আল্লাহ তাআলা যখন কোনো কিছুর ইচ্ছা করেন, তখন তাঁর জন্য কোনো উপকরণ, কোনো প্রস্তুতি, কোনো দীর্ঘ প্রক্রিয়া, কোনো সহায়কের প্রয়োজন হয় না। তিনি কেবল বলেন, হয়ে যাও; আর তা হয়ে যায়। এই আয়াতে সৃষ্টি-জগতের সমস্ত শক্তির শিকড় খুলে দেওয়া হয়েছে এক বাক্যে, আর মানুষের অহংকারকে নীরবে মাটিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। মানুষ কত আয়োজন করে, কত পরিকল্পনা আঁটে, কত হিসাব কষে; তবু তার ইচ্ছার ভেতরেও অক্ষমতার ছায়া লেগে থাকে। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা এমন নয়। তাঁর ইচ্ছাই যথেষ্ট। তাঁর আদেশই বাস্তবতা। তাঁর ‘কুন’ মানেই অস্তিত্বের দরজা খুলে যাওয়া।

সূরা আন-নাহলের ধারায় এই ঘোষণা বিশেষভাবে হৃদয় কাঁপিয়ে দেয়, কারণ এ সূরায় নিয়ামত, হালাল-হারাম, জীবনধারণের উপকরণ, এবং মানুষের প্রতি আল্লাহর অগণিত অনুগ্রহ বারবার সামনে এসেছে। মৌমাছির কথা, খাদ্যের বিধান, পানীয়, ফল, ছায়া, পথনির্দেশ, এমন কত নিদর্শন—সবই এক সত্যের দিকে ইশারা করে: যার হাতে সৃষ্টি, রিজিক, আইন, জীবন-মৃত্যু—সবকিছুই তাঁরই। এই আয়াত কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি তাওহীদের সেই চিরন্তন ঘোষণা, যা প্রতিটি যুগের মানুষের অহংকার ভাঙে, অবাধ্য মনকে থামায়, এবং কৃতজ্ঞ হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে।

আল্লাহর ইচ্ছা কোনো দুর্বল বাসনা নয়, কোনো অনিশ্চিত চেষ্টা নয়, কোনো মানুষের মতো দ্বিধা-দোলায় ভরা পরিকল্পনাও নয়। তাঁর ইচ্ছা মানেই চূড়ান্ত সত্যের ঘোষণা। তিনি যখন কিছু চান, তখন সময় তাঁর সামনে বাধা নয়, দূরত্ব তাঁর সামনে পর্দা নয়, উপাদান তাঁর সামনে শর্ত নয়। সৃষ্টিজগতের সব দরজা তাঁর এক ইশারায় খুলে যায়। এই আয়াত মানুষের অন্তরের গোপন অহংকারকে ভেঙে দেয়, কারণ মানুষ নিজের সামান্য ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে অনেক সময় নিজেকেই বড় ভাবতে শেখে; অথচ তার হৃদস্পন্দন, তার নিশ্বাস, তার সামর্থ্য—সবই সেই রবের অনুগ্রহে চলমান।

সূরা আন-নাহলের ধারায় এই সত্য আরও গভীর হয়ে ওঠে, কারণ এখানে নিয়ামতের পর নিয়ামত চোখের সামনে এনে আল্লাহ যেন জিজ্ঞেস করছেন: যিনি মৌমাছিকে পথ দেখান, যিনি খাদ্য, ফল, ছায়া, উপকার ও জীবনের উপকরণ দান করেন, তাঁর জন্য কি অসম্ভব কিছু আছে? হালাল-হারামের সীমারেখা, রিজিকের বিস্তার, দাওয়াতের ধৈর্য—সবকিছুর পেছনে একই বিশ্বাস দাঁড়িয়ে আছে: আল্লাহই সৃষ্টিকর্তা, আল্লাহই ব্যবস্থাপক, আল্লাহই হুকুমদাতা। তাই যে হৃদয় এ আয়াত বোঝে, সে নিয়ামতকে আর কেবল ভোগের বস্তু মনে করে না; সে বুঝতে শেখে, প্রতিটি দান একেকটি আহ্বান—কৃতজ্ঞ হও, নত হও, রবকে চিনে নাও।

আর এখানেই ঈমানের কোমল কিন্তু শক্তিশালী শিক্ষা: আমরা ফল চাই, কিন্তু ফল দানকারীকে ভুলে গেলে আমাদের ভেতর শূন্যতা জন্মায়; আমরা পথ চাই, কিন্তু পথপ্রদর্শককে অস্বীকার করলে সেই পথই অন্ধকারে হারায়। আল্লাহর ‘কুন ফাইয়াকূন’ আমাদের শেখায়, দুঃসময়েও হতাশা নয়, সুসময়েও অহংকার নয়। যিনি না থেকেও সৃষ্টি করেন, যিনি ইচ্ছা করলেই অস্তিত্ব দেন, তিনিই আমাদের অন্তরের জট খুলতে পারেন, গুনাহের আঁধার সরাতে পারেন, শুকনো হৃদয়ে ঈমানের ফুল ফোটাতে পারেন। এই আয়াত তাই শুধু মহাবিশ্বের শক্তি ঘোষণা করে না; এটি বান্দার বুকের ভিতর এক নরম কাঁপন জাগায়—হে আমার রব, আপনার ইচ্ছার সামনে আমার সব দাবি ছোট, আমার সব কৃতিত্ব তুচ্ছ, আর আপনার দানই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা।
আল্লাহ যখন কোনো কিছুর ইচ্ছা করেন, তখন তাঁর সামনে কোনো দূরত্ব বাধা হয় না, কোনো অন্ধকার প্রতিবন্ধকতা হয় না, কোনো শক্তি তাঁকে প্রতিরোধ করতে পারে না। মানুষ যেখানে ইচ্ছা পূরণের আগে উপকরণ খোঁজে, পরিকল্পনা আঁকে, সহায়তা জোগাড় করে, সেখানে রব্বুল আলামিনের ইচ্ছাই যথেষ্ট। এ আয়াত আমাদের অন্তরের ভেতর জমে থাকা অহংকারকে ভেঙে দেয়। যে হৃদয় মনে করে আমি পারি, আমার চেষ্টাই যথেষ্ট, আমার বুদ্ধিই শেষ কথা—এই এক বাক্য তাকে নীরবে কাঁপিয়ে দেয়: কুন ফাইয়াকূন। সৃষ্টির সমস্ত জাঁকজমক, মানুষের সব দম্ভ, শক্তি-ক্ষমতার সব প্রদর্শন আল্লাহর ইচ্ছার সামনে কত ক্ষুদ্র, কত নীরব, কত অসহায়।

সূরা আন-নাহলে যখন আমরা নিয়ামতের পর নিয়ামত দেখি—মৌমাছির বিস্ময়, খাদ্যের হালাল-হারামের সীমা, জীবনের প্রয়োজন, পথচলার দিশা—তখন এই আয়াত যেন বলে, যিনি এত নিখুঁতভাবে রিজিক সাজান, যিনি এক ফোঁটা মধুর ভেতরও হিকমত রাখেন, তিনি তোমার দোয়া শুনতেও সক্ষম, তোমার দুর্বলতা জানতেও সক্ষম, তোমার তাওবা কবুল করতেও সক্ষম। তাই কৃতজ্ঞতার আসল রূপ হলো অন্তরের নত হওয়া। যে নেয়ামতকে দেখে মনে করে এটি আমার অধিকার, সে অকৃতজ্ঞ; আর যে নেয়ামতকে দেখে বলে, এটি আমার রবের দান, তার হৃদয়ে ইমান জেগে ওঠে। এই আয়াত আমাদের শেখায়—যিনি সবকিছু ‘হও’ বলে অস্তিত্বে আনেন, তাঁর নির্দেশের সামনে হালালকে হালাল, হারামকে হারাম, সত্যকে সত্য বলে মেনে নেওয়াই মুমিনের শান্তি।

মানুষের সমাজে আজ কত অহংকার, কত পরিকল্পনার দৌড়, কত প্রভাবের ভ্রান্ত নিরাপত্তা। কিন্তু কুন ফাইয়াকূন স্মরণ করিয়ে দেয়—জীবন আল্লাহর হাতে, মৃত্যু আল্লাহর হাতে, পরিবর্তন আল্লাহর হাতে, মুক্তি আল্লাহর হাতে। তাই দাওয়াতের পথে, ধৈর্যের পথে, আত্মশুদ্ধির পথে মুমিন ভেঙে পড়ে না; সে জানে ফলাফল আল্লাহর ইচ্ছায়, দায়িত্ব তার আমানত। আমাদের কাজ সত্য বলা, নরম হৃদয়ে ডাকা, নিজেকে শোধরানো, আর প্রতিটি অবস্থায় রবের দরজায় ফিরে যাওয়া। যে হৃদয় এই আয়াতের সামনে দাঁড়ায়, তার জিহ্বা গর্বে ভারী হয় না; তার চোখে আসে অশ্রু, তার অন্তরে আসে ভয় ও আশা—ভয় এই যে আমি কত ছোট, আর আশা এই যে আমার রব কত মহান।

এই আয়াতের সামনে এসে মানুষের সব “কেন”, “কীভাবে”, “কতদিন” যেন ছোট হয়ে যায়। আমরা যাকে অসম্ভব ভাবি, আল্লাহর জন্য তা কখনোই দুরূহ নয়; আমরা যাকে দূরে মনে করি, তা তাঁর ইচ্ছার সামনে মুহূর্তের ব্যবধানও নয়। তাই মুমিনের হৃদয় এখানে একদিকে ভয়ে কেঁপে ওঠে, অন্যদিকে প্রশান্তিতে নুয়ে পড়ে। ভয়, কারণ আমরা এমন এক সত্তার সামনে দাঁড়িয়ে আছি—যাঁর ক্ষমতার বাইরে কিছু নেই, যাঁর কাছে গোপন বলে কিছু নেই, যাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি কারও নেই। প্রশান্তি, কারণ যিনি সবকিছু “হও” বলে অস্তিত্বে আনতে পারেন, তিনিই আবার রহমত দিয়ে বান্দাকে জাগাতে পারেন, ক্ষমা দিয়ে গুনাহগারকে ফেরাতে পারেন, আর তাওবার দরজা খুলে দিতে পারেন এক নিঃশব্দ ইশারায়।

সূরা আন-নাহলের নিয়ামতের স্রোত, মৌমাছির বিস্ময়, হালাল রিজিকের মিষ্টতা, জীবনকে ঘিরে আল্লাহর অসংখ্য দান—সবকিছুর শেষে এই আয়াত যেন বলছে: কৃতজ্ঞ হও, কারণ তুমি যা পেয়েছ তা তোমার দক্ষতায় নয়; বিনীত হও, কারণ তোমার অস্তিত্বও তোমার আয়ত্তে নয়; ধৈর্য ধরো, কারণ যার ইচ্ছায় আসমান-জমিন দাঁড়িয়ে আছে, তিনি তোমার দোয়া শুনেন; আর দাওয়াত দাও মৃদু কণ্ঠে, কারণ সত্যের শক্তি মানুষের জোরে নয়, আল্লাহর ইচ্ছায়। আজ যদি অন্তর কঠিন হয়ে থাকে, তবে এই “কুন ফাইয়াকূন” মনে করো—যিনি শূন্য থেকে সৃষ্টি আনেন, তিনি মৃত হৃদয়েও হিদায়াতের প্রাণ ফুঁকে দিতে পারেন। তাই অহংকার নয়, আত্মসমর্পণ চাই; দাবিদাওয়া নয়, ইবাদত চাই; বিস্ময় নয় শুধু, সিজদা চাই। আল্লাহ আমাদের সেই অন্তর দিন, যে অন্তর তাঁর ইচ্ছার সামনে ভেঙে পড়ে, কিন্তু তাঁর রহমতের ভেতরেই আবার জেগে ওঠে।