“আর যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমাদের রব কী নাযিল করেছেন?”—তখন তারা বলে, “পূর্ববর্তীদের কাহিনী-কথা।” সূরা আন-নাহলের এই আয়াত মানুষের এক গভীর আত্মপ্রতিরোধকে উন্মোচন করে। সত্য যখন দরজায় কড়া নাড়ে, অহংকার কখনো কখনো জবাব দেয় অবজ্ঞা দিয়ে; ওহীকে তখন তারা বিচার করে না, বরং উপহাসের ভাষায় দূরে ঠেলে দেয়। অথচ রবের নাযিল করা বাণী কাহিনীর সাজানো মালা নয়; তা হৃদয়ের জন্য আলো, পথহারা মানুষের জন্য দিশা, আর আত্মার জন্য জাগরণের ডাক। এই একটি প্রশ্নেই যেন মানুষের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়: তুমি শুনছ কী, আর তার জবাবে তোমার অন্তর কীভাবে সাড়া দিচ্ছে?

সূরা আন-নাহল মক্কী সুরা; এর বড় সুর জুড়ে আছে নিয়ামত, তাওহীদ, কৃতজ্ঞতা, হালাল-হারামের সীমারেখা, এবং মানুষের কাছে আল্লাহর দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার ধৈর্যময় আহ্বান। এই আয়াতও সেই বৃহৎ সুরেরই অংশ। মক্কার পরিবেশে বহু মানুষ ওহীকে গুরুত্ব দিয়ে শুনতে প্রস্তুত ছিল না; তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আহ্বানের ভেতরে সত্যের বদলে শুধু পুরোনো গল্পের ছায়া দেখতে চাইত। নির্ভরযোগ্যভাবে নির্দিষ্ট কোনো একক ঘটনার সঙ্গে এই আয়াতকে বেঁধে বলা না গেলেও, এর পেছনে সেই সামগ্রিক মক্কী বাস্তবতা স্পষ্ট—সত্যের সামনে আত্মসমর্পণ না করে মানুষ কীভাবে বিদ্রূপকে আশ্রয় বানায়।

কিন্তু কুরআনের দৃষ্টি থেমে থাকে না মানুষের অবজ্ঞায়; সে ভাঙা মনকে আবার তাওহীদের দিকে ফেরায়। যে রব আকাশ থেকে বৃষ্টি নামান, মাটি থেকে খাদ্য জাগান, মৌমাছিকে তার স্বভাবগত পথে চালান, তিনি কি তাঁর বান্দার জন্য পথনির্দেশ নাযিল করতে অপারগ? তাই এ আয়াত আমাদের কেবল কাফিরদের জবাব শুনায় না; নিজের অন্তরকেও পরীক্ষা করতে বলে। আমি ওহীর কথা শুনে কৃতজ্ঞ হই, নাকি সন্দেহের পোশাকে তা হালকা করে দেখি? আল্লাহর নাযিলকৃত বাণী কি আমার কাছে জীবনের দীপ্তি, নাকি কেবল ইতিহাসের গল্প? সূরা আন-নাহল আমাদের শেখায়, নিয়ামতকে চেনা মানে ওহীকে সম্মান করা; আর ওহীকে সম্মান করা মানে আল্লাহর সামনে নম্র হয়ে দাঁড়ানো।

মানুষের অন্তর কখনো এমন এক দেয়াল তুলে ফেলে, যেখানে সত্য এসে আঘাত করেও ফিরে যায় অবজ্ঞার শব্দ হয়ে। “তোমাদের রব কী নাযিল করেছেন?”—এ প্রশ্নে তাদের উচিত ছিল থেমে যাওয়া, ভাবা, কৃতজ্ঞ হয়ে শোনা; কিন্তু অহংকারের অন্ধকারে তারা ওহীকে বলল, “পূর্ববর্তীদের কিসসা-কাহিনী।” কত করুণ এই ভঙ্গি! যে বাণী হৃদয়কে জাগাতে আসে, তাকে তারা গল্প বলে উড়িয়ে দেয়; যে কথা আকাশের দিক থেকে নেমে আসে, তাকে তারা মাটির ধুলো মনে করে। আসলে এই জবাব শুধু এক বাক্য নয়, এটি আত্মার রোগের প্রকাশ—সত্যকে বোঝার শক্তি নষ্ট হয়ে গেলে মানুষ আলোর মুখেও ছায়া দেখে।

সূরা আন-নাহলের বড় সুরে নিয়ামতের পর নিয়ামত ছড়িয়ে আছে; মৌমাছির নিখুঁত জীবন, রিজিকের হালাল-হারামের সীমা, তাওহীদের স্বচ্ছ আহ্বান, আর কৃতজ্ঞতার কোমল কিন্তু গভীর ডাক। সেই প্রেক্ষাপটে এই আয়াত যেন বলে দেয়, আল্লাহর দান কেবল শরীরের জন্য নয়, হৃদয়ের জন্যও। ওহী মানুষকে পথ দেখায়, যেন সে জানে কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, কোনটি পবিত্র, কোনটি ক্ষতিকর। কিন্তু যে অন্তর নিজের জিদকে সত্যের চেয়ে বড় করে, সে রবের বাণীর ভেতরও উপদেশ খোঁজে না—বরং অবহেলার অজুহাত খোঁজে। এটাই মানুষের ট্র্যাজেডি: নিয়ামতের ভেতর দাঁড়িয়ে নিয়ামতদাতাকে অস্বীকার করা।
তাই এই আয়াত আমাদের থামিয়ে জিজ্ঞেস করে: আমি যখন কুরআন শুনি, তখন কি আমার হৃদয় কৃতজ্ঞ হয়, নাকি প্রতিরক্ষামূলক হয়ে ওঠে? আমি কি আল্লাহর নাযিল করা বাণীকে সত্যের আলো হিসেবে গ্রহণ করি, নাকি নিজের পছন্দ-অপছন্দের মানদণ্ডে তাকে বিচার করি? দাওয়াতের পথও এখানে শিক্ষা পায়—সত্য বলার পর মানুষের জবাব সবসময় সম্মানের হবে না, কখনো উপহাসও হবে; তবু নবীর পথ ধৈর্যের, কারণ ওহী মানুষের কানের জন্য নয় শুধু, তার অন্তরের জন্য। যে অন্তর বিনয়ী, সে কাহিনীর আড়ালেও হেদায়েত দেখে; আর যে অন্তর জেদি, সে হেদায়েতের ভেতরেও কেবল গল্প খুঁজে ফেরে।

এই আয়াত শুধু মক্কার একদল মানুষের কথা বলে না; এটি প্রতিটি যুগের সেই হৃদয়কেও চিনিয়ে দেয়, যে সত্যের ডাক শুনে আগে বোঝে না, পরে ঠাট্টা করে। যখন রবের পক্ষ থেকে কিছু নাযিল হওয়ার কথা বলা হয়, তখন কৃতজ্ঞ অন্তর বলে—এ তো আমার প্রয়োজনের জবাব, আমার অস্থির আত্মার জন্য আলো। আর অহংকারভরা মন বলে—এ সবই পুরোনো কাহিনী। মানুষ যখন ওহীকে কাহিনী বানিয়ে ফেলে, তখন আসলে সে আকাশকে নয়, নিজের সংকীর্ণতাকেই প্রকাশ করে। কারণ আল্লাহর বাণী কালের ধুলোয় চাপা পড়ার জন্য নাযিল হয় না; তা মানুষের হৃদয়ের জং তুলে দিতে, তাকে সত্যের সামনে দাঁড় করাতে, এবং নি’আমতের মাঝেও রবকে চিনতে শেখাতে নাযিল হয়।

সূরা আন-নাহলের বৃহৎ সুর আমাদের শেখায়, সব নিয়ামতের উৎস একমাত্র আল্লাহ; মৌমাছির ক্ষুদ্র দেহে যেমন তিনি বিস্ময় রেখেছেন, তেমনি ওহীর ছোট্ট একটি বাক্যে তিনি রেখেছেন জীবন বদলে দেওয়ার শক্তি। কিন্তু অবাধ্য হৃদয় নিয়ামত দেখেও কৃতজ্ঞ হয় না, হুকুম শুনেও নরম হয় না, সত্যের সামনে এসে আরো শক্ত হয়ে যায়। তাই এ আয়াত আমাদের নিজেদের দিকে তাকাতে বাধ্য করে: আমি কি আল্লাহর কথা শুনে তার মহত্ত্ব অনুভব করি, নাকি নিজের পছন্দের বাইরে কিছু এলে তাকে হালকা করে দিই? যে অন্তর ওহীকে সম্মান করে, সে ধীরে ধীরে হালাল-হারামের সীমা চিনে নেয়, দাওয়াতের ভাষা আয়ত্ত করে, এবং ধৈর্যের পথে স্থির থাকে; আর যে অন্তর অবজ্ঞায় অভ্যস্ত, সে শেষ পর্যন্ত নিজের অন্ধকারকেই সত্য ভেবে বসে।

আজ এই আয়াত আমাদের সামনে এক কঠিন আয়না ধরে: আমি কি সত্যের কাছে নরম, নাকি অহংকারে কঠিন? আমি কি রবের নাযিল করা বাণীকে হৃদয়ের চিকিৎসা মনে করি, নাকি নিষ্প্রাণ গল্প বলে এড়িয়ে যাই? মানুষের সমাজে যখন কৃতজ্ঞতা কমে যায়, তখন নিয়ামতের মাঝেও অস্বস্তি জন্মায়; আর যখন ওহীকে তুচ্ছ করা শুরু হয়, তখন পথ হারানোকে স্বাভাবিক মনে হতে থাকে। কিন্তু আল্লাহর ডাক এখনো জাগ্রত—ফিরে এসো, শুনো, বোঝো, কৃতজ্ঞ হও। হয়তো আজই সেই মুহূর্ত, যখন হৃদয়কে জিজ্ঞেস করতে হয়: তোমার রব কী নাযিল করেছেন? তুমি কি তার জবাবে বিনয়ের আলো বহন করছ, নাকি অস্বীকারের ধুলো?

কিন্তু ওহীকে “কাহিনী” বলা আসলে কাহিনীর অপমান নয়; এটা নিজের হৃদয়ের দীনতাকে ঢাকার চেষ্টা। কারণ যে অন্তর সত্যের সামনে নত হতে চায় না, সে সত্যকে ছোট করে দেখাতে চায়। আল্লাহর নাযিলকৃত কথা যখন মানুষের অহংকারে আঘাত করে, তখন অনেকেই তাকে অবহেলার ভাষায় সরিয়ে দিতে চায়। অথচ কুরআন এমন কোনো কথা নয় যা সময়ের ধুলোয় হারিয়ে যায়; তা এমন বাণী, যা মৃত হৃদয়কে জাগায়, গাফেল চোখে অশ্রু নামায়, আর বান্দাকে ফিরিয়ে আনে তার রবের দিকে। সূরা আন-নাহলের নিয়ামতের বিস্তৃত আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে এই আয়াত যেন আমাদের বলছে: যে ব্যক্তি আল্লাহর দান দেখে কৃতজ্ঞ হয় না, সে আল্লাহর বাণী শুনেও সত্য চিনতে পারে না।

আজও মানুষ ভিন্ন ভাষায় সেই একই ভুল করে। কেউ কুরআনকে দূরের গল্প ভাবে, কেউ কুরআনের হুকুমকে নিজের পছন্দ-অপছন্দের তুলাদণ্ডে মাপে, কেউ হালাল-হারামের সীমাকে কঠিন মনে করে, কেউ দাওয়াতের কণ্ঠকে তুচ্ছ করে। কিন্তু মুমিনের পরিচয় অন্য জায়গায়। মুমিনের হৃদয় বলে, ‘রব আমার জন্য যা নাযিল করেছেন, তাতেই আমার নূর, আমার পরিশুদ্ধি, আমার মুক্তি।’ এই ঈমানই মানুষকে নরম করে, বিনয়ী করে, ধৈর্যশীল করে। আর যে নবীর পথ বেছে নেয়, সে জানে—সত্যের পথে উপহাস থাকবে, কিন্তু শেষ বিচারে কাহিনী নয়, কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর সত্যটাই আসল। তাই আজ অন্তরকে প্রশ্ন করো: আমি কি ওহীকে শ্রদ্ধা করছি, নাকি নিজের অহংকারকে বাঁচাতে তাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছি? যদি হৃদয় কঠিন হয়ে যায়, তবে দেরি না করে রবের কাছে ফিরে আসো। কারণ আল্লাহর কথা কখনো পুরোনো হয় না; পুরোনো হয় কেবল মানুষের অমনোযোগ।