মানুষ যখন আল্লাহর নামে কড়া শপথ করে বলে, মৃত্যু হয়ে গেলে আর কেউ ফিরে আসবে না, তখন আসলে সে কেবল একটি মত নয়—একটি অহংকারও প্রকাশ করে। সূরা আন-নাহলের এই আয়াতে সেই অস্বীকারের মুখে আল্লাহ তাআলা সত্যকে স্থির, দৃঢ়, অচল করে ঘোষণা করেন: অবশ্যই পুনরুত্থান হবে। মৃত্যু শেষ কথা নয়; কবর চূড়ান্ত পরাজয় নয়; নিঃশেষ হয়ে যাওয়া মানুষের নিয়তি নয়। আল্লাহর ওয়াদা সত্য, তাঁর ক্ষমতার সামনে মাটিতে মিশে যাওয়া দেহও আবার দাঁড়িয়ে যাবে। মানবজীবন যতই ক্ষণস্থায়ী হোক, তার প্রতিটি শ্বাসই যেন এই ঘোষণা শোনায়—তোমাদের অস্তিত্ব আল্লাহর হাতে, এবং প্রত্যাবর্তনও তাঁরই দিকে।
এই আয়াতের প্রসঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট, নির্ভরযোগ্য একক ঘটনার বর্ণনা জোর দিয়ে বলা নিরাপদ নয়; বরং এটি মক্কার সেই বৃহৎ অস্বীকার-পরিস্থিতির অংশ, যেখানে মানুষ আখিরাতকে মানতে চাইত না, যদিও তারা প্রতিদিন নিদর্শন দেখত। সূরার সামগ্রিক প্রবাহে নিয়ামত, তাওহীদ, হালাল-হারাম, কৃতজ্ঞতা, এবং আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শনের মাঝে মৌমাছির বিস্ময়কর জীবনও সামনে আসে—যেন সৃষ্টিজগত নিজেই সাক্ষ্য দেয় যে যিনি এত নিখুঁতভাবে জীবন পরিচালনা করেন, তিনি মৃত্যু-পরবর্তী পুনর্জীবনেও অপারগ নন। যারা আল্লাহর দেওয়া নিদর্শন দেখেও অস্বীকার করে, তাদের অজ্ঞতা আসলে জ্ঞানহীনতা নয় শুধু; তা হলো হৃদয়ের পর্দা, যা সত্যের আলোকে ঢেকে দেয়।
আয়াতের শেষ বাক্যটি হৃদয়ে কাঁপন তোলে: কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না। এই না-জানাটা কেবল তথ্যের অভাব নয়; এটি এমন এক সীমা, যেখানে মানুষ নিজের দৃষ্টি, বুদ্ধি, ইচ্ছা—সবকিছুকে চূড়ান্ত মনে করতে শুরু করে। অথচ আল্লাহর ওয়াদার সামনে মানুষের সব ধারণা ছোট হয়ে যায়। তাই এই আয়াত আমাদের কেবল আখিরাতের কথা মনে করিয়ে দেয় না, বরং তাওহীদের সামনে নত হতে শেখায়: যিনি সৃষ্টি করেন, তিনি পুনরায় সৃষ্টি করতে পারেন; যিনি জীবন দেন, তিনি জীবন ফিরিয়েও দিতে পারেন। আর যে হৃদয় এই সত্য গ্রহণ করে, তার কাছে মৃত্যু আর অন্ধ শূন্যতা নয়—বরং আল্লাহর সত্য ওয়াদের দিকে এক নিশ্চিত যাত্রা।
মানুষ যখন বুক ফুলিয়ে আল্লাহর নামে কঠোর শপথ করে বলে, মৃত্যুর পরে আর কিছু নেই, তখন সে কেবল আখিরাতকেই অস্বীকার করে না; সে নিজের সীমাকেও ভুলে যায়। এই অস্বীকারের ভেতরে লুকিয়ে থাকে অহংকারের এক অদ্ভুত তাপ—যেন ক্ষণস্থায়ী বুদ্ধি দিয়ে চিরন্তন সত্যকে ঘিরে ফেলা যায়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা সেই তর্কের সামনে একটিমাত্র শব্দ রাখেন, আর তা হলো তাঁর নিশ্চিত ওয়াদা। মৃত্যু কোনো শূন্যতা নয়, কবর কোনো চূড়ান্ত বিলুপ্তি নয়; মানুষ মাটি হয়ে গেলেও তার রবের ক্ষমতার বাইরে সে কখনো যায় না। যে সত্তা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, তাঁর কাছে পুনরায় সৃষ্টি করা আরও সহজ—কোনো কিছুর জন্যই তিনি অপারগ নন।
এই আয়াত মানুষকে শুধু ভয় দেখায় না; এটি মানুষকে জাগিয়ে তোলে। যদি পুনরুত্থান সত্য হয়, তবে প্রতিটি শ্বাসই অর্থপূর্ণ, প্রতিটি কাজই জবাবদিহিমূলক, প্রতিটি নিয়ামতই পরীক্ষা। যে আল্লাহ মধুর ফোঁটার মধ্যে উপকার লুকিয়ে রাখেন, পাতার মধ্যে জীবন লুকিয়ে রাখেন, মৃত হৃদয়ে ঈমানের ডাক লুকিয়ে রাখেন—তিনি অবশ্যই মৃত দেহের মধ্যেও পুনর্জীবনের ক্ষমতা রাখেন। তাই মুমিনের অন্তর এখানে বিনয়ী হয়: সে দুনিয়াকে চূড়ান্ত মনে করে না, নিজের জ্ঞানকে পরম বলে দাবি করে না, আর আল্লাহর ওয়াদাকে কখনো দুর্বল মনে করে না। মানুষের অজ্ঞতা বড় হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর সত্য তার চেয়েও বড়; আর সেই সত্যই একদিন কবরের নিঃস্তব্ধতা ভেঙে বলে উঠবে—তোমরা যা অস্বীকার করেছিলে, তা-ই সত্য ছিল।
মানুষের অহংকার কখনো কখনো এত দূর যায় যে সে আল্লাহর নাম নিয়ে শপথ করে বলে—মৃত্যুর পরে আর কোনো জীবন নেই। এই অস্বীকার শুধু যুক্তির ঘাটতি নয়, হৃদয়ের উপর জমে থাকা পর্দা। সূরা আন-নাহলের এই আয়াতে সেই পর্দার সামনে আল্লাহ তাআলা তাঁর সত্য ওয়াদা উচ্চারণ করেন: অবশ্যই পুনরুত্থান হবে। মৃত্যু শেষ নয়; তা কেবল পর্দা সরার মুহূর্ত। যে দেহ মাটিতে মিশে যায়, যাকে মানুষ তুচ্ছ ভাবে, আল্লাহর কুদরতের সামনে তারও ফিরে দাঁড়ানো অসম্ভব নয়। মানুষের জেদ যত বড়ই হোক, আল্লাহর ওয়াদা তার চেয়েও অধিক সত্য, অধিক দৃঢ়, অধিক নিকট।
এখানে আখিরাত অস্বীকারের জবাব শুধু একটি আকীদার বক্তব্য নয়; এটি আত্মার জন্য এক কঠিন জাগরণ। কারণ পুনরুত্থান মানে এই নয় শুধু যে আমরা আবার উঠব, বরং এই যে আমাদের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি নীরবতা, প্রতিটি নিয়ত আল্লাহর সামনে ফিরে যাবে। যে সমাজ আখিরাত ভুলে যায়, সেখানে অন্যায় সহজ হয়ে যায়, কৃতজ্ঞতা ম্লান হয়ে যায়, হালাল-হারামের সীমা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। আর যে হৃদয় এই ওয়াদাকে সত্য বলে জানে, সে জানে—আমি একা নই, আমার শেষও অন্ধকারে হারিয়ে যাবে না; আমার ফিরে যাওয়া আছে, হিসাব আছে, এবং সেই হিসাবের অধিপতি আল্লাহ।
তাই এই আয়াত ভয় জাগায়, আবার আশা-ও জাগায়। ভয়—যেন মানুষ তার গাফলতকে ভেঙে ফেলে; আশা—যেন তওবার দরজা দেখে সে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। সূরার সামগ্রিক আলোয় এই সত্য আরও গভীর হয়: যেমন আল্লাহ মৌমাছিকে পথ দেখান, নি‘আমতের ভাণ্ডার খুলে দেন, হালালকে পরিচ্ছন্ন করে দেন, তেমনি তিনি মৃতকেও জীবন দিতে সক্ষম। সৃষ্টি যেখানে তাঁর কুদরতের সাক্ষী, সেখানে পুনরুত্থান কেন অসম্ভব হবে? বরং অসম্ভব হলো মানুষের হঠকারিতা। আর মুমিনের হৃদয় এই আয়াত শুনে নরম হয়—সে বলে, হে আল্লাহ, তুমি যখন পুনরুত্থানের ওয়াদা করেছ, তখন আমার জীবনের প্রতিটি শ্বাস যেন সেই ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি হয়ে ওঠে।
বَلَىٰ—অবশ্যই হবে। এই এক শব্দে ভেঙে যায় অস্বীকারের প্রাচীর, নত হয় অহংকারের মাথা। আল্লাহর ওয়াদা কথার কড়াকড়ি নয়; তা সত্যের ঘোষণা, কুদরতের অঙ্গীকার। তাই যারা আজ আখিরাতকে দূরে ঠেলে দেয়, তারা আসলে নিজের আত্মাকেই অন্ধকারে ঠেলে দেয়। এই আয়াত আমাদের কানে কেবল পুনরুত্থানের সংবাদ দেয় না; দেয় ফিরে আসার সতর্কতা, তওবার ডাক, এবং জীবনকে হালকা করে দেখার বিপদ থেকে জাগিয়ে তোলার স্পর্শ। মৃত্যু যদি নিশ্চিত হয়, তবে সাক্ষাৎও নিশ্চিত; আর সাক্ষাৎ যদি নিশ্চিত হয়, তবে হিসাবকে উপেক্ষা করা সবচেয়ে বড় বোকামি।
হে অন্তর, আজ আর অজ্ঞতার আশ্রয় নিও না। যে আল্লাহ তোমাকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, তিনি তোমাকে আবারও দাঁড় করাতে সক্ষম—এ বিশ্বাসই তোমার ভাঙা ভিতকে জোড়া দেয়, তোমার পাপকে ক্ষমার দিকে ঠেলে দেয়, তোমার জীবনকে অর্থ দেয়। তাই অহংকার নয়, কৃতজ্ঞতা; অস্বীকার নয়, সেজদা; অবহেলা নয়, প্রস্তুতি—এই হোক তোমার নীরব প্রতিশ্রুতি। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ আল্লাহর কাছেই ফিরবে, আর তখন সত্যকে অস্বীকার করার সব শব্দ মুছে যাবে; থাকবে শুধু তাঁর ওয়াদা, যা সর্বদা সত্য।