীকারকে হয়তো শক্তি মনে হয়, আজকের বিলাসকে হয়তো স্থায়িত্ব মনে হয়, কিন্তু একদিন সব পর্দা সরে যাবে। তখন জানা মানে আর তত্ত্ব জানা নয়; তখন জানা মানে মুখোমুখি হওয়া, নিজের কীর্তির ফল দেখা, নেয়ামতের হিসাব বোঝা। এই আয়াত তাই আমাদের শেখায়, শোকর কেবল একটি নৈতিক শোভা নয়; এটা ঈমানের প্রাণ। যে হৃদয় আল্লাহকে চিনে কৃতজ্ঞ হয়, সে-ই আলোয় থাকে। আর যে হৃদয় নেয়ামত পেয়ে অস্বীকারে মেতে ওঠে, সে নিজেই নিজের জন্য এক অন্ধকার ভবিষ্যৎ লিখে ফেলে।

আল্লাহর দান যখন মানুষের হাতে আসে, তখন তার আসল পরীক্ষা শুরু হয়। কেউ সেই দানকে দেখে রবের দিকে ঝুঁকে পড়ে, আর কেউ সেই দানকেই গর্বের আসনে বসায়; কৃতজ্ঞতার বদলে জন্ম নেয় অস্বীকার, শোকরের বদলে জন্ম নেয় অহংকার। এই আয়াতে সেই অন্তর্দহনের কথাই ধরা পড়েছে—মানুষকে যা দেওয়া হয়েছে, তা সে যদি আল্লাহর অনুগ্রহ বলে না মানে, তবে সে আসলে দানকে নয়, দানদাতাকেই অস্বীকার করছে। নিয়ামত তখন আর রহমত থাকে না; তা হয়ে ওঠে প্রমাণ, যা মানুষের অন্তরের সত্যতা প্রকাশ করে। যেদিন রিজিক, সুস্থতা, সুযোগ, পরিবার, নিরাপত্তা—এসব নিয়ামতকে আমরা নিজের যোগ্যতা বলে মনে করি, সেদিনই আমাদের ভেতরে এক সূক্ষ্ম কুফরের ছায়া নেমে আসে।

‘অতএব মজা ভোগ করে নাও’—এই বাক্যে আনন্দের অনুমতি নেই, আছে ভয়ের কঠিন সুর। যেন বলা হচ্ছে, তোমরা যদি সত্যকে ঢেকে রেখে সাময়িক ভোগে ডুবে থাকতে চাও, থাকো; কিন্তু এই ভোগের আয়ু খুবই ক্ষণস্থায়ী, আর এর পরেই আসে এমন এক জানা, যা আর ফিরে পাওয়া যায় না। দুনিয়ার ভোগ মানুষকে যতই মাতাল করুক, তার অন্তর-আকাশে একদিন জবাবদিহির সূর্য উঠবেই। তখন সম্পদ থাকবে, কিন্তু প্রশান্তি থাকবে না; সুযোগ থাকবে, কিন্তু আর সংশোধনের সময় থাকবে না; মুখে অজুহাত থাকবে, কিন্তু অন্তর জানবে—সবকিছু মিথ্যা ছিল, শুধু আল্লাহর হিসাব সত্য ছিল।

এই আয়াত আমাদের সমাজকেও জাগিয়ে তোলে। যে সমাজ নেয়ামতের ভেতর থেকেও মালিককে ভুলে যায়, সে সমাজ ধীরে ধীরে হৃদয়হীন হয়ে পড়ে; হালাল-হারামের সীমা ঝাপসা হয়, শক্তি বাড়ে কিন্তু বরকত কমে, ভোগ বাড়ে কিন্তু শান্তি সরে যায়। মুমিনের জন্য এই কথা তাই শুধু সতর্কবার্তা নয়, ফিরে আসার আহ্বানও বটে—নিজের আমলকে প্রশ্ন করো, নিজের সন্তুষ্টিকে প্রশ্ন করো, নিজের দৃষ্টিকে প্রশ্ন করো: আমি কি নিয়ামতকে আল্লাহর পথে ব্যবহার করছি, নাকি নিয়ামতের মোহে আল্লাহকেই ভুলে যাচ্ছি? যে হৃদয় আজ শোকরের কান্না শেখে, সে হৃদয়ই কাল নিরাপদ থাকবে। আর যে অন্তর এখনো জাগ্রত, সে যেন দেরি না করে—কারণ সত্য জানা যখন অবধারিত, তখন তাওবার দরজাই মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।

মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর বিপদ হয়তো অভাব নয়, বরং দান পেয়ে অন্ধ হয়ে যাওয়া। যখন আল্লাহ দেন, তখন তাঁর দিকে ফিরতে হয়; কিন্তু কত হৃদয় নেয়ামতকে আড়াল বানিয়ে নেয়, আর সেই আড়ালেই হককে চাপা দিতে চায়। এই আয়াত যেন বলছে—তোমরা ভোগ করো, কিন্তু মনে রেখো, ভোগের মাঝেই তোমাদের আসল পরিণতি লুকিয়ে আছে। আজ যে শরীর সুস্থ, যে রিজিক হাতে, যে সময় বেঁচে আছে, যে ঘর নিরাপদ, যে মুখে কথা আছে—এসব কিছুই স্থায়ী মালিকানার প্রমাণ নয়; এগুলো কেবল সেই মহান দয়ার উজ্জ্বল সাক্ষ্য, যাকে অস্বীকার করলে মানুষ নিজের অন্তরকেই অস্বীকারকারী করে তোলে।

দুনিয়ার মজা কখনো শেষ কথা নয়। এটি এমন এক ক্ষণিকের পর্দা, যার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে চূড়ান্ত সত্য। মানুষ যখন ভাবে সব কিছু নিয়ন্ত্রণে, তখনই সে আসলে সবচেয়ে বেশি অসহায়। আর যখন হিসাবের দিন এসে দাঁড়াবে, তখন কোনো ভোগ, কোনো বিলাস, কোনো বাহানা, কোনো ব্যস্ততা তাকে এক কণা পরিমাণও রক্ষা করতে পারবে না। তাই আজই হৃদয় নরম হোক, জিহ্বায় শোকর নামুক, চোখে অশ্রু আসুক; কারণ নেয়ামতের যথার্থ জবাব হলো কৃতজ্ঞতা, আর কৃতজ্ঞতার আসল রূপ হলো আল্লাহর সামনে বিনয়। হে আমাদের রব, আমাদেরকে সেইসব মানুষের অন্তর্ভুক্ত করবেন না, যারা দান পেয়ে দাতাকে ভুলে যায়; বরং আমাদের এমন বান্দা বানান, যারা নেয়ামত দেখে আরও বেশি সেজদায় ঝুঁকে পড়ে, আর ভোগের নয়, আপনার সন্তুষ্টির পথেই শান্তি খুঁজে পায়।